সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ২৪৭তম সংখ্যা | বিভাগ:

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ


মুসাম্মত উম্মে আয়মান

গুলশান, ঢাকা।

সুওয়াল: ইদানিং ব্লগ বা ফেসবুকে কিছু নাস্তিক বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করে উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার ৬ বছর বয়স মুবারকে শাদী মুবারক হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে থাকে।

এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ৬ বছর বয়স মুবারকে শাদী মুবারক হওয়ার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল আছে কি না? যদি থেকে থাকে, তবে তা বহুল প্রচারিত মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফে প্রকাশ করলে আমাদের ঈমান-আমল হিফাযত হতো।

জাওয়াব: উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার ৬ বছর বয়স মুবারকে আক্বদ বা শাদী মুবারক হওয়ার বিষয়টি অর্থাৎ বাল্য বিবাহ সুন্নত হওয়ার বিষয়টি যারা অস্বীকার করে, তারা অসংখ্য ছহীহ পবিত্র হাদীছ শরীফ অস্বীকার করার কারণে কাফির!

কেননা বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, উনার বয়স মুবারক যখন ৬ বছর তখন উনার সাথে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র আক্বদ বা শাদী মুবারক সম্পন্ন হয় এবং ৯ বছর বয়স মুবারক-এ তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্রতম হুজরা শরীফ-এ তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করেন। সুবহানাল্লাহ! এ বিষয়টি একটি নয় দুটি নয় বরং অসংখ্য পবিত্র ছহীহ হাদীছ শরীফ দ্বারাই অকাট্যভাবে প্রমাণিত। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, এ বিষয়টি অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে একাধিক পবিত্র ছহীহ হাদীছ শরীফ উনাদেরকে অস্বীকার করা। আর এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, পবিত্র হাদীছ শরীফ অস্বীকার করা কাট্টা কুফরী। আর যে কুফরী করে সেই কাফির হয়। নাউযুবিল্লাহ!

আমরা নির্ভরযোগ্য পবিত্র ছহীহ হাদীছ শরীফ উনার কিতাব মুবারক থেকে এ সম্পর্কিত দলীল-আদিল্লাহসমূহ ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ বা বিশুদ্ধ কিতাব ‘ইবনে মাজাহ শরীফ’ উনার বর্ণনাসমূহ-

حَدَّثَنَا سُوَيْدُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُسْهِرٍ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ حضرت ام الـمؤمنين عَائِشَةَ الصديقة عليها السلام، قَالَتْ : تَزَوَّجَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ وَأَنَا بِنْتُ سِتِّ سِنِينَ، …. فَأَسْلَمَتْنِي إِلَيْهِ وَأَنَا يَوْمَئِذٍ بِنْتُ تِسْعِ سِنِينَ.

অর্থ: “উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে আমার আক্বদ বা শাদী মুবারক সম্পন্ন হয় যখন আমার বয়স মুবারক ছিল ৬ বছর। ……. আর ৯ বছর বয়স মুবারকে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হুজরা শরীফে আমি তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করি।” সুবহানাল্লাহ! (সূনানু ইবনে মাজাহ কিতাবুন নিকাহ বাবু নিকাহিছ ছিগার ইউযাউয়্যিজু হুন্নাল আবাউ।)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ বা বিশুদ্ধ কিতাব ‘ছহীহ মুসনাদে আহমদ শরীফ’ উনার বর্ণনা-

حدثنا عبد الله حدثني أبي ثنا محمد بن بشر قال حدثنا محمد بن عمرو قال ثنا أبو سلمة ويحيى قالا : … فزوجها إياه و حضرت ام الـمؤمنين عائشة الصديقة عليها السلام يومئذ بنت ست سنين …. وبنى بي رسول الله صلى الله عليه و سلم وأنا يومئذ بنت تسع سنين…. إسناده حسن.

অর্থ: “হযরত আবূ সালমা ও হযরত ইয়াহইয়া রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা বলেন, উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার বয়স মুবারক যখন ৬ বছর তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার সাথে আক্বদ মুবারক সম্পন্ন করেন। হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন: আর আমার বয়স মুবারক যখন ৯ বছর তখন আমি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হুজরা শরীফ-এ তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করি।” এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সনদ হাসান পর্যায়ের। (ছহীহ মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদীছু আস সাইয়্যিদাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম ৬ খন্ড, ২১০ পৃষ্ঠা।)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ বা বিশুদ্ধ কিতাব ‘ছহীহ ইবনু হিব্বান শরীফ’ উনার বর্ণনা-

أخبرنا الحسن بن سفيان حدثنا إبراهيم بن سعيد الجوهري حدثنا أبو أسامة حدثنا هشام بن عروة عن أبيه عن حضرت ام الـمؤمين عائشة الصديقة عليها السلام قالت: تزوجني رسول الله صلى الله عليه وسلم لِست سنين وبنى بي وأنا بنت تسع سنين.

অর্থ: “উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে আমার আক্বদ বা শাদী মুবারক সম্পন্ন হয় যখন আমার বয়স মুবারক ছিল ৬ বছর। ……. আর ৯ বছর বয়স মুবারকে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হুজরা শরীফে আমি তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করি।” সুবহানাল্লাহ! (ছহীহ ইবনু হিব্বান বি তারতীবে ইবনে বিলবান যিকরু আয়িশাতা উম্মুল মু’মিনীন আলাইহাস সালাম ও আন আবীহা।) (চলবে)

মীর মুহম্মদ ছাবের আলী

বায়তুল মোকাররম মার্কেট, ঢাকা

মুহম্মদ হাবীবুর রহমান, সংসদ ভবন, ঢাকা

মুহম্মদ জুনাইদ, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

সুওয়াল: বর্তমানে মসজিদের ভিতরে চেয়ারে বসে নামায আদায় করার ব্যাপারে তীব্র মতভেদ দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, মসজিদের ভিতরে চেয়ারে বসে নামায আদায় করা জায়িয নেই। আবার কেউ বলছে জায়িয। উভয়েই পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ ও ফিক্বাহের কিতাব থেকে দলীল দিয়ে থাকে।

এখন আমরা কোনটা গ্রহণ  করবো? বহুল প্রচারিত দলীলভিত্তিক মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এ এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সঠিক ফায়সালা তুলে ধরলে সাধারণ মুসলমানগণ উপকৃত হতো।

জাওয়াব: পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে মসজিদের ভিতরে বা মসজিদের বাহিরে চেয়ারে বসে নামায আদায় করার সঠিক ফায়সালা হচ্ছে, মসজিদের ভিতরে হোক অথবা মসজিদের বাহিরে হোক, দাঁড়াতে সক্ষম হোক  অথবা দাঁড়াতে অক্ষম হোক, প্রত্যেক অবস্থাতেই চেয়ার, টেবিল, টুল, বেঞ্চ অথবা অনুরূপ (পা ঝুলে থাকে এমন) কোন আসনে বসে নামায আদায় করা কাট্টা হারাম, নাজায়িয ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ এবং নামায বাতিল হওয়ার কারণ। এ ফতওয়াটি ছহীহ, দলীলভিত্তিক ও গ্রহণযোগ্য। এর খিলাফ কোন ফতওয়াই ছহীহ, দলীলভিত্তিক ও গ্রহণযোগ্য নয়।

আমরা ধারাবাহিকভাবে উল্লিখিত বিষয়ে দলীল-আদিল্লাহ পেশ করার পাশাপাশি যারা চেয়ার, টেবিল, টুল ও বেঞ্চে বসে নামায পড়াকে জায়িয বলে, তাদের সে সমস্ত বক্তব্যগুলো নির্ভরযোগ্য দলীল দ্বারা খ-ন করবো। ইন্শাআল্লাহ!

উল্লেখ্য যে, আমরা প্রথমেই ধারাবাহিকভাবে “চেয়ারে বসে নামায পড়া বিদয়াত, নাজায়িয ও নামায বাতিল হওয়ার কারণ” এ সম্পর্কিত দলীল-আদিল্লাহসমূহ উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ!

