এক মসজিদের জনৈক খতীব কর্তিক কিছু ভুল ও আপত্তিকর বক্তব্যের শরয়ী ফায়সালা

সংখ্যা: ২২০তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ রুহুল আমীন

উত্তর শাহজাহানপুর, ঢাকা

 সুওয়াল : ঢাকা শহরের এক মসজিদের জনৈক খতীব বিভিন্ন সময় জুমুয়ার বয়ানে এমন কিছু বক্তব্য প্রদান করেন, যে বক্তব্যগুলি মুছল্লীদের দৃষ্টিতে ভুল এবং আপত্তিকর বলে মনে হয়েছে। বক্তব্যগুলি আসলেই ভুল ও আপত্তিকর হয়ে থাকলে উক্ত খতীবের পিছনে নামায পড়া ঠিক হবে কি-না? পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

খতীবের আপত্তিকর বক্তব্যসমূহ নিম্নরুপ:

১। ফেরেশতা আলাইহিমুস সালামগণ উনারা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে সিজদা করেননি, উনারা সিজদা করেছেন মহান আল্লাহ পাক উনাকে। হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি ছিলেন ক্বিবলা।

২। বিভিন্ন সময় নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শানে ‘জনাবে মোস্তফা’ শব্দ ব্যবহার করছেন।

৩। হযরত আদম আলাইহিস সালাম হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনার পিতা।

৪। জিনাকারী যার সাথে জেনা করেছে তার কাছে মাফ চাইলে মহান আল্লাহ পাক তিনি মাফ করে দিবেন।

৫। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তিনি উনার মায়ের পেটে এক ঘণ্টা ছিলেন।

৬। সকল নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি পরীক্ষা করেছেন, তেমনি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকেও মহান আল্লাহ পাক তিনি অনেক পরীক্ষা করেছেন।

৭। একদিন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একজন ছাহাবী উনাকে মেরেছেন। ওই ছাহাবী তিনি রাগ হয়ে গেলে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন তুমি এখন কি করবে? ওই ছাহাবী তিনি বললেন, আমি এর প্রতিশোধ নিব। হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার হাতে লাঠি দিলেন। ওই ছাহাবী তিনি বললেন, আমার গায়ে জামা নেই। আপনার গায়ে জামা আছে। হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজ শরীর মুবারক-এর জামা মুবারক খুললেন। তখন ওই ছাহাবী হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পেটে চুমু দিয়ে দিলেন।

৮। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনার পায়ে যখন তীর বিদ্ধ হলো, তীর খুলতে না পারায় তিনি নিজেই বললেন: আমি যখন নামাযে দাঁড়াব তখন তোমরা আমার তীর খুলে ফেলবে। কারণ আমার নামাযে খুব ধ্যান হয়।

৯। জুমুয়ার খুতবায় তিনি দীর্ঘদিন বাম হাতে লাঠি ব্যবহার করেছেন। কেউ প্রশ্ন করলে জবাব দেন, বাম হাতে লাঠি ব্যবহার করা সুন্নত। আর ডান হাতে খুতবার কিতাব থাকবে।

১০। তিনি বিভিন্ন সময় নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শানে “মায়ের পেট বা মায়ের পেটে ছিলেন”, এরকম বক্তব্য দিয়েছেন। কথাটা আদবের খিলাফ কিনা?

১১। কারবালার ময়দানে ইয়াযীদের সন্তান হুর ইবনে ইয়াযীদ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার পক্ষে জিহাদ করে শাহাদাত বরণ করেছেন। ঘটনাটি কি সত্য?

