মুহম্মদ আবুল হায়াত, নরসিংদী

সংখ্যা: ২০৬তম সংখ্যা | বিভাগ:

সুওয়াল: বেশি লোককে যাকাত দেয়ার জন্য কম দামের খদ্দরের লুঙ্গি ও পাতলা শাড়ি কাপড় যাকাত হিসেবে দিলে যাকাত আদায় হবে কি না?

জাওয়াব: কম দামের খদ্দরের লুঙ্গি ও পাতলা শাড়ি কাপড় যাকাত হিসেবে দিলে যাকাত কস্মিনকালেও আদায় হবে না। কারণ শরীয়ত তথা কুরআন ও সুন্নাহর ফতওয়া হলো যেটা সবচেয়ে ভাল, পছন্দনীয় ও মূল্যবান সেটাই দান করতে হবে। আর যেটা খারাপ, নি¤œমানের ও নি¤œমূল্যের সেটা দান করা যাবে না। অর্থাৎ যাকাত তথা দান-ছদকার বস্তু যেমন হালাল হওয়া শর্ত তেমনি তা উৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে মূল্যবান হওয়াও শর্ত। অন্যথায় তা আল্লাহ পাক-উনার নিকট আদৌ কবুলযোগ্য নয়।

এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফে বর্ণিত রয়েছে-

عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما تصدق احد بصدقة من طيب ولا يقبل الله عز وجل الا الطيب.

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি পবিত্র বা উৎকৃষ্ট বস্তু হতে দান করলো। আর আল্লাহ পাক তো পবিত্র বা উৎকৃষ্ট ব্যতীত কোন কিছুই কবুল করেন না। (বুখারী শরীফ)

ছহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত রয়েছে, আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, হাশরের ময়দানে বিচারের জন্য সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে। তারমধ্যে একজন হলো সম্পদশালী। যাকে অনেক সম্পদ দান করা হয়েছে। আল্লাহ পাক তাকে বলবেন, হে ব্যক্তি! আমি তোমাকে দুনিয়াতে অনেক সম্পদের মালিক করেছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কি আমল করেছো? সে ব্যক্তি বলবে, আয় আল্লাহ পাক! আপনার পছন্দনীয় এমন কোন পথ নেই যে পথে আমি দান খয়রাত করিনি। অর্থাৎ আপনি যতগুলো রাস্তা পছন্দ করতেন মসজিদ, মাদরাসা, লঙ্গরখানা, ইয়াতীমখানা, গরীব-মিসকীন, ফকীর-ফুক্বারা, ইয়াতীম-অনাথ, রাস্তা-ঘাট, পুল-ব্রীজ, পানির ব্যবস্থা ইত্যাদি সব জায়গায় আমি কম-বেশি দান করেছি। কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেইনি। সবাইকে দান করেছি একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য। আল্লাহ পাক বলবেন, মিথ্যা কথা। তুমি আমার জন্য করনি। বরং তুমি এজন্য করেছ যে, লোকেরা তোমাকে দানশীল বলবে। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। আল্লাহ পাক তখন ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের আদেশ করবেন, হে ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম আপনারা এ দানশীল ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করুন। ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা তৎক্ষনাত তাকে চুলে ধরে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। নাঊযুবিল্লাহ!

কাজেই, দান-ছদক্বা, যাকাত-ফিতরা সবকিছু করতে হবে একমাত্র আল্লাহ পাক-উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে। গইরুল্লাহ’র জন্য কোন আমল করা যাবে না। মানুষ দানশীল বলবে, দানবীর বলবে, দাতা বলবে, মানুষ জানবে, চিনবে, সমাজে নামধাম হবে, প্রচার-প্রসার ঘটবে, পরিচিতি হবে, যশ-খ্যাতি অর্জিত হবে, সমাজের অধিপতি হওয়া যাবে, নেতা-নেত্রী হওয়া যাবে, মসজিদের সেক্রেটারী, সভাপতি হওয়া যাবে, এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, মন্ত্রী-মিনিষ্টার হওয়া যাবে ইত্যাদি সবই হলো গইরুল্লাহ।

এই গইরুল্লাহ’র উদ্দেশ্য থাকার দরুণ দেখা যায়, বেশি লোককে যাকাত দেয়ার জন্য তারা কম দামের খদ্দরের পাতলা লুঙ্গি ও পাতলা শাড়ি দিয়ে থাকে যা সাধারণভাবে পড়ার উপযুক্ত নয়। কারণ সে লুঙ্গি ও শাড়ি যাকাত দানকারী ও দানকারিণী পরিধান করতে কখনই রাজি হবে না বা পছন্দ করবে না। যদি তাই হয়, যেটা যাকাত দানকারী ও দানকারিণী নিজেরা গ্রহণ করতে রাজী নয় সেটা আল্লাহ পাক কি করে গ্রহণ করবেন? মূলত সে দান আদৌ আল্লাহ পাক-উনার নিকট গৃহীত হবে না। আল্লাহ পাক তা পরিষ্কার কালাম পাকে জানিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-

لن تنالوا البر حتى تنفقوا مما تحبون. وما تنفقوا من شىء فان الله به عليم.

অর্থ: তোমরা কখনই নেকী, কল্যাণ হাছিল করতে পারবে না, যে পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রিয় বা পছন্দনীয় বস্তু দান করবে। এবং তোমরা যা কিছু দান করো সে সম্পর্কে আল্লাহ পাক অবশ্যই পূর্ণ খবর রাখেন। (সূরা আলে ইমরান-৯২)

আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ করেন-

يايها الذين امنوا انفقوا من طيبت ما كسبتم ومما اخرجنا لكم من الارض ولا تيمموا الخبيث منه تنفقون ولستم باخذيه الا ان تغمضوا فيه واعلموا ان الله غزيز حميد.

অর্থ: æহে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো এবং নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে নিয়ত বা মনস্থ করো না। কেননা তোমরা তা অনিচ্ছাকৃত ব্যতীত গ্রহণ করবে না। জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তিনি অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।” (সূরা বাক্বারা: আয়াত শরীফ-২৬৭)

এখানে সম্পদের যাকাত, ফিতরা ও জমির ফসলের উশর ইত্যাদি ফরয, ওয়াজিব, নফল সকল প্রকার দান-ছদক্বার কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ যেটা উত্তম উৎকৃষ্ট, মূল্যবান সেটাই দিতে হবে। যেটা নিকৃষ্ট, নি¤œমানের, নি¤œমূল্যের সেটা দেয়া তো দূরের কথা সেটা দেয়ার কল্পনা বা চিন্তা করাও যাবে না। কেননা খারাপটা কেউই গ্রহণ করতে চায় না। তাহলে আল্লাহ পাক সেটা কি করে গ্রহণ করবেন। এখন কেউ যদি চোখ বন্ধ করে নিজের খেয়াল খুশি মতো সেটা দিয়ে দেয় সেক্ষেত্রে আল্লাহ পাক জানিয়েছেন দেখো, আল্লাহ পাক তোমাদের এসব দানের মুখাপেক্ষী নন। তিনি গণী বা অভাবমুক্ত এবং হামীদ বা চরম প্রশংসিত।

অতএব, যেটা সবচেয়ে ভাল, পছন্দনীয় ও মূল্যবান সেটাই যাকাত হিসেবে দান করতে হবে। অন্যথায় তা আল্লাহ পাক উনার নিকট আদৌ কবুলযোগ্য হবে না। (সমূহ হাদীছ, তাফসীর ও ফিক্বাহর কিতাব দ্রষ্টব্য)

 

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।