সুওয়াল : পবিত্র মুহররম শরীফ মাসের ফযীলত ও আমলসমূহ দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

সংখ্যা: ২৩৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ মুঈনুল ইসলাম, মানিকনগর, ঢাকা


 

জাওয়াব : পবিত্র মুহররম শরীফ মাসটি অতিশয় ফযীলতপূর্ণ। এ মাসটি রহমত, বরকত, সাকীনা ও মাগফিরাত উনাদের দ্বারা সমৃদ্ধ। আরবী ১২টি মাসের মধ্যে হারাম বা পবিত্র মাস হলো ৪টি। তার মধ্যে পবিত্র মুহররম শরীফ মাস হলো অন্যতম। যেমন, এ প্রসঙ্গে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ان عدة الشهور عند الله اثنا عشر شهرا فى كتب الله يوم خلق السموت والارض منها اربعة حرم ذلك الدين القيم فلا تظلموا فيهن انفسكم.

অর্থ :  “নিশ্চয়ই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আসমান-যমীনের সৃষ্টির শুরু থেকে গণনা হিসেবে মাসের সংখ্যা বারটি। তন্মধ্যে চারটি হচ্ছে হারাম বা পবিত্র মাস। এটা সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম বা অবিচার করনা।” (পবিত্র সূরা তওবা শরীফ  : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৬)

এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

ثلاثة متواليات ذو القعدة وذو الـحجة والـمحرم ورجب مضر الذى بين جمادى وشعبان.

অর্থ : “হারাম মাসসমূহ উনাদের মধ্যে তিনটি হলো ধারাবাহিক অর্থাৎ পরস্পর মিলিত। তা হলো- পবিত্র যিলক্বদ শরীফ, পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ ও পবিত্র মুহররম শরীফ। আর চতুর্থটি হলো মুদ্বার গোত্রের পবিত্র রজব শরীফ মাস; যা পবিত্র জুমাদাল উখরা শরীফ ও পবিত্র শা’বান শরীফ মাসের মাঝখানে অবস্থিত।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ, মুসনাদে আহমদ, শুয়াবুল ঈমান)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اكرموا الـمحرم من اكرم الـمحرم اكرمه الله بالـجنة ونجاه من النار

অর্থ : “তোমরা পবিত্র মুহররম শরীফ মাসকে সম্মান কর। যে ব্যক্তি পবিত্র মুহররম শরীফ মাসক উনাকে সম্মান করবে, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে জান্নাত দিয়ে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ দিয়ে সম্মানিত করবেন।” সুবহানাল্লাহ!

স্মরণযোগ্য যে, পবিত্র মুহররম শরীফ মাসের উল্লেখযোগ্য ও শ্রেষ্ঠতম দিন হচ্ছে ১০ই মুহররম শরীফ ‘আশূরা’র দিনটি। এ দিনটি বিশ্বব্যাপী এক আলোচিত দিন। সৃষ্টির সূচনা হয় এ দিনে এবং সৃষ্টির সমাপ্তিও ঘটবে এ দিনে। বিশেষ বিশেষ সৃষ্টি এ দিনেই করা হয় এবং বিশেষ বিশেষ ঘটনাও এ দিনেই সংঘটিত হয়।

বর্ণিত রয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে শুরু করে সাইয়্যিদুনা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত প্রায় সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কোন না কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা এ দিনে সংঘটিত হয়েছে। সঙ্গতকারণে এ দিনটি আমাদের সবার জন্যে এক মহান আনুষ্ঠানিকতার দিন, রহমত, বরকত, সাকীনা, মাগফিরাত উনাদের হাছিল করার দিন। ফলে এ দিনে বেশ কিছু আমল করার ব্যাপারে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন-

১। পবিত্র আশূরা শরীফ উপলক্ষে দু’দিন রোযা রাখা : পবিত্র আশূরা শরীফ উপলক্ষে দু’দিন রোযা রাখা সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم افضل الصيام بعد رمضان شهر الله الـمحرم.

