সুওয়াল: ছারছিনা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক পত্রিকা ৬০ বর্ষ ১লা সংখ্যা ১৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। নাউযুবিল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং উনার সম্মানিতা আহলিয়া হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনাদের শান মুবারকে উপরোক্ত বক্তব্য উল্লেখ করাটা কি শুদ্ধ হয়েছে?

সংখ্যা: ২৩৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ মুনীরুল ইসলাম, বানারিপাড়া, বরিশাল


জাওয়াব: পাক্ষিক পত্রিকায় প্রকাশিত উক্ত আর্টিকেলের বক্তব্যটি আদৌ শুদ্ধ হয়নি। বরং সম্পূর্ণ ভুল ও কুফরী হয়েছে এবং এ প্রকার কুফরী আক্বীদা থেকে তওবা করা প্রত্যেক ঈমানদারদের জন্য খাছ ফরয। কারণ এ প্রকার আক্বীদা যারা পোষণ করবে তারা কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হবে।

হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা পরস্পর হচ্ছেন মানবজাতির আদি পিতা ও মাতা আলাইহিমাস সালাম। শুধু তাই নয়, উনারা উভয়ে হচ্ছেন কুল মাখলূক্বাতের নবী ও রসূল, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়া মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত আদি পিতা ও আদি মাতা আলাইহিমাস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ! উনারা উভয়েই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত সৃষ্টি, মনোনীত বান্দা ও মনোনীত বান্দী। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ان الله اصطفى ادم ونوحا وال ابراهيم وال عمران على العالـمين

অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনাকে এবং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার বংশধর উনাদেরকে ও হযরত ইমরান আলাইহিস সালাম উনার বংশধর উনাদেরকে তামাম আলমের বুকে মনোনীত করেছেন। (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৩)

অর্থাৎ  হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত ও সম্মানিত নবী ও রসূল আলাইহিস সালাম এবং মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত খলীফা বা প্রতিনিধি আলাইহিস সালাম। তিনি এমন মনোনীতভাবে সৃষ্টি যে মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে স্বীয় কুদরতী হাত মুবারকে সৃষ্টি করেছেন এবং উনার মধ্যে রূহ মুবারক ফুঁকে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় উনাকে সৃষ্টি করার পর উনার সম্মানার্থে উনাকে সিজদা করার জন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি লক্ষ লক্ষ বছর যাবৎ ইবাদত গোযার এবং তাসবীহ-তাহলীল পাঠে মশগুল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী ও রসূলসহ উনাদের সকলকে আদেশ মুবারক করেছিলেন। সুবহানাল্লাহ!

সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হযরত আদম আলাইহি সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার কিরূপ বেমেছাল মর্যাদা সম্পন্ন মনোনীত নবী, রসূল ও খলীফা বা প্রতিনিধি। আর উনারই সম্মানে সম্মানিত হচ্ছেন উনার মহিয়সী আহলিয়া হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম। উনাকেও মহান আল্লাহ পাক তিনি বেমেছাল বুযুর্গী, সম্মান দিয়ে এবং জান্নাতবাসিনী  ৭০ জন সম্মানিতা হুর উনাদের খুবছূরত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, এরূপ বেমেছাল মর্যাদাসম্পন্ন, মনোনীত, শ্রেষ্ঠতম বান্দা ও বান্দী হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং উনার আহলিয়া হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনাদের সম্পর্কে কি করে এ কথা বলা যেতে পারে যে, উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। নাউযুবিল্লাহ!

যেকোন মুসলমান ব্যক্তি তিনি তার মুসলমান পিতা-মাতা সম্পর্কে উক্তরূপ কথা বলতে পারে না। যদি তাই হয় তাহলে যাঁরা শুধু মুসলমান উনাদেরই পিতা-মাতা নন বরং হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্মানিত পিতা ও মাতা আলাইহিমাস সালাম উনাদের সম্পর্কে কি করে উক্ত বক্তব্য ও লিখনী প্রকাশ করা যেতে পারে। পবিত্র দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে ইলমহীন, আক্বলহীন, সমঝহীন, গণ্ডমূর্খ, জাহিল, নাদান ও নির্বোধ ব্যক্তির পক্ষেই কেবল উক্তরূপ কুফরী বক্তব্য ও লেখনী প্রকাশ করা সম্ভব। নাউযুবিল্লাহ!

