বিতির নামায তিন রাকয়াত নাকি এক রাকয়াত?

সংখ্যা: ২২৫তম সংখ্যা | বিভাগ: ,

মুহম্মদ আব্দুল হান্নান
শান্তিবাগ, ঢাকা।

সুওয়াল: হানাফী মাযহাব মতে, বিতির নামায তিন রাকাআত কিন্তু এক রাকাআত পড়ার বর্ণনাও নাকি হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে সঠিক ফায়ছালা জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব : বিতির নামায তিন রাকাআতই পড়তে হবে এবং তা দু’ বৈঠক ও এক সালামে অর্থাৎ তিন রাকাআত শেষে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করতে হবে। বিতির নামায তিন রাকাআতের চেয়ে কম অর্থাৎ এক রাকাআত অথবা তিন রাকাআতের চেয়ে বেশি যেমন পাঁচ, সাত, নয় রাকাআত পড়া জায়িয নেই। এটাই হচ্ছে হানাফী মাযহাব উনার ফতওয়া।
যেমন এ প্রসঙ্গে তহাবী ও দারু কুতনী শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ام الـمؤمنين عائشة الصديقة عليها السلام ان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤتر بثلاث.
অর্থ : উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তিন রাকাআত বিতির আদায় করতেন।
বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ام الـمؤمنين عائشة الصديقة عليها السلام (فى صفة صلاته صلى الله عليه وسلم بالليل) يصلى اربعا فلا تسئل عن طولهن وحسنهن ثم يصلى اربعا فلا تسئل عن طولهن و حسنهن ثم يصلى ثلاثا.
অর্থ: উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তাহাজ্জুদ নামাযের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি চার রাকাআত নামায আদায় করতেন। সেগুলোর সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করো না অর্থাৎ অনেক সময় ধরে ও সুন্দর করে উক্ত নামায আদায় করতেন। তারপর তিনি চার রাকাআত নামায আদায় করতেন। সেগুলোর সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করো না। এরপর তিনি তিন রাকাআত নামায আদায় করতেন।
এ হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে শুরুতে চার এবং চার মোট আট রাকাআত হচ্ছে তাহাজ্জুদ এবং শেষের তিন রাকাআত হচ্ছে বিতির।
আবূ দাউদ শরীফ ও তহাবী শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابن قيس رحمة الله عليه سالت ام المؤمنين حضرت عائشة الصديقة عليها السلام بكم كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوتر قالت كان يوتر باربع وثلث و ست وثلث وثمان وثلث وعشر وثلث ولـم يكن يوتر بانقص من سبع ولا باكثر من ثلث عشر.
অর্থ : হযরত ইবনে আবী ক্বায়িস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমি উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কত রাকাআত বিতির পড়তেন? জাওয়াবে তিনি বললেন, চার ও তিন রাকাআত, ছয় ও তিন রাকাআত, আট ও তিন রাকাআত এবং দশ ও তিন রাকাআত। সাত রাকাআতের কম ও তের রাকাআতের বেশি পড়তেন না।
এ হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ৪, ৬, ৮ ও ১০ রাকাআত হচ্ছে তাহাজ্জুদ আর উক্ত রাকাআতসমূহের সাথে যে তিন রাকাআতের কথা উল্লেখ রয়েছে তা হচ্ছে বিতির।
বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ ও নাসায়ী শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابى سلمة قال سألت حضرت عائشة ام الـمؤمنين عليها السلام عن صلوة رسول اله صلى الهশ عليه وسلم فقالت كان يصلى ثلث عشر ركعة يصلى ثمان ركعات ثم يوتر وفى رواية ثم يصلى ثلثا ثم يصلى ركعتين وهو جالس.
অর্থ : তাবিয়ী হযরত আবূ সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, আমি উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার নিকট নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার (রাতের বেলার) নামায সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি রাতে তের রাকাআত নামায পড়তেন। আট রাকাআত নফল (তাহাজ্জুদ নামায) পড়তেন। অতঃপর তিন রাকাআত বিতির পড়তেন। তারপর বসে দুই রাকাআত (হালকী) নফল পড়তেন।
তিরমিযী শরীফ ও নাসায়ী শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابى ابن كعب رضى اله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يوتر بثلث ركعات وكان يقرأ فى الاولى بسبح اسم ربك الاعلى وفى الثانية بقل يا ايها الكافرون وفى الثالثة بقل هو الله احد و عن حضرت عائشة ام الـمؤمنين عليها السلام مثله.
