সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সংখ্যা: ২৪৯তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ বিলাল হুসাইন, সুনামগঞ্জ

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।


জাওয়াব: সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার ফতওয়া হলো, কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার কাছে বাইয়াত হওয়া ফরয। এটাই হচ্ছে দলীলসম্মত এবং হাক্বীক্বী ফতওয়া। কেননা ইখলাছ অর্জন করা হচ্ছে ফরয। আর ইখলাছ হাছিল হয়ে থাকে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ছোহবত মুবারক উনার নূর এবং উনার দেয়া সবক্ব ক্বলবী যিকির করার দ্বারা। আর এসকল প্রতিটি বিষয়ই ফরয উনার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয। উনার ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয। উনার থেকে ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ হাছিল করা ফরয। ক্বলবী যিকির-আযকার করা ফরয। উক্ত ফরযসমূহ প্রত্যেকটি কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

স্মরণীয় যে, মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে ইবাদত বা আমল করার নাম ইখলাছ। অর্থাৎ প্রত্যেক পুরুষ ও মহিলাকে ইখলাছ অর্জন করতে হবে। অন্যথায় আমল করে ফায়দা বা মর্যাদা হাছিল করা তো দূরের কথা নাজাত লাভ করাটাই কঠিন হবে।

কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

الناس كلهم هلكى الا الـمؤمنون والـمؤمنون كلهم هلكى الا العالـمون والعالـمون كلهم هلكى الا العاملون والعاملون كلهم هلكى الا الـمخلصون

অর্থ : সমস্ত মানুষ ধ্বংস মু’মিনগণ ব্যতীত এবং মু’মিনগণও ধ্বংস আলিমগণ ব্যতীত এবং আলিমগণও ধ্বংস আমলকারীগণ ব্যতীত এবং আমলকারীগণও ধ্বংস ইখলাছ অর্জনকারীগণ ব্যতীত। (মিরকাত শরীফ)

যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وما امروا الا ليعبدوا الله مخلصين له الدين

অর্থ: ঈমানদারদেরকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেনো খালিছভাবে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার জন্যে ইবাদত বন্দিগী করে। (সূরা বাইয়্যিনাহ শরীফ: আয়াত শরীফ ৫)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت ابى امامة الباهلى رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان الله لا يقبل من العمل الا ما كان له خالصا وابتغى به وجهه

অর্থ: “হযরত আবূ উমামা আল বাহিলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক ওই আমল কবুল করবেন না, যা ইখলাছের সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক অর্জনের জন্য করা না হয়।” (নাসায়ী শরীফ, দায়লামী শরীফ)

উল্লেখ্য, মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে কোন আমল করা হলে তা হবে গইরুল্লাহ। তা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কখনোই কবুলযোগ্য হবে না। তা যত বড় আমলই হোক না কেন। যার উদাহরণ মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ সূরা মাঊন উনার মধ্যে উল্লেখ করেছেন।

ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

فويل للمصلين

অর্থাৎ, নামায আদায়কারীদের জন্য আফসুস তথা জাহান্নাম। (পবিত্র সূরা মাঊন শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৪)

অনুরূপভাবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন, যা মুসলিম শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্য না থাকার কারণে জিহাদকারী জিহাদ করা সত্বেও, ক্বারী কুরআন শরীফ শিক্ষা দেয়া সত্বেও এবং আলিম ইলম উনার প্রচার প্রসার করা সত্বেও এবং দানশীল দানের সমস্ত রাস্তায় দান করা সত্বেও তাদের সকলকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। নাউযুবিল্লাহ!

