সুওয়াল : মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা কে ছিলেন? অনেকে বলে থাকে যে, উনার পিতা ছিল মূর্তিপূজক আযর। এ কথাটা কতটুকু ঠিক? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

সংখ্যা: ২৪৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

আল্লামা মুহম্মদ শহীদুল ইসলাম, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি


সুওয়াল : মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা কে ছিলেন? অনেকে বলে থাকে যে, উনার পিতা ছিল মূর্তিপূজক আযর। এ কথাটা কতটুকু ঠিক? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে এরূপভাবে মনোনীত যে, উনাদের কারো পিতা-মাতা আলাইহিমাস সালাম উনারা কেউই কাফির কিংবা মুশরিক ছিলেন না। বরং উনাদের মধ্যে অনেকে নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আর যাঁরা নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না উনারা ঈমানদার তো অবশ্যই উপরন্তু উনারা ছিলেন উনাদের যুগে মহান আল্লাহ পাক উনার লক্ষস্থল বান্দা ও ওলী উনাদের অন্তর্ভুক্ত। এটাই হচ্ছে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও ক্বিয়াস উনাদের মত এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত উনাদের মত। এ মতের বিপরীত মত, অর্থ, ব্যাখ্যা, বক্তব্য, লিখনী সবই কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা ছিলেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম, যিনি পরিপূর্ণ দ্বীনদার, পরহেযগার, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মত ও পথের পরিপূর্ণ অনুসারী একজন খালিছ ঈমানদার। সর্বোপরি তিনি ছিলেন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার রুবূবিয়াত প্রকাশের মহানতম ওসীলা। কেননা সমগ্র মাখলূক্বাত বা কায়িনাত সৃষ্টির যিনি মূল উৎস সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র ওজুদ ‘নূর’ মুবারক উনার একজন মহান ধারক-বাহক।

হযরত আদম ছফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার থেকে শুরু করে যে সকল মনোনীত ও সম্মানিত পুরুষ-মহিলা আলাইহিমুস সালাম ও আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের মাধ্যমে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র ওজূদ ‘নূর’ মুবারক হযরত আব্দুল্লাহ যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম এবং হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম উনাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে উনারা সকলেই ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম পবিত্রতম সুমহান ব্যক্তিত্ব। সুবহানাল্লাহ! উনাদের মধ্যে কেউই কাফির, মুশরিক বা বেদ্বীন ইত্যাদি ছিলেননা। উনারা সকলেই ছিলেন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত খাছ বান্দা-বান্দি উনাদের অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

মূলত যারা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা বা পরিবারকে মূর্তিপূজক হিসেবে অভিহিত করে থাকে তারা পবিত্র হাদীছ শরীফ ও পবিত্র তাফসীর শরীফ উনাদের সম্পর্কে নেহায়েত অজ্ঞ ও জাহিল হওয়ার কারণেই করে থাকে। এছাড়া তারা মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মহানতম ও পবিত্রতম শান, মান, মর্যাদা, মর্তবা সম্পর্কে এবং উনার সুমহান পরিচয় সম্পর্কে চরম অজ্ঞ ও গ- মূর্খ হওয়ার কারণে এবং পবিত্র সূরা আনআম শরীফ উনার ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ব্যবহৃত لابيه ازر উনার মূল ও সঠিক অর্থ যা পবিত্র হাদীছ শরীফ ও পবিত্র তাফসীর শরীফ উনাদের মধ্যে বর্ণিত রয়েছে তা গ্রহণ না করে তার বিপরীতে শুধুমাত্র আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থের উপর ভিত্তি করে অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করার কারণেই করে থাকে। যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

যেমন পবিত্র সূরা আনআম শরীফ: ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

واذ قال ابرهيم لابيه ازر اتتخذ اصناما الـهة.

অর্থ : “আর যখন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তিনি স্বীয় চাচা আযরকে বললেন, আপনি কি মূর্তিকে ইলাহ (মা’বুদ) হিসেবে গ্রহণ করছেন?”