১২। গত ০১.০৮.২০১২ ঈসায়ী তারিখে একটি টিভি চ্যানেলে এক মহিলার প্রশ্নের উত্তরে উক্ত খতীব সাহেব বলেছেন, শুধু মহিলারা একজন মহিলার ইমামতিতে নামায আদায় করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুরুষ ইমাম যেমন এক সিজদার সামনে দাঁড়ায় মহিলা ইমাম সেভাবে নয় বরং একই কাতারে মাঝখানে একটু সামনে মহিলা ইমাম দাঁড়াবে।

১৩। অন্য একদিন একই টিভি চ্যানেলে বিতরের নামায প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে উক্ত খতীব সাহেব বলেছেন যে, হযরত জিবরীল আলাইহিস উনার নূরানী পাখার সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার।

জাওয়াব : সুওয়ালে উল্লেখিত খতীবের আপত্তিকর বক্তব্যসমূহের মধ্যে কিছু বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে ভুল ও চরম আপত্তিকর; যা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের বর্ণনার সুস্পষ্ট খিলাফ বা বিরোধী হওয়ার কারণে কুফরী হয়েছে। কিছু বক্তব্য ভুল হওয়ার পাশাপাশি চরম বিভ্রান্তিকর। কিছু বক্তব্য বর্ণনা ও ভাষাগত ভুল। কিছু বক্তব্য চরম অজ্ঞতার শামিল।

বক্তব্যগুলির সঠিক জাওয়াব ধারাবাহিকভাবে অত্র যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ-এ প্রদান করা হলো।

 

৬নং সুওয়াল তার জাওয়াব

  সুওয়াল: সকল নবী আলাইহিমুস সালাম উনাকে যেমন আল্লাহ পাক পরীক্ষা করেছেন তেমনি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকেও মহান আল্লাহ পাক তিনি অনেক পরীক্ষা করেছেন।

জাওয়াব: সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করার বিষয়টি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ক্ষেত্রে সে অর্থে ব্যবহৃত হবে না। কেননা হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে মনোনীত অর্থাৎ উনাদেরকে নবী ও রসূল হিসেবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

الله يصطفى من الـملائكة رسلا ومن الناس

অর্থ: মহান আল্লাহ পাক তিনি ফেরেশতাদের মধ্য থেকে এবং মানুষদের মধ্য থেকে রসূল মনোনীত করেছেন। (পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭৫)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরও ইরশাদ মুবারক করেন-

الله اعلم حيث يجعل رسالته

অর্থ: মহান আল্লাহ পাক তিনি সমধিক জ্ঞাত কাকে রসূল মনোনীত করবেন। (পবিত্র সূরা আনআম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১২৪)

পৃথিবীতে প্রথম আগমনকারী নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে মহান আল্লাহ পাক যমীনে উনার খলীফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করা ও পাঠানোর বিষয়ে হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের জানালে, হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা স্বাভাবিকভাবে উনাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে মারামারি কাঁটাকাঁটি ও রক্ত প্রবাহিত করার বিষয়টি উল্লেখ করলে মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি যা জানি আপনারা তা জানেন না। অতঃপর মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে মহান আল্লাহ পাক উনার নবী, রসূল ও খলীফা করে সৃষ্টি করেন। অনুরূপভাবে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে উনার নুবুওওয়াত প্রাপ্তির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

كنت نبيا وادم بين الـماء والطين وفى رواية بين الروح والجسد

অর্থ: “আমি ঐ সময়েও নবী হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি যখন মাটি ও পানির মধ্যে ছিলেন। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, রূহ ও শরীরের মধ্যে ছিলেন।” অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে সৃষ্টির বহু আগে থেকেই তথা সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ পাক তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে নবী ও রসূল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।

উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে প্রতিভাত হলো, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা সৃষ্টির শুরু থেকেই মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে মনোনীত।

এরপর হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই ওহী মুবারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেমন এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

نوحى اليهم

অর্থ: আমি উনাদের (হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম) প্রতি ওহী মুবারক প্রেরণ করি।

আর বিশেষ করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারক-এ মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وما ينطق عن الـهوى ان هو الا وحى يوحى