আরো উল্লেখ্য যে, বিগত সংখ্যায় আমরা প্রমান করেছি যে, মসজিদের ভিতরে, নামায পড়ার উদ্দেশ্যে চেয়ার, টেবিল, টুল, বেঞ্চ অথবা অনুরূপ (পা ঝুলে থাকে এমন) কোন আসন ইত্যাদি প্রবেশ করানোই বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ।

আর বর্তমান সংখ্যায় আমরা প্রমাণ করবো যে, ২. চেয়ারে বসে নামায পড়াও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ বা হারাম।

সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে পবিত্র মসজিদের ভিতরে হোক বা অন্য যেকোনো স্থানেই হোক না কেন, কোন অবস্থাতেই চেয়ারে বসে নামায পড়া জায়িয নেই। বরং বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ বা হারাম এবং নামায বাতিল হওয়ার কারণ। কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, তাবিয়ীন, তাবি-তাবিয়ীন, ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কেউ কখনো চেয়ারে বসে নামায পড়েছেন এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না।

অতএব, বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, চেয়ারে বসে নামায আদায় করা দ্বীনের ভিতর একটি নতুন আবিষ্কার অর্থাৎ বিদয়াত ফিদ দ্বীন (بدعة فى الدين) যা বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহর অন্তর্ভুক্ত। আর বিদয়াত সম্পর্কে গত সংখ্যায় দলীলভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

এবার দেখুন দেওবন্দী মৌলভী যারা চেয়ারে বসে নামায পড়ে এবং এটাকে জায়িয বলে ফতওয়া দেয়, তারা বিদয়াত সম্পর্কে কি লিখেছে ও বলেছে- দেওবন্দীদের কথিত মুরুব্বী হেকারত নেতা আহমক শফী তার লিখিত “সুন্নত ও বিদয়াতের পরিচয়” নামক বইয়ে লিখেছে-

** শরীয়তের পরিভাষায় ইবাদতের ঐ সকল নতুন নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতিকেই বিদআত বলা হয়, যা বেশী সাওয়াবের উদ্দেশ্যে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খুলাফায়ে রাশিদীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ও সালফে সালেহীনের পবিত্র স্বর্ন যুগের (যাঁদের যুগকে কল্যাণের যুগ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে) পর আবিষ্কার করা হয়েছে। অথচ রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ছাহাবায়ে কিরামের বরকতময় যুগে এর চাহিদা ও কারণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এ সকল কর্ম কথায়, কাজে, প্রকাশ্যে, ইঙ্গিতে করেছেন বলে কোন প্রমান পাওয়া যায় না। (২০ পৃষ্ঠা)

** যে সব কাজের প্রয়োজন নবী কারীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যুগে ও পরবর্তী যুগে একই প্রকার, তার মধ্যে এমন কোন নিয়ম নীতি আবিষ্কার করা, যা নবী কারীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা ছাহাবায়ে কিরামগণ করেননি। তা বিদআত হবে। যা কুরআন সুন্নাহর আলোকে নিষেধ ও অবৈধ। (২২ পৃষ্ঠা)

** বিদআতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে যদি ইবাদতে নিজের পক্ষ হতে সীমা শর্ত ও নতুন নুতন নিয়ম পদ্ধতি চালু করা হয়, তাহলে সঠিক দ্বীনের পরিবর্তন হয়ে যাবে। (২৮ পৃষ্ঠা)

** শরীয়ত যে সকল ইবাদতকে নিঃশর্ত ও মুক্ত রেখেছে, সে সকল ইবাদতে নিজের পক্ষ হতে শর্ত লাগানো বা তার পদ্ধতি প্রবর্তন করা কিংবা নিজের পক্ষ হতে সময় নির্ধারণ করা সবই শরীয়তের দৃষ্টিতে বিদআত, মন্দ ও অগ্রাহ্য। ….. খালেছ দৈহিক ইবাদতে যারা এমন কোন গুণ বাড়াবে, যা সাহাবায়ে কিরামের যুগে ছিল না। তাও বিদআত হবে। কারণ, এই নিয়ম-নীতি পরিবর্তনের দ্বারা দ্বীন পরিবর্তন হয়ে যায়। (৩৩ পৃষ্ঠা)

আহমক শফীর উপরোক্ত বক্তব্য থেকে যে বিষয়গুলো সাব্যস্ত হয়েছে তাহলো, (১) ইবাদতের ঐ সকল নতুন নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতিকেই বিদয়াত বলা হয় যা খইরুল কুরূনে অর্থাৎ রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খুলাফায়ে রাশিদীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ও সালফে ছালিহীন উনাদের পবিত্র স্বর্ণ যুগে ছিল না। (২) ইবাদতে নিজের পক্ষ থেকে সীমা শর্ত ও নতুন নতুন নিয়ম পদ্ধতি চালু করা বিদয়াত, যা দ্বীনের মধ্যে পরিবর্তন করার নামান্তর।

অতএব, দেওবন্দী মৌলভীদের দেয়া বিদয়াতের সংজ্ঞা দ্বারাই প্রমানিত হয় যে, পবিত্র মসজিদের ভিতরে হোক বা অন্য যেকোনো স্থানেই হোক চেয়ারে বসে নামায পড়া বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহর অন্তর্ভুক্ত। কেননা প্রথমত: চেয়ারে বসে নামায পড়ার আমল খইরুল কুরূনে অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খুলাফায়ে রাশিদীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ও সালফে ছালিহীন উনাদের পবিত্র স্বর্ণ যুগে ছিল না। দ্বিতীয়ত: এর দ্বারা ইবাদতে (নামাযে) নতুন নিয়ম-পদ্ধতি চালু করা হয়। যা দ্বীনের মধ্যে পরিবর্তন করার নামান্তর। অর্থাৎ কাট্টা কুফরী।

অতএব, সম্মানিত শরীয়ত উনার ফায়ছালা হলো পবিত্র মসজিদের ভিতরে হোক বা অন্য যেকোনো স্থানেই হোক চেয়ারে বসে নামায পড়া বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ ও হারাম।

উল্লেখ্য যে, পবিত্র হাদীছ শরীফ এবং পবিত্র ফিক্বাহর কিতাবসমূহে পবিত্র নামাযে বসার যে তরতীব বা নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে, সে নিয়মের মধ্যে চেয়ার বা টুলে বসে নামায পড়ার কোনই বর্ণনা নেই। কাজেই চেয়ার বা টুলে বসে পবিত্র নামায আদায় করলে পবিত্র নামাযে বসার যে পবিত্র সুন্নত রয়েছে তা বাদ হয়ে যায়। ফলে একটি বিদয়াতের প্রচলন হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে-

عن حضرت غضيف بن الحارث الثمالى رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما احدث قوم بدعة الا رفع مثلها من السنة فتمسك بسنة خير من احداث بدعة.

অর্থ : “হযরত গুদাইফ ইবনে হারিছ ছুমালী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখনই কোন সম্প্রদায় একটি বিদয়াত সৃষ্টি করেছে, তখনই একটি পবিত্র সুন্নত বিলুপ্ত হয়েছে। কাজেই, একটি সুন্নত মুবারক উনার উপর আমল করা একটি বিদয়াত সৃষ্টি করা হতে উত্তম।” (মুসনাদে আহমদ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত হয়েছে-

عن حضرت ام الـمؤمنين عائشة الصديقة عليها السلام قالت قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من احدث فى امرنا هذا ما ليس منه فهو رد.

অর্থ: উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি আমাদের এ সম্মানিত দ্বীন উনার মধ্যে কোন নতুন বিষয় প্রবর্তন করেছে, যা উনার মধ্যে নেই, তার উক্ত বিষয় প্রত্যাখ্যানযোগ্য। (বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)

অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন কোন বিষয় প্রবর্তন করলো যা সম্মানিত দ্বীন ইসলাম তথা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের মধ্যে নেই, তা পরিত্যাজ্য বা বাতিল বলে গণ্য হবে।

عن حضرت جابر رضى الله تعالى عنه قال قال رسول لله صلى الله عليه وسلم اما بعد فان خير الـحديث كتاب الله وخير الـهدى هدى محمد صلى الله عليه وسلم وشر الامور محدثاتها وكل بدعة ضلالة.