এ আয়াত উনার ব্যাখ্যায় হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনাদের সর্বসম্মত মত হচ্ছে, এখানে ابيه শব্দ মুবারক উনার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ‘আযর’ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। অর্থাৎ উদ্ধৃত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে اب (আবুন) শব্দ মুবারক উনার অর্থ পিতা না হয়ে উনার অর্থ হবে চাচা। কারণ, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অনেক স্থানেই اب (আবুন) শব্দটি পিতা ব্যতীত অন্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে।

যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার পাক কালাম উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

ام كنتم شهداء اذ حضر يعقوب الـموت اذ قال لبنيه ما تعبدون من بعدى قالوا نعبد الـهك واله ابائك ابرهيم واسمعيل واسحق الـها واحدا.

অর্থ : “তোমরা কি উপস্থিত ছিলে? যখন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ গ্রহণের সময় উপস্থিত হলো তখন তিনি উনার সন্তানগণ উনাদেরকে বললেন, ‘আপনারা আমার পর কার ইবাদত করবেন? উনারা উত্তরে বললেন, ‘আমরা আপনার রব তায়ালা উনার এবং আপনার পূর্ব পিতা (আপনার দাদা) হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার এবং (আপনার চাচা) হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার এবং (আপনার পিতা) হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম উনার একক রব খালিক্ব মালিক মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করবো।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৩৩)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে اب (আবুন) দ্বারা দাদা, চাচা ও পিতা সকলকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, এ সম্পর্কে  বিশ্বখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’ উনার ৩য় খ-ের ২৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

وكان ازر على الصحيح عما لابراهيم والعرب يطلقون الاب على العم كما فى قوله تعالى نعبد الـهك واله ابائك ابراهيم واسماعيل واسحاق الـها واحدا.

অর্থ : “বিশুদ্ধ মতে আযর ছিলো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। আর আরবরা চাচাকেও اب (আবুন) শব্দ দ্বারা অভিহিত করে থাকে।” যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, আমরা আপনার প্রতিপালক ও আপনার পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসহাক্ব আলাইহিস সালাম উনাদের একক প্রতিপালক মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করবো।”

“তাফসীরে মাযহারী” কিতাব উনার ৩য় খণ্ডের ২৫৬ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ রয়েছে-

والعرب يطلقون الاب على العم.

অর্থ : “আরববাসীরা الاب (আল আবু) শব্দটি চাচার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেন।” তাফসীরে কবীর কিতাবের ১৩তম খণ্ডের ৩৮ পৃষ্ঠায়ও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।

সুতরাং, পবিত্র সূরা আনআম শরীফ উনার ৭৪নং আয়াত শরীফে ابيه ازر এর অর্থ হলো আযর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। উনার পিতা নন।

এ সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এসেছে-

عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه ان ابا ابراهيم عليه السلام لم يكن اسمه ازر وانما كان اسمه تارح عليه السلام

অর্থ : “রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতার নাম আযর নয়। বরং উনার পিতার নাম মুবারক হলো হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম।” (ইবনে আবি হাতিম শরীফ, ইবনে কাছীর শরীফ- ৩/২৪৮)

এ সম্পর্কে তাফসীরে কবীর শরীফ ১৩/৩৮ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ রয়েছে-

ان والد ابراهيم عليه السلام كان تارح وازر كان عما له والعم قد يطلق عليه اسم الاب.

অর্থ : “নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা ছিলেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম। আর আযর ছিলো উনার চাচা। এবং আম্মুন (চাচা) শব্দটি কখনও ‘ইসমুল আব’ অর্থাৎ পিতা নামে ব্যবহৃত হয়।”

মূলতঃ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনিসহ সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগ উনাদের পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষ ছিলেন পরিপূর্ণ ঈমানদার, খালিছ মু’মিন। কেউই কাফির ছিলেন না।

এ সম্পর্কে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে-

ان اباء الانبياء ماكانوا كفارا ويدل عليه وجوه منها قوله وتقلبك فى الساجدين.

