মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৬১)

সংখ্যা: ২০২তম সংখ্যা | বিভাগ:

প্রসঙ্গ : স্বীয় শায়খ বা মুর্শিদ ক্বিবলা-উনার মুহব্বত ও সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত দশটি মাক্বাম হাছিল করার কোশেশ করবে।

 

রিয়াযত-মাশাক্কাত করার কুওওয়াত বা শক্তি হাছিলের উপায়

(গত সংখ্যার পর)

পেট

সালিক বা মুরীদকে পেটের রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। পেটের সংশোধন তার জন্যে অপরিহার্য। সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে ইছলাহ বা  সংশোধনের দিক থেকে এটা সবচেয়ে কঠিন ক্ষেত্র। দুঃখ-কষ্ট ও ব্যতিব্যস্ততা সৃষ্টির ব্যাপারে পেটের স্থান সবার ঊর্ধ্বে। আর ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টির ক্ষেত্রে মারাত্মক। কারণ, এটি হলো গোটা দেহের সব কিছুর উৎস ও আকর। সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সম্পর্ক পেটের সাথে জড়িত। সবলতা-দুর্বলতা এবং সজ্জলতা ও নির্লজ্জতা এর কারণেই দেখা দেয়। এর আপদ বা ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে হলে প্রথমে হারাম ও সংশয়পূর্ণ খানা-পিনা থেকে একে রক্ষা করতে হবে। তারপর আল্লাহ পাক তিনি তাওফীক দিলে প্রয়োজনাতিরিক্ত হালাল বস্তু থেকেও একে বাঁচাতে হবে। হারাম ও সংশয়পূর্ণ বস্তু থেকে তিনভাবে পেটকে রক্ষা করা চলে।

এক: জাহান্নামের আগুন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আল্লাহ পাক তা থেকে বাঁচতে বলেছেন-

তিনি ইরশাদ করেন-

ان الذين ياكلون اموال اليتمى ظلما انما ياكلون فى بطونهم نارا. وسيصلون سعيرا.

অর্থ: æনিশ্চয়ই যারা জোর-জুলুম করে ইয়াতীমের সম্পদ খায়, তারা যেন আগুন দ্বারা তাদের পেটকে ভর্তি করে। অতি শীঘ্রই তারা আগুনে প্রবেশ করবে।” (সূরা নিসা : আয়াত শরীফ-১০)

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-

كل لحم نبت من سحت كانت النار اولى به

অর্থ: হারামের দ্বারা সৃষ্ট গোশত জাহান্নামের যোগ্য। (মিশকাত শরীফ)

দুই: হারাম ও সন্দেহযুক্ত বস্তু ভক্ষণকারী মরদুদ। সে আল্লাহ পাক উনার ইবাদতের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। কারণ, আল্লাহ পাক উনার ইবাদত-বন্দেগী পবিত্র ব্যক্তিই করতে পারে। আল্লাহ পাক কি অপবিত্র ব্যক্তিকে মসজিদে যেতে ও বিনা ওযুতে কুরআন শরীফ স্পর্শ করতে নিষেধ করেননি? আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

ولا جنبا الا عابرى سبيل حتى تغتسلوا

অর্থ: আর অপবিত্র হলে গোসল না করে নামাযের নিকটে যেয়োনা। তবে মুসাফির হলে ভিন্ন কথা। (কারণ মুসাফির অবস্থায় গোসলের সম্ভব না হলে তায়াম্মুম করতে পারবে) (সূরা নিসা: আয়াত শরীফ-৪৩)

আল্লাহ পাক তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন-

لا يمسه الا المطهرون

অর্থ: æপবিত্রতা অর্জন না করে কেউ কুরআন শরীফ স্পর্শ করবে না।” (সূরা ওয়াক্বিয়া : আয়াত শরীফ-৭৯)