স্মরণীয় যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কেউই মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশ-নিষেধ মুবারকের খিলাফ বা বিপরীত কোন কাজ করেননি। এটাই হচ্ছে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা তথা সকল মু’মিন-মুসলমান উনাদের আক্বীদা। এর বিপরীত হচ্ছে ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফেরকার আক্বীদা। কাজেই, মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত নবী ও রসূল হযরত আবুল বাশার আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার ওহী মুবারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উনার পরিপূর্ণ অনুগত, ফরমাবরদার, আজ্ঞাবহ, আদেশ-নিষেধ মুবারক পালনকারী। কাজেই, তিনি কখনো মহান আল্লাহ পাক উনার কোন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেননি এবং তিনি কোন নাফরমানীও করেননি।

হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি যদি মহান পাক উনার কোন আদেশ কিংবা নিষেধ অমান্য করে থাকেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নাফরমান হয়ে থাকেন তাহলে হযরত নবী ও রসূল হিসেবে উনাদের খুছূছিয়াত বা বৈশিষ্ট্য মুবারক থাকলো কোথায়! পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে কোথাও কি উল্লেখ আছে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং হযরত হওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন? আদৌ নেই। মনে রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার প্রতি উক্ত মিথ্যা তোহমত দেয়ার পরিণাম নিঃসন্দেহে কুফরী এবং কাফির ও জাহান্নামী হওয়ার কারণ।

উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের অর্থ বর্ণনায় সবখানে লুগাতী বা অভিধানগত অর্থ প্রযোজ্য ও গ্রহণযোগ্য নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষে লুগাতী অর্থ পরিহার করে তাফছীলী বা তা’বীলী অর্থ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় অর্থ শুদ্ধ হবে না। বিশেষ করে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার সম্পর্কে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে, হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সম্পর্কে, হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের সম্পর্কে এমন অর্থ গ্রহণ করা যাবে না, যে অর্থ গ্রহণ করলে উনাদের শান-মান, মর্যাদা-মর্তবা, বুযুর্গী সম্মানের খিলাফ হয়। উদাহরণস্বরূপ পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ উনার ৪৫নং আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার শান মুবারকে مكر শব্দ মুবারক উনার লুগাতী বা আভিধানিক অর্থ “ধোকাবাজি বা ষড়যন্ত্র” গ্রহণ না করে ‘হিকমত বা কৌশল’ গ্রহণ করতে হবে। একইভাবে উপরে বর্ণিত সকল মনোনীত ও সম্মানিত বান্দা-বান্দী উনাদের শান মুবারক সম্মত অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হবে।

মূলতঃ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের মর্যাদা বা শান মুবারক বিরোধী কথা-বার্তা যারা বলে থাকে বা লিখে থাকে তারা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ এবং পবিত্র আক্বায়িদ শরীফ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই তা বলে থাকে। যেমন কেউ বলে থাকে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি গন্ধম খেয়ে ভুল করেছিলেন। নাউযুবিল্লাহ! আবার কেউ বলে থাকে যে, তিনি গন্ধম খেয়ে একটা গুণাহ করেছিলেন। নাউযুবিল্লাহ! আবার অত্র সুওয়ালে বলা হয়েছে যে, তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। নাউযুবিল্লাহ!

প্রকৃতপক্ষে হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার শান মুবারক বিরোধী উল্লেখিত বক্তব্যসমূহের একটিও সঠিক নয়।

কেননা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وما ارسلنا من قبلك من رسول الا نوحى اليه

অর্থ: আমি আপনার (নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্বে প্রত্যেক রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি ওহী মুবারক প্রেরণ করেছি। (পবিত্র সূরা আম্বিয়া শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২৫)

অর্থাৎ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের যাবতীয় কার্যাবলী সম্মানিত ওহী মুবারক দ্বারা তথা মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে পরিচালিত হতো। যার পরিপ্রেক্ষিতে আক্বায়িদ শাস্ত্রের সমস্ত কিতাবে উল্লেখ রয়েছে-

الانبياء عليهم السلام كلهم معصومون

অর্থ: হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই মা’ছূম বা নিস্পাপ। (শরহে আক্বায়িদে নাসাফী, তাকমীলুল ঈমান, ফিক্বহুল আকবর, হাক্বায়িদে হাক্কাহ ইত্যাদি)