অর্থ: হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ ইরশাদ মুবারক হচ্ছেন মহান আল্লাহ পাক উনার কিতাব মুবারক এবং সর্বোত্তম তর্জ-তরীক্বা মুবারক হচ্ছেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পথ। আর সর্বনিকৃষ্ট কাজ বা আমল হচ্ছে, যা দ্বীন সম্পর্কে (মনগড়াভাবে) নতুন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং (এরূপ) প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই (বিদআত) গোমরাহী। (মুসলিম শরীফ)

عن حضرت عبد الله بن عباس رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الامر ثلاثة امر بين رشده فاتبعه وامر بين غيه فاجتنبه وامر اختلف فيه فكله الى الله عز وجل.

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, সম্মানিত শরীয়ত উনার আমল তিন প্রকার: ১. এমন বিষয় যার হিদায়েত সম্পূর্ণ পরিস্কার; সুতরাং উনার অনুসরণ করবে। ২. এমন বিষয় যার গোমরাহী সম্পূর্ণ পরিস্কার; সুতরাং তা পরিত্যাগ করবে। এবং ৩. এমন বিষয় যাতে ইখতিলাফ রয়েছে। তা মহান আল্লাহ পাক উনার উপর সোপর্দ করবে (অর্থাৎ তা পরিস্কার বিধানের আলোকে হিদায়েতের দিকে প্রবল না গোমরাহীর দিকে প্রবল তা বুঝার চেষ্টা করবে) (আহমদ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

عن حضرت حسان رضى الله تعالى عنه قال ما ابتدع قوم بدعة فى دينهم الا نزع الله من سنتهم مثلها ثم لا يعيدها اليهم الى يوم القيامة

অর্থ: হযরত হাসসান বিন ছাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখনই কোন ক্বওম সম্মানিত দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে কোন বিদআত সৃষ্টি করেছে, তখনই মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদের মধ্য হতে সে পরিমাণ সুন্নত উঠিয়ে নিয়েছেন। অতঃপর ক্বিয়ামত পর্যন্ত সে সুন্নত তাদেরকে আর ফিরিয়ে দেয়া হবে না। (দারিমী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

অতএব প্রমাণিত হলো যে, চেয়ার-টেবিল বা চেয়ার বা টুলে বসে পবিত্র নামায আদায় করার অর্থ হচ্ছে বিদয়াতের প্রচলন করা। আর পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের বিরোধী প্রত্যেকটি কথা বা কাজই হচ্ছে বিদয়াতের অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেক বিদয়াতই গুমরাহী এবং এর অনুসরণকারীরা গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট ও জাহান্নামী। নাউযুবিল্লাহ! (চলবে)

মুহম্মদ জাকির হুসাইন

সদর, পাবনা

সুওয়াল: আমাদের এলাকায় খাছ মুজাদ্দিদিয়া তরীক্বার জনৈক পীর নামধারী ব্যক্তি বলে থাকে যে, পাঁচ কল্লি টুপি হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সুন্নত অর্থাৎ তিনি নাকি পাঁচ কল্লি টুপি ব্যবহার করতেন। একথাটি কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াব: বিনা দলীল-প্রমাণে কারো কোন বক্তব্য সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত অর্থাৎ সম্মানিত দ্বীন ইসলাম ও সম্মানিত মুসলমান উনাদের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং অনুসরণযোগ্যও নয়। কাজেই, কোন তরীক্বার পীর নামধারী ব্যক্তি হোক কিংবা তার অনুসারী কেউ হোক সে যদি সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কিংবা উনার প্রকৃত স্থলাভিষিক্ত ওয়ারিছ উনাদের কোন বিষয় সম্পর্কে বলে তবে অবশ্যই তাকে দলীল সহকারে বলতে হবে। অন্যথায় তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এ সম্পর্কে স্বয়ং যিনি খ¦ালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। যা পবিত্র সূরাতুল বাক্বারা উনার ১১১ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

هاتوا برهانكم ان كنتم صادقين

অর্থ: যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে দলীল পেশ করো।

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার নির্দেশ অনুযায়ী সুওয়ালে উল্লেখিত পীর নামধারী ব্যক্তিকে দলীল পেশ করতে হবে যে, আফদ্বালুল আউলিয়া, ইমামে রব্বানী, ক্বইয়ূমে আউওয়াল হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে পাঁচ কল্লি টুপি পরিধান করতেন, তা উনার কোন কিতাবে বা কোন মাকতূবে উল্লেখ আছে। যদি দলীল দিতে পারে তবেই তার বক্তব্য সত্য বলে সাব্যস্ত হবে। অন্যথায় মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার কারণে উক্ত পীর নামধারী ব্যক্তির উপর মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত বর্ষিত হবে। যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

لعنت الله على الكاذبين

অর্থ: মিথ্যাবাদীদের উপর মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত। (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৬১)

অপর এক পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

واجتنبوا قول الزور

অর্থ: তোমরা মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকো। (পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩০)

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

انما الكذب لكل الذنوب ام

অর্থ: মিথ্যা হচ্ছে সমস্ত গুনাহর মূল।

এছাড়া পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে মুনাফিকদের আলামত বা চিহ্ন সম্পর্কে যেসব পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত হয়েছে সেসব বর্ণনার মধ্যে মিথ্যা বলার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ মিথ্যা বলা মুনাফিকদের অন্যতম বা বিশেষ বদ খাছলত বা বদ স্বভাব। নাউযুবিল্লাহ!

মিথ্যাবাদী বা মিথ্যা বক্তব্যধারী ব্যক্তি চরম ফাসিকের অন্তর্ভুক্ত। এরূপ ব্যক্তি পীর নামের কলঙ্ক। এরা ধোকাবাজ প্রতারক। এদের ছোহবত বা সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা কর্তব্য।

মূলতঃ পাঁচ কল্লি টুপির প্রচলন অনেক পরে হয়েছে। পাঁচ কল্লি টুপির উদ্ভাবক বা উৎপত্তিকারক হচ্ছে দেওবন্দ মাদরাসার মুরুব্বীরা। যেমন এ সম্পর্কে দেওবন্দ মাদরাসার মুহাদ্দিছ মালানা আছগর হুসাইন দেহলবী তার “গুলজারে সুন্নত” কিতাবে লিখেছে-

اکابر دین می پانچ کلی کی ٹوپی کا رواج ہواہے.

অর্থ: আকাবিরে দ্বীনদের অর্থাৎ দেওবন্দী মুরুব্বীদের মধ্যে পাঁচ কল্লি টুপির রেওয়াজ চালু হয়।

প্রতিভাত হলো, পাঁচ কল্লি টুপি নতুন উদ্ভাবিত বিষয়, যাকে ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে বিদআত বলা হয়েছে এবং তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

من احدث فى امرنا هذا ما ليس منه فهو رد

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে কোন নতুন বিষয়ের প্রবর্তন করবে, যার ভিত্তি সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে নেই, তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। অর্থাৎ তা আমল করা যাবে না। (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ)

তিনি অন্যত্র ইরশাদ মুবারক করেন-

ما احدث قوم بدعة الا رفع مثلها من السنة فتمسك بسنة

অর্থ: যখনই কোন ক্বওম বা সম্প্রদায় একটি বিদআতের প্রচলন করেছে তখনই একটি সুন্নত লোপ পেয়েছে। অতএব উদ্ভাবিত বিদআতের পরিবর্তে সুন্নত আঁকড়ে ধরাই তোমাদের জন্য উত্তম অর্থাৎ অপরিহার্য। (আহমদ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

কাজেই, আফদ্বালুল আউলিয়া, ক্বইয়্যূমে আউওয়াল হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পাঁচ কল্লি টুপ পরিধান সম্পর্কে পীর নামধারী ব্যক্তির বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা।

আল্লামা মুহম্মদ মাছুমুর রহমান

মাদারীপুর

সুওয়াল: মা’জূর অবস্থায় যদি কোন সন্তান মারা যায় তখন মা কি সন্তানকে স্পর্শ করতে  পারবে?

