সুওয়াল: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইন্তিকাল দিবস হচ্ছে দুঃখের দিন। আর দুঃখের দিনে খুশি প্রকাশ করাটা অন্যায়।” এ বক্তব্য কতটুকু পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ সম্মত? দয়া করে জানাবেন।

সংখ্যা: ২৪১তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান, সদর, কিশোরগঞ্জ

 সুওয়াল: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইন্তিকাল দিবস হচ্ছে দুঃখের দিন। আর দুঃখের দিনে খুশি প্রকাশ করাটা অন্যায়।” এ বক্তব্য কতটুকু পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ সম্মত? দয়া করে জানাবেন।


জাওয়াব: উপরোক্ত বক্তব্য পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের সম্পূর্ণ খিলাফ যা কাট্টা কুফরী। আর “ইন্তিকাল” শব্দের অর্থ হচ্ছে স্থানান্তরিত হওয়া বা করা। অর্থাৎ ইহ্কাল থেকে পরকালে স্থানান্তরিত হওয়া বা গমন করা।

হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের শান মুবারকে ইন্তিকালের হুকুম:

ইন্তিকাল সম্পর্কে হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের শানে বলা হয়েছে-

الا ان اولياء الله لايموتون بل ينتقلون من دار الفناء الى دار البقاء

অর্থ: “সাবধান! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক উনার ওলীগণ উনারা মৃত্যুবরণ করেন না বরং উনারা অস্থায়ী আবাস থেকে স্থায়ী আবাসে প্রত্যাবর্তন করেন।”

শহীদগণ উনাদের শানে ইন্তিকালের হুকুম:

আর যাঁরা শহীদ উনাদের শানে খোদ কালাম পাকে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ولاتقولوا لـمن يقتل فى سبيل الله اموات بل احياء ولكن لاتشعرون.

অর্থ: “তোমরা উনাদেরকে মৃত বলোনা। যাঁরা মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় শহীদ হয়েছেন বরং উনারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারছো না।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫৪)

অন্যত্র ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ولا تحسبن الذين قتلوا فى سبيل الله امواتا بل احياء عند ربـهم يرزقون.

অর্থ: যাঁরা মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় শহীদ হন উনাদেরকে কখনো মৃত মনে করোনা; বরং উনারা উনাদের রব তায়ালা উনার নিকট জীবিত ও রিযিকপ্রাপ্ত। (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৬৯)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় যামানার লক্ষস্থল ওলীআল্লাহ আওলাদে রসূল মুজাদ্দিদে আ’যম ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় যাঁরা শহীদ হন উনারা যদি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট জীবিত ও রিযিকপ্রাপ্ত হন এবং উনাদেরকে মৃত বলা নিষেধ হয়ে যায় তাহলে মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বতে যাঁরা বা যেসকল আউলিয়ায়ে কিরাম পুরুষ কিংবা মহিলা উনারা পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন উনাদের সম্পর্কে তাহলে কি হুকুম হবে, তা চিন্তা-ফিকির করতে হবে। বস্তুত সেসম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

الـموت جسر الى الله

অর্থ: উনাদের বিছাল শরীফ গ্রহণ হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত দীদার মুবারক লাভের সেতু। অর্থাৎ উনারা পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের সাথে সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত দীদার মুবারক লাভে ধন্য হন। সুবহানাল্লাহ!

যেমন হানাফী মাযহাবের ইমাম হযরত ইমামে আ’যম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিছাল শরীফ গ্রহণ করার পর উনাকে যখন দাফন মুবারক করার জন্য খাটিয়ায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তিনি খাটিয়া মুবারক থেকে বুড়ির মাসয়ালার জাওয়াব দিয়েছিলেন যে, হে বুড়ি! তুমি জেনে রাখ, তোমার ছাগলের থুতনীর পশমের চেয়ে আমার দাড়ী মুবারক অনেক অনেক গুণ সম্মানিত। কারণ হলো, আমি সম্মানিত ঈমান উনার সাথে এবং মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বতে বিছাল শরীফ গ্রহণ করেছি। সুবহানাল্লাহ!