অর্থ: তিনি ওহী মুবারক ব্যতীত নিজ থেকে কোন কথা বলেন না।

প্রতিভাত হলো, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা যেমনিভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে মনোনীত হয়ে সৃষ্টি হয়েছেন তদ্রুপ উনারা পরিপূর্ণরূপে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রদত্ব ওহী মুবারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

কাজেই, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি বিষয় ওহী মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ উনাদের অসুস্থ হওয়া, কষ্ট-তাকলীফ বরদাশত করা, কাফিরদের অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করা, জিহাদ করা, শাহাদাত বরণ করা ইত্যাদি সবই উনাদের নুবুওওয়াত ও রিসালাত উনাদের হাক্বীক্বত প্রকাশ যা বান্দা-বান্দী ও উম্মত সকলের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ।

মূল কথা হলো, হযরত নবী-রসুল আলাইহিমুস সালাম উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশ বা ইচ্ছার উপর পরিপূর্ণরূপে নিবেদিত বা ফানা ও বাক্বা ছিলেন। উনাদের নিজস্ব কোন ইখতিয়ার বা ইচ্ছা এবং নিজস্ব কোন মত মুবারক-পথ মুবারক ছিল না।

কাজেই, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পরীক্ষা করা হয়েছে একথাটি শুদ্ধ নয়। বরং উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশ মুবারক পালনে অত্যন্ত দৃঢ় ছিলেন সে বিষয়টি উম্মতকে জানানো যাতে উম্মতরাও হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি আক্বীদা বিশুদ্ধ করে উনাদেরকে অনুসরণ করে মহান আল্লাহ পাক উনার বিধানসমূহ দৃঢ়তার সাথে পালন করে হাক্বীক্বী রিযামন্দি মুবারক হাছিল করতে পারে।

 

৭নং সুওয়াল তার জাওয়াব

 সুওয়াল: একদিন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একজন ছাহাবী উনাকে মেরেছেন ওই ছাহাবী তিনি রাগ হয়ে গেলে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, তুমি এখন কি করবে? ওই ছাহাবী তিনি বললেন, আমি এর প্রতিশোধ নিব। হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার হাতে লাঠি দিলেন। ওই ছাহাবী তিনি বললেন, আমার গায়ে জামা নেই। আপনার গায়ে জামা আছে। হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শরীর মুবারকের জামা মুবারক খুললেন। তখন ওই ছাহাবী হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পেটে চুমু দিয়ে দিলেন।

জাওয়াব: উল্লেখিত বক্তব্যটি চরম আপত্তিকর ও বেয়াদবিমূলক। প্রকৃতপক্ষে হাদীছ শরীফ উনার বর্ণনাটি ঐরকম নয়।

যেমন হাদীছ শরীফ উনার বর্ণনাটি হচ্ছে-

عن حضرت اسيد بن حضير رضى الله تعالى عنه رجل من الانصار قال بينما هو يحدث القوم وكان فيه مزاح بينا يضحكهم فطعنه النبى صلى الله عليه وسلم فى خاصرته بعود فقال اصبرنى قال اصطبر قال ان عليك قميصا وليس على قميص فرفع النبى صلى الله عليه وسلم عن قميصه فاحتضنه وجعل يقبل كشحه فقال انما اردت هذا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم.

 অর্থ: হযরত উসাইদ ইবনে হুদ্বাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি একদা লোকদের মাঝে ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। উনার বর্ণনায় হাসির নিদর্শন ছিল, তিনি লোকদেরকে হাসাচ্ছিলেন। এমন সময় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক খ- কাঠি দ্বারা উনার কোমরে খোঁচা দিলেন। তখন হযরত উসাইদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, আপনি আমাকে খোঁচা দিয়েছেন। সুতরাং আমাকেও সুযোগ দিন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আচ্ছা সুযোগ গ্রহণ করুন। তখন হযরত উসাইদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, আপনার শরীর মুবারকে তো জামা মুবারক আছে, অথচ আমার শরীরে জামা নেই। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার শরীর মুবারক-এর জামা মুবারকটি তুলে ধরলেন, আর অমনি হযরত উসাইদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং উনার পার্শ্বদেশে চুম্বন দিতে লাগলেন আর বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইহাই আমার ইচ্ছা ছিল। (আবূ দাউদ শরীফ)