জাওয়াব: হ্যাঁ, পারবে। মূলত: সাধারণভাবে মুসলমান পুরুষ-মহিলা উনারা পবিত্র। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

ان الـمؤمن طهور لا ينجسه شىء

অর্থ: নিশ্চয়ই মু’মিনগণ পবিত্র। কোন কিছুই উনাদেরকে অপবিত্র করতে পারে না। (মিশকাত শরীফ)

কাজেই, সন্তান ইনতিকাল করলে মা যদি মাজুর থাকেন তথাপি সন্তানকে স্পর্শ করতে পারবেন।

দলীলসমুহ: মিশকাত শরীফ, মিরক্বাত শরীফ, নূরুছ ছুদূর ফী শরহিল কুবূর, আহকামে মাইয়্যিত।

আবূ আহমদ ফাতিমা মুশিরা

মাদারটেক, ঢাকা।

সুওয়াল: ছোট নিষ্পাপ বাচ্চা সে কি তার মা-বাবা ভাই বোন বা কোন আত্মীয়স্বজনকে সুপারিশ করতে পারবে?

জাওয়াব: হ্যাঁ, মু’মিন-মুসলমান উনাদের শিশু বাচ্চারা ইনতিকাল করলে, তারা নিজেরা যেমন জান্নাতী হবে এবং অবস্থা অনুযায়ী তারা তাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা আত্মীয় স্বজন তাদেরকে সুপারিশ করার অনুমতি প্রাপ্ত হবেন।

যার কারণে শিশু বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের জানাযা নামাযে উক্তরূপ দুআ করার জন্য হুকুম দেয়া হয়েছে।

জানাযা নামাযে তৃতীয় তাকবীরের পর অপ্রাপ্ত বয়স্কদেরকে ওসীলা হিসেবে গ্রহণ করে আমরা দুআ করে থাকি।

যেমন আমরা বলে থাকি-

اللهم اجعله لنا فرطا واجعله لنا اجرا وذخرا واجعله لنا شافعا ومشفعا

অর্থাৎ, আয় বারে ইলাহী! এই শিশুকে কিয়ামত দিবসে আমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পথপ্রদর্শক করুন এবং আমাদের জন্য তাকে ছওয়াবের ওসীলা ও নেকীর ভা-ার করুন। আর তাকে আমাদের সুপারিশকারী করুন এবং আমাদের জন্য তার সুপারিশ কবুল করুন।

কাজেই, অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানরা ক্বিয়ামতের দিন স্বীয় পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য সুপারিশ করবেন এবং তাদের সুপারিশ কবুলও করা হবে। সুবহানাল্লাহ!

দলীলসমূহ: তা’লীমুল কুরআন, নামায শিক্ষা, তরীকুল ইসলাম, মকছুুদুল মু’মিন ইত্যাদি।

উম্মু আহমদ ফাতিমা

গোড়ান, ঢাকা

সুওয়াল: মা-বাবা মৃত সন্তানের উদ্দেশ্যে যত দূর থেকে হোক যদি অল্প আওয়াজে তার উদ্দেশ্যে কোন কিছু বলে তাহলে কি সে কবরে থেকে শুনতে পায়?

জাওয়াব: শুধু বাবা-মাই নয় বরং যে কোনো ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির কবরের নিকট গিয়ে মৃত ব্যক্তিকে কিছু বললে সে শুনতে পায় তবে জাওয়াব দিতে পারে না। পিতা-মাতা অথবা অন্য কেউ উক্ত সন্তানের জন্য অথবা কোনো মৃত ব্যক্তি পুরুষ বা মহিলা তাদের জন্য দুআ করলে কিংবা দান-ছদক্বা করলে সেটা মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেন এবং তার বিনিময় বা প্রতিদানও দিয়ে থাকেন। সুবহানাল্লাহ!

দলীলসমূহ: তবারানী শরীফ, তাফসীরে কবীর, তাফসীরে মাযহারী ইত্যাদি।

মুহম্মদ নূরুন নবী

ফুলগাজী, ফেনী।

সুওয়াল: চাচাতো বোনের মেয়ে, সে সম্পর্কে ভাগ্নি হয় তাকে বিবাহ করা যাবে কিনা?

জাওয়াব: চাচাতো বোন এবং চাচাতো বোনের মেয়ে উভয়কে বিবাহ করা জায়িয রয়েছে।

প্রকাশ থাকে যে, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম বা ইসলামী শরীয়তে যে সকল মহিলাকে বিবাহ করা হারাম বা নিষিদ্ধ, তা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র সূরা নিসা শরীফ উনার ২২, ২৩ ও ২৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ সমূহের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেমন এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَلَا تَنكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۚ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا ﴿٢٢﴾ حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُم مِّن نِّسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۗ إِنَّ اللَّـهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا. والـمحصنت من النساء الا ما ملكت ايمانكم كتب الله عليكم.

অর্থ: আর মহিলাদের মধ্যে তোমাদের পিতৃপুরুষ (পিতা-পিতামহ ইত্যাদি) যাদের বিবাহ করেছেন তোমারা তাদেরকে বিবাহ করবে না। কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে তা আলাদা। এটা অশ্লীল, ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট আচরণ। তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাগণকে, তোমাদের কন্যাদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুগণকে, তোমাদের খালাগণকে, তোমাদের ভাইয়ের মেয়েদেরকে এবং তোমাদের বোনের মেয়েদেরকে। তোমাদের সেইসব মাতাগণ, যারা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছেন, তোমাদের দুধ-বোনগণ, তোমাদের আহলিয়াদের মাতাগণ, তোমরা যাদের সাথে নির্জনঅবস্থান করেছ সেই আহলিয়াদের কন্যা- যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সাথে নির্জনঅবস্থান না করে থাক, তবে তাদের মেয়েকে বিবাহ করাতে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের আহলিয়া এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত (জাহিলী যুগে) হয়ে গেছে তা আলাদা। নিশ্চয় মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। এবং মহিলাদের মধ্যে যারা বিবাহিতা তাও, তবে যারা তোমাদের দখলে (বাঁদী) এসেছে তাদের কথা আলাদা। এ হলো মহান আল্লাহ পাক উনার বিধান তোমাদের জন্য। (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২২, ২৩, ২৪)

উক্ত পবিত্র  আয়াতাংশ উনার মধ্যে-

وبنات الاخ وبنات الاخت এবং  واخواتكم

অর্থাৎ “তোমাদের বোনদেরকে এবং তোমাদের ভাইয়ের মেয়েদেরকে এবং তোমাদের বোনের মেয়েদেরকে” এ আয়াতাংশ উনার ব্যাখ্যায় সকল তাফসীরগ্রন্থ ও ফিক্বাহর গ্রন্থসমূহে যা উল্লেখ রয়েছে তা হচ্ছে, সহোদরা বোন যাকে আপন বোন বলা হয়, বৈমাত্রেয় বোন, বৈপিত্রেয় বোন, দুধ বোন এবং তাদের মেয়ে অর্থাৎ ভাগ্নী, ভাগ্নীর মেয়ে নাতনী এবং নাতনীর মেয়ে এভাবে যত নীচে যাক, সকল মেয়েকে বিবাহ করা হারাম।

কেবল উক্ত চার প্রকার বোন এবং তাদেরই যারা মেয়ে (ভাগ্নি) এবং তাদের অধস্তন মেয়েরা ব্যতীত অন্য সকল সম্বন্ধের ও পরিচয়ের বোন, ভাগ্নী, নাতনী, পুতনীকে বিবাহ করা ইসলামী শরীয়তে জায়িয রয়েছে। সম্মানিত ইসলামী শরীয়তে যা হারাম করা হয়নি তা নিজেদের ধারণায় বা খেয়ালখুশির বশবর্তী হয়ে হারাম বলা কবীরা ও কুফরী গুনাহর অন্তর্ভুক্ত।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

يايها الذين امنوا لاتحرموا طيبت ما احل الله لكم ولاتعتدوا ان الله لا يحب الـمعتدين

অর্থ: হে ঈমানদাররা! তোমরা হারাম করো না সে সকল পবিত্র বস্তুকে, যা মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে তোমরা সীমালঙ্ঘণ করো না। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি সীমালঙ্ঘণকারীকে পছন্দ করেন না। (পবিত্র সূরা মায়িদাহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৭)