অনুরূপভাবে তৃতীয় হিজরী শতাব্দী সনের বিশিষ্ট বুযুর্গ হযরত যুননূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করার পর উনার কপাল মুবারকে কুদরতিভাবে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়েছিল

هذا حبيب الله مات فى حب الله

অর্থ: ইনি মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বতে বিছাল শরীফ গ্রহণ করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

একইভাবে যিনি হিজরী সপ্তম শতাব্দী সনের মুজাদ্দিদ, সুলত্বানুল হিন্দ, গরীবে নেওয়াজ, আওলাদে রসূল হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চীশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করার পর উনার কপাল মুবারকে কুদরতীভাবে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়েছিল-

هذا حبيب الله مات فى حب الله

অর্থ: ইনি মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বতে বিছাল শরীফ গ্রহণ করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

সত্যিই উনার বিছাল শরীফ গ্রহণের পর উনার প্রধান খলীফা হাফিযে মাদারযাদ হযরত বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুরাকাবার হালতে উনাকে দেখতে পেয়ে সালাম ও কদমবুছী করার পর জিজ্ঞাসা করলেন, হে আমার শায়েখ! মহান আল্লাহ উনার নিকট আপনি কিরূপ ব্যবহার পেলেন? জাওয়াবে সুলত্বানুল হিন্দ, হাবীবুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্যশীল বান্দা অনেক শ্রেণীর। তন্মধ্যে যাঁরা প্রথম শ্রেণী উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত আরশ মুবারকের অধিবাসী। উনারা চব্বিশ ঘন্টা অর্থাৎ দায়িমীভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার দীদার মুবারকে মশগুল। মহান আল্লাহ পাক তিনি দয়া করে আমাকে ঐ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম ও শহীদগণ, উনাদের শান মুবারকই যদি এ রকম হয় তাহলে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম উনাদের পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ কি হবে?

হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ উনাদের শানে ইন্তিকালের হুকুম:

হযরত নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারক সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

الانبياء عليهم السلام احياء فى قبورهم.

অর্থ: “হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম উনারা উনাদের রওজা শরীফে জীবিত রয়েছেন।” (দায়লামী শরীফ)

মূলত: হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ, পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ এবং উনাদের বিশেষ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার দিনসমূহ মহান আল্লাহ পাক উনার বিশেষ দিনসমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং এ দিনসমূহে উম্মতকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য অর্থাৎ পালন করার বা বন্দিগী করার জন্য পবিত্র কুরআন শরীফ সূরা ইবরাহীম শরীফ উনার ৫নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে আদেশ মুবারক করা হয়েছে। কেননা এ দিনসমূহে মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে খাছ রহমত, বরকত, সাকীনা, শাস্তি বর্ষিত হয়।

যেমন, এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وسلم عليه يوم ولد ويوم يموت ويوم يبعث حيا

অর্থ: “হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম উনার প্রতি সালাম (শান্তি) যে দিন তিনি বিলাদত শরীফ গ্রহন করেছেন এবং যেদিন তিনি বিছাল শরীফ গ্রহন করবেন এবং যেদিন পুনরুত্থিত হবেন।” (পবিত্র সূরা মারইয়াম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫)

অনুরূপ হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম উনার সম্পর্কে উনার নিজের বক্তব্য মুবারক পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

والسلم على يوم ولدت ويوم اموت ويوم ابعث حيا

অর্থ: “আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি বিলাদত শরীফ গ্রহণ করি, যেদিন আমি বিছাল শরীফ গ্রহণ করি এবং যেদিন পুণরুত্থিত হব।” (পবিত্র সূরা মারইয়াম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৩)

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

حياتى خير لكم ومماتى خير لكم

অর্থ: “আমার যমীনে সম্মানিত অবস্থান মুবারক করা এবং পবিত্র রওযা শরীফ উনার মধ্যে অবস্থান মুবারক করা (ইহকাল ও পরকাল) সব অবস্থাই তোমাদের জন্য কল্যাণ ও খায়ের বরকতের কারণ।” (কানযুল উম্মাল শরীফ)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

ان من افضل ايامكم يوم الجمعة فيه خلق ادم وفيه قبض

অর্থ: “তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে উত্তম দিন হচ্ছে জুমুয়ার দিন, ঐ দিনে হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি সৃষ্টি হয়েছেন এবং ঐ দিনেই তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন।” (নাসাঈ শরীফ)      

অতঃপর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

ان هذا يوم عيد جعله الله للمسلمين

অর্থ: “এই জুমুয়ার দিন হচ্ছে ঈদের দিন। এদিনকে মহান আল্লাহ পাক তিনি মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন সাব্যস্ত করেছেন।” (ইবনে মাজাহ্, মুসনদে আহমদ)

সুতরাং বুঝা গেলো যে, জুমুয়ার দিনটি মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত আবুল বাশার আদম আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ গ্রহণের দিন হওয়া সত্বেও মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বয়ং নিজেই সে দিনটিকে খুশির দিন হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাহলে কি মহান আল্লাহ পাক তিনি অন্যায় করলেন? নাউযুবিল্লাহ!