অথচ হাদছ বা জানাবাত নাপাকী বৈধ কাজ থেকেই দেখা দেয়। সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি হারাম ও সন্দেহযুক্ত বস্তু খেয়ে অপবিত্র হয়েছে সে কি করে অনুমতি পাবে? সে কি করে মহান ও পবিত্রতম সত্তার ইবাদতে নিয়োজিত হবে? উনার পবিত্র নাম মুবারক কিছুতেই সেই অপবিত্র মুখে উচ্চারিত হতে পারে না।

হযরত ইয়াহিয়া ইবনে মায়াজ রাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ইবাদত-ইতায়াত (আনুগত্যতা) আল্লাহ পাক উনার কোষাগারে সুরক্ষিত রয়েছে। তার চাবি হলো দোয়া। তার তালা হলো হালাল রুজী। তালাই যদি লাগানো না গেল, তো চাবি দিয়ে কি হবে? কি করে সে ইতায়াত ও ইবাদতের দ্বার উন্মোচন করবে?

তিন: হারাম ও সন্দেহযুক্ত বস্তু ভক্ষণকারী ভাল কাজ থেকে দূরে থাকে। আর যদি কোন কল্যাণকর কাজের তাওফীক পেয়েও যায়, তাও আল্লাহ পাক উনার দরবারে কবুল হয় না। কাজেই, সে সময়ে তার নাফরমানী, কঠোরতা ও সময়ে অপচয় ব্যতীত কিছুই দেখা যাবেনা।

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন. খাতামুন নাবিয়্যীন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, æরাত জেগে ইবাদতকারীদের অনেকেই শুধু জাগাই সার হয়, কোন ফল হয় না। তেমনি অনেক রোযাদারদের উপোস থাকা ও পিপাসায় কাতর হওয়াই সার হয়, রোযা হয় না।” (দারেমী)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে। যার পেটে হারাম বস্তু আছে, আল্লাহ পাক উনার দরবারে তার ইবাদত কবুল হয় না। কাজেই, এসব ব্যাপারে অত্যন্ত ভেবে চিন্তে চলা দরকার।

বেশি খাওয়ার দশ বিপদ: মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হুজ্জাতুল ইসলাম, ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, বেশি খাওয়া সালিক বা মুরীদের জন্য বিপদের কারণ। এবং সাধকের জন্য তা পরীক্ষা স্বরূপ। আমি ভেবে চিন্তে তাতে দশটি আপদ দেখতে পেয়েছি।

এক: অতিরিক্ত ও লোভনীয় খানা-পিনা অন্তরকে কঠিন করে ও অন্তরের আলো নিভিয়ে দেয়। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-

لا تميتوا القلب كثرت الطعام ولشراب فان القلب ليموت كالزوع اذا كثر عليه الماء

অর্থ: æঅতিরিক্ত খানা-পিনার দ্বারা অন্তরকে মেরে ফেলো না। বেশি পানি যেরূপ শস্যকে নষ্ট করে তেমনি অতিরিক্ত খাদ্য অন্তরকে ধ্বংস করে।”

কোন কোন পুণ্যবান ব্যক্তিত্ব এরূপ উপমা দিয়ে ব্যাপারটি বুঝিয়েছেন যে, পাকস্থলী অন্তরের নিচে বসানো একটি উত্তপ্ত ডেকচি বা পাতিল। তার তাপ অন্তরে লাগে এবং বেশি লাগলে তা নষ্ট ও বিষাক্ত হয়ে যায়। (মিনহাজুল আবিদীন-১৩৭)

দুই: বেশি খানা-পিনা গোটা দেহকে আপদে ডুবিয়ে রাখে। শরীরকে বাজে ও ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত রাখে। কারণ, মানুষ যখন বেশি খাওয়ার লোভে লিপ্ত থাকে তখন হালাল-হারাম বেছে চলতে পারে না। তখন তার চোখ হারামের মধ্যে তৃপ্তি লাভের পথ খুঁজতে থাকে। কান অন্যায় কথা শুনতে রাজি হয়, জিহবা ও লজ্জাস্থান নির্লজ্জ কথা ও কাজে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ হয়। পা দুটো পাপ পথে চলতে আগ্রহী হয়। পক্ষান্তরে কম খেয়ে কোন মতে বেঁচে চললে তার সব অবয়ব দুর্বল থাকে এবং ওসব বাজে অনাচারের জন্যে উৎসাহ বোধ করে না। তাই সে সৎ পথে চলতে বাধ্য হয়।