এ হাদীছ শরীফ উনার বর্ণনার মাধ্যমে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উম্মতকে এ বিষয়টি শিক্ষা দিলেন যে, লোকজনকে হাসানোর উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেয়া বা ওয়াজ করা জায়িয নেই। এ কারণে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উক্ত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে কাঠি দিয়ে খোঁচা দিয়েছিলেন। আর এতে উক্ত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি আদৌ রাগান্বিত হননি। বরং উনাকে খোঁচা দেয়ার সুযোগ নেয়ার কথা বলে তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূরানী দেহ মুবারকে সরাসরি চুম্বন করে বিশেষ ফযীলত লাভ করেন। সুবহানাল্লাহ!

উল্লেখ্য, কোন মুসলমানের পক্ষেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি রাগান্বিত হওয়া সম্ভব নয়। কেউ হলে সে মুসলমান থাকতে পারে না। নিঃসন্দেহে সে কাফিরের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি এবং সমস্ত মানুষ অপেক্ষা এমনকি তার ধন-সম্পদ এবং তার জীবনের থেকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সবচেয়ে বেশি মুহব্বত না করবে। (মিশকাত শরীফ)

তাহলে একজন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি একথা কি করে বলা যেতে পারে যে, তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি রাগ হয়ে গেলেন! অথচ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে তো রাগ হওয়ার বিষয়টি মোটেও নেই।

প্রথমত: এটা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বর্ণনার মধ্যে হেরফের বা পরিবর্তন করা হলো। দ্বিতীয়ত: হযরত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি দোষারোপ করা হলো। অথচ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের প্রতি দোষারোপ করা, বিদ্বেষ পোষণ করা কুফরী এবং কাফিরেরাই সেটা করে থাকে। যেমন এ প্রসঙ্গে সূরা ফাতহ্ শরীফ উনার ২৯নং আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ليغيظ بهم الكفار

অর্থাৎ- কেবল কাফিরেরাই উনাদের (হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে বা দোষারোপ করে থাকে।

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

من غاظ اصحاب محمد صلى الله عليه وسلم فهو كافر

অর্থ: যে ব্যক্তি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের প্রতি বিদ্বেষ বা দোষারোপ করে সে কাফির। (নাসীমুর রিয়াদ্ব)

অপর এক হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اذا رايتم الذين يسبون اصحابى فقولوا لعنة الله على شركم

অর্থ: যখন তোমরা কাউকে দেখবে যে, সে আমার ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে গালি দিচ্ছে বা দোষারোপ করছে তখন তোমরা বলবে, এ মন্দ কাজের জন্য তোমাদের প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত বর্ষিত হোক। (তিরমিযী শরীফ)

অর্থাৎ, ইবলীস যেরূপ মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে লা’নতগ্রস্ত হয়ে মালউন বা অভিশপ্ত তদ্রুপ যে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের কাউকে দোষারোপ করে, সেও ইবলীসের মতোই মালউন বা অভিশপ্ত হবে এবং ইবলীসের পরিণতির মতোই তারও পরিণতি হবে অর্থাৎ চিরজাহান্নামী হবে। নাউযুবিল্লাহ!