কাজেই, আমল করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ ইখলাছের সাথে আমল করতে হবে। তবেই সে আমলের দ্বারা-পরিপূর্ণ ফায়দা বা মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اخلص دينك يكفيك العمل القليل

অর্থ: ইখলাছের সাথে আমল করো। অল্প আমলই তোমার নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। (আল মুসতাদরাক লিল হাকিম)

অতএব, প্রত্যেকের জন্য ইখলাছ অর্জন করা ফরয। আর ইলমুল ইখলাছ উনার অপর নামই হচ্ছে ইলমুল ক্বলব বা ইলমুত তাছাওউফ।

যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت الحسن رحمة الله عليه قال العلم علمان فعلم فى القلب فذاك العلم النافع وعلم على اللسان فذالك حجة الله عز وجل على ابن ادم

অর্থ: “হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, ইলম দু’প্রকার। একটি হচ্ছে ক্বলবী ইলম (ইলমে তাছাওউফ) যা উপকারী ইলম। অপরটি হচ্ছে যবানী ইলম (ইলমে ফিক্বাহ) যা মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে বান্দার প্রতি দলীল স্বরূপ।” (দারিমী, মিশকাত, মিরকাত, মাছাবীহুস সুন্নাহ)

ইমামে আ’যম হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “ইলম শিক্ষা করা ফরয বলতে বুঝায় ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ। অর্থাৎ উভয়টিই শিক্ষা করা ফরয।”

উল্লেখ্য, হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি প্রথমে আওলাদে রসূল হযরত ইমাম বাকির আলাইহিস সালাম উনার কাছে মুরীদ হন এবং উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করার পর উনারই ছেলে আওলাদে রসূল হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক্ব আলাইহিস সালাম উনার কাছে বাইয়াত হয়ে কামালিয়াত অর্জন করেন। সুবহানাল্লাহ! যা বিশ্বখ্যাত গায়াতুল আওতার ফী শরহে দুররিল মুখতার, সাইফুল মুকাল্লিদীন, ইছনা আশারিয়া ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।

হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব মিশকাত শরীফ উনার শরাহ মিরকাত শরীফ-এ হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি মালিকী মাযহাবের ইমাম উনার ক্বওল উল্লেখ করেছেন যে-

من تفقه ولـم يتصوف فقد تفسق ومن تصوف ولـم يتفقه فقد تزندق ومن جمع بينهما فقد تحقق

অর্থ: “যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো অথচ ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করলো না, সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করলো কিন্তু ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো না অর্থাৎ গুরুত্ব দিলনা, সে যিন্দিক (কাফির)। আর যে ব্যক্তি উভয়টিই অর্জন করলো, সে ব্যক্তিই মুহাক্কিক।”

জানা আবশ্যক যে, ইলমে ফিক্বাহ অর্থাৎ ওযূ, গোসল, ইস্তিঞ্জা, নামায-কালাম, মুয়ামালাত, মুয়াশারাত ইত্যাদি শিক্ষার জন্য ওস্তাদ গ্রহণ করা যেমন ফরয; সেটা মাদরাসায় গিয়েই হোক অথবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো ওস্তাদের নিকট থেকেই হোক তা শিক্ষা করা ফরয। তদ্রূপ ইলমে তাছাওউফ উনার জন্যও ওস্তাদ গ্রহণ করা ফরয। আর এ ওস্তাদকেই আরবীতে ‘শায়েখ’ বা ‘মুর্শিদ’ বলা হয় আর ফারসীতে ‘পীর’ বলা হয়।

বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে যে-

كل ما يترتب عليه الاثر من الفروض الاعيان فهو فرض عين

অর্থ : “যে কাজ বা আমল ব্যতীত ফরযসমূহ আদায় করা সম্ভব হয়না, ফরযগুলোকে আদায় করার জন্য সে কাজ বা আমল করাও ফরয।”

হানাফী মাযহাব উনার মশহূর ফিক্বাহর কিতাব ‘দুররুল মুখতার’ উনার মাঝে উল্লেখ আছে যে-

ما لايتم به الفرض فهو فرض

অর্থ : “যে আমল ব্যতীত কোনো ফরয পূর্ণ হয়না, উক্ত ফরয পূর্ণ করার জন্য ওই আমল করাও ফরয।”

উল্লিখিত উছুলের ভিত্তিতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইলমে তাছাওউফ যেহেতু অর্জন করা ফরয আর তা যেহেতু কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব নয়, সেহেতু একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করাও ফরয।

শুধু তাই নয়, কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ছোহবত ইখতিয়ার করা বা উনাকে অনুসরণ করার নির্দেশ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যেই রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

يايها الذين امنوا اتقوا الله وكونوا مع الصدقين.

অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! তোমরা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো এবং ছাদিক্বীন বা সত্যবাদীগণ উনাদের সঙ্গী হও।” (পবিত্র সূরা তওবা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১১৯)

উপরোক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ছাদিক্বীন দ্বারা উনাদেরকেই বুঝানো হয়েছে, যাঁরা যাহির-বাতিন, ভিতর-বাহির, আমল-আখলাক্ব, সীরত-ছূরত, ক্বওল-ফে’ল সর্বাবস্থায় সত্যের উপর ক্বায়িম রয়েছেন। অর্থাৎ যাঁরা ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ উভয় ইলমে তাকমীলে (পূর্ণতায়) পৌঁছেছেন।

মোট কথা, যিনি বা যাঁরা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মত মুবারক অনুযায়ী মত হয়েছেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পথ মুবারক অনুযায়ী পথ হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

واتبع سبيل من اناب الى

অর্থ : “যিনি আমার দিকে রুজু হয়েছেন, উনার পথকে অনুসরণ করো।” (পবিত্র সূরা লুক্বমান শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫)

অন্যত্র খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

من يهد الله فهو الـمهتد ومن يضلل فلن تـجد له وليا مرشدا

অর্থ : “খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি যাঁকে হিদায়েত দান করেন, সেই হিদায়েত পায়। আর যে ব্যক্তি গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ় থাকে, তার জন্য কোনো ওলীয়ে মুর্শিদ (কামিল শায়েখ) পাবেন না।” (পবিত্র সূরা কাহফ্ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৭)

অর্থাৎ যারা কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হয়না, তারা পথভ্রষ্ট। কারণ তখন তাদের পথ প্রদর্শক হয় শয়তান। নাঊযুুবিল্লাহ!

যার কারণে সুলত্বানুল আরিফীন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি, সাইয়্যিদুত ত্বায়িফা হযরত জুনায়িদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারাসহ আরো অনেকেই বলেছেন যে-

من ليس له شيخ فشيخه شيطان

অর্থ : “যার কোনো শায়েখ বা মুর্শিদ নেই, তার মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক হলো শয়তান।” নাঊযুবিল্লাহ! (ক্বওলুল জামীল, নুরুন আলা নূর, তাছাওউফ তত্ত্ব)

আর শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الشيخ فى اهله كالنبى فى امته وفى رواية الشيخ لقومه كالنبى فى امته

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা উম্মতের নিকট যেরূপ সম্মানিত ও অনুসরণীয়, শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনিও উনার অধীনস্থদের নিকট তদ্রƒপ সম্মানিত ও অনুসরণীয়।” (দায়লামী শরীফ, মাকতুবাত শরীফ, জামিউল জাওয়ামি’, আল মাক্বাছিদুল হাসানাহ, তানযীহুশ শরীয়াহ, আল মীযান, আল জামিউছ ছগীর, আদ দুরারুল মুনতাশিরাহ ইত্যাদি)

অর্থাৎ হযরত নবী-রসূল আলাইহিস সালাম উনার দ্বারা যেরূপ উম্মতের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সর্বক্ষেত্রে ইছলাহ লাভ হয়, সেরূপ শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার দ্বারা মুরীদের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সর্বক্ষেত্রে ইছলাহ লাভ হয়। সুবহানাল্লাহ!

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

لا يؤمن احدكم حتى يكون الله ورسوله احب اليه من نفسه وماله ووالده وولده والناس اجمعين.