আরো উল্লেখ রয়েছে-

الانبياء عليهم السلام كلهم منزهون عن الصغائر والكبائر والكفر والقبائح

অর্থ: হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই ছগীরা, কবীরা, কুফর-শিরক এবং অপছন্দনীয় কাজ থেকেও পবিত্র। (শরহে আক্বায়িদে নাসাফী, তাকমীলুল ঈমান, ফিক্বহুল আকবর, হাক্বায়িদে হাক্কাহ ইত্যাদি)

কাজেই, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে পবিত্র আক্বায়িদ শাস্ত্র অনুযায়ী হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি আক্বীদা পোষন করতে হবে। অন্যথায় কারো পক্ষে মু’মিন-মুসলমান থাকা সম্ভব হবে না।

অতএব, হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার জান্নাত থেকে যমীনে আগমনের সঠিক যে ঘটনা তাহলো- মহান আল্লাহ পাক তিনি যখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনাদেরকে আদেশ মুবারক করেছিলেন যে-

لاتقربا هذه الشجرة.

অর্থ: “আপনারা এই (গন্ধমের) গাছের নিকটবর্তী হবেন না।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৫)। তখন উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার এ আদেশ মুবারক অনুযায়ী সে গাছের নিকটবর্তী হননি। বরং উক্ত গাছের অনুরূপ বিপরীত দিকের অন্য একটি গাছ দেখিয়ে ইবলিস শয়তান এসে হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনাকে মিথ্যা কছম খেয়ে বলেছিল যে, যদি আপনারা এ গাছের ফল খান, তবে আপনারা ফেরেশ্তা হয়ে যাবেন অথবা স্থায়ীভাবে বেহেশ্তে বসবাস করতে পারবেন। কোন কোন বর্ণনা মুতাবিক তখন হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম সে গাছ হতে ফল এনে শরবত বানিয়ে হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে খাইয়েছিলেন। অপর বর্ণনায়, ফল কেটে খাইয়েছিলেন। এ ঘটনা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার অজান্তেই সংঘটিত হয়েছিল। সুতরাং যা অজান্তে সংঘটিত হয়, তা কি করে ভুল বা অপরাধ হতে পারে? বাস্তবিক তা কখনই ভুল  হতে পারেনা। (সমূহ তাফসীরের কিতাব)   

এর মেছালস্বরূপ উল্লেখ করা যায়- ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত মুবারকের ঘটনা। তিনি যে শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেছিলেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। উনাকে দ্বীন ইসলাম উনার শত্রুরা শহীদ করার জন্য একে একে পাঁচবার বিষ পান করায়। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক উনার রহমতে তিনি প্রত্যেকবারই বেঁচে যান। ষষ্ঠবার উনাকে শহীদ করার জন্য উনার পানির কলসিতে যে কলসির মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখতেন, (যেন তার ভিতর কিছু ফেলা না যায়,) সেই কাপড়ের উপর শত্রুরা হিরকচূর্ণ বিষ উনার অজান্তে মিশিয়ে দিয়েছিল। তিনি গভীর রাত্রিতে হিরকচূর্ণ বিষ মিশ্রিত পানি কলসি থেকে ঢেলে পান করেন, যার ফলশ্রুতিতে তিনি শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। যা উনার অজান্তেই সংঘটিত হয়েছিল। (সিররুশ্ শাহাদাতাইন, শুহাদায়ে কারবালা, সীরতে হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিমাস সালাম) এখন প্রশ্ন উঠে, সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে উনার শাহাদাতকে আত্মহত্যা বলতে হবে, না ভুল করার কারণে ইন্তিকাল করেছেন, তা বলতে হবে?