অর্থ : হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিতির নামায তিন রাকাআত পড়তেন। তিনি প্রথম রাকায়াতে (সূরা ফাতিহার পর) ‘সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আ’লা’ সূরা পাঠ করতেন, দ্বিতীয় রাকায়াতে ‘কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরূন’ পাঠ করতেন এবং তৃতীয় রাকায়াতে ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ পাঠ করতেন।
মুছান্নাফ- ইবনে আবী শায়বা শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابن مسعود رضى الهল تعالى عنه قال قال رسول الهে صلى الهা عليه وسلم وتر الليل ثلث كوتر النهار صلوة المغرب.
অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, রাতের বিতির তিন রাকাআত যেমন দিনের বিতির মাগরিবের নামায তিন রাকাআত।
عن حضرت عبد الله بن عباس رضى الله تعالى عنه (فى صفة قيامه صلى الله عليه وسلم بالليل) ثم قام فصلى ركعتين فاطال فيهما القيام والركوع والسجود ثم انصرف …. فعل ذلك ثلاث مرات ست ركعات ….. ثم اوتر بثلاث.
অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তাহাজ্জুদ বা রাতের নামাযের বিবরণে বলেন, তিনি দাঁড়িয়ে দু’রাকাআত নামায আদায় করলেন। সেগুলোর কিরাআত, রুকূ ও সিজদাহ দীর্ঘ করলেন। এভাবে তিনি তিন বারে ছয় রাকাআত নামায আদায় করলেন। এরপর তিনি তিন রাকাআত বিতির আদায় করলেন।
তহাবী শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت انس بن مالك رضى الله تعالى عنه قال الوتر ثلث ركعات وكان بثلث ركعات
অর্থ : খাদিমু রসূলিল্লাহ হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, বিতির নামায তিন রাকাআত এবং তিনি নিজেও তিন রাকাআত বিতির পড়তেন।
মাআনিউল আছার ১৬৪ পৃষ্ঠা এবং মুয়াত্তা ইমাম মুহম্মদ ১৪৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابن مسعود رضى الله تعالى عنه الوتر ثلث كثلث الـمغرب
অর্থ : ফক্বীহুল উম্মত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, বিতির মাগরিব নামাযের ন্যায় তিন রাকাআত।
নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابى ابن كعب رضى الله تعالى عنه مرفوعا كان يوتر بثلاث ركعات.
অর্থ : হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি মরফু’সূত্রে বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তিন রাকাআত বিতির আদায় করতেন।
মাআনিউল আছার ১৬৪ পৃষ্ঠায় এবং তহাবী শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابى العالية قال علمنا اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ان الوتر مثل صلوة الـمغرب غير انا نقرأ فى الثالثة فهذا وتر الليل وهذا وتر النهار
অর্থ : তাবিয়ী হযরত আবুল আলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, নিশ্চয়ই বিতির মাগরিব নামাযের ন্যায় (তিন রাকাআত)। ব্যতিক্রম হলো যে, আমরা বিতিরের তৃতীয় রাকায়াতে ক্বিরায়াত পাঠ করি। সুতরাং ইহা রাতের বিতির এবং মাগরিব হচ্ছে দিনের বিতির।
ছহীহ বুখারী শরীফ ১ম খ- (মিছরী ছাপা) ১১৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
قال القاسم راينا اناسا منذ ادركنا يوترون بثلث
অর্থ : হযরত ইমাম ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন, আমি (বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত মদীনা শরীফ-এ) হযরত ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে দেখেছি উনারা সকলেই তিন রাকাআত বিতির পড়তেন।
ফতহুল ক্বাদীর ১৭৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
روى ابن ابى شيبة عن الحسن رحمة الله عليه قال اجمع الـمسلمون على ان الوتر ثلث لايسلم الا فى اخرهن.