অর্থ : হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “পবিত্র রমাদ্বান শরীফ উনার ফরয রোযার পর উত্তম রোযা হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার মাস পবিত্র মুহররম শরীফ উনার রোযা।” (মুসলিম শরীফ)

عن حضرت ابى قتادة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم صيام يوم عاشوراء احتسب على الله ان يكفر السنة التى قبله.

অর্থ : হযরত আবূ কাতাদাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “পবিত্র আশূরা শরীফ উনার রোযা পালনে আমি মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে আশা করি যে, তিনি (উম্মতের) বিগত বছরের গুনাহখতা ক্ষমা করে দিবেন।” (মুসলিম শরীফ)

عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم صوموا التاسع والعاشر وخالفوا فيه اليهود.

অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমরা ৯ ও ১০ই মুহররম শরীফ রোযা রেখে ইহুদীদের খিলাফ তথা বিপরীত আমল কর।” (তিরমিযী শরীফ)

২। রোযাদারদেরকে ইফতার করানো : রোযাদারদেরকে ইফতার করানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

من فطر فيه صائما فكانـما افطر عنده جميع امة (سيدنا حبيبنا شفيعنا مولانا) محمد صلى الله عليه وسلم

অর্থ : “পবিত্র আশূরা উনার দিন যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে, তিনি যেন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সমস্ত উম্মতকে ইফতার করালো।” সুবহানাল্লাহ!

৩। পবিত্র আশূরা উনার দিন পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়ানো : পবিত্র আশূরা উনার দিন পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়ানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت عبد الله بن مسعود رضى الله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من وسع على عياله فى النفقة يوم عاشوراء وسع الله عليه سائر سنته

অর্থ : “যে ব্যক্তি আশূরা উনার দিন তার পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়াবে-পরাবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি সারা বৎসর ওই ব্যক্তিকে সচ্ছলতা দান করবেন।” (তবারানী শরীফ, শুয়াবুল ঈমান, মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ, মুমিন কে মাহে ওয়া সাল ইত্যাদি)

৪ ও ৫। গরিবদের পানাহার করানো ও ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানো : গরিবদের পানাহার করানো ও ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

من مسح فيه على رأس يتيم واطعم جائعا وسقى شربة من ماء اطعم الله من موائد الجنة وسقاه الله تعالى من الرحيق السلسبيل

অর্থ  :  “পবিত্র আশূরা উনার দিন কোন মুসলমান যদি কোন ইয়াতীমের মাথায় হাত স্পর্শ করে, কোন ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়ায় এবং কোন পিপাসার্তকে পানি পান করায় তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে জান্নাত উনার দস্তরখানায় খাদ্য খাওয়াবেন এবং ‘সালসাবীল’ ঝর্ণা থেকে পানীয় (শরবত) পান করাবেন।”

৬। চোখে (ইছমিদ) সুরমা দেয়া : চোখে সুরমা দেয়া সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

من اكتحل يوم عاشوراء بكحل فيه مسك لـم يشك عينه الى قبيل من ذلك اليوم.

অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র আশূরা উনার দিন মিশক মিশ্রিত সুরমা চোখে দিবে, সেদিন হতে পরবর্তী এক বৎসর তার চোখে কোন প্রকার রোগ হবেনা।” (মাক্বাছিদে হাসানা, শুয়াবুল ঈমান, দায়লামী, মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ্)

৭। গোসল করা : পবিত্র আশূরা উনার দিনে গোসল করা সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

من اغتسل فيه عفى ولـم يـمرض الا مرض الـموت وامن من الكسل والتعليل

অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র আশূরা উনার দিন গোসল করবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দান করবেন। মৃত্যু ব্যতীত তার কোন কঠিন রোগ হবেনা এবং সে অলসতা ও দুঃখ-কষ্ট হতে নিরাপদ থাকবে।”

অতএব, পবিত্র মুহররমুল হারাম মাস এবং এর মধ্যস্থিত পবিত্র আশূরার দিনের ফাযায়িল-ফযীলত ও আমল উনাদের সম্পর্কে জেনে সে মুতাবিক আমল করে মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি হাছিল করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর দায়িত্ব-কর্তব্য।

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।