অর্থ : “নিশ্চয়ই সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পিতা বা পূর্বপুরুষ উনারা কেউই কাফির ছিলেননা।

তার দলীল হচ্ছে, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার এ কালাম বা  পবিত্র আয়াত শরীফ-

وتقلبك فى السجدين.

অর্থাৎ : “তিনি আপনাকে (হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) সিজদাকারীগণ উনাদের মধ্যে স্থানান্তরিত করেছেন।” (পবিত্র সূরা শুয়ারা শরীফ ২১৯, তাফসীরে কবীর- ১৩/৩৮)

প্রকাশ থাকে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার জলীলুল ক্বদর নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি হলেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষ।

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

ملة ابيكم ابرهيم هو سمكم الـمسلمين.

অর্থাৎ- “তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র দ্বীন উনার উপর কায়িম থাক। তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান।” (পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭৮)

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যাঁদের মাধ্যমে যমীনে তাশরীফ এনেছেন অর্থাৎ হযরত আদম ছফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে হযরত আব্দুল্লাহ যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত উনারা সকলেই ছিলেন সিজদাকারী। অর্থাৎ সকলেই নামায-কালাম, যিকির-আযকার, ইবাদত-বন্দিগীতে মশগুল ছিলেন। উনারা সকলেই পূর্ণ পরহেযগার, মুত্তাক্বী ও ধার্মিক ছিলেন।

এ সম্পর্কে পবিত্র তাফসীর শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে-

فالاية دالة على ان جميع اباء محمد صلى الله عليه وسلم كانوا مسلمين وحينئذ يجب القطع بان والد ابراهيم عليه السلام كان مسلما.

অর্থ : “উপরোক্ত আয়াত শরীফ উনার দ্বারা এটাই ছাবিত বা প্রমাণিত যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষ উনারা সকলেই পরিপূর্ণ মুসলমান ছিলেন। এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত বা সাব্যস্ত যে, নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতা মুসলমান ছিলেন।” (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩/৩৮)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন-

لـم ازل انقل من اصلاب الطاهرين الى ارحام الطاهرات.

অর্থ : “আমি সর্বদা পূত-পবিত্র নারী ও পুরুষ উনাদের মাধ্যমেই স্থানান্তরিত হয়েছি।” সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩/৩৯)

তিনি আরো বলেন-

لـم يلتق ابوى قط على سفاح.

অর্থ : “আমার পিতা-মাতা (পূর্বপুরুষ) কেউই কখনও কোন অন্যায় ও অশ্লীল কাজে জড়িত হননি।” (কানযুল উম্মাল শরীফ, ইবনে আসাকীর, বারাহিনে  কাতিয়াহ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

بعثت من خير قرون بنى ادم قرنا فقرنا حتى بعثت من القرن الذى كنت فيه.

অর্থ : “আমি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সন্তানগণ উনাদের মধ্যে সর্বোত্তম সম্প্রদায়ের মধ্যেই সর্বদা প্রেরিত হয়েছি। এমনকি আমি যে (কুরাইশ) সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিলাম সেটিই ছিলো সর্বোত্তম সম্প্রদায়।” সুবহানাল্লাহ! (বুখারী শরীফ, তাফসীরে মাযহারী শরীফ ৪র্থ খণ্ড ৩০৮ পৃষ্ঠা)

এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় কিতাবে বর্ণিত হয়েছে-

فلا يـمكن ان يكون كافرا فى سلسلة ابائه صلى الله عليه وسلم.

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পিতা (পূর্ব পুরুষ) উনাদের সিলসিলার মধ্যে কেউই কাফির হওয়া সম্ভব নয়।” (তাফসীরে মাযহারী শরীফ ৪র্থ খ- ৩০৮ পৃষ্ঠা)

এ সম্পর্কে কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে-

ان احدا من اجداده ما كان من الـمشركين.