অর্থ : হযরত ইবনে আবী শায়বা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তাবিয়ী হযরত ইমাম হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মুসলমানগণ হযরত ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং হযরত তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সকলে একমত হয়েছেন যে, বিতির এক সালামে তিন রাকাআত নামায।
মাআনিউল আছার ১৬৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
اثبت عمر بن عبد العزيز رحمة الله عليه الوتر بالمدينة بقول الفقهاء ثلثا لا يسلم الا فى اخرهن.
অর্থ : খলীফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ফক্বীহ ইমামগণ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ফতওয়া অনুসারে মদীনা শরীফ-এ এক সালামে তিন রাকাআত বিতির পড়ার ব্যবস্থা ছাবিত বা স্থাপন করেছিলেন।
মাআনিউল আছার ১৬৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
عن الفقهاء السبعة سعيد بن الـمسيب وعروة بن الزبير والقاسم بن محمد وابى بكر بن عبد الرحمن وخارجة بن زيد وعبيد الله وسليمان بن يسار فى مشيخة سواهم اهل الفقه وصلاح فكان مما رعيت عليهم ان الوتر ثلث لا يسلم الا فى اخرهن
অর্থ : হযরত আবু যিয়াদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমি (মদীনা শরীফ উনার) বিখ্যাত সাতজন ফক্বীহ- হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ক্বাসিম ইবনে মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত আবু বকর ইবনে আব্দুর রহমান রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত খারিজা ইবনে যায়িদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত উবায়দুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত সুলাইমান ইবনে ইয়াসার রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং এতদভিন্ন উনাদের অনেক বুযুর্গ ফক্বীহ শিক্ষক রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের থেকে স্মরণ রেখেছি যে, বিতির এক সালামে তিন রাকাআত নামায।
স্মরণীয় যে, তিন রাকাআত বিতির আদায়কালে শেষ রাকায়াতেই সালাম ফিরাতে হবে। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত রয়েছে-
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يسلم الا فى اخرهن
অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তিন রাকাআত বিতির নামাযের শেষ রাকায়াতেই সালাম ফিরাতেন।
হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার সনদে বর্ণনা করেছেন-
يوتر بثلث لا يفصل بينهن
অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তিন রাকাআত বিতির পড়তেন; কিন্তু দ্বিতীয় রাকায়াতে সালাম ফিরাতেন না।
উপরোক্ত দলীলসমৃদ্ধ বর্ণনা দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, তিন রাকাআত বিতির নামায দু’ বৈঠকে ও এক সালামে আদায় করতে হবে। বিশেষ করে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার বর্ণিত হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা তিন রাকাআত বিতিরের বিষয়টি স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে; সেখানে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তিন রাকাআত বিতির নামাযে প্রথম রাকায়াতে কোন সূরা, দ্বিতীয় রাকায়াতে কোন সূরা এবং তৃতীয় রাকায়াতে কোন সূরা পড়েছেন তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি তিনি এক, পাঁচ বা সাত রাকাআত বিতির পড়তেন, তাহলে সে বর্ণনাও থাকতো; কিন্তু সে বর্ণনা কারো থেকে বর্ণিত নেই। কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তিন রাকাআতই বিতির পড়তেন।
উল্লেখ্য, তিন রাকাআত বিতিরের বিপক্ষে যাদের মতামত তারা হযরত ইমাম দারু কুতনী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বর্ণিত একখানা হাদীছ শরীফ উল্লেখ করে থাকে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
لا توتروا بثلاث اوتروا بخمس او بسبع ولا تشبهوا بصلوة الـمغرب