প্রকৃতপক্ষে উপরোক্ত দু’টির কোনটিই বলা যাবেনা। যদি কেউ কোন একটিও বলে, তবে সে মিথ্যা তোহমত দেয়ার গুণাহে গুণাহগার হবে, যা কুফরীর শামিল হবে। হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার ঘটনাও তদ্রুপ। যা উনার অজান্তে সংঘটিত হয়েছিল। আর প্রকারান্তরে উনার উক্ত ঘটনা মুবারকটিও ছিল সম্মানিত ওহী মুবারক উনারাই অন্তর্ভুক্ত।

যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ কিতাব মুসলিম শরীফ ও মিশকাত শরীফ ইত্যাদি কিতাবসমূহের মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ গ্রহনের পর হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সাথে সাক্ষাৎ মুবারক হলো। তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার যথাযথ প্রশংসা করে বললেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে সৃষ্টি করে জান্নাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অতঃপর আপনিই মানব জাতিকে যমীনে নিয়ে আসার কারণ ঘটিয়েছেন। উত্তরে হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি এটা কিভাবে জানলেন? বললেন, তাওরাত শরীফ-এ পেয়েছি। হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে সৃষ্টির কতকাল পূর্বে তাওরাত শরীফ লিপিবদ্ধ করেছেন বলে আপনি জানেন? হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম তিনি বললেন, চল্লিশ বৎসর পূর্বে। তখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, যে বিষয়টি আমাকে সৃষ্টির চল্লিশ বৎসর পূর্বে মহান আল্লাহ পাক তিনি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন সে বিষয়টি সম্পর্কে কেন আমার কাছে জানতে চাচ্ছেন? অতঃপর নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার উপর জয়ী হলেন। সুবহানাল্লাহ!

স্মরণযোগ্য যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম উনাদের স্বপ্ন মুবারকও যেখানে ওহী মুবারকের অন্তর্ভুক্ত সেখানে উনাদের জাগ্রত অবস্থার বিষয়গুলো কি ওহী মুবারকের বাইরে ছিল? কখনই নয়। যদি তাই হয় তাহলে ওহী মুবারকের ফায়সালাকৃত বিষয়ের জন্য উনাদেরকে দোষারোপ করা কি করে শুদ্ধ হতে পারে?

কাজেই, উনাদের সাথে যদি ভুল বা গুনাহর বিষয়টি সম্পৃক্ত করা হয় তাহলে একইসাথে এটাও সম্পৃক্ত হয়ে যায় যে, মহান আল্লাহ পাক তিনিই ওহী মুবারক নাযিলে ভুল করেছেন এবং তিনিই উনাদেরকে গুনাহ করিয়েছেন। নাঊযুবিল্লাহ! যা চিন্তা-কল্পনা করাও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

অনুরূপ অন্যান্য হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ঘটনাও। মানুষ সঠিক ইতিহাস না জানার কারণে এবং পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সঠিক ব্যাখ্যা না বুঝার কারণে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকে বেয়াদবিমূলক কুফরী কথা-বার্তা বলে থাকে। নাউযুবিল্লাহ!

হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে কতটুকু আদব রক্ষা করতে হবে, সে প্রসঙ্গে কিতাবে ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত তরীকত হযরত ইমাম সাররি সাকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ঘটনা উল্লেখ করা হয়, যিনি উনার যামানায় মহান আল্লাহ পাক উনার লক্ষ্যস্থল ওলীআল্লাহ ছিলেন। যিনি ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত তরীক্বত ছিলেন। তিনি একবার স্বপ্নে মহান আল্লাহ পাক উনার নবী হযরত ইয়া’কুব আলাইহিস সালাম উনাকে দেখেন। দেখে তিনি পরিপূর্ণ আদবের সাথে প্রশ্ন করেছিলেন, হে মহান আল্লাহ পাক উনার নবী হযরত ইয়া’কুব আলাইহিস সালাম! আপনার অন্তরে মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত সত্যিকারভাবেই প্রবল রয়েছে তা সত্বে আপনি কি করে আপনার ছেলে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনার জুদায়ীর (বিচ্ছেদের) কারণে উনার মুহব্বতে চল্লিশ বছর যাবৎ কেঁঁদে কেঁদে আপনার চক্ষু মুবারক নষ্ট করেছিলেন? একথা বলার সাথে সাথে গইব থেকে নেদা (আওয়াজ) হলো, “হে সাররি সাকতী! সতর্কতার সাথে হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকে কথা বলুন।” এরপর হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনাকে উনার সামনে পেশ করা হলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান এবং এভাবে একাধারা তের দিন তের রাত বেহুঁশ থাকার পর হুঁশ ফিরে পান। তখন গইব থেকে পুনরায় নেদা হয়, “মহান আল্লাহ পাক উনার নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকে এ ভাবে কথা বললে এরূপই অবস্থা হয়ে থাকে।” (তাযকিরাতুল আউলিয়া)

উপরোক্ত ওয়াকিয়ার দ্বারা প্রতিভাত হয় যে, হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে কি পরিমাণ আদবের সাথে কথা বলতে হবে এবং উনাদের সাথে বেয়াদবির কি পরিণতি? সত্যিই তা চিন্তা-ফিকিরের বিষয়। বেয়াদব সম্পর্কে হযরত জালালুদ্দীন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

بے ادب محروم گشت از لطف رب.

