প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম-নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৫৭তম পর্ব)

সংখ্যা: ২২৫তম সংখ্যা | বিভাগ:

প্রাণীর মূর্তি, ভাস্কর্য তৈরি করা-করানো, ছবি তোলা-তোলানো, আঁকা-আঁকানো, রাখা-রাখানো হারাম ও নাজায়িয হওয়ার অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীল প্রমাণ

স্মর্তব্য যে, নির্ভরযোগ্য ও সর্বজনমান্য প্রায় পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও পবিত্র ফিক্বাহ-ফতওয়ার কিতাবেই “প্রাণীর মূর্তি, ভাস্কর্য তৈরি করা-করানো, ছবি তোলা-তোলানো, আঁকা-আঁকানো, রাখা-রাখানো হারাম ও নাজায়িয” বলে উল্লেখ আছে। নিম্নে সেসকল কিতাবসমূহ থেকে ধারাবাহিকভাবে এ সম্পর্কিত দলীল প্রমাণ তুলে ধরা হলো-
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র তাফসীর শরীফ থেকে প্রমাণিত যে, মূর্তি, ভাস্কর্য, প্রতিকৃতি, প্রাণীর ছবি ইত্যাদি হারাম, কুফরী ও শিরকী কাজ
মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে এবং ব্যাখ্যায়, তাফসীর গ্রন্থসমূহে মূর্তি, ভাস্কর্য, প্রতিকৃতি প্রাণীর ছবি ইত্যাদি তৈরি করা, এদের পূজা করা এগুলোর ব্যবসা করা এবং যে কোন অবস্থায় এগুলোর অনুশীলন করাকে নিষেধ করা হয়েছে। এগুলো তৈরি করা হারাম, এগুলোর পূজা করা কুফরী শিরকী এবং মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদতের বিপরীতে গাইরুল্লাহর ইবাদত করার শামিল।
লক্ষণীয় যে, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখিত تماثيل জাতীয় শব্দগুলো দ্বারা কোন কোন অবস্থায় সরাসরি প্রাণীর ছবি বুঝানো না হলেও প্রাণীর ছবি মূর্তি-ভাস্কর্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এগুলোও একপ্রকার মূর্তি বা ভাস্কর্য। পূর্ব যামানা থেকে প্রমাণিত যে, মূর্তি তৈরি হয় পাথর, কাচ, তামা, লোহা, কাঠ, মাটি, স্বর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি উপকরণ দ্বারা। আর প্রাণীর ছবিগুলো তৈরি হয় কলমের কালি, তুলি ও আলো দ্বারা। এই কালি, তুলি ও আলো এগুলোও তো পাথর কাচ ও মাটির মতোই একেকটি উপকরণ। সুতরাং পবিত্র কুরআন শরীফ উনার বর্ণিত تماثيل তামাছীল, শব্দ দ্বারা যদিও প্রাণীর ছবি সরাসরি নিষেধ হয় না। কিন্তু ব্যাখ্যা সাপেক্ষ্যে প্রাণীর ছবিগুলোও একপ্রকার মূর্তি হওয়ায় এগুলোর অনুশীলন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ভিত্তিতে হারাম, কুফরী ও শিরকী হিসেবে সাব্যস্ত। এটাই গ্রহণযোগ্য ফয়সালা।
নি¤েœ মূর্তি, ভাস্কর্য, প্রাণীর ছবি নিষেধ সম্পর্কিত আয়াত শরীফগুলো উল্লেখ করে বিশ্ববিখ্যাত সর্বজনমান্য পবিত্র তাফসীর শরীফ উনার কিতাব থেকে তার ছহীহ সমাধান তুলে ধরা হলো-

পবিত্র আয়াত শরীফসমূহ
উনাদের তাফসীর
পবিত্র আয়াত নম্বর : ৬
…. ثُمَّ نُكِسُوا عَلَى رُؤُوسِهِمْ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا هَؤُلَاء يَنطِقُونَ. قَالَ افَتَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكُمْ شَيْئًا وَلَا يَضُرُّكُمْ. أُفٍّ لَّكُمْ وَلِمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ. قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانصُرُوا آلِهَتَكُمْ إِن كُنتُمْ فَاعِلِينَ. قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ. وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْنَاهُمُ الْأَخْسَرِينَ.