অর্থ: “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কামিল মু’মিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের নিকট মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তোমাদের জান-মাল, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় না হবেন।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ, ফতহুল বারী, উমদাতুল ক্বারী, ইরশাদুস্ সারী, শরহে নববী শরীফ, মিরকাত শরীফ, আশয়াতুল লুময়াত, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, শরহুত ত্বীবী)

এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ আছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা ইরশাদ মুবারক করেন, তখন সেখানে হযরত উমর ইবনুল খ্বত্তাব আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনাকে আমি সবকিছু থেকে অধিক মুহব্বত করি কিন্তু আমার প্রাণের চেয়ে অধিক মুহব্বত এখনো করতে পারিনি। তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “হে হযরত উমর ইবনুল খত্তাব আলাইহিস সালাম! আপনি এখনও মু’মিনে কামিল হতে পারেননি।” একথা শুনে হযরত উমর ইবনুল খ্বত্তাব আলাইহিস সালাম তিনি বাচ্চা শিশুদের ন্যায় কাঁদতে লাগলেন। (কারণ তিনি মনে করেছিলেন, যেজন্য তিনি পিতা-মাতা, ভাই-বোন, বাড়ী-ঘর, ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ইত্যাদি সব ছেড়ে ঈমান গ্রহণ করেছেন, সে ঈমানই যদি পরিপূর্ণ না হয়, তাহলে এতকিছু ত্যাগ করার সার্থকতা কোথায়?

হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার এই আকুতি দেখে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে কাছে ডাকলেন এবং নিজ হাত মুবারক উনার সিনার উপর রাখলেন (তাছাওউফের ভাষায়, ফায়িযে ইত্তিহাদী দিলেন)। সাথে সাথে হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার এখন এরূপ অবস্থা হয়েছে যে, আমি একজন কেন? আমার ন্যায় শত-সহ সহস্র ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম আপনার জন্যে জান কুরবান করতে প্রস্তুত আছি।

একথা শুনে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “হে হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম! এতক্ষণে আপনি মু’মিনে কামিল হয়েছেন। সুব্হানাল্লাহ!

উল্লেখিত ঘটনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা প্রত্যেকেই কামিল বা পরিপূর্ণ মু’মিন হয়েছেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক ছোহবত ও মুবারক ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ উনার কারণেই। অন্য কোন আমলের দ্বারা মু’মিনে কামিল হননি। যদি হতেন তবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাকে বলতেন, আপনি অমুক আমল বেশি বেশি করুন তবেই মু’মিনে কামিল হবেন। কিন্তু তিনি তা না বলে উনাকে ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ্ মুবারক দিয়ে মু’মিনে কামিল বানিয়ে দিলেন। সুবহানাল্লাহ!