অর্থ : “নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বাপ-দাদাগণ উনারা কেউই মুশরিক ছিলেননা।” (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩ খণ্ড ৩৯ পৃষ্ঠা)

উপরোক্ত দলীলভিত্তিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা ছিলেন হাক্বীক্বী পরহেযগার, মুত্তাক্বী, পরিপূর্ণ ঈমানদার ও মুসলমান। উনার নাম মুবারক ছিল হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম। আর আযর নামক ব্যক্তি ছিল উনার চাচা। আরো প্রমাণিত হলো যে, পূর্ববর্তী সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পূর্বপুরুষগণ এবং সর্বোপরি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষগণ হযরত আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার থেকে শুরু করে হযরত আব্দুল্লাহ যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত সকলেই ছিলেন পূত-পবিত্র চরিত্র মুবারক উনার অধিকারী, পূর্ণ ধার্মিক ও পরিপূর্ণ মুসলমান।

অতএব, যে ব্যক্তি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা ও পরিবার সম্পর্কে কুফরীমূলক আক্বীদা রাখবে ও বক্তব্য-লিখনী প্রকাশ করবে পবিত্র ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তার উপরে মুরতাদের হুকুম বর্তাবে। অর্থাৎ সে ইসলাম বা মুসলমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে। পবিত্র ইসলামী খিলাফত থাকলে তাকে তিনদিন সময় দেয়া হতো তওবা করার জন্য। তিনদিনের মধ্যে তওবা না করলে তার শাস্তি হতো মৃত্যুদ-। সে মারা গেলে তার জানাযা পড়া জায়িয হবে না। তাকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না; বরং তাকে মৃত কুকুর-শৃগালের মত মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে। তার জীবনের সমস্ত নেক আমল বাতিল হয়ে যাবে। বিয়ে করে থাকলে তার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে এবং সে হজ্জ করে থাকলে তা বাতিল হয়ে যাবে। সে ওয়ারিছসত্ব থেকেও বঞ্চিত হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ ২৪০তম সংখ্যা পাঠ করুন।

{দলীলসমূহ : (১) তাফসীরে মাযহারী, (২) ইবনে কাছীর, (৩) ইবনে আবী হাতিম, (৪) কবীর, (৫) আহকামুল কুরআন, (৬) আহমদী, (৭) তাফসীরে বাইযাবী, (৮) বয়ানুল হক্ব, (৯) মাআলিমুত তানযীল, (১০) তাফসীরে জালালাইন, (১১) বুখারী, (১২) মুসলিম, (১৩) তিরমিযী, (১৪) বাইহাক্বী, (১৫) মিশকাত, (১৬) মুস্তাদরাকে হাকিম, (১৭) তবারানী, (১৮) কামূস, (১৯) ফতহুল বারী,(২০) উমদাতুল ক্বারী, (২১) মিরকাত, (২২) আশয়াতুল লুময়াত, (২৩) লুময়াত, (২৪) তা’লীকুছ ছবীহ, (২৫) শরহুত ত্বীবী, (২৬) মুযাহিরে হক্ব, (২৭) ফতহুল মুলহিম, (২৮) শরহে নববী, (২৯) আহমদ, (৩০) ইবনে আসাকির, (৩১) ইবনে মারদুবিয়া, (৩২) তাক্বদীসু আবায়িন নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, (৩৩) দুররুল মুখতার, (৩৪) ফিকহুল আকবর, (৩৫) শরহুশ শিফা, (৩৬) শুমুলুল ইসলাম লি উছূলির রসূলিল কিরাম, (৩৭) আকাইদে নিজামিয়া, (৩৮) কাছাছূল আম্বিয়া, (৩৯) কাছাছূল কুরআন, (৪০) কুরআন কাহিনী, (৪১) কিতাবুদ্ দারাযিল, (৪২) মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া, (৪৩) শাওয়াহিদুন্ নুবুওওয়াহ, (৪৪) কিছাছে আম্বিয়া, (৪৫) মাতালিউন নূর, (৪৬) আল মুসতালিদ, (৪৭) বারাহিনে ক্বাতিয়া ইত্যাদি।}

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।