অর্থ : অতঃপর এতে তাদের মস্তক অবনত হলো এবং তারা বললো, “আপনি তো জানেন যে, এরা কথা বলে না।” হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, তোমরা কি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পরিবর্তে এমন কিছুর উপাসনা কর, যা তোমাদের কোন উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারেনা? আফসুস তোমাদের জন্যে এবং মহান আল্লাহ পাক উনার পরিবর্তে যাদের উপাসনা কর তাদের জন্যে। তোমরা কি বুঝ না? তারা বললো, উনাকে আগুনে পুড়ে ফেলো, এভাবে তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি (মহান আল্লাহ পাক) বললাম, হে আগুন, তুমি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার জন্য শীতল আরামদায়ক হয়ে যাও। তারা সর্বাত্মকভাবে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা দুষ্টামী করার চক্রান্ত করতে চাইল, অতঃপর আমি তাদেরকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম। (পবিত্র সূরাতুল আম্বিয়া শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫১-৭০)
৬নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার
তাফসীর বা ব্যাখ্যা
অত্র আয়াত শরীফ উনাদের বিশদ তাফসীর অসংখ্য তাফসীরের কিতাব সমূহে বর্ণিত আছে। এখানে শুধু একখানা ছহীহ তাফসীর গ্রন্থ ‘আততাফসীরুল মাযহারী’ উনার ইবারত তুলে ধরে আলোচনা করা হলো। যাতে প্রাণীর ছবি, মূর্তি, প্রতিমা, ভাস্কর্য ইত্যাদী অনুশীলন করা হারাম, কুফ্রী ও র্শিক হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এতে অসংখ্য নছীহতও বিদ্যমান রয়েছে।
পূর্ব প্রকাশিতের পর
(৯৯১)
ثُمَّ نُكِسُوا عَلى رُؤُسِهِمْ يعنى ردوا إلى الكفر وانقلبوا إلى الـمجادلة بعد ما استقاموا بالمراجعة إلى العقول شبه عودهم إلى الباطل بصيرورة أسفل الشيء أعلاه والا على الأسفل لَقَدْ عَلِمْتَ ما هؤُلاءِ يَنْطِقُونَ فكيف تأمر بسوالهم والتقدير وقالوا واللّه لقد علمت ما هؤلاء ينطقون.
قالَ ابراهيم لما تم الحجة عليهم أَفَتَعْبُدُونَ عطف على محذوف تقديره أتعترفون بان هؤلاء لا ينطقون ولا تنفعكم شيئا ولا يضرون وانكم أنتم الظالمون في عبادتها أفتعبدون بعد ذلك مِنْ دُونِ اللَّهِ ما لا يَنْفَعُكُمْ شَيْئاً من النفع ان عبدتموها وَلا يَضُرُّكُمْ ان تركتم عبادتها انكار لعبادتها وتوبيخ بعد ما اعترفوا بانها جمادات لا تنفع فلا تضر فانه ينافى الألوهية.
أُفٍّ قرأ ابن كثير وابن عامر بفتح الفاء من غير تنوين والباقون بكسر الفاء نافع وحفص منهم بالتنوين والباقون بغير تنوين كما مر في الاسراء مجله الرفع فانه مبتدأ نكرة على طريقه ويل له وما بعده خبره أو اسم فعل بمعنى أتضجر لَكُمْ وَلِما تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أى غيره تضجر واستعذار لكم على اصرار الباطل مع وضوح بطلانه ولهؤلاء على معبوديتهم مع عدم الاستحقاق وأف صوت الـمتضجر الـمستكره وقيل معناه الاحتقار والاستقذار وفي الحديث القى رسول اللّه طرفه ثوبه على أنفه وقال أف أف مستقذرا لما شمّ الرائحة الكريهة وقيل معناه الاحتقار قال البيضاوي ومعناه قبحا ولتنا واللام لبيان المتافف له أَفَلا تَعْقِلُونَ استفهام توبيخ وعطف على محذوف تقديره انتظرون فلا تعقلون ان هذه الأصنام لا تستحق العبادة ولا تضلح لها وانما يستحقها اللّه تعالى فلما لزمتهم الحجة وعجزوا عن الجواب أخذوا فى المضارّة.