কাজেই, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার ঘোষিত কোন হালাল বিষয়কে হারাম করা এবং কোন হারাম বিষয়কে হালাল করা উভয়টাই কুফরী। এ কুফরী থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয।

উল্লেখ্য, চাচাতো বোনের মেয়েকে অর্থাৎ এই ভাগ্নীকে বিবাহ করা যে জায়িয এ মাসয়ালাটি সহজে বুঝার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট দলীল হচ্ছেন সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ হযরত ফাতিমাতুয যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি। উনাকে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার সাথে বিবাহ দিয়েছেন। আর হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনি হচ্ছেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আপন চাচাতো ভাই। অর্থাৎ হযরত ফাতিমাতুয যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার আপন চাচাতো ভাই উনার মেয়ে।

স্মরণীয় যে, চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে হলো ভাতিজী আর চাচাতো বোনের মেয়ে হলো ভাগ্নী উভয়ই সম্পর্কের দিক থেকে সমান অর্থাৎ সমপর্যায়ভুক্ত।

যদি তাই হয়, অর্থাৎ চাচাতো ভাইয়ের মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যেরূপ জায়িয একইভাবে চাচাতো বোনের মেয়ের সাথেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়িয। দলীল: {দলীলসমূহ্ঃ (১) তাফসীরে আহকামুল কুরআন, (২) তাফসীরে জালালাইন, (৩) তাফসীরে কুরতুবী, (৪) তাফসীরে মাযহারী, (৫) তাফসীরে রুহুল মায়ানী, (৬) তাফসীরে তাফসীরে রূহুল বয়ান, (৭) তাফসীরে তাফসীরে খাযিন, (৮) তাফসীরে বাগবী, (৯) তাফসীরে ইবনে কাছীর, (১০) তাফসীরে তাবারী, (১১) তাফসীরে কবীর, (১২) তাফসীরে দুররে মুনছুর, (১৩) ফতহুল ক্বাদীর, (১৪) আইনী, (১৫) আলমগীরী, (১৬) বাহরুর রায়িক, (১৭) ফতওয়ায়ে ক্বাযীখান, (১৮) ফতওয়ায়ে শামী, (১৯) তাফসীরে দুররুল মুখতার, (২০) রদ্দুল মুহতার, (২১) ফতওয়ায়ে আমীনিয়া,  (২২) ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, (২৩) আইনুল হিদায়া ইত্যাদি।}

মুহম্মদ কামাল হুসাইন

শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার

সুওয়াল: একজন মৌলভী ছাহেবের বক্তব্য হলো, দাঁড়ি একমুষ্ঠির উপরে রাখা জায়িয নেই। বক্তব্যটি কতটুকু সঠিক?

জাওয়াব: উক্ত বক্তব্যটি মোটেই সঠিক হয়নি। বরং সম্মানিত সুন্নত মুবারক উনার বিরোধী হয়েছে। আর সুন্নত মুবারক উনার বিরোধী বক্তব্য কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

মূলত এক মুষ্ঠির নীচে দাঁড়ি কাটা, ছাটা ও মু-ন করা নাজায়িয ও হারাম। কাজেই যাদের দাঁড়ী লম্বা রয়েছে তাদেরকে কমপক্ষে এক মুষ্ঠি পরিমাণ দাঁড়ী রাখতেই হবে। কারণ, এক মুষ্ঠি পরিমাণ দাঁড়ী রাখা হচ্ছে ফরযের অন্তর্ভুক্ত। এক মুষ্ঠির নীচে দাঁড়ী কাটলে, ছাটলে বা মু-ন করলে ফরয তরকের গুণাহে গুনাহগার হবে।

উল্লেখ্য, সীরাতগ্রন্থসমূহে উল্লেখ রয়েছে যে, স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দাঁড়ী মুবারক ছিল সীনাপোর, যা প্রকৃতপক্ষে এক মুষ্ঠির বেশি। আর এ পরিমাণ অর্থাৎ সিনাপোর দাঁড়ী রাখাটাই খাছ সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত। অতএব, দাঁড়ী অত্যধিক লম্বা হলে, তা কেটে খাছ সুন্নত তরীক্বা মুতাবিক রাখাই হচ্ছে উত্তম।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ ৩০ থেকে ৩৪তম সংখ্যায় প্রকাশিত ফতওয়া পাঠ করুন।

মুহম্মদ কবির হুসাইন তাবির

দক্ষিণ মুসলিম বাগ, শ্রীমঙ্গল

সুওয়াল: জনৈক মৌলভী ছাহেব বলেন, নীচের দাঁতের মাড়ির নীচে যে চুলগুলো থাকে সেগুলো দাঁড়ী। উপরের মাড়িরগুলো দাঁড়ী নয়। বরং উপরের মাড়িরগুলো কেটে ফেলা জায়িয। মৌলভী ছাহেবের উক্ত বক্তব্যটি কতটুকু সঠিক হয়েছে তা দলীলসহ জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াব: সুওয়ালে উল্লেখিত মৌলভী ছাহিবের বক্তব্য স্পষ্ট হয়নি। কেননা দাঁতের মাড়ির মধ্যে দাঁড়ী বা মোচ উঠেনা। বরং দাঁড়ী ও মোচ উঠে থাকে চামড়ার মধ্যে। কাজেই থুতনীর মধ্যে যে চুল উৎপন্ন হয় সেগুলো হচ্ছে দাঁড়ী। আর নাকের সম্মুখভাগে উপরের মাড়ি বরাবর বাইরের দিকে উঠা চুলকে মোচ বলা হয়। দাঁড়ী কমপক্ষে এক মুষ্ঠি রাখা ফরয। এক মুষ্ঠির নীচে দাঁড়ী কাটা, ছাটা ও মু-ন করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। আর মোচ কেটে বা ছোট করে রাখা  সুন্নত।

মোচ মু-ন করা সম্মানিত সুন্নত মুবারক উনার খিলাফ এবং মাকরূহ তাহরীমীর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি এক মুষ্ঠির নীচে দাঁড়ী কাটে, ছাটে ও মু-ন করে, সে ব্যক্তি ফাসিকের অন্তর্ভুক্ত। ফাসিকের পিছনে নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমী। ফাসিকের পিছনে নামায পড়লে উক্ত নামায দোহারানো ওয়াজিব। দলীল: আলমগীরী, শামী, দুররুল মুখতার, বাহরুর রায়িক ইত্যাদি।

মুহম্মদ ইবনে সাত্তার

মুসলিমবাগ, শ্রীমঙ্গল

সুওয়াল: সুন্নতী চুল রাখার নিয়ম কি? কয় তরীক্বায় সুন্নতী চুল রাখা যায় এবং সকল ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা কি সুন্নতী চুল মুবারক রেখেছেন? দলীল সহকারে জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াব: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হচ্ছেন সকলের জন্য আদর্শ। উনাকেই সকল হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ অনুকরণ করেছেন।

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাধারণত চার তরীক্বায় চুল মুবারক রাখতেন। (এক) জুম্মা অর্থাৎ কানের লতি বরাবর। (দুই) লিম্মা অর্থাৎ কান ও ঘাড়ের মাঝামাঝি (তিন) ওফরা অর্থাৎ ঘারের কিছুটা উপরে। এখানে স্মরনীয় যে, পুরুষের চুল ঘাড় স্পর্শ করা ও ঘাড় অতিক্রম করাটা হারাম। আর মহিলাদের চুল ঘাড়ের উপরে ছোট করে রাখা হারাম। (চার) নিছফু উযনাইহি অর্থাৎ দু কানের মাঝামাঝি করে রাখতেন। এ চার প্রকারই বাবরী চুলের অন্তর্ভুক্ত।

উল্লেখ্য, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হজ্জ ও উমরা ব্যতীত কখনো চুল মু-ন করেননি বা চুল ছোট করে রাখেননি।

কাজেই, হজ্জ ও উমরা ব্যতীত অন্য সময় প্রয়োজন ব্যতিত চুল মু-ন করা বা ছোট করে রাখা সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত নয়। আর হজ্জ  ও উমরা ব্যতীত চুল মু-ন করা অবস্থায় দায়িমীভাবে থাকাটা ৭২টি জাহান্নামী ফিরক্বার মধ্যে অন্যতম খারিজী ফিরক্বার আলামত বা নিদর্শন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ!

