সুওয়াল: “আল আয়িম্মাতু মিন কুরাইশ” এবং “তা‘য়াল্লামুল ফারায়িদ্বা ওয়া আল্লিমূহা ফাইন্নাহা নিছফুল ইলম” হাদীছ শরীফ দুখানা জনৈক ব্যক্তি বানোয়াট মনে করে অস্বীকার করে থাকে। এ বিষয়ে সঠিক জাওয়াব জানতে ইচ্ছুক।

সংখ্যা: ২৩৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ তৈমুর, পঞ্চগড়


 

জাওয়াব: সুওয়ালে উল্লেখিত পবিত্র হাদীছ শরীফ দু’খানা বিশুদ্ধ এবং দলীলসমৃদ্ধ। যেমন প্রথম হাদীছ শরীফখানা উনার মূল বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত আনাস বিন মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। যিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশিষ্ট খাদিম। যিনি সুদীর্ঘ দশ বৎসর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উনার পুতপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের খিদমত মুবারকের আঞ্জাম দিয়েছেন।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت انس بن مالك رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الائمة من قريش.

অর্থ: হযরত আনাস বিন মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, খলীফা হবেন কুরাইশদের থেকে। (মুসনাদে আহমদ শরীফ, মুসনাদে বাজ্জার শরীফ, মুসনাদে আবু ইয়ালা শরীফ, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী শরীফ, মুসতাদরাক লিল হাকিম শরীফ, মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, সুনানে দারু কুতনী, মু’জামুল কবীর লিত তবারানী, সুনানুদ দারিমী, তারীখুল খুলাফা ইত্যাদি।)

আর দ্বিতীয় হাদীছ শরীফখানা বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী অর্থাৎ রাবীগণ উনাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেছেন। পবিত্র হাদীছ শরীফ মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه مرفوعا تعلموا الفرائض وعلموها فانها نصف العلم

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে মারফুসূত্রে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তোমরা ফারায়িয শিক্ষা করো এবং তা শিক্ষা দাও। কেননা নিশ্চয়ই তা হচ্ছে ইলমের অর্ধেক। (ইবনে মাজাহ, দারু কুতনী, হাকিম ইত্যাদি)

প্রকাশ থাকে যে, পবিত্র হাদীছ শরীফ হলো ওহী মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْـهَوٰى  اِنْ هُوَ اِلَّا وَحْى يُوحٰى

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ওহী মুবারক ব্যতিত নিজের থেকে কোন কথা মুবারক বলেন না।” (পবিত্র সূরা নজম শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩, ৪)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت الـمقدام بن معديكرب رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الا انى اتيت القران ومثله معه.

অর্থ : “হযরত মিক্বদাম ইবনে মা’দী কারিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, জেনে রাখো, আমাকে পবিত্র কুরআন শরীফ দেয়া হয়েছে এবং উনার সাথে উনার অনুরূপ বিষয় অর্থাৎ পবিত্র হাদীছ শরীফ দেয়া হয়েছে। (আবু দাউদ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

উল্লেখ্য, মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার প্রিয়তম রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি যেসকল ওহী মুবারক নাযিল করেছেন তা দু’শ্রেণীর। এক- ওহীয়ে মাতলূ, তা হচ্ছে পবিত্র কুরআন শরীফ। দুই- ওহীয়ে গইরে মাতলূ, অর্থাৎ ওহী দ্বারা প্রাপ্ত মূল ভাবটিকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বীয় ভাষা মুবারক এ প্রকাশ করেছেন, ইহাই পবিত্র হাদীছ শরীফ। ইহা ক্বিরায়াত হিসেবে পাঠের হুকুম নামাযে দেয়া হয়নি।

পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনা করাকে রেওয়ায়েত বলে এবং যিনি বর্ণনা করেন উনাকে রাবী বলে।  পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার রাবী পরম্পরাকে সনদ বলে। কোন হাদীছ শরীফ উনার সনদ বর্ণনা করাকে ইসনাদ বলে। কখনো ইসনাদ ‘সনদ’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সনদ বর্ণনা করার পর যে মূল হাদীছ শরীফ বর্ণনা করা হয়, উনাকে মতন বলে।