(ثم نكسوا على رءوسهم এরপর তাদের মাথা অবনত হয়ে গেল)
: অর্থাৎ কিছুক্ষণের জন্য তারা সঠিক চিন্তা-ভাবনা করার পর তারা পুনরায় কুফরীর দিকে ফিরে গেল এবং ঝগড়া ও বিতর্কে লিপ্ত হলো। বাতিলের প্রতি তাদের ফিরে যাওয়াকে কোন বস্তুর উপরের অংশকে নিচু করা ও নিচের অংশকে উঁচু করার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
(لقد علمت ما هؤلاء ينطقون আপনি তো জানেনই, মূর্তিরা কথা বলে না) : এখানে একথা ঊহ্য আছে- و قالوا والله لقد علمت ما هؤلاء ينطقون ‘আর তারা বললো, আল্লাহ তায়ালা উনার ক্বসম! আপনি তো জানেনই যে মূর্তিরা কথা বলতে পারে না’।
(قال তিনি বললেন) : অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, যখন তাদের উপর দলীল-প্রমাণ পূর্ণ হলো।
(افتعبدون من دون الله ما لا ينفعكم شيئا و لا يضركم তবে কি তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পরিবর্তে এমন কিছুর অর্থাৎ মূর্তির উপাসনা করবে! যারা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে না, আর ক্ষতিও করতে পারে না।) কাফিররা যখন একথা স্বীকার করলো যে, তাদের উপাস্য মূর্তিগুলো কতক জড়বস্তু। যা না কারোর কোন উপকার করতে পারে, আর তাদের উপাসনা না করলে কোন ক্ষতিও করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনা করে বললেন, এমন বস্তুর উপাসনা করতে হবে কেন? এমন বস্তু তো উপাসনা পাবার যোগ্য নয়।
(اف لكم و لـما تعبدون من دون الله আফসুস, ধিক তোমাদেরকে এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পরিবর্তে যাদের তোমরা উপাসনা কর তাদেরকে!) : তোমাদের জন্য ধিক্ তো একারণে যে, তোমরা এসব উপাস্যদের স্পষ্টরূপে বাতিল জানার পরও অব্যাহতভাবে এদের উপাসনার উপর হঠকারীতা করছো। আর এসব উপাস্যদের জন্য ধিক্ এ কারণে যে, এগুলো উপাস্য হবার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও এদের পূজা করা হচ্ছে। اف বলা হয় এমন আওয়াজকে যা এমন কোন ব্যক্তির মুখ থেকে বের হয়, যিনি কোন বস্তুকে অপছন্দ করছেন এবং তার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বলেন, اف অর্থ তুচ্ছ জ্ঞান করা ও ঘৃণা করা। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত- একবার নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দুর্গন্ধ অনুভব করলেন, তখন তিনি আপন নাক মুবারক উনার উপর একটা কাপড় রেখে উফ্ উফ্ বলে ঘৃণা প্রকাশ করলেন। হযরত আল্লামা বায়দ্বাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, اف অর্থ: মন্দ ও দুর্গন্ধ।
(افلا تعقلون তবুও কি তোমরা বুঝবে না?) :
অর্থাৎ তবুও কি তোমরা এ বিষয়টি বুঝবে না যে এসব মূর্তিগুলো ইবাদত পাওয়ার যোগ্য নয়। বরং ইবাদত পাবার যোগ্য একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা রব্বুল্ আলামীন তিনিই। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার দলীল-প্রমাণ পেশ করার পর এতে যখন তারা পরাস্ত হলো এবং কোন জবাব দিতে অক্ষম হলো, তখন তারা উনাকে কষ্ট দিতে শুরু করলো।