এ প্রসঙ্গে মশহূর ওয়াক্বিয়া বর্ণিত রয়েছে যে, মানতিকের ইমাম হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাদরাসায় লেখাপড়া শেষ করেছেন। তিনি কিতাবে পড়েছেন, ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ উভয় প্রকার ইলমই অর্জন করতে হবে। প্রত্যেকের জন্য সেটা ফরয। তিনি তো ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করেছেন মাদরাসায় গিয়ে। কিন্তু তখন পর্যন্ত উনার ইলমে তাছাওউফ অর্জন করা হয়নি। তাই তিনি ইলমে তাছাওউফ অর্জন করার জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী হযরত নজীবুদ্দীন কুবরা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ গেলেন। গিয়ে বললেন, হুযূর! আমি আপনার কাছে বাইয়াত হতে এসেছি। মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরার নাম কি? তিনি বললেন, আমার নাম ফখরুদ্দীন। মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী বললেন, কোন ফখরুদ্দীন, যিনি মানতিকের ইমাম? তিনি জবাব দিলেন, জী হুযূর! আমি সেই ফখরুদ্দীন। মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী হযরত নজীবুদ্দীন কুবরা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বাইয়াত করালেন। অত:পর সবক দিয়ে বললেন, তোমার ভিতর মানতিকের ইলম পরিপূর্ণ। কাজেই, তুমি আগামী এক বছর যাহিরী কোন পড়া-শুনা না করে নিরিবিলি অবস্থান করে ইলমে তাছাওউফ বা তরীক্বতের সবক আদায় করতে থাক। মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নির্দেশ মুতাবিক তিনি নিরিবিলি অবস্থান করে তরীক্বতের সবক আদায় করতে লাগলেন। এরপর তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন মুর্শিদ ক্বিবলা তো পড়তে নিষেধ করেছেন। কিন্তু লিখতে তো নিষেধ করেননি। এ চিন্তা করে তিনি তরীক্বতের সবক আদায়ের ফাঁকে ফাঁকে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার তাফসীর লিখতে শুরু করলেন এবং বেশকিছু অংশ তাফসীর লিখলেন। যা তাফসীরে কবীর হিসেবে আজ সারাবিশ্বে মশহূর। বছর শেষে তিনি যখন উনার মুর্শিদ ক্বিবলা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ উপস্থিত হলেন। মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে দেখে বললেন, তোমার তো ইলমে মানতিক আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বললেন, তোমার ভিতরে ইলমে তাছাওউফ প্রবেশ করাতে হলে ইলমে মানতি কমাতে হবে এবং এটা বলে তিনি ইলমে মানতিক কমানোর জন্য ফায়িয নিক্ষেপ করলেন। এতে হযরত ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ভিতরে কটকট শব্দ হতে লাগলো। তিনি মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুযূর! আমার ভিতরে কিসের শব্দ হচ্ছে। মুর্শিদ ক্বিবলা বললেন, তোমার ভিতরে মানতিকের যে অতিরিক্ত ইলম সেটা কমিয়ে দিচ্ছি। তিনি বললেন, হুযূর! বেয়াদবি মাফ করবেন, ফখরুদ্দীনের ফখরই তো ইলমে মানতিক। তা না কমানোর জন্য তিনি আরজু পেশ করলেন এবং মুর্শিদ ক্বিবলা উনা সবক নিয়ে নিজের এলাকায় চলে আসলেন। মুর্শিদ ক্বিবলা উনা ইজাযত নিয়ে তিনি স্বীয় এলাকায় তা’লীম-তালক্বীন, দর্স-তাদরীসের কাজ করতে লাগলেন। তিনি জানেন শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সাধারণ মুসলমান তো বটে, যারা আলিম-উলামা, পীর-মাশায়িখ, ছুফী-দরবেশ দাবীদার তাদেরকেও শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এবং অনেককে বিভ্রান্ত করেও ফেলে। এমনকি ইন্তিকালের মুহূর্তেও শয়তান ধোঁকা দিয়ে ঈমানহারা করার চেষ্টা করে থাকে। সেজন্য মানতিকের ইমাম হযরত ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি মুখতালিফ রিওয়ায়েত একশ থেকে এক হাজার দলীল প্রস্তুত করে রাখলেন যাতে ইন্তিকালের সময় উনাকে শয়তান ধোঁকা দিয়ে ঈমানহারা করতে না পারে। সত্যিই দেখা গেল, হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার যখন ইন্তিকালের সময় উপস্থিত হলো তখন ইবলীস হাযির হয়ে গেল। হাযির হয়ে সে মহান আল্লাহ পাক দুজন বলে যুক্তি পেশ করতে লাগলো। আর ইবলীসের সে বাতিল যুক্তি খ-ন করে হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ থেকে দলীল পেশ করতে লাগলেন। উনার সমস্ত দলীল শেষ হয়ে গেল তথাপি ইবলীসের বাতিল যুক্তি খণ্ডন করা গেলনা। এখন ঈমানহারা হয়ে ইন্তিকাল করার উপক্রম। তিনি এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে উনার মুর্শিদ ক্বিবলা তিনি যুহর নামাযের ওযূ করছিলেন। তিনি ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার এমন ভয়াবহ অবস্থা জানতে পেরে ওযূর পানি নিক্ষেপ করে বললেন, হে ফখরুদ্দীন রাযী! তুমি ইবলীসকে বল, বিনা দলীলে মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন। বহু দূর থেকে যখন মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিক্ষিপ্ত ওযূর পানি এসে উনার চেহারার উপর পড়লো এবং মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ক্বওল মুবারকের আওয়াজ উনার কানে এসে পৌঁছাল তিনি ইবলীসকে জানিয়ে দিলেন, হে ইবলীস! তুমি জেনে রাখ, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন। এটা আমি বিনা দলীলেই বিশ্বাস করি। তখন ইবলীস বললো, হে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী! আপনি আজকে আপনার মুর্শিদ ক্বিবলা উনার উসীলায় বেঁচে গেলেন। অন্যথায় আপনাকে ঈমানহারা করে মৃত্যুমুখে পতিত করে চলে যেতাম।