আরো উল্লেখ্য, পবিত্র হাদীছ শরীফ প্রথমত তিন প্রকারের। ক্বওলী, ফে’লী ও তাকরীরী। কথা জাতীয় পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাকে ক্বওলী, কার্যবিবরণ সম্বলিত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাকে ফে’লী এবং সম্মতিসূচক পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাকে তাকরীরী হাদীছ শরীফ বলে।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার আরো প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন- মারফু, মাওকুফ, মাকতু, মুত্তাসিল, মুনকাতি, মুরসাল, মুআল্লাক, মুদাল্লাস, মুদ্বতারাব, মুদরাজ, ছহীহ, হাসান, দ্বয়ীফ, মাওদূ, মাতরূক, মুবহাম, গরীব, আযীয, মাশহূর, মুতাওয়াতির ইত্যাদি। এ সমুদয় প্রকারভেদ রাবী বা বর্ণনাকারীর বর্ণনার উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার উপর ভিত্তি করে নয়। সুতরাং কোন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সম্পর্কে এ কথা বলা কখনই শুদ্ধ হবে না যে, ওমুক হাদীছ শরীফখানা দ্বয়ীফ, বরং বলতে হবে যে, ওমুক হাদীছ শরীফখানা উনার বর্ণনাকারী বা রাবী দ্বয়ীফ বা মাওদূ।

কারণ যা হাদীছ শরীফ তা হাদীছ শরীফই। তা রাবী বা বর্ণনাকারীর বর্ণনায় তারতম্য হতে পারে।

কাজেই, যা হাদীছ শরীফ তা হাদীছ শরীফ নয় বলা এবং যা হাদীছ শরীফ নয় তা হাদীছ শরীফ বলা উভয়টাই কুফরী। এ কুফরীর পরিণাম হচ্ছে জাহান্নাম। এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

عن حضرت عبد الله بن عمرو رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم بلغوا عنى ولو اية وحدثوا عن بنى اسرائيل ولا حرج ومن كذب على متعمدا فليتبوأ مقعده من النار.

অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আমার তরফ থেকে একখানা পবিত্র আয়াত শরীফ বা একখানা হাদীছ শরীফ হলেও তোমরা তা (মানুষের নিকট) পৌঁছে দাও। বনী ইসরাইলের নিকট থেকে শুনেও তোমরা হাদীছ শরীফ বর্ণনা করতে পার, এতেও কোনরূপ আপত্তি নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় আমার প্রতি মিথ্যারোপ করবে (অর্থাৎ আমি যা বলেছি তা বলি নাই বলে প্রচার করবে এবং যা বলি নাই তা বলেছি বলে প্রচার করবে, সে দুনিয়ায় থাকতেই) তার বাসস্থান জাহান্নামে প্রস্তুত করে নিল। (বুখারী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

এ হাদীছ শরীফ উনার আলোকে অনুসরণীয় উলামায়ে কিরামগণ উনারা মাসয়ালা প্রদান করেছেন যে, “কেউ যদি একখানা চুল মুবারক নিয়ে বলে যে, এ চুল মুবারকখানা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চুল মুবারক তাহলে যার বা যাদের সামনে বলা হলো, তাদের সকলের উচিত তা বিশ্বাস করা। অবিশ্বাস করাটা কুফরী। তবে বক্তব্যদাতা মিথ্যা বললে সে দায়ী হবে এবং জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

অতএব, যেই পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহ স্বয়ং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম বর্ণনা করেছেন এবং যা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের বহু প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে, উক্ত হাদীছ শরীফসমূহকে বানোয়াট বলে অস্বীকার করার দুঃসাহস কোন মুসলমান দেখাতে পারে না। যে দুঃসাহস দেখাবে বুঝতে হবে তার ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে। সে মুনাফিক ও মুরতাদ হয়ে গেছে। অন্যথায় তাকে প্রমাণ করতে হবে উক্ত হাদীছ শরীফসমূহ যখন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা বর্ণনা করেছেন তখন উনাদের মধ্যে কেউ উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহকে বানোয়াট বলেছেন কিনা? উনারা যদি বানোয়াট বা মাওদূ বলে না থাকেন তাহলে পরবর্তী কেউ বানোয়াট বললে তা কস্মিনকালেও গ্রহণযোগ্য হবে না। মূলতঃ পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহ মাওদূ (বানোয়াট) বা দ্বয়ীফ (দূর্বল) বলে পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহের প্রতি অসম্মান ও আমলের প্রতি নিরুৎসাহিত করণের চক্রান্ত হচ্ছে ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফিরক্বার লোকদের। এদের থেকে নিজেদের ঈমান-আমল হিফাযত করা অপরিহার্য কর্তব্য।

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।