দলীলসমূহ: শরহে মিশকাত শরীফ, মিরক্বাত শরীফ, ফতওয়ায়ে আলমগীরী, ফতওয়ায়ে শামী, বুখারী, ফতহুল বারী, উমদাতুল ক্বারী, আইনী ইত্যাদি)

মুহম্মদ রূহুল কুদুস, বগুরা।

ডা. মুহম্মদ আওক্বাত আলী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

সুওয়াল: মুজাদ্দিদে আ’যম সাইয়্যিদুনা মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম তিনি সম্মানিত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত ১০ম খলীফা এবং খলীফাতুল উমাম সাইয়্যিদুনা হযরত শাহযাদা হুযূর ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি ১১তম খলীফা এবং ‘আস সাফফাহ’ লক্বব মুবারক উনার অর্থ, ব্যাখা-বিশ্লেষণ ও মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম তিনিই যে সম্মানিত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত মহান খলীফা ‘হযরত আস সাফফাহ আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম’ এবং উনার মুবারক উছীলায় যে, অবশ্যই অবশ্যই বর্তমান যামানায় সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠিত হবে এ সম্পর্কে দলীল ভিত্তিক বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: :

(পূর্ব প্রকাশিতের পর ২১)

‘সাইয়্যিদুল খুলাফা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা ইমাম খলীফাতুল্লাহ হযরত আস সাফফাহ আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম তিনি বাংলাদেশতো অবশ্যই; এমনকি সারা পৃথিবীতে, সারা কায়িনাতে সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠা করবেনই করবেন ইনশাআল্লাহ।’ সুবহানাল্লাহ :

চতুর্থ প্রমাণ

বর্তমান সয়টা হচ্ছে সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নির্দিষ্ট সময়:

সুতরাং এখান থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, বর্তমান বিশ্বে যত সরকার রয়েছে, যত শাসক রয়েছে- হোক মুসলমানদের দেশে অথবা কাফিরদের দেশে, তারা প্রত্যেকেই চরম অত্যাচারী, যালিম, লুটেরা, স্বৈরাচার, গোমরাহ, পথভ্রষ্ট, বিভ্রান্ত। শুধু তাই নয়, তারা গোমরাহ, পথভ্রষ্ট, বিভ্রান্ততো অবশ্যই, এমন কি তারা জোরপূর্বক সাধারণ লোকদেরকেও গোমরাহ, পথভ্রষ্ট, বিভ্রান্ত করে যাচ্ছে। নাঊযুবিল্লাহ! তাই তারা নিঃসন্দেহে চরম গোমরাহকারী, পথভ্রষ্টকারী, বিভ্রান্তকারীও বটে। আর তাদেরই কারণে আজ পুরো পৃথিবী ফিতনা-ফাসাদ, বেপর্দা-বেহায়া, অত্যাচার-অবিচার, যুুলুম-নির্যাতনে, কুফরী-শিরকী, হারাম-নাজায়িয কার্যকলাপে, বেইনসাফীতে ভরে গেছে। কোথায়ও সম্মানিত ইনসাফ উনার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই।

আর এই কঠিন সময়েই দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের মধ্য থেকে উনার একজন আখাচ্ছুল খাছ আওলাদ এবং সম্মানিত কুরআন শরীফ, সম্মানিত হাদীছ শরীফ এবং পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব মুবারক উনাদের মধ্যে বর্ণিত ১২ জন মহান খলীফা আলাইহিমুস সালাম উনাদের মধ্য থেকে ১০ম খলীফা পবিত্র রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা ইমাম খলীফাতুল্লাহ ‘হযরত আস সাফফাহ আলাইহিস সালাম’। (সুবহানাল্লাহ)

কাজেই উনার মুবারক উছীলায় বর্তমান যামানায় অতিশীঘ্রই এদেশে, সারা পৃথিবীতে, সারা কায়িনাতে সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠিত হবেই হবে ইনশাআল্লাহ। এখানে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কেননা এটা বিশুদ্ধ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা সকলেরই জানা রয়েছে যে, বিশুদ্ধ সম্মানিত হাদীছ শরীফ দ্বারা ফায়সালাকৃত কোন বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করলে, কোন চূ-চেরা, ক্বিল-ক্বাল করলে কস্মিনকালেও ঈমাদার থাকা যায় না; বরং ঈমান হারা হয়ে কাফির হয়ে যেতে হয়। কাজেই কেউ যদি মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা ইমাম খলীফাতুল্লাহ হযরত আস সাফফাহ আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম তিনি যে, অতিশীঘ্রই এদেশে, সারা পৃথিবীতে, সারা কায়িনাতে সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠা করবেন- এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করে, কোন প্রকার চূ-চেরা ক্বিল-ক্বাল করে তাহলে সে সম্মানিত বিশুদ্ধ হাদীছ শরীফ উনাদের বিরোধীতা করার শামিল হবে। (না‘ঊযুবিল্লাহ)

 তার পাশাপাশি এই বিষয়টিও অতি সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, ১২তম খলীফা হযরত ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম তিনি কস্মিনকালেও আলোচ্য হাদীছ শরীফ মুবারক উনার মধ্যে বর্ণিত মহান খলীফা আলাইহিস সালাম নন। কেননা তিনি যখন খলীফা হিসেবে প্রকাশ পাবেন তারপূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত দুনিয়ার যমীনে সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক থাকবে এবং খলীফাও থাকবেন। যেটা বিশুদ্ধ হাদীছ শরীফ মুবারক উনার দ্বারা প্রমাণিত। যেই সম্মানিত বিশুদ্ধ হাদীছ শরীফগুলো আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি। অথচ আলোচ্য সম্মানিত হাদীছ শরীফ মুবারক উনার মধ্যে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে-

 وَبَعْدَ الْـجَـبَابِرَة ِ يـَخْرُجُ رَجُلٌ مِّنْ اَهْلِ بَـيْتـِىْ يَـمْلَاُ الْاَرْضَ عَدْلًا

“চরম অত্যাচারী, চরম স্বৈরাচারী, চরম নাফরমান, চরম উদ্ধত, চরম গোমরাহ, চরম পথভ্রষ্ট, চরম বিভ্রান্ত, চরম পথভ্রষ্টকারী, চরম বিভ্রান্তকর শাসকদের শাসন ব্যবস্থা তথা জোর জবরদস্তিমূলক শাসনব্যবস্থা, যুলুমতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পর আমার হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের মধ্য থেকে আমার একজন খাছ আওলাদ, একজন মহান খলীফা আলাইহিস সালাম তিনি দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নিবেন। তিনি দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নিয়ে পুরো পৃথিবী, সারা কায়িনাত সম্মানিত ইনসাফ মুবারক দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিবেন তথা সারা বিশ্বে, সারা কায়িনাতে সম্মানিত খিলাফত আ’লা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠিা করবেন।” সুবহানাল্লাহ!

সুতরাং এই কথা দিবালোকের ন্যায় অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, আলোচ্য সম্মানিত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত মহান খলীফা আলাইহিস সালামই হচ্ছেন সাইয়্যিদুল খুলাফা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা ইমাম হযরত আস সাফফাহ আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম তিনি। হযরত ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম তিনি কস্মিনকালেও আলোচ্য হাদীছ শরীফ মুবারক উনার মধ্যে বর্ণিত মহান খলীফা আলাইহিস সালাম নন। (সুবহানাল্লাহ)

 অতএব এই বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল খুলাফা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা ইমাম খলীফাতুল্লাহ হযরত আস সাফ্ফাহ আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম উনার মুবারক উছীলায় বর্তমান যামানায় সারা পৃথিবীতে, সারা কায়িনাতে অবশ্যই অবশ্যই সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠিত হবেই হবে ইনশাআল্লাহ।

মুহম্মদ এনামুল কবীর

নরসিংদী

সুওয়াল : আজকাল দেখা যায়, আমাদের দেশসহ বিভিন্ন দেশে নববর্ষ পালন করা এবং এ উপলক্ষে ভালো খাওয়া-পরার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়। এটা কতটুকু শরীয়তসম্মত?