অর্থ: “বেয়াদব মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত থেকে বঞ্চিত।” (মসনবী শরীফ)

উল্লেখ্য যে, হযরত ইমাম সাররি সাকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত তরীক্বত ও মহান আল্লাহ পাক উনার লক্ষ্যস্থল ওলী হওয়া সত্বেও উনার প্রতি সতর্কবাণী ও সাবধানবাণী উচ্চারিত হয়েছে। উনার ওয়াকিয়া বা ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি কি পরিমাণ আদব রক্ষা করা উচিত।

মূলতঃ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ভুল করা তো দূরের কথা, কোন প্রকার অপছন্দনীয় কাজও উনারা করতেন না। বরং সর্বপ্রকার অপছন্দনীয় কাজ থেকেও উনারা বেঁচে থাকতেন বা পবিত্র থাকতেন, সে প্রসঙ্গে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র  সীরত মুবারক থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়- “একবার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হুজরা শরীফে বসা ছিলেন। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লাম উনার সাথে সাক্ষাত মুবারক করার অনুমতি চাইলেন। এ সংবাদ উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট পৌঁছালেন। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, সে ব্যক্তিকে অপেক্ষা করতে বলুন। একথা বলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার পাগড়ী মুবারক, জামা বা কোর্তা মুবারক ইত্যাদি গুছগাছ করে নিলেন। এমনকি হুজরা শরীফ থেকে বের হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে পানির গামলাতে নিজের চেহারা মুবারক দেখে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তা দেখে সে সময় উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনিও কি এরূপ করেন? তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “কিরূপ করি?” উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, “এরূপ পরিপাটি।” এর জাওয়াবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমরা মহান আল্লাহ পাক উনার নবী। আমাদের কোন কাজ কারো অপছন্দ হলে, সে ঈমান হারা হয়ে যাবে।” (আল্ মুরশিদুল আমীন)

অতএব, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা যে কতটুকু অপছন্দনীয় কাজ থেকে বেঁচে থাকতেন, এ হাদীছ শরীফ উনার বর্ণিত ঘটনা তারই প্রমাণ। তাহলে কি করে এ কথা বলা যেতে পারে বা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম  উনারা ভুল-ত্রুটি করেছিলেন? বস্তুতঃ এরূপ আক্বীদা পোষণ করা সম্পূর্ণই হারাম ও কুফরী।

কাজেই, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকের খিলাফ কোন অর্থ গ্রহণ করা যাবেনা বরং এমন অর্থ ব্যবহার বা গ্রহণ করতে হবে, যাতে উনাদের শান মুবারক সমুন্নত থাকে।

যেমন পবিত্র সূরা আনআম ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তরজমা বর্ণনায় অনেকে মূর্তিপূজক আযর নামক ব্যক্তিটিকে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা বলে উল্লেখ করে থাকে। যা সম্পূর্ণরূপে ভুল ও কুফরী। কেননা তা মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার এবং সর্বোপরি সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের পবিত্রতম শান বা মর্যাদা মুবারক উনার প্রকাশ্য বিরোধী।

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وتقلبك فى الساجدين

অর্থ : মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে (নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে) সিজদাকারীগণ উনাদের মধ্যে স্থানান্তরিত করেছেন। (পবিত্র সূরা শুআরা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২১৯)

এ পবিত্র আয়াতে কারীমা দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্ব পুরুষ আলাইহিমুস সালাম এবং পূর্ব মহিলা আলাইহিন্নাস সালাম উনারা সকলেই পরিপূর্ণ ঈমানদার ও দ্বীনদার ছিলেন। উনাদের কেউই কাফির মুশরিক ছিলেন না।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لـم ازل انقل من اصلاب الطاهرين الى ارحام الطاهرات

অর্থ : আমি সর্বদা পূতঃপবিত্র পুরুষ  ও মহিলা উনাদের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছি। (তাফসীরে কবীর)

এছাড়া আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা হচ্ছে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কারো পিতা ও মাতা উনারা কেউই কাফির-মুশরিক ছিলেন না। তাহলে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্ব পিতা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা তিনি কি করে মূর্তিপূজক তথা মুশরিক হতে পারেন!

