সুওয়াল: বাতিল আক্বীদা ও ফিরক্বার লোকদের বক্তব্য হচ্ছে, “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উনার তারিখ নিয়ে মতভেদ; তাই মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় পালন করা ঠিক নয়। আর ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ বিলাদত শরীফ উনার দিন এটা সবচেয়ে দুর্বল মত।” এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের ফায়সালা জানিয়ে বাধিত করবেন।

সংখ্যা: ২৪১তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ হারুনুর রশীদ, মাহিগঞ্জ, রংপুর

 সুওয়াল: বাতিল আক্বীদা ও ফিরক্বার লোকদের বক্তব্য হচ্ছে, “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উনার তারিখ নিয়ে মতভেদ; তাই মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় পালন করা ঠিক নয়। আর ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ বিলাদত শরীফ উনার দিন এটা সবচেয়ে দুর্বল মত।” এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের ফায়সালা জানিয়ে বাধিত করবেন।


জাওয়াব: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ নিয়ে মতভেদ, তাই মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় পালন করা ঠিক নয়। আর ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ উনার বিলাদত শরীফ উনার দিন এটা সবচেয়ে দুর্বল মত।” নাউযুবিল্লাহ! এরূপ বক্তব্য দানকারী ব্যক্তিদের বক্তব্যের সমর্থনে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের ছহীহ কোন দলীল-প্রমাণ নেই। বরং তা সম্পূর্ণ উদ্ভট ও মনগড়া বক্তব্য। কাজেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।

কারণ, মহান আল্লাহ্ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

هاتوا برهانكم ان كنتم صدقين.

অর্থ: “তোমরা সত্যবাদী হলে দলীল পেশ কর।” (পবিত্র সূরা নমল শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৬৪)

আর, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দলীল সম্মত কথা হলো, মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় পালন বা আমল করা অবশ্যই ঠিক। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

يايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم فان تنازعتم فى شىء فردوه الى الله والرسول.

অর্থ: “হে মু’মিনগণ! তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনাকে ইত্বায়াত করো এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ইতায়াত করো এবং তোমাদের মধ্যে যাঁরা উলিল আমর উনাদেরকে ইত্বায়াত করো। অতঃপর যখন কোন বিষয়ে উলিল-আমরগণ উনাদের মধ্যে ইখতিলাফ দেখতে পাবে তখন (সে বিষয়টি ফায়সালার জন্য) তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করো। অর্থাৎ যে উলিল আমর উনার স্বপক্ষে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দলীল বেশি হবে উনারটিই গ্রহণ করো।” সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৯)   

উল্লেখ্য, মহান আল্লাহ পাক তিনি হক্ব-নাহক্ব দু’টি বিষয়ই মানুষের মাঝে বর্ণনা করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وهدينه النجدين.

অর্থ: “আমি দু’টি পথই জানিয়ে দিয়েছি।” (পবিত্র সূরা বালাদ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১০)

হক্বতালাশীগণ নাহক্বের বিরোধিতা করেন, আর নাহক্ব পন্থীরা হক্ব উনার বিরোধিতা করে। এমনিভাবে প্রায় প্রতিটি বিষয়, প্রতিটি আমলের ক্ষেত্রেই হক্ব ও নাহক্বপন্থীদের মধ্যে ইখতিলাফ বা মতবিরোধ রয়েছে। তবে ইখতিলাফ বা মতভেদ দু’ ধরণের হয়ে থাকে। (১) শুধু হক্ব উনার জন্যই হক্ব তালাশীগণের ইখতিলাফ।

যেমন, ঈমানের শর্ত হিসেবে কেউ উল্লেখ করেছেন-

تصديق بالجنان

অর্থাৎ- “অন্তরের সত্যায়ন।”

ও اقرار باللسان

অর্থাৎ- “মৌখিক স্বীকৃতি।”     আবার কেউ উল্লিখিত দু’টি শর্তের সাথে তৃতীয় শর্ত হিসেবে عمل بالاركان অর্থাৎ- “ফরযসমূহ আমল করা” উল্লেখ করেছেন। অনুরূপ পবিত্র নামায, পবিত্র রোযা, পবিত্র হজ্জ্ব, পবিত্র যাকাত ইত্যাদি প্রায় প্রতিটি বিষয় বা আমলের ক্ষেত্রে উনাদের মাসয়ালা-মাসায়িল, হুকুম-আহকাম বর্ণনার ব্যাপারে ইখতিলাফ পরিলক্ষিত হয়।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

اختلاف العلماء رحمة.

অর্থাৎ- “হক্কানী-রব্বানী আলিমগণ উনাদের ইখতিলাফ রহমতের কারণ।”

যেমন, হক্কানী-রব্বানী আলিমগণ ইখতিলাফ করে সম্মানিত হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী, হাম্বলী ৪টি সম্মানিত মাযহাবকেই হক্ব বলে স্বীকার করে নিয়েছেন এবং এর উপরই উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

(২) হক্ব ও নাহক্বের মধ্যে হক্ব তালাশীগণের সাথে নাহক্বপন্থীদের ইখতিলাফ বা মতবিরোধ।

মহান আল্লাহ পাক তিনি এক, আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শেষ নবী, পবিত্র মীলাদ শরীফ-পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ করা অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম উনার ছানা-ছিফত মুবারক করা ফরয এবং তা করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মুহব্বত, মা’রিফত ও সন্তুষ্টি মুবারক হাছিল হয় এসব হক্বতালাশীগণের আক্বীদা ও আমল।

কিন্তু নাহক্ব বা বাতিলপন্থীদের আক্বীদা ও আমল হচ্ছে, মহান আল্লাহ পাক তিনজন (নাউযুবিল্লাহ) অর্থাৎ তারা ত্রিত্ববাদ বা তিন খোদায় বিশ্বাসী, তাদের কারো আক্বীদা হলো “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শেষ নবী বা রসূল নন।” নাউযুবিল্লাহ! আবার কারো কারো আক্বীদা ও আমল হচ্ছে, “পবিত্র মীলাদ শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ বিদআত, হারাম, শিরক ইত্যাদি।” নউযুবিল্লাহ!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় যদি পালন করা ঠিক না হয় তাহলে কি মহান আল্লাহ পাক উনাকে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম ইত্যাদি সব বাদ দিতে হবে? নাউযুবিল্লাহ! কখনোই নয়।

বরং মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অর্থাৎ উনারা ইখতিলাফ সম্পর্কে বলেছেন যে, “যেখানে ইখতিলাফ হবে সেখানে যেই উলিল আমর উনার পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ সম্মত দলীল বেশী হবে উনারটিই গ্রহণ করতে হবে। কাজেই, যে ব্যক্তি বলবে মতভেদপূর্ণ বা ইখতিলাফি বিষয় পালন করা ঠিক নয়, সে ব্যক্তি চরম জাহিল ও কাট্টা কাফিরের অন্তর্ভুক্ত।”

হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনাদের বর্ণনা মতে, কোন মুসলমান নামধারী আলিম ও জাহিল নামধারী ব্যক্তির প্রতি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমত উনার পরিবর্তে গযব ও লা’নত এটা বুঝার জন্য নিম্নোক্ত আলামত বা লক্ষণগুলো পর্যায়ক্রমে তার মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রথমতঃ সে ইবাদত-বন্দেগীতে অলস হয়ে যাবে। দ্বিতীয়তঃ কোন মেয়ে লোক অথবা আমরাদের (ক্বারীবুল বুলুগ) তথা অল্প বয়স্ক বালকদের প্রতি আসক্ত হয়ে যাবে। তৃতীয়তঃ ওলী আল্লাহগণ উনাদের বিরোধিতা করবে। চতুর্থতঃ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারক উনার খিলাফ মন্তব্য করবে। পঞ্চমতঃ স্বয়ং খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ্ পাক উনার শান মুবারক উনার খিলাফ আক্বীদা ও মত পোষণ করবে।

কাজেই, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের বর্ণনা মতে, উক্ত ব্যক্তি লা’নতের তৃতীয় স্তর অতিক্রম করে চতুর্থ স্তরে উপনীত হয়েছে। কেননা মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছানা-ছিফত মুবারক করা হয় এমন বিষয় ও আমল সম্পর্কে তার বিরূপ চিন্তা, বক্তব্য ও মন্তব্যই তা প্রমাণ করে; যা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের সম্পূর্ণ বিপরীত।

অতএব, প্রমাণিত হলো যে, “কোন বিষয়ে যখন একাধিক মত থাকবে তখন যেই মতটি অীধক ছহীহ ও নির্ভরযোগ্য হবে তা আমল করতে হবে।” মতভেদ আছে বলে মূল বিষয়টির আমলই ছেড়ে দিতে হবে, এ বক্তব্য চরম শ্রেণীর জাহিল ও কাফিরের উক্তি বৈ কিছু নয়। এ বক্তব্য পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের সম্পূর্ণ বিপরীত তাই কুফরীর শামীল।

আর ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের দিন এটাই সবচেয়ে ছহীহ ও মশহূর মত।

যেমন, এ প্রসঙ্গে হাফিয আবূ বকর ইবনে আবী শাইবাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছহীহ্ সনদ সহকারে বর্ণনা করেন-

عن حضرت عفان رحمة الله عليه عن حضرت سعيد بن مينا رحمة الله عليه عن حضرت جابر و حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنهما قالا ولد رسول الله صلى الله عليه وسلم عام الفيل يوم الاثنين الثانى عشر من شهر ربيع الاول.

অর্থ: “হযরত আফফান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণিত। তিনি হযরত সাঈদ ইবনে মীনা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জাবির ও হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা উনারা বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ ‘হস্তি বর্ষের ১২ই রবীউল আউওয়াল ইয়ামুল ইছনাইন (সোমবার শরীফ) হয়েছিল।” (বুলুগুল আমানী শরহিল ফাত্হির রব্বানী, মা ছাবাতা বিসসুন্নাহ)

উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনার সনদের মধ্যে প্রথম বর্ণনাকারী হযরত আফফান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ বলেছেন, “হযরত আফফান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একজন উচ্চ পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য ইমাম, প্রবল স্মরণশক্তি ও দৃঢ়প্রত্যয় সম্পন্ন ব্যক্তি।” (খুলাসাতুত্ তাহযীব) “দ্বিতীয় বর্ণনাকারী সাঈদ ইবনে মীনা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।” (খুলাসাহ্,তাক্বরীব) আর তৃতীয় হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। এ দু’জন উচ্চ পর্যায়ের ফক্বীহ্ ছাহাবী উনাদের বিশুদ্ধ সনদ সহকারে বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, “১২ই রবীউল আউয়াল শরীফ হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের দিবস।” এ ছহীহ্ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনার উপরই ইমামগণ উনাদের ইজমা (ঐক্যমত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (সীরাতে হালবিয়াহ, যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব, মাছাবাতা বিস্সুন্নাহ ইত্যাদি)

উপরোক্ত বিশুদ্ধ বর্ণনা মুতাবিক ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ হচ্ছে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের দিবস। এটাই ছহীহ ও মশহূর মত। এ মতের বিপরীতে যেসব মত ঐতিহাসিকগণ থেকে বর্ণিত রয়েছে তা অনুমান ভিত্তিক ও দুর্বল। তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মূলত: নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের সঠিক তারিখ ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ সম্পর্কে যারা চু-চেরা করে থাকে তারা দু’ দিক থেকে কাফির।

প্রথমতঃ তারা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ ও মশহূর বর্ণনা অস্বীকার করার কারণে কাফির। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

روى حضرت ابو بكر ابن ابى الشيبة بسند الصحيح عن حضرت عفان عن حضرت سعيد بن مينا عن حضرت جابر وابن عباس رضى الله تعالى عنهما قالا ولد رسول الله صلى الله عليه وسلم عام الفيل يوم الاثنين الثانى عشر من شهر ربيع الاول .

অর্র্থ: “হযরত হাফিয আবূ বকর ইবনে আবী শাইবাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি ছহীহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন, হযরত আফফান রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত। তিনি হযরত সাঈদ ইবনে মীনা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জাবির ও হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ হস্তি বাহিনী বর্ষের ১২ই রবীউল আউওয়াল সোমবার শরীফ হয়েছিল। (বুলুগুল আমানী শরহিল ফাতহির রব্বানী)

এ ছহীহ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনার উপরই ইমামগণ উনাদের ইজমা’ (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (সীরাত-ই-হালবিয়াহ, যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব, মা ছাবাতা বিসসুন্নাহ ইত্যাদি)

দ্বিতীয়ত: পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত ‘নাসী’কে স্বীকার করে নেয়ার কারণে তারা কাফির। যেমন এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন-

انما النسىء زيادة فى الكفر يضل به الذين كفروا يحلونه عاما ويحرمونه عاما ليواطؤوا عدة ما حرم الله فيحلوا ما حرم الله .

অর্র্থ: “নিশ্চয়ই নাসী তথা মাসকে আগে পিছে করা কুফরীকে বৃদ্ধি করে থাকে। এর দ্বারা কাফিরেরা গুমরাহীতে নিপতিত হয়। তারা (ছফর মাসকে) এক বছর হালাল করে নেয় এবং আরেক বছর হারাম করে নেয়, যাতে মহান আল্লাহ পাক উনার হারামকৃত মাসগুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে।” (পবিত্র সূরা তওবা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৭)

অর্র্থাৎ, জাহিলিয়াতের যুগে কাফির, মুশরিকরা ছফর মাসকে অশুভ ও কুলক্ষণে মনে করতো। তাই তারা নিজেদের খেয়াল-খুশি মুতাবিক উক্ত মাসটিকে আগে-পিছে করতো। আরেকটি কারণ হলো, যখন তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ করার প্রয়োজন মনে করতো বা যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো, তখন তারা ছফর মাসকে আগে পিছে করে হারাম মাসের সংখ্যা নিরূপণ করতো, যা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কুফরী। (তাফসীরে দুররে মানছূর)

এছাড়াও কাফির, মুশরিকরা তাদের নিজেদের স্বার্থে দুনিয়াবী ফায়দা লাভের জন্য বছরকে বারো মাসে গণনা না করে কোন কোন বছর দশ মাস থেকে সতের মাস পর্যন্ত গণনা করতো, যা নাসী হিসেবে মশহূর। এর কারণে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উনার তারিখ ও দিন নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। কারণ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত শরীফ থেকে বিদায় হজ্জ পর্যন্ত প্রায় তেষট্টি (৬৩) বছর। এই তেষট্টি বছর যাবৎ কাফির, মুশরিকরা নাসী করেছে। আর এই জন্যই বিদায় হজ্জের সময় খুতবায় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মাস, তারিখ, দিন, স্থান সমস্ত কিছু নতুন করে ফায়সালা করেছেন, যা বিদায় হজ্জের খুতবায় বর্ণিত রয়েছে।

যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت ابى بكرة رضى الله تعالى عنه قال خطبنا النبى صلى الله عليه وسلم يوم النحر قال ان الزمان قد استدار كهيئته يوم خلق الله السموات والارض السنة انثى عشر شهرا منها اربعة حرم ثلث متواليات ذو القعدة وذوالحجة والمحرم ورجب مضر الذى بين جمادى وشعبان وقال اى شهر هذا قلنا الله ورسوله اعلم فسكت حتى ظننا انه سيسميه بغير اسمه قال اليس ذا الحجة قلنا بلى قال اى بلد هذا قلنا الله ورسوله اعلم فسكت حتى ظننا انه سيسميه بغير اسمه قال اليس البلدة قلنا بلى قال فاى يوم هذا قلنا الله ورسوله اعلم فسكت حتى ظننا انه سيسميه بغير اسمه قال اليس يوم النحر قلنا بلى قال فان دماءكم واموالكم واعراضكم عليكم حرام كحرمة يومكم هذا فى بلدكم هذا فى شهركم هذا وستلقون ربكم فيسئلكم عن اعمالكم الا فلا ترجعوا بعدى ضلالا يضرب بعضكم رقاب بعض الا هل بلغت قالوا نعم قال اللهم اشهد فليبلغ الشاهد الغائب فرب مبلغ اوعى من سامع .

অর্র্থ: “হযরত আবূ বাকরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র কুরবানীর দিনে (দশই যিলহজ্জ শরীফ) আমাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দান করলেন এবং বললেন, বছর ঘুরে এসেছে তার গঠন অনুযায়ী, যেদিন মহান আল্লাহ তায়ালা আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন। বছর বার মাসে। তার মধ্যে চারটি মাস হারাম বা সম্মানিত। তিনটি পর পর এক সাথে- পবত্র যিলক্বদ শরীফ, পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ ও পবিত্র মুহররম শরীফ এবং চতুর্থ মাস মুদ্বার গোত্রের পবিত্র রজবুল হারাম মাস, যা পবিত্র জুমাদাল উখরা শরীফ ও পবিত্র শা’বান শরীফ উভয়ের মধ্যখানে অবস্থিত। অতঃপর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, এটি কোন মাস? আমরা বললাম, “মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারাই অধিক অবগত।” অতঃপর তিনি এতোক্ষণ চুপ রইলেন, যাতে আমরা ভাবলাম যে, সম্ভবতঃ তিনি উনার অন্য নাম করবেন। তৎপর বললেন, “এটি কি পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ নয়?” আমরা বললাম, “হ্যাঁ, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” অতঃপর তিনি বললেন, “এটি কোন শহর?” আমরা বললাম, “মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারাই অধিক অবগত।” অতঃপর তিনি এতোক্ষণ চুপ রইলেন যাতে আমরা ভাবলাম যে, সম্ভবতঃ তিনি এর অন্য নাম করবেন। তৎপর বললেন, “এটি কি পবিত্র মক্কা শরীফ শহর নয়?” আমরা বললাম, “হ্যাঁ, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” অতঃপর তিনি বললেন, “এটি কোন দিন?” আমরা বললাম,

“মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারাই অধিক অবগত।” অতঃপর তিনি এতোক্ষণ চুপ রইলেন, যাতে আমরা ভাবলাম যে, সম্ভবতঃ তিনি এর অন্য নাম করবেন। তৎপর বললেন, “এটি কি পবিত্র কুরবানী উনার দিন নয়?” আমরা বললাম, “হ্যাঁ, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” তখন তিনি বললেন, “আপনাদের জীবন, সম্পদ ও সম্মান আপনাদের জন্য পবিত্র, যেমন আপনাদের এই মাস, এই শহর ও এই দিন পবিত্র। আপনারা শীঘ্রই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট পৌঁছবেন আর তিনি আপনাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। সাবধান! আমার পর আপনারা পথভ্রষ্ট হয়ে একে অন্যের জীবননাশ করবেন না। আমি কি আপনাদেরকে (মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বিধান) পৌঁছাইনি? হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সকলেই বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তখন তিনি বললেন, হে মহান আল্লাহ পাক! আপনি সাক্ষী থাকুন। অতঃপর তিনি বললেন, আপনারা প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি যেনো অনুপস্থিত ব্যক্তিকে এটা পৌঁছিয়ে দেন। কেননা, অনেক এমন ব্যক্তি যাকে পরে পৌঁছানো হয়, সে আসল শ্রোতা অপেক্ষা অধিক উপলব্ধিকারী ও হিফাযতকারী হয়ে থাকে। (বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)

অতএব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- উনার বিলাদত শরীফ উনার সঠিক তারিখ ১২ রবীউল আউওয়াল শরীফ ব্যতীত অন্য যেসব তারিখ ঐতিহাসিকগণ থেকে বর্ণিত রয়েছে, তা কাফিরদের নাসী তথা মাস, দিন, তারিখ পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বর্ণিত রয়েছে। ফলে তা মানা বা গ্রহণ করা বা স্বীকার করা প্রত্যেকটিই কুফরীর সামিল। নাউজুবিল্লাহ!

{দলীলসমূহ: (১) তাফসীরে রহুল মায়ানী, (২) তাফসীরে রুহুল বয়ান, (৩) তাফসীরে মাযহারী, (৪) তাফসীরে ইবনে কাছীর, (৫) তাফসীরে ইবনে আব্বাস, (৬) তাফসীরে খাযেন, (৭) বাগবী, (৮) কুরতুবী, (৯) কবীর, (১০) তাফসীরে তাবারী, (১১) তাফসীরে দুররে মনছুর, (১২) বুলুগুল আমানী শরহিল ফাত্হির রব্বানী, (১৩) আল বিদায়া ওয়ান্ নিহায়া, (১৪) খুলাসাতুত্ তাহযীব, (১৫) খুলাসাহ্, (১৬) তাক্বরীব, (১৭) সীরাত-ই-হালবিয়াহ, (১৮) যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব, (১৯) মাছাবাতা বিস্সুন্নাহ্, (২০) শামামাহ্-ই-আম্বরিয়াহ্, (২১) ফত্হুর রব্বানী, (২২) আল মাওরেদ আর রাবী, (২৩) হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন, (২৪) মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়াহ্, (২৫) মাদারিজুন নুবুওওয়াত, (২৬) তাওয়ারীখে হাবীবে ইলাহ্ ইত্যাদি)  

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।