জাওয়াব : পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার দৃষ্টিতে নওরোজ বা যে কোন নববর্ষ পালন করা হারাম ও বিদয়াত।”

কাজেই, নববর্ষ সেটা বাংলা হোক, ইংরেজি হোক, আরবী হোক ইত্যাদি সবই ইহুদী-নাছারা,  বৌদ্ধ, মজুসী-মুশরিকদের তর্জ-তরীক্বা; যা পালন করা থেকে বিরত থাকা সকল মুসলমানের জন্য ফরয-ওয়াজিব।

উল্লেখ্য, সাধারণভাবে প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিল এবং এ ধারাবাহিকতা এখনও পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উৎসব পালিত হয়। ইরান থেকেই এটা একটি সাধারণ সংস্কৃতির ধারা বেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে।

তাছাড়া বাংলা পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উপলক্ষে শহরে ও গ্রামে যে ভোজ, মেলা উৎসব হয় তাও ইরানের নওরোজ হতে পরোক্ষভাবে এদেশে এসেছে। মোঘল পূর্ববর্তী আমলে এদেশে নওরোজ বা নববর্ষ পালনের রীতি প্রচলিত ছিল না।

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ পালনের সংস্কৃতি হিন্দুদের থেকে এসেছে। তবে কথিত বাংলা সন প্রকৃতপক্ষে ফসলী সন বা পহেলা বৈশাখ বাঙালি দ্বারা প্রবর্তিত নয়। বাদশাহ আকবর ফসলী সন হিসেবে এর প্রবর্তন করে। আর বাদশাহ আকবর ছিল মঙ্গলীয় এবং ফারসী ভাষী। তাহলে এটা কি করে বাঙালি সংস্কৃতি হতে পারে? কাজেই বাঙালিদের জন্য এটা অনুসরণীয় নয়। আর মুসলমানদের জন্য তো এটা অনুসরণ করার প্রশ্নই আসেনা।

হযরত ইমাম আবু হাফস্ কবীর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “নওরোজ বা নববর্ষ উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে তার ৫০ বৎসরের আমল থাকলেও তা বরবাদ হয়ে যাবে।” অর্থাৎ নওরোজ বা নববর্ষ পালনের কারণে তার জিন্দেগীর সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে।

বিশেষত বাংলা নববর্ষ হিন্দুদের খাছ ধর্মীয় উৎসবের দিন। এর আগের দিন তাদের চৈত্র সংক্রান্তি। আর পহেলা বৈশাখ হলো ঘট পূজার দিন।

কাজেই, মুসলমানদের জন্য বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন নববর্ষ পালন করার অর্থ হচ্ছে বিজাতি ও বিধর্মীদের সাথেই মিল রাখা। তাদেরই অনুসরণ অনুকরণ করা। নাঊযুবিল্লাহ!

অথচ পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ان شر الدواب عند الله الذين كفروا فهم لا يؤمنون

অর্থ  : “নিশ্চয়ই সমস্ত প্রাণীর মাঝে মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কাফিররাই নিকৃষ্ট, যারা ঈমান আনেনি।” (সূরা আনফাল : আয়াত শরীফ ৫৫)

অন্যত্র ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ولا تطع الكافرين والـمنافقين

অর্থ : কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ কর না। (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن عمرو بن شعيب عن ابيه عن جده ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ليس منا من تشبه بغيرنا

অর্থ  :  হযরত আমর ইবনে শুয়াইব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার পিতা থেকে এবং তিনি উনার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “ওই ব্যক্তি আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে বিজাতীয়দের সাথে সাদৃশ্য রাখে।” (মিশকাত শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরও ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت عبد الله بن عمر رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من تشبه بقوم فهو منهم

অর্থ  :  “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভুক্ত অর্থাৎ তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (সুনানে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ)

অতএব, পহেলা বৈশাখ, পহেলা জানুয়ারি, পহেলা মুহররম ইত্যাদি নববর্ষ পালন করার জন্য উৎসাহিত করা এবং সাথে সাথে ভাল খাওয়া-পড়ার জন্যও উৎসাহিত করা কাট্টা হারাম ও কুফরী যা থেকে বিরত থাকা ও বেঁচে থাকা সকল মুসলমানের জন্য ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত।

মুহম্মদ আমীর হুসাইন

কাতার

সুওয়াল :  বছরের মধ্যে কি কোন নির্দিষ্ট দিন আছে, যেদিন ভালো খাওয়া-পরার ব্যাপারে ইসলামী শরীয়ত উনার মধ্যে উৎসাহ দেয়া হয়েছে?

জাওয়াব :  হ্যাঁ, রয়েছে। সে দিনটি হচ্ছে পবিত্র দশই মুহররম শরীফ। এ দিনটিতে প্রত্যেক পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে তার পরিবারের সদস্যদেরকে ভালো খাদ্য খাওয়ানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

من وسع على عياله فى النفقة يوم عاشورا وسع الله عليه سائر سنته

অর্থ : “যে ব্যক্তি তার পরিবারবর্গকে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন অর্থাৎ পবিত্র দশই মুহররম শরীফ-এ ভালো খাদ্য খাওয়াবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে এক বৎসরের জন্য সচ্ছলতা দান করবেন।” সুবহানাল্লাহ! (তবারানী শরীফ, মা-ছাবাতা বিস্সুন্নাহ)

এ প্রসঙ্গে কিতাবে একটি ওয়াকিয়া বর্ণিত রয়েছে। এক ব্যক্তি ছিল গরিব ও আলিম। একবার অসুস্থতার কারণে তিনি তিনদিন যাবৎ কোন কাজ করতে পারলেন না। চতুর্থ দিন ছিল পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন। তিনি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিনে ভালো খাওয়ার ফযীলত সম্পর্কে জানতেন। তখন ছিল কাজীদের (বিচারক) যুগ। এলাকার কাজী ছাহেব ধনী ব্যক্তি ছিল।

গরিব আলিম ব্যক্তি তিনি কাজী ছাহেবের কাছে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার ফযীলতের কথা বলে এবং নিজের অসুস্থতা ও পরিবারের অভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশত ও ২ দিরহাম হাদিয়া অথবা কর্জ হিসেবে চাইলেন। কাজী ছাহেব তাকে যুহরের সময় আসতে বললো। যুহরের সময় কাজী ছাহেব বললো, আছরের সময় আসতে। এরপরে আছরের সময় ইশা এবং ইশার সময় সরাসরি না করে দিল। তখন গরিব আলিম ব্যক্তি বললেন:  হে কাজী ছাহেব! আপনি আমাকে কিছু দিতে পারবেন না সেটা আগেই বলতে পারতেন, আমি অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু তা না করে আমাকে সারাদিন ঘুরিয়ে এই শেষ মুহূর্তে নিষেধ করলেন? কাজী ছাহেব সেই গরিব আলিম ব্যক্তির কথায় কর্তপাত না করে দরজা বন্ধ করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো।

মনের দুঃখে গরিব আলিম ব্যক্তি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। পথে ছিল এক খ্রিস্টানের বাড়ি। একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে কাঁদতে দেখে উক্ত খ্রিস্টান কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু বিধর্মী বিধায় খ্রিস্টানকে প্রথমে তিনি কিছু বলতে চাইলেন না। অতঃপর খ্রিস্টানের অধীর আগ্রহের কারণে তিনি আশূরা শরীফ উনার ফযীলত ও তাঁর বর্তমান অবস্থার কথা ব্যক্ত করলেন। খ্রিস্টান ব্যক্তি তখন উৎসাহী হয়ে আলিম ব্যক্তিকে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশত, ২ দিরহাম এবং অতিরিক্ত আরও ২০ দিরহাম দিল এবং বললো যে, আপনাকে আমি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে প্রতিমাসে এ পরিমাণ হাদিয়া দিব। গরিব আলিম তখন তা নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং খাবার তৈরি করে ছেলে-মেয়েসহ আহার করলেন। অতঃপর দোয়া করলেন, “আয় মহান আল্লাহ পাক! যে ব্যক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করলো, আমার ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি ফোটালো, মহান আল্লাহ পাক! আপনি তার দিল খুশি করে দিন, তাকে সন্তুষ্ট করে দিন।”