অতএব বলার অপেক্ষা রাখেনা, উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে আযর নামক ব্যক্তিটি আসলে উনার পিতা ছিলো না; বরং উনার চাচা ছিল। সুতরাং উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ابيه  অর্থ উনার পিতা নয় বরং উনার চাচা। আর উনার পিতা হচ্ছেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম।

অনুরূপভাবে সূরা ত্ব-হা শরীফ উনার ১২১নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার শেষাংশে

وعصى ادم ربه فغوى

উনার তরজমা বর্ণনায় অনেকে বলে থাকে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি উনার পালনকর্তার আদেশ লঙ্ঘন করলেন, ফলে তিনি পথভ্রান্ত হয়ে গেলেন। নাউযুবিল্লাহ!

এ তরজমা মহান আল্লাহ পাক উনার প্রথম নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র শান মুবারক উনার খিলাফ হওয়ার কারণে প্রকাশ্য কুফরী। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা হচ্ছে সমস্ত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা ওহী মুবারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উনারা ওহী ছাড়া কোন কথা বলেননি এবং কোন কাজ করেননি। তাই উনারা সমস্ত গুনাহখতা, ভুল-ভ্রান্তির উর্ধ্বে। উনারা মা’ছূম বা নিষ্পাপ। তাছাড়া হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে নবী-রসূল হিসেবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই, হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার নাফরমানী বা অবাধ্যতাজনিত  কাজ সংঘঠিত হয় কি করে এবং তিনি পথভ্রান্ত বা পথহারা হন কি করে!

প্রকৃতপক্ষে উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ছহীহ অর্থ হচ্ছে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি উনার রব তায়ালা উনার আদেশ মুবারক পালন করলেন অতঃপর যমীনে তাশরীফ আনলেন। অর্থাৎ ফরমাবরদারী করে জমিনে তাশরীফ মুবারক আনলেন।

একইভাবে সূরা দ্বুহা শরীফ উনার ৭নং পবিত্র আয়াত শরীফ-

ووجدك ضالا فهدى

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তরজমা বর্ণনায় অনেকেই বলে ও লিখে থাকে যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার প্রিয়তম রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পথহারা পেয়েছেন অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। নাউযুবিল্লাহ!

এ তরজমা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে জঘণ্য কুফরীর শামিল। কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তো সৃষ্টিই হয়েছেন মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হিসেবে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে; যা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্ট বর্ণিত রয়েছে।

সুতরাং যিনি সৃষ্টিই নবীউল্লাহ, রসূলুল্লাহ, হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে তিনি পথহারা, বিভ্রান্ত হন কি করে! এ তরজমা কোন মুসলমান করতে পারেনা। কেউ করলে তাকে খালিছ তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। অন্যথায় জাহান্নাম ব্যতীত তার জন্য কোন জায়ঠিকানা থাকবে না।

প্রকৃতপক্ষে উক্ত আয়াত শরীফ উনার সঠিক অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে কিতাববিহীন পেয়েছেন অতঃপর কিতাব প্রদান করেছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয়তম রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী উনাদেরকে রাবী বলা হয়। এই রাবীগণ উনাদের মধ্যে যাঁরা প্রথম শ্রেণীর রাবী, উনাদেরকে বলা হয় ছেক্বাহ রাবী।