এ ওয়াক্বিয়া দ্বারা হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ মুবারক উনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

অতএব, হযরত নবী-রসূল আলাইহিস সালাম উনার উম্মত না হয়ে যেরূপ ইছলাহ ও নাজাত লাভ করা যায়না, তদ্রƒপ কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত না হওয়া পর্যন্ত ইছলাহ বা পরিশুদ্ধতা ও নাজাত লাভ করা যায়না। বরং শয়তানী প্রবঞ্চনায় পড়ে গোমরাহীতে নিপতিত হওয়াই স্বাভাবিক।

আর এ কারণেই জগদ্বিখ্যাত আলিম, আলিমকুল শিরোমণি, শ্রেষ্ঠতম মাযহাব, হানাফী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম, ইমামুল আ’যম হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

لولا سنتان لـهلك ابو نعمان

অর্থ : “(আমার জীবনে) যদি দু’টি বৎসর না পেতাম, তবে আবূ নু’মান (আবূ হানীফা) ধ্বংস হয়ে যেতাম।” (সাইফুল মুকাল্লিদীন, ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া)

অর্থাৎ আমি হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি যদি আমার শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা হযরত ইমাম বাকির আলাইহিস সালাম অতঃপর হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক আলাইহিস সালাম উনাদের নিকট বাইয়াত না হতাম, তবে আমি ধ্বংস বা বিভ্রান্ত হয়ে যেতাম।

সুতরাং প্রমাণিত হলো, যে ব্যক্তি কোনো কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত না হবে, তার পক্ষে শয়তানী প্রবঞ্চনা ও বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা আদৌ সম্ভব নয়। কেননা কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত ক্বলবে যিকির জারি করা অসম্ভব। আর ক্বলবে যিকির জারি করা ব্যতীত শয়তানী ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকাও সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-

ومن يعش عن ذكر الرحـمن نقيض له شيطنا فهو له قرين. وانـهم ليصدونـهم عن السبيل ويـحسبون انـهم مهتدون.

অর্থ : “যে ব্যক্তি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র যিকির থেকে বিরত (গাফিল) থাকে, আমি (খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক) তার জন্য একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেই। অর্থাৎ তার গাফলতীর কারণেই তার সাথে একটা শয়তান নিযুক্ত হয়ে যায়। অতঃপর সেই শয়তান তার সঙ্গী হয় এবং তাকে সৎ পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে অর্থাৎ পাপ কাজে লিপ্ত করে দেয়। অথচ তারা মনে করে, তারা সৎ পথেই রয়েছে।” (পবিত্র সূরা যুখরূফ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৬, ৩৭)

তাই পরিশুদ্ধতা লাভ করার জন্য বা ক্বলবে যিকির জারি করার জন্য অবশ্যই একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হতে হবে।