 

৮নং সুওয়াল তার জাওয়াব

 
সুওয়াল: হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার পায়ে যখন তীর বিদ্ধ হলো, তীর খুলতে না পারায় তিনি নিজেই বললেন, আমি যখন নামাযে দাঁড়াব তখন তোমরা আমার তীর খুলে ফেলবে। কারণ আমার নামাযে খুব ধ্যান হয়।

জাওয়াব: এ বক্তব্যটিও তার শুদ্ধ হয়নি। কারণ তীর খোলার বিষয়ে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি নিজের নামাযে ধ্যান হওয়ার কথা নিজে প্রকাশ করেননি। বরং তীর খোলার সময় তিনি যখন ভীষণ ব্যাথা অনুভব করছিলেন তখন স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে বললেন যে, হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি যখন নামাযে দাঁড়াবেন তখন আপনারা তীর খোলার কাজটি সম্পন্ন করে ফেলবেন। সত্যিই তিনি যখন নামাযে দাঁড়ালেন তখন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উনার পা মুবারকে বিদ্ধ তীরটি অনায়েসে খুলে ফেললেন, এতে তিনি কোন আওয়াজ বা কষ্টই অনুভব করলেন না।

এ ঘটনায় নামাযে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার পরম দীদার বা হুযূরী পয়দা হওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। যেটা হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে ইহসান কি? সে জিজ্ঞাসার জাওয়াবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

ان تعبد الله كانك تراه فان لـم تكن تراه فانه يراك.

অর্থ: তুমি এমনভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করো যেনো তুমি উনাকে দেখছ। আর যদি উনাকে দেখতে না পাও তাহলে ধারণা করো যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।

এ হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় হযরত মুহাদ্দিছীনে কিরাম ইহসান উনার দুটি স্তর বর্ণনা করেছেন। প্রথম স্তর হচ্ছে- বান্দা মহান আল্লাহ পাক উনাকে দেখে দেখে ইবাদত করবে। আর দ্বিতীয় স্তর হলো- বান্দা এ ধারণা নিয়ে ইবাদত করবে যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে দেখছেন।

এ দুই স্তরের হুযূরী ব্যতীত বান্দার ইবাদত-বন্দেগী মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে কবুল হবেনা।

বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার হুযূরী ছিল প্রথম স্তরের হুযূরী। যে কারণে নামাযের মধ্যে উনার পায়ে বিদ্ধ তীর খোলা সত্বেও তিনি টেরই পাননি। সুবহানাল্লাহ!

 

৯নং সুওয়াল তার জাওয়াব

 

সুওয়াল: জুমুয়ার খুতবায় তিনি দীর্ঘদিন বাম হাতে লাঠি ব্যবহার করেছেন। কেউ প্রশ্ন করলে জবাব দেন, বাম হাতে লাঠি ব্যবহার সুন্নত। আর ডান হাতে খুতবা থাকবে।

জাওয়াব : বাম হাতে লাঠি সুন্নত। আর ডান হাতে খুতবা থাকবে। এ বক্তব্যটি সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও মনগড়া।

সাধারণত সুন্নত বলতে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আমলকে বুঝানো হয়ে থাকে।

কাজেই, যে কথা বা যে কাজ নূরে মুজাসসাম  হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেননি বা করেননি সে কথা বা কাজ তিনি বলেছেন বা করেছেন বলার অর্থ হচ্ছে উনার প্রতি মিথ্যারোপ করা। ছহীহ বুখারী শরীফ উনার হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

من كذب على متعمدا فليتبوأ مقعده من النار

অর্থ: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে, সে যেনো যমীনে থাকতেই তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নিলো। নাউযুবিল্লাহ!

মূলত নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নামে মিথ্যারোপ করা কুফরী। আর কুফরীর শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম।

স্মরণীয় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মুখস্থ খুতবা দিয়েছেন। ফলে খুতবার কিতাব বা বই উনার হাত মুবারক এ রাখার প্রশ্নই আসতে পারে না। আর খুতবা দানকালে ডান হাতে লাঠি রাখা সুন্নত। এছাড়া লাঠির উচ্চতা হবে খতীব ছাহিবের কাঁধ বরাবর যা সাধারণভাবে হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরা যায় এবং লাঠিটি খেজুর গাছের হওয়াটাও সুন্নত।

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।