আর মহান আল্লাহ পাক উনার শ্রেষ্ঠতম রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং নিজেই জুমুয়ার দিনকে খুশির দিন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তাহলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কি এ ঘোষণা দিয়ে অন্যায় করলেন? নাউযুবিল্লাহ!

উল্লেখ্য, সুওয়ালে বিবৃত বক্তব্য মুতাবিক বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের বিছাল শরীফ উনার দিন খুশি প্রকাশ করা অন্যায়মূলক কাজ; তাহলে তাদের ভাষায় বলতে হয় যে, “মহান আল্লাহ্ পাক স্বয়ং তিনি নিজেই হযরত আবুল বাশার আদম আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ গ্রহনের দিন (জুমুয়ার দিন) খুশির দিন হিসেবে নির্দিষ্ট করে আর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সেই নির্দিষ্ট দিন খুশির দিন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে অন্যায় করেছেন?” নাউযুবিল্লাহ!

এ আক্বীদা যদি কোন ব্যক্তি বা মুসলমান পোষণ করে তবে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হবে। পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের আগমন, বিদায়, পুনরুত্থান প্রত্যেকটিই রহমত, বরকত ও সাকীনার কারণ।

অতএব, অন্যান্য হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের বিলাদত শরীফ, বিছাল শরীফ এক কথায় সবকিছুই যেখানে রহমত, বরকত, সাকীনার দ্বারা পরিপূর্ণ সেখানে যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিষয়টি তো বলার অপেক্ষা রাখেনা।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার শ্রেষ্ঠতম রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

حياتى خير لكم ومماتى خير لكم.

অর্থ: “আমার যমীনে সম্মানিত অবস্থান মুবারক করা এবং পবিত্র রওযা শরীফ উনার মধ্যে অবস্থান মুবারক করা (ইহকাল ও পরকাল) সব অবস্থাই তোমাদের জন্য কল্যাণ ও খায়ের বরকতের কারণ।” (কানযুল উম্মাল শরীফ)

অর্থাৎ, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করার বরকতময় দিন উম্মতের জন্য দুঃখ প্রকাশের দিন নয়। কারণ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেদিন বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন সেদিনেই যমীনে সম্মানিত তাশরীফ মুবারক রেখেছেন, তাই উনার সম্মানিত তাশরীফ মুবারক অর্থাৎ পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে মহান আল্লাহ পাক উনার আখাচ্ছুল খাছ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা প্রত্যেক মাখলুক্বাত খাছ করে জ্বিন-ইনসানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এরপরও মূল কথা হলো, তিনি হচ্ছেন হায়াতুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শুধুমাত্র পর্দার আড়ালে মুবারক অবস্থান করবেন। কাজেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করার দিনে দুঃখ প্রকাশ করার প্রশ্নই আসতে পারেনা। শুধুমাত্র যারা বদ আক্বীদা বিশিষ্ট, বিদয়াতী, গোমরাহ, বাতিল ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত তারাই উক্ত দিনে দূঃখ প্রকাশ করতে পারে বা দুঃখের দিন হিসেবে ঘোষণা করতে পারে।

এরপরও উক্ত বদ আক্বীদা বিশিষ্ট বিদয়াতী ও গোমরাহ লোকদের বলতে হয়, তারা যদি “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওা সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের দিন উনাকে দুঃখের দিন বলে উক্ত দিনে খুশি প্রকাশ না করে শোক পালন করতে চায় তথাপিও তারা সে দিনকে শোকের দিন হিসেবে সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে প্রমাণ করতে পারবেনা।

কারণ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

امرنا ان لانحد على ميت فوق ثلاث الا لزوج

অর্থ: “আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমরা কারো ওফাতে তিন দিনের পর আর শোক প্রকাশ না করি। তবে স্বামীর জন্য স্ত্রী (৪ মাস ১০ দিন) শোক পালন করতে পারবে।” (বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, দারিমী, মুয়াত্তা ইমাম মালিক)