অর্থ : তোমরা তিন রাকাআত বিতির পড়োনা। পাঁচ কিংবা সাত রাকাআত পড়ো। মাগরিব নামাযের তুল্য নামায পড়ো না।
এ হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় হযরত ইমাম তহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেছেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিতিরের পূর্বে আরো দুই, চার, ছয়, আট অথবা দশ রাকাআত নফল (তাহাজ্জুদ) আদায় করতেন। আর মাগরিবের পূর্বে তিনি নফল আদায় করতেন না। সেই অর্থে বলেছেন যে, তোমরা বিতিরের সাথে আরো দুই কিংবা চারি রাকাআত নফল আদায় করো, তাহলে উহা মাগরিবের তুল্য হবে না। এ দ্বারাও প্রমাণিত হলো যে এক রাকাআত বিতির হতে পারে না।
এছাড়া পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে হানাফী মাযহাব উনার বিপরীত বিতির পড়ার ব্যাপারে যেসব বর্ণনা এসেছে, তাতে প্রতি দু’ রাকায়াতে বসার ব্যবস্থা নেই। অথচ ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিম শরীফ উনাদের মধ্যে স্পষ্ট বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
صلوة الليل مثنى و مثنى
অর্থ : রাতের নামায দুই রাকাআত দুই রাকাআত। অর্থাৎ রাতের প্রত্যেক নামাযে দুই-দুই রাকায়াতে বসতে হবে।
ছহীহ মুসলিম শরীফ-এ আরো বর্ণিত রয়েছে-
كان يقول فى كل ركعتين التحية
অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলতেন, প্রত্যেক দুই রাকায়াতে আত্তাহিয়্যাতু অর্থাৎ তাশাহহুদ পড়তে হবে।
অনুরূপ ছহীহ তিরমিযী শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-
تشهد فى كل ركعتين
অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, প্রত্যেক দুই রাকায়াতে তাশাহহুদ পড়তে হবে।
অতএব, বিতির নামায সম্পর্কিত হানাফী মাযহাব উনার বর্ণনার বিপরীত যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায় তার হুকুম মানসূখ বা রহিত হয়েছে। কিংবা তার মর্ম অন্যরূপ। বিশেষ করে যদি বিতির নামায এক রাকাআত পড়া জায়িয হতো তাহলে ফজরের দু’ রাকাআতের স্থলে এক রাকাআত কছর করার হুকুম হতো। মূলত দু’ রাকাআতের কম কোন ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত বা নফল নামায নেই।
যেমন এ প্রসঙ্গে মুয়াত্তায়ে ইমাম মুহম্মদ ১৪৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابن مسعود رضى الله تعالى عنه قال ما اجزاءت ركعة واحدة قط
অর্থ : ফক্বীহুল উম্মত হযরত ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, এক রাকাআত বিতির পড়া কখনোই জায়িয হবে না।
তামহীদ কিতাবে বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت ابى سعيد رضى الله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم نهى عن البتيراء ان يصلى الرجل واحدة يوتربها.
অর্থ : হযরত আবূ সাঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অপূর্ণ নামায আদায় করতে নিষেধ করেছেন, আর তা হচ্ছে এক রাকাআত দ্বারা বিতির আদায় করা।
মুয়াত্তায়ে মালিক ৪৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে-
قال حضرت مالك رحمه الله تعالى ليس هذا العمل عندنا ولكن ادنى الوتر ثلث
অর্থ : মালিকী মাযহাব উনার ইমাম হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমাদের নিকট এক রাকাআত বিতির এ সম্পর্কিত আমলের কোন অস্তিত্ব নেই। বরং বিতির অতিকম তিন রাকাআত।
উল্লেখ্য, হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হচ্ছেন মদীনা শরীফ উনার অধিবাসী। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এবং সম্মানিত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা যে পবিত্র মদীনা শরীফ-এ জীবন মুবারক অতিবাহিত করেছেন সেখানকার অধিবাসীগণ উনারা এক রাকাআত বিতির পড়তেন না; বরং উনারা এক রাকাআত বিতির নাজায়িয মনে করতেন। এতেই প্রমাণিত হয় যে, এক রাকাআত বিতির পড়া জায়িয নেই।
কাজেই, পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা হানাফী মাযহাব উনার বিপরীত বিতির নামায পড়ার বর্ণনাসমূহের হুকুম মানসূখ হয়েছে। আর শুধুমাত্র হানাফী মাযহাবে বর্ণিত তিন রাকাআত বিতির পড়ার হুকুম বলবৎ রয়েছে।