পবিত্র হাদীছ শরীফ বিশারদগণ উনারা ছেক্বাহ্ রাবী হওয়ার জন্য যে মানদ- নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে মূল বিষয় হচ্ছে- (১) আদালত ও (২) জব্ত। জব্ত হচ্ছে- প্রখর স্মরণশক্তি। তা এমন যে, একবার শুনলে আর ভুলেনা।      আর আদালত-এর মধ্যে যে শর্তসমূহ রয়েছে, তার মধ্যে প্রধান হলো দু’টি। যথা- (ক) তাক্বওয়া, (খ) মুরুওওয়াত। (ক) তাক্বওয়া হচ্ছে- কুফর-শিরক, বিদ্য়াত ও ফাসিকী কাজ থেকে বেঁচে থাকার সাথে সাথে কবীরাহ গুণাহ থেকে, এমনকি ছগীরাহ গুণাহও বার বার করা থেকে বেঁচে থাকা। পবিত্র হাদীছ শরীফ সম্পর্কে মিথ্যা না বলা। সাধারণ কাজে মিথ্যা না বলা। অজ্ঞাতনামা না হওয়া, অপরিচিত না হওয়া। গাফলতী না থাকা। বদ আক্বীদা সম্পন্ন না হওয়া। বে-আমল না হওয়া।  (খ) আর মুরুওওয়াত হচ্ছে- অশ্লীল-অশালীন, অশোভনীয়, অপছন্দনীয় আচার-আচরণ, উঠা-বসা, চাল-চলন, যেখানে-সেখানে ইস্তিঞ্জা করতে বসা, হাট-বাজারে গিয়ে চিৎকার করা, রাস্তা-ঘাটে লোকজনের সাথে অনর্থক ঝগড়া-ঝাটি করা ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া এমনকি দৃষ্টিকটু কাজ থেকে বিরত থাকা। যেমন- রাস্তায় হেঁটে হেঁটে খাদ্য খাওয়া, রাস্তায় অট্টহাস্য করা, চিৎকার করা ইত্যাদি। (তাদরীবুর রাবী, মুকাদ্দামাতুশ শায়েখ, মীযানুল আখবার, নূরুল আনোয়ার, মুকাদ্দামাতুল মিশকাত)

এখন ফিকিরের বিষয় এই যে, পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী ছেক্বাহ্ রাবী যদি এত গুণ ও যোগ্যতাসম্পন্ন এবং তাক্বওয়াধারী হন অর্থাৎ পবিত্র হাদীছ শরীফ বিশারদ এই উম্মতের নিকট যদি ছেক্বাহ রাবী হিসেবে পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী হওয়ার জন্য ছগীরাহ্ গুণাহ্ বার বার না করা ও দৃষ্টিকটু সাধারণ অপছন্দনীয় কাজও না করা শর্ত হয়, তাহলে যাঁরা মহান আল্লাহ পাক উনার নবী হবেন এবং মহান আল্লাহ্ পাক উনার কালাম বর্ণনা করবেন, উনাদের জন্য মহান আল্লাহ পাক কি মানদ- নির্ধারণ করেছেন বা উনাদের ক্ষেত্রে কি পরিমান মা’ছূম ও মাহ্ফূজ হওয়া নির্দিষ্ট করেছেন তা অনুধাবনীয়।

অতএব, যে কোন লোকের জন্যই হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ উনাদের শান মুবারক উনার বিন্দুমাত্র খিলাফ কথাবার্তা বলা সম্পূর্ণ নাজায়িয, হারাম ও কুফরী। এ ধরণের কুফরী আক্বীদা থেকে বেঁচে থাকা সমস্ত মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয।

 {দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীরে আহকামুল কুরআন জাসসাস্, (২) তাফসীরে কুরতুবী, (৩) তাফসীরে মাযহারী, (৪) তাফসীরে রুহুল বয়ান, (৫) তাফসীরে রুহুল মায়ানী, (৬) তাফসীরে খাযিন, (৭) তাফসীরে বাগবী, (৮) তাফসীরে কবীর, (৯) তাফসীরে তাবারী, (১০) তাফসীরে যাদুল মাছীর, (১১) তাফসীরে দুররে মনছুর, (১২) তাফসীরে ইবনে কাছীর, (১৩) শরহে আক্বাইদে নছফী, (১৪) ফিক্বহে আকবর, (১৫) তাকমীলুল ঈমান, (১৬) আক্বাইদে হাক্কাহ, (১৭) তাযকিরাতুল আউলিয়া, (১৮) মসনবী শরীফ, (১৯) আল মুরশিদুল আমীন, (২০) তাদরীবুর রাবী, (২১) মুকাদ্দামাতুশ্ শায়েখ, (২২) মীযানুল আখবার, (২৩) মুকাদ্দামাতুল মিশকাত, (২৪) নূরুল আনোয়ার, (২৫) রু’ইয়াতুল হাদীস, (২৬) নুখবাতুল ফিকির, (২৭) কিফায়া, (২৮) কাশফুল আসরার ইত্যাদি।} 

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।