আর এ কারণেই পৃথিবীতে যত হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা আগমন করেছেন, উনাদের প্রত্যেকেই কোনো একজন শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হয়েছেন এবং উনারা উনাদের স্ব স্ব কিতাবে শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করাকে ফরয বলেছেন। যেমন- গউছুল আ’যম, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, ইমামুল আইম্মাহ হযরত বড়পীর আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিতাব ‘সিররুল আসরার’ নামক কিতাবে লিখেন-

ولذالك طلب اهل التلقين لـحياة القلوب فرض

অর্থ : “ক্বল্ব্ জিন্দা করার জন্য অর্থাৎ অন্তর পরিশুদ্ধ করার জন্য ‘আহলে তালক্বীন’ তালাশ করা অর্থাৎ কামিল মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা ফরয।” অনুরূপ ‘ফতহুর রব্বানী’ কিতাবেও উল্লেখ আছে।

তদ্রূপ হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশ্ব সমাদৃত কিতাব ‘ক্বিমিয়ায়ে সায়াদাত’ কিতাবে, ক্বাইউমুয যামান হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘মাকতুবাত শরীফ’ কিতাবে, আওলাদে রসূল, আশিকে নবী হযরত আহমদ কবীর রেফায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আল ‘বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ’ কিতাবে উল্লেখ করেন যে, “অন্তর পরিশুদ্ধ করার জন্য বা ইলমে তাছাওউফ অর্জন করার জন্য একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয।”

অনুরূপ তাফসীরে রূহুল বয়ান, তাফসীরে রূহুল মায়ানী ও তাফসীরে কবীর ইত্যাদি কিতাবেও উল্লেখ আছে।

মূলত কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনি মুরীদের অন্তর পরিশুদ্ধ করতঃ খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার খাছ নৈকট্য মুবারক লাভ করানোর এক বিশেষ উসীলা বা মাধ্যম।

এ জন্যেই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে নির্দেশ মুবারক করেন-

يايها الذين امنوا اتقوا الله وابتغوا اليه الوسيلة

অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! তোমরা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো এবং খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য মুবারক লাভ করার জন্য ওসীলা তালাশ (গ্রহণ) করো।” (পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৫)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় “তাফসীরে রূহুল বয়ান” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে-

الوصول لا يـحصل الا بالوسيلة وهى العلماء الـحقيقة ومشائخ الطريقة

অর্থ : “ওসীলা ব্যতীত খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য মুবারক লাভ করা যায়না। আর উক্ত ওসীলা হচ্ছেন হাক্বীক্বী আলিম বা তরীক্বতপন্থী কামিল মুর্শিদ উনারা।”

উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে প্রতিভাত হলো যে, প্রত্যেকের জন্য একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয।

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।

সুওয়াল: সিলেট দরগাহ সংলগ্ন খারিজী মাদরাসা জামিয়া কাসিমুল উলূমের মুহতামিম আবুল কালাম যাকারিয়া ও সুবহানীঘাট ফুলতলী মাসলাকের মাদরাসা ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মুহম্মদ কুতুবুল আলম স্বাক্ষরিত একটি লিখিত ফতওয়া আমার হস্তগত হয়। সেখানে তারা একটি হাদীছ শরীফ ও মা লা বুদ্দা মিনহু কিতাবের বরাত দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, “ফরয নামাযের দুই সিজদার মধ্যখানে اللهم اغفرلى وارحمنى واجبرنى واهدنى وارزقنى وعافنى وارفعنى এ দোয়াটি সম্পূর্ণটাই পড়া জায়িয। উল্লেখ্য আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে তাদের লিখিত ফতওয়াটির ফটোকপি সুওয়ালের সাথে প্রেরণ করা হলো। এখন আমার সুওয়াল হলো-সত্যিই কি ফরয নামাযের দু’ সিজদার মধ্যখানে উক্ত দোয়াটি সম্পূর্ণ পড়া জায়িয? দলীল ভিত্তিক জাওয়াব দিয়ে আমাদের ফরয ইবাদত নামাযকে হিফাযত করবেন বলে আমরা আশাবাদী।