(৯৯২)
قالُوا حَرِّقُوهُ بالنار وَانْصُرُوا آلِهَتَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ فاعِلِينَ نصرها شرط مستغن عن الجزاء بما مضى قال هذا رجل من الأكراد قيل اسمه هنون فخسف اللّه به الأرض فهو يتجلجل فيها إلى يوم القيامة وقيل قاله نمرود فلما اجمع نمرود وقومه على إحراق ابراهيم عليه السّلام حبسوه في بيت وبنوا بنيانا كالحظيرة وقيل بنوا أتونا بقرية يقال لها كوثى ثم جمعوا له أصلاب الحطب من اصناف الخشب مدة حتى كان الرجل يمرض فيقول لئن عافانى اللّه لا جمع حطبا لابراهيم وكانت المرأة تطلب في بعض ما تطلب لأن أصابته لتحطبن في نار ابراهيم وكان الرجل بوصي بشراء الحطب والقائه فيه وكانت المرأة تغزل وتشترى الحطب بغزلها فتلقيه فيه احتسانا قال ابن اسحق كانوا يجمعون الحطب شهرا فلما جمعوا ما أرادوا واشعلوا في كل ناحية من الحطب فاشتعلت النار واشتدت حتى ان كان الطائر لتمربها فتحرق من شدة وهجها فاوقدوا عليها سبعة ايام روى انهم لم يعلموا كيف يلقونه فيها فجاء إبليس فعلمهم علم المنجنيق فعلموا ثم عمدوا إلى ابراهيم فرفعوه إلى راس البنيان وقيدوه ثم وضعوه فى الـمنجنيق مقيدا مغلولا فصاحت السموات والأرض ومن فيها من الملئكة وجميع الخلق الا الثقلين صيحة واحدة أى ربنا ابراهيم خليلك يلقى في النار وليس في الأرض أحد يعبدك غيره فاذن لها في نصرته فقال اللّه عزّ وجلّ انه خليلى ليس لى خليل غيره وانا اله ليس له اله غيرى فان استعان بشيء منكم أو دعاه فلينصره فقد أذنت له في ذلك وان لم يدع غيرى فانا اعلم به وانا وليه فخلوا بينى وبينه فلما أرادوا القائه في النار أتاه خازن المياه فقال ان أردت أخمدت النار وأتاه خازن الرياح فقال ان شئت طيرت النار في الهواء فقال ابراهيم لا حاجة لى إليكم حسبى اللّه ونعم الوكيل وروى عن أبى بن كعب ان ابراهيم قال حين أو ثقوه ليلقوه في النار لا اله الا أنت سبحانك لك الحمد ولك الملك لا شريك لك ثم رموا به في المنجنيق إليها واستقبله جبرئيل فقال يا ابراهيم ألك حاجة قال اما إليك فلا قال جبرئيل قال ربك فقال ابراهيم حسبى من سوالى علمه بحالي قال كعب الأحبار جعل كل شيء يطفى عنه النار الا الوزغ فانه كان ينفخ في النار وروى البغوي عن سعيد بن المسيب عن أم شريك ان رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم امر بقتل الوزغ وقال كان ينفخ على ابراهيم وأورد الشيخان في الصحيحين والطبراني عن ابن عباس مرفوعا اقتلوا الوزغ ولو في جوف الكعبة وعن سعد بن أبى وقاص ان رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم امر بقتل الوزغ وسماه فويسقا رواه مسلم وعن أبى هريرة ان رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم قال من قتل وزغا في أول حربة كتب له مأته حسنة وفي الثانية دون ذلك وفي الثالثة دون ذلك رواه مسلم.