হযরত আবু জা’ফর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, পেটে যদি ক্ষুধা থাকে তো সব অঙ্গই ক্লান্ত থাকে, বাসনা-কামনা দেখা দেয় না। যদি পেট ক্ষান্ত ও তৃপ্ত হয়, তাহলে সব অঙ্গে ক্ষুধা জেগে উঠে।

মোটকথা, মানুষের কথা ও কাজের সাথে খানা-পিনা প্রভাব জড়িত। পেটে যদি হারাম বস্তু প্রবেশ করানো হয়, তাহলে হারামই প্রকাশ পাবে এবং বাহুল্য বস্তু দিলে, বাহুল্য কাজই দেখা দিবে। খানা-পিনা যেন মানুষের কথা ও কাজের বীজ।

তিন: বেশি খাওয়া-দাওয়ায় বুদ্ধি-বিবেক লোপ পায় । হযরত দুররানী রহমতুল্লাহি আলাইহি যথার্থই বলেছেন, দুনিয়া ও আখিরাতের কোন কাজ যদি তুমি উদ্ধার করতে চাও, তাহলে তা করার আগে কিছু খেও না। কারণ, খাবারের সাথে সাথে তোমার বুদ্ধি অন্যরূপ ধারণ করে। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সত্য বটে। কারো ইচ্ছে হলে পরীক্ষা করে দেখতে পারে।

চার: বেশি খেলে ইবাদত কম হয়। বেশি খেলে দেহ ভার হয়, চোখ অলস মদির ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অবসাদগ্রস্ত হয়। তখন শোয়া ছাড়া কোন পথ থাকে না। চেষ্টা করেও কর্মে তৎপর হওয়া যায় না। তাই বলা হয় বেশি খেলে নির্জীব হতে হয়।

আল্লাহ পাক উনার নবী হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত আছে, একদিন শয়তান এসে উনার কাছে রূপ ধরে দাঁড়াল। তার হাতে কতগুলো কাঠি ছিল। হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম প্রশ্ন করলেন, এ সব কি? শয়তান উত্তর দিল, এগুলো রিপু ও আকাঙ্খার কাঠি। এগুলো দিয়েই মানুষ শিকার করি। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, এতে আমার জন্যে কিছু রয়েছে কি? শয়তান বললো না, তবে একরাতে আপনার উম্মতের মধ্যে একজন দরবেশ, যে পেট পুরে কিছু খেয়েছিল। যার কারণে তার নামাযে কিছু গাফলতি সৃষ্টি করে দিয়েছিলাম। তিনি তখন বললেন, নিশ্চয়ই আমি কখনো পেট পুরে খাব না। শয়তান তখন বলে উঠল, নিশ্চয়ই এরপর থেকে কাউকে আমি আর কোন রহস্য জানাবো না।

এ তো গেল সেই নবী আলাইহিস সালাম উনার উম্মতের দরবেশের কথা, জীবনে যিনি একবার মাত্র তৃপ্তি মিটিয়ে খেয়েছিলেন। তাহলে জীবনে যারা এক বেলাও ভুখা থাকেনি, তাদের ইবাদতের অবস্থা কি? ইমামুল মুহাদ্দিছীন হযরত ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ইবাদত এমন এক ব্যবসা যার দোকান হলো নিঃসঙ্গতা ও রসদ বা মালামাল হলো ক্ষুধা। (অসমাপ্ত)

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০৩) হুসনুল খুল্ক্ব বা সচ্চরিত্রবান মুরীদই শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সর্বাধিক নৈকট্যশীল ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত।

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০২) হুসনুল খুলক বা সচ্চরিত্রবান মুরীদই শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সর্বাধিক নৈকট্যশীল ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত।

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০৮)

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০৭)

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০১) হুসনুল খুল্ক্ব বা সচ্চরিত্রবান মুরীদই শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সর্বাধিক নৈকট্যশীল ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত।