সুওয়াল: অনেকে মনে করে থাকে, পিতা-মাতা জীবিত থাকাকালে মুর্শিদ বা শায়েখ উনার নিকট বাইয়াত হওয়া যায় না। এ ধারণা কতুটুকু শুদ্ধ ও শরীয়তসম্মত? দয়া করে জানাবেন।

সংখ্যা: ২৪৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ আসলাম হুসাইন, পলাশ, নরসিংদী

সুওয়াল: অনেকে মনে করে থাকে, পিতা-মাতা জীবিত থাকাকালে মুর্শিদ বা শায়েখ উনার নিকট বাইয়াত হওয়া যায় না। এ ধারণা কতুটুকু শুদ্ধ ও শরীয়তসম্মত? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াব: পিতা-মাতা জীবিত থাকাকালে শায়েখ বা মুর্শিদ উনার নিকট বাইয়াত হওয়া যায় না। এটা একটি অবান্তর ধারণা। যা সম্পূর্ণরূপে সম্মানিত শরীয়ত উনার খিলাফ এবং কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

মূলতঃ পিতা-মাতা উনারা জীবিত থাকতেই শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করতে হবে। কেননা বাইয়াত  হওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত দুই প্রকার ফরয ইলিমের মধ্যে অন্যতম ফরয ইলিম হচ্ছেন- ইলমুন নাফে’ বা উপকারী ইলিম অর্থাৎ ইলমে তাছাওউফ অর্জন করা। কেননা কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত উক্ত ইলিম অর্জন করা যায় না।

কাজেই, ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করার জন্য যেরূপ মাদরাসার উস্তাদগণের নিকট গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। একইভাবে ইলমে তাছাওউফ অর্জন করার জন্য কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হতে হয়।

উল্লেখ্য, ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করার জন্য প্রত্যেকের পিতা-মাতা অথবা মুরুব্বীগণই সন্তানদেরকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে থাকেন। কারো যদি পিতা-মাতা অথবা মুরুব্বী জীবিত না থাকেন, তাহলে তার পক্ষে ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং সময় বিশেষে অসম্ভবও হয়ে যায়।

কেননা ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করার সময় যেমন থাকা-খাওয়া, লেখা-পড়া ইত্যাদির জন্য টাকা-পয়সার জরূরত হয়, সে টাকা-পয়সার আঞ্জাম দেন পিতা-মাতা অথবা মুরুব্বীগণ। অনুরূপ ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করার সময়ও থাকা-খাওয়া, লেখা-পড়া ইত্যাদির জন্য টাকা-পয়সার জরূরত হয় এবং সে টাকা-পয়সার আঞ্জাম পিতা-মাতা ও মুরুব্বীগণ উনাদেরকেই দিতে হবে। যদি উনারা আঞ্জাম না দেন তবে সন্তানদের জন্য ইলমে তাছাওউফ অর্জন করা কঠিন ও অসম্ভব হয়ে যাবে।

আরো উল্লেখ্য, মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে ইবাদত বা আমল করার নাম ইখলাছ। অর্থাৎ প্রত্যেক পুরুষ মহিলাকে ইখলাছ অর্জন করতে হবে। অন্যথায় আমল করে ফায়দা বা মর্যাদা হাছিল করা তো দূরের কথা নাজাত লাভ করাটাই কঠিন হবে। কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

الناس كلهم هلكى الا الـمؤمنون والـمؤمنون كلهم هلكى الا العالـمون والعالـمون كلهم هلكى الا العاملون والعاملون كلهم هلكى الا الـمخلصون

অর্থ : সমস্ত মানুষ ধ্বংস মু’মিনগণ ব্যতীত এবং মু’মিনগণও ধ্বংস আলিমগণ ব্যতীত এবং আলিমগণও ধ্বংস আমলকারীগণ ব্যতীত এবং আমলকারীগণও ধ্বংস ইখলাছ অর্জনকারীগণ ব্যতীত। (মিরকাত শরীফ)

প্রতিভাত হলো, ইখলাছ অর্জনকারীগণ ব্যতীত অন্য কারো পক্ষে হালাকী বা ধ্বংস থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হবে না।

অতএব, প্রত্যেকের জন্য ইখলাছ অর্জন করা ফরয। আর ইলমুল ইখলাছ উনার অপর নামই হচ্ছে ইলমুল ক্বলব বা ইলমুত তাছাওউফ।

যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت الحسن رحمة الله عليه قال العلم علمان فعلم فى القلب فذاك العلم النافع وعلم على اللسان فذالك حجة الله عز وجل على ابن ادم

অর্থ: “হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, ইলম দু’প্রকার। একটি হচ্ছে ক্বলবী ইলম (ইলমে তাছাওউফ) যা উপকারী ইলম। অপরটি হচ্ছে যবানী ইলম (ইলমে ফিক্বাহ) যা মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে বান্দার প্রতি  দলীল স্বরূপ।” (দারিমী, মিশকাত, মিরকাত, মাছাবীহুস সুন্নাহ)

সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার ইমাম হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বিশ্ববিখ্যাত আলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি বলেন-

لولا سنتان لـهلك ابو نعمان

অর্থ: “আমি নু’মান বিন ছাবিত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি ধ্বংস হয়ে যেতাম যদি দু’বছর না পেতাম।” (সাইফুল মুক্বাল্লিদীন, ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া)

অর্থাৎ হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি দু’বছর উনার দ্বিতীয় শায়েখ ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক্ব আলাইহিস সালাম উনার দরবার শরীফ-এ থেকে ইলমে তাছাওউফ অর্জন করেন।

বর্ণিত রয়েছে, হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি প্রথমে ইমামুল খ¦ামিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম বাকির আলাইহিস সালাম উনার কাছে মুরীদ হন এবং উনার বিছাল শরীফ উনার পর উনারই ছেলে ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক্ব আলাইহিস সালাম উনার কাছে বাইয়াত হয়ে কামালিয়াত অর্জন করেন। সুবহানাল্লাহ! যা বিশ্বখ্যাত গায়াতুল আওতার ফী শরহে দুররিল মুখতার, সাইফুল মুকাল্লিদীন, ইছনা আশারিয়া ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।

প্রখ্যাত আলিম হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব মিশকাত শরীফ উনার শরাহ মিরকাত শরীফ-এ হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি মালিকী মাযহাবের ইমাম উনার ক্বওল শরীফ উল্লেখ করেছেন যে-

من تفقه ولـم يتصوف فقد تفسق ومن تصوف ولـم يتفقه فقد تزندق ومن جمع بينهما فقد تحقق

অর্থ: “যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো অথচ ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করলো না, সে ব্যক্তি ফাসিক (গোনাহগার)। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করলো কিন্তু ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো না অর্থাৎ গুরুত্ব দিলনা, সে যিন্দিক (কাফির)। আর যে ব্যক্তি উভয়টিই অর্জন করলো, সে ব্যক্তিই মুহাক্কিক।”

জানা আবশ্যক যে, ইলমে ফিক্বাহ অর্থাৎ ওযূ, গোসল, ইস্তিঞ্জা, নামায-কালাম, মুয়ামালাত, মুয়াশারাত ইত্যাদি শিক্ষার জন্য ওস্তাদ গ্রহণ করা যেমন ফরয; সেটা মাদরাসায় গিয়েই হোক অথবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো ওস্তাদের নিকট থেকেই হোক তা শিক্ষা করা ফরয। তদ্রূপ ইলমে তাছাওউফ উনার জন্যও ওস্তাদ গ্রহণ করা ফরয। আর এ ওস্তাদকেই আরবীতে ‘শায়েখ’ বা ‘মুর্শিদ’ বলা হয় এবং ফারসীতে ‘পীর’ বলা হয়।

‘দুররুল মুখতার’ যা বিশ্বখ্যাত ফতওয়ার কিতাব তারমধ্যে একটি উছূল উল্লেখ করা হয়েছে-

ما لايتم به الفرض فهو فرض، ما لايتم به الواجب فهو واجب

অর্থ: “যা ব্যতীত ফরয পূর্ণ হয় না, তা গ্রহণ বা পালন করাও ফরয। যা ব্যতীত ওয়াজিব পূর্ণ হয়না, তা গ্রহণ বা পালন করাও ওয়াজিব।”

অতএব, প্রত্যেক পুরুষ এবং মহিলাকে ইখলাছ অর্জন করার জন্য অবশ্যই ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফে পূর্ণতাপ্রাপ্ত, পবিত্র শরীয়ত ও পবিত্র সুন্নতের পূর্ণপাবন্দ সত্যিকার একজন ওলীআল্লাহ উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ইখলাছ অর্জন করা কখনোই সম্ভব হবে না। আর ইখলাছ ব্যতীত আমল কখনোই কবুল হবে না। অর্থাৎ আমল কবুল হওয়ার জন্য ইখলাছ হচ্ছে পূর্ব শর্ত।

উল্লেখ্য, যদি কারো পিতা-মাতা বুযুর্গ, ওলীআল্লাহ অথবা হক্কানী আলিম হন, তাহলে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলার নিকট বাইয়াত হওয়ার জন্য উনাকে জিজ্ঞেস করে অনুমতি নিতে হবে।

কারণ মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

فسئلوا اهل الذكر ان كنتم لا تعلمون

অর্থ: “যদি তোমরা না জান, তবে আহলে যিকির বা আল্লাহওয়ালা উনাদেরকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও।” (সূরা নহল : আয়াত শরীফ ৪৩ ও সূরা আম্বিয়া : আয়াত শরীফ ৭)

আর যে পিতা-মাতার ইলিম-কালাম নেই, তাদের নিকট যদি শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করার অনুমতি চাওয়া হয়, আর তারা অনুমতি না দেন, তথাপিও কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হতে হবে। যেহেতু শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয।

অতএব, প্রত্যেক পিতা-মাতার কর্তব্য হলো কোনো হক্কানী ওলী বা মুর্শিদ গ্রহণ করে ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করা এবং তারা স্বীয় সন্তানদেরকে যেভাবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে থাকে, ঠিক সেভাবে কোনো হক্কানী ওলী বা মুর্শিদ উনার দরবার শরীফ-এ ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করার জন্য পৌঁছিয়ে দেয়া।

বিশ্বখ্যাত ওলী ও ফার্সী কবি হযরত শায়েখ সা’দী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “সন্তানের বুঝ পয়দা হওয়ার সাথে সাথেই কোনো হক্কানী ওলীর ছোহবতে সোপর্দ করে দাও। হক্কানী ওলী উনার ছোহবত লাভের বদৌলতে সন্তান বড় ওলীআল্লাহ হতে না পারলেও অন্তত সে কখনো গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট হবেনা।”

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।