অতএব, সম্মানিত শরীয়ত উনার দলীল-আদিল্লাহ দ্বারা পবিত্র ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ উনাকে কোন মতেই শোকের দিন হিসেবে সাব্যস্ত করা সম্ভব নয়। কাজেই যেদিনটি শোকের দিন নয়, সেদিন কি করে শোক পালন করবে? তাই আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার

পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের দিনকে নিয়ামত মনে করে উক্ত দিন উপলক্ষে শুকরিয়া স্বরূপ খুশি প্রকাশ করা প্রত্যেক উম্মতের জন্য ফরয।

সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, সাধারণভাবে একই দিনে যদি শোক ও খুশির ঘটনাবলীর সমাবেশ ঘটে যায় তবে শোক প্রকাশের বৈধতা তিন দিন পরেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু খুশিকে স্মরণ করা ও সেটার আনন্দ উদযাপন করার বৈধতা সর্বদাই থেকে যায়। আর খাছভাবে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম উনাদের সম্পর্কে ফতওয়া হলো, উনাদের পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ ও পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশসহ প্রত্যেকটি বিষয়ই রহমত, বরকত ও সাকীনা ইত্যাদির কারণ। তাই উনাদের পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ ও পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ যদি একই দিনে সংঘটিত হয় তবে সেদিন শোক প্রকাশ না করে খুশি প্রকাশ করা ও শুকরিয়া আদায় করা প্রত্যেক উম্মতের দায়িত্ব ও কর্তব্য তথা ফরয উনার অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, ইন্তিকালের দিনে শোকের বৈধতা অবান্তর। কিন্তু “সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ পবিত্র ঈদে মীলাদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” উনার খুশি ক্বিয়ামত পর্যন্তই বহাল থাকবে। তাই এদিনে শোক পালন করা বৈধ হবেনা। বরং শুকরিয়া স্বরূপ মহা পবিত্র ঈদে মীলাদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা মহা পবিত্র ও মহা সম্মানিত সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করা দায়িত্ব ও কর্তব্য তথা ফরয। এ মর্মে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

قل بفضل الله وبرحمته فبذلك فليفرحوا هو خير مما يجمعون

অর্থ: (হে আমার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি বলে দিন যে, মহান আল্লাহ পাক উনার বরকতময় ফদ্বল ও সম্মানিত রহমত স্বরূপ আপনাকে পাওয়ার কারণে তাদের (উম্মতের তথা সমস্ত কায়িনাতের) উচিত বা দায়িত্ব কর্তব্য অর্থাৎ ফরয হচ্ছে খুশি প্রকাশ করা। ইহা অর্থাৎ খুশি প্রকাশ করার আমল মুবারক তাদের সমস্ত আমল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা ইউনুস শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৮)

{দলীলসমূহ: (১) তাফসীরে রহুল মায়ানী, (২) তাফসীরে রুহুল বয়ান, (৩) তাফসীরে মাযহারী, (৪) তাফসীরে ইবনে কাছীর, (৫) তাফসীরে ইবনে আব্বাস, (৬) তাফসীরে খাযিন, (৭) বাগবী, (৮) কুরতুবী, (৯) কবীর, (১০) তাবারী, (১১) দুররে মনছুর, (১২) মুসলিম, (১৩) আবূ দাউদ, (১৪) মিশকাত, (১৫) ফতহুল মুলহিম, (১৬) শরহে নববী, (১৭) মুফহিম, (১৮) আউনুল মা’বুদ, (১৯) বজলুল মাজহুদ, (২০) মিরকাত, (২১) কানযুল উম্মাল, (২২) আশয়াতুল লুময়াত, (২৩) লুময়াত, (২৪) শরহুত্ ত্বীবী, (২৫) তা’লীকুছ্ ছবীহ্, (২৬) মুযাহিরে হক্ব, (২৭) মিরআতুল মানাযীহ্, (২৮) আন্ নিয়ামাতুল কুবরা, (২৯) খাছায়িছুল কুবরা, (৩০) আখবারুল আখইয়ার, (৩১) মাদারিজুন্ নুবুওওয়াত, (৩২) তাযকিরায়ে গাউছিয়া, (৩৩) ইনশিরাহুছ্ ছুদূর, (৩৪) বালাগুল মুবীন, (৩৫) সীরাতুন্ নবী বা’দ আজ বিসালুন নবী, (৩৬) সীরাতে খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী, (৩৭) নুরুল আনোয়ার ইত্যাদি।}

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।