(قالوا حرقوه তারা বললো, উনাকে জ্বালিয়ে দাও) : অর্থাৎ আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে দাও।
(وانصروا الـهتكم ان كنتم فاعلين এবং তোমাদের দেবতাগুলোকে সাহায্য করো, যদি কিছু করতে চাও।) :
‘র্কুদ’ গোত্রের এক ব্যক্তি একথা বলেছিল। যার নাম ছিল ‘হানূন’। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে মাটিতে ধসিয়ে দিয়েছিলেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত সে তাতে প্রবিষ্ট হতেই থাকবে।
কোন কোন মুফাসসির বলেন : একথাটি বলেছিল স্বয়ং নামরূদ। নামরূদ ও তার সম্প্রদায় যখন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে জ্বালিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, তখন তারা উনাকে একটি ঘরে বন্দী করলো এবং তার চারদিকে প্রাচীরের ন্যায় একটি ঘর তৈরি করলো। কেউ কেউ বলেন, নামরূদ ও তার সম্প্রদায়ের লোকরা ‘কূছা’ নামক এক গ্রামে খুবই বড় এক গর্ত খনন করলো এবং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য তারা দীর্ঘকাল যাবৎ মজবূত ও শক্ত কাঠ জমা করলো। এ ব্যাপারে জনসাধারণের এত অধিক উৎসাহ ছিল যে, তাদের কেউ রোগাক্রান্ত হলে সে মানত করতো যে, ‘মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে রোগ মুক্ত করলে আমি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে পুড়িয়ে দেয়ার জন্য কাষ্ঠ জমা করবো’। নাউযুল্লিাহ! মহিলারা তাদের উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য মানত করতো, ‘যদি তার উদ্দেশ্য সফল হয়, তবে সে অবশ্যই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য প্রজ্বলিত আগুনে কাঠ নিক্ষেপ করবে’। নাউযুবিল্লাহ! পুরুষরা ওয়াসিয়াত করে যেত যে, আমার পরে কাঠ ক্রয় করে যেন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। মহিলারা চরখা দ্বারা সূতা কেটে তার পয়সা দ্বারা কাঠ ক্রয় করতো এবং ছাওয়াবের আশায় তারা সে কাঠ আগুনে নিক্ষেপ করতো। নাউযুবিল্লাহ!
হযরত ইবনু ইসহাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, এক মাস পর্যন্ত তারা কাঠ জমা করতে থাকে। যে পরিমাণ কাঠ তারা জমা করার ইচ্ছা করেছিল, তা যখন জমা হলো, তখন তারা চারদিক থেকে আগুন জ্বালিয়ে দিল। আগুনের লেলিহান শিখা যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো এবং তার তীব্রতা এমন প্রচন্ডরূপ ধারণ করলো যে, কোন পাখী তার পাশ দিয়ে যাবার চেষ্টা করলে সে জ্বলে যেত।
এভাবে তারা সাত দিন যাবত অগ্নি প্রজ্বলিত করলো, এরপর তার মধ্যে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে নিক্ষেপ করতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু এ ভয়াবহ আগুনে তারা কিভাবে উনাকে নিক্ষেপ করবে, তা তাদের বোধগম্য হলো না। এ সময় ইবলীস শয়তান এসে ‘মিনজানীক বা ক্ষেপণাস্ত্র’ অর্থাৎ চড়ক গাছ দ্বারা নিক্ষেপ করার নিয়ম শিক্ষা দিল। এ শিক্ষা লাভ করে তারা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে এক উঁচু অট্রালিকার উপর উঠালো এবং উনাকে বেঁধে মিনজানীকের উপর রেখে দিল। এ দৃশ্য দেখে আকাশমন্ডলী, পৃথিবী, এর মধ্যস্থিত সব, হযরত ফেরেশ্তা আলাইহিমুস সালাম উনারা এবং মানুষ ও জিন ব্যতীত সকল মাখলূকাত চীৎকার করে বললো, হে আমাদের রব! হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি তো আপনার খলীল, আপনার বন্ধু, উনাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। তিনি ব্যতীত পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে আপনার ইবাদত করে। অতএব উনাকে সাহায্য করার জন্য এদেরকে অনুমতি দান করুন। মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি বললেন, তিনি তো আমার খলীল তিনি ব্যতীত পৃথিবীতে আমার অন্য কোন খলীল নেই। আমি উনার ইলাহ, আমি ব্যতীত উনার আর কেউ ইলাহ নেই। যদি তিনি তোমাদের কারোর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন, তবে সে যেন উনাকে সাহায্য করে, আমি তাকে অনুমতি দিলাম। আর যদি তিনি আমাকে ব্যতীত অন্য কারোর কাছে সাহায্য না চান, কাউকে না ডাকেন, তবে আমি উনাকে খুব জানি, আমিই উনার অভিভাবক। অতএব তোমরা উনার ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দাও। যখনই তারা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে আগুনে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলো তখন পানির দায়িত্বে নিয়োজিত হযরত ফেরেশতা আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত হয়ে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে বললেন, আপনি চাইলে আগুন নিভিয়ে দিবো। বায়ুর জন্য নিয়োজিত হযরত ফেরেশতা আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত হয়ে বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে আমি আগুন উড়িয়ে নিবো। হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, তোমাদের সাহায্যের আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা তিনিই যথেষ্ট, তিনিই আমার উত্তম অভিভাবক।
হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : যালিম নামরূদের লোকেরা যখন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে আগুনে নিক্ষেপের জন্য উনার হাত-পা মুবারক বাঁধছিলো, তখন তিনি বলেছিলেন, আয় মহান আল্লাহ তায়ালা! আপনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আপনারই, রাজত্ব আপনারই, আপনার কোন শরীক নেই ।
এরপর তারা চড়ক গাছের মাধ্যমে উনাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। এ সময় হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তিনি উনার কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কোন সাহায্যের প্রয়োজন আছে? তিনি জবাবে বলেছিলেন, আপনার কাছে আমার কোন প্রয়োজন নেই। হযরত জিবরাঈল ইলাইহিস সালাম তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন, আপনার রব উনার কাছে? তিনি বলেন, মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি আমার অবস্থা ভালোভাবেই জানেন। কাজেই উনার কাছে নতুন করে আমার কিছু চাওয়ার নেই।
তাবিয়ী হযরত কা’ব আহবার রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার আগুন নিভিয়ে দেয়ার জন্য সকলেই চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কেবল গিরগিট বা কাকলাস সে আগুনে ফুঁক দিয়ে এর তীব্রতা বাড়াবার চেষ্টা করছিল। আল্লামা হযরত ইমাম বাগাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার সূত্রে হযরত উম্মু শুরাইক রদ্বিয়াল্লাহু আনহা উনার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- “নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ‘ওয়াযাগ্ বা কাকলাশ’ হত্যা করতে আদেশ করেছেন এবং বলেছেন, হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার আগুনের তীব্রতা বাড়াবার জন্য গিরগিট তাতে ফুঁক দিয়েছিল।”
হযরত ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহমাতুল্লাহি আলাইহিমা উনারা উনাদের ছহীহ গ্রন্থে এবং ইমাম ত্ববারানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার থেকে মারফূ’ সূত্রে বর্ণনা করেন, “তোমরা গিরগিট হত্যা করো যদিও তা পবিত্র কা’বা ঘরের অভ্যন্তরে থাকে।” হযরত সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি গিরগিট মারার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে ‘ফুওয়াইসিক বা ছোট অপরাধী’ বলে নামকরণ করেছেন। পবিত্র হাদীছ শরীফখানা হযরত ইমাম মুসলিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন। হযরত আবূ হুরায়রাহ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতেই গিরগিট হত্যা করতে পারবে, তার জন্য তার আমলনামায় একশ’ ছাওয়াব লেখা হবে। আর যে ব্যক্তি দ্বিতীয় আঘাতে হত্যা করবে, তার জন্য এর চাইতে কম ছাওয়াব এবং যে ব্যক্তি তৃতীয় আঘাতে হত্যা করবে, তার জন্য এর চাইতেও কম ছাওয়াব লেখা হবে। (ছহীহ মুসলিম শরীফ)
অসমাপ্ত- পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ শরীফ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত, দিন, সময় ও মুহূর্তের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৯

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-২৫

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ শরীফ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত, দিন, সময় ও মুহূর্তের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৭ম পর্ব)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ শরীফ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত, দিন, সময় ও মুহূর্তের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয় ৬ষ্ঠ পর্ব)