ওই রাতে কাজী ছাহেব স্বপ্ন দেখলো, স্বপ্নে কাজী ছাহেবকে বলা হচ্ছে, হে কাজী ছাহেব! তুমি মাথা উত্তোলন কর। মাথা তুলে কাজী ছাহেব দেখতে পেলো যে, তার সামনে দুটি বেহেশ্তী বালাখানা। একটি স্বর্ণের তৈরী আরেকটি রৌপ্যের তৈরী। কাজী ছাহেব বললো, ‘আয় মহান আল্লাহ পাক! এটা কি?’ গায়িবী আওয়াজ হলো, ‘এ বালাখানা দুটি হচ্ছে বেহেশতী বালাখানা। এ বালাখানা দুটি তোমার ছিল। কিন্তু এখন আর তোমার নেই। কারণ তোমার কাছে যে গরিব আলিম লোকটি আশূরা শরীফ উপলক্ষে সাহায্যের জন্য এসেছিলেন তাকে তুমি সাহায্য করনি। এজন্য এ বালাখানা দুটি এখন উমুক খ্রিস্টান লোকের হয়েছে।’ কারণ সে খ্রিস্টান লোকটা আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে গরিব আলিমকে সাহায্য করেছে। অতঃপর কাজী ছাহেবের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম থেকে উঠে ওযু ও নামায আদায় করে সেই খ্রিস্টানের বাড়িতে গেলো। খ্রিস্টান কাজী ছাহেবকে দেখে বিস্ময়াভূত হলো। কারণ কাজী ছাহেব খ্রিস্টানের পড়শি বা প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত কোন সময় তার বাড়িতে আসতে দেখেনি।

অতঃপর খ্রিস্টান ব্যক্তি কাজী ছাহেবকে বললো, ‘আপনি এত সকালে কি জন্য এলেন?’ কাজী ছাহেব বললো, ‘হে খ্রিস্টান ব্যক্তি! তুমি গত রাতে যে নেক কাজ করেছ সেটা আমার কাছে এক লাখ দেরহামের বিনিময় বিক্রি করে দাও।’ খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, ‘হে কাজী সাহেব! আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমি বুঝতে পারছি না। আপনি স্পষ্ট করে বলুন।’ তখন কাজী সাহেব তার স্বপ্নের কথা জানালো এবং বললো, ‘তুমি নিশ্চয়ই সেই গরিব আলিম লোকটিকে সাহায্য করেছ।’ তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি তা স্বীকার করলো। কাজী ছাহেব বললো যে, ‘তুমি তো খ্রিস্টান, তুমি তো এই বালাখানা পাবেনা। তোমার এটা নিয়ে কি ফায়দা হবে? তুমি তোমার এই নেক কাজ এক লাখ দিরহামের বিনিময়ে আমার নিকট বিক্রি করে দাও এবং তুমি তার কাছে প্রত্যেক মাসে যে ওয়াদা করেছ আমি তাকে তা দিয়ে দিব।’ খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, ‘হে কাজী ছাহেব! আমি যদি মুসলমান হয়ে যাই তাহলে কি সেই বালাখানা পাবো?’ তখন কাজী ছাহেব বললো:  ‘হ্যাঁ, তুমি যদি মুসলমান হও তবে বালাখানা পাবে।’ তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, ‘হে কাজী ছাহেব! আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি পবিত্র কালিমা শরীফ পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম।’ অতঃপর সত্যি সে খ্রিস্টান ব্যক্তি মুসলমান হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ!

অতএব এটা ফিকিরের বিষয় যে, পবিত্র মুহররম শরীফ মাস তথা পবিত্র আশূরা শরীফ উনাকে সম্মান করার কারণে মহান আল্লাহ পাক তিনি খ্রিস্টান ব্যক্তিকে ঈমান দিয়ে দিলেন। এমনকি জান্নাত নছীব করলেন। সুবহানাল্লাহ!

মুহম্মদ রেজাউল করীম

মুহম্মদপুর, ঢাকা

সুওয়াল : পবিত্র মুহররম শরীফ মাসের ফযীলত ও আমলসমূহ দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : পবিত্র মুহররম শরীফ মাসটি অতিশয় ফযীলতপূর্ণ। এ মাসটি রহমত, বরকত, সাকীনা ও মাগফিরাত উনাদের দ্বারা সমৃদ্ধ। আরবী ১২টি মাসের মধ্যে হারাম বা পবিত্র মাস হলো ৪টি। তার মধ্যে পবিত্র মুহররম শরীফ মাস হলো অন্যতম। যেমন, এ প্রসঙ্গে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ان عدة الشهور عند الله اثنا عشر شهرا فى كتب الله يوم خلق السموت والارض منها اربعة حرم ذلك الدين القيم فلا تظلموا فيهن انفسكم.

অর্থ :  “নিশ্চয়ই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট উনার কিতাবে আসমান-যমীনের সৃষ্টির শুরু থেকে গণনা হিসেবে মাসের সংখ্যা বারটি। তন্মধ্যে চারটি হচ্ছে হারাম বা পবিত্র মাস। এটা সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম বা অবিচার করনা।” (পবিত্র সূরা তওবা শরীফ  : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৬)

এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

ثلاثة متواليات ذو القعدة وذو الـحجة والـمحرم ورجب مضر الذى بين جمادى وشعبان.

অর্থ : “হারাম মাসসমূহ উনাদের মধ্যে তিনটি হলো ধারাবাহিক অর্থাৎ পরস্পর মিলিত। তা হলো- পবিত্র যিলক্বদ শরীফ, পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ ও পবিত্র মুহররম শরীফ। আর চতুর্থটি হলো মুদ্বার গোত্রের পবিত্র রজব শরীফ মাস; যা পবিত্র জুমাদাল উখরা শরীফ ও পবিত্র শা’বান শরীফ মাসের মাঝখানে অবস্থিত।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ, মুসনাদে আহমদ, শুয়াবুল ঈমান)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اكرموا الـمحرم من اكرم الـمحرم اكرمه الله بالـجنة ونجاه من النار

অর্থ : “তোমরা পবিত্র মুহররম শরীফ মাসকে সম্মান কর। যে ব্যক্তি পবিত্র মুহররম শরীফ মাসক উনাকে সম্মান করবে, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে জান্নাত দিয়ে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ দিয়ে সম্মানিত করবেন।” সুবহানাল্লাহ!

স্মরণযোগ্য যে, পবিত্র মুহররম শরীফ মাসের উল্লেখযোগ্য ও শ্রেষ্ঠতম দিন হচ্ছে ১০ই মুহররম শরীফ ‘আশূরা’র দিনটি। এ দিনটি বিশ্বব্যাপী এক আলোচিত দিন। সৃষ্টির সূচনা হয় এ দিনে এবং সৃষ্টির সমাপ্তিও ঘটবে এ দিনে। বিশেষ বিশেষ সৃষ্টি এ দিনেই করা হয় এবং বিশেষ বিশেষ ঘটনাও এ দিনেই সংঘটিত হয়।

বর্ণিত রয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে শুরু করে সাইয়্যিদুনা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত প্রায় সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কোন না কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা এ দিনে সংঘটিত হয়েছে। সঙ্গতকারণে এ দিনটি আমাদের সবার জন্যে এক মহান আনুষ্ঠানিকতার দিন, যা রহমত, বরকত, সাকীনা, মাগফিরাত উনাদের হাছিল করার দিন। ফলে এ দিনে বেশ কিছু আমল করার ব্যাপারে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন-

১। পবিত্র আশূরা শরীফ উপলক্ষে দু’দিন রোযা রাখা : পবিত্র আশূরা শরীফ উপলক্ষে দু’দিন রোযা রাখা সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم افضل الصيام بعد رمضان شهر الله الـمحرم.

অর্থ : হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “পবিত্র রমাদ্বান শরীফ উনার ফরয রোযার পর উত্তম রোযা হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার মাস পবিত্র মুহররম শরীফ উনার রোযা।” (মুসলিম শরীফ)

عن حضرت ابى قتادة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم صيام يوم عاشوراء احتسب على الله ان يكفر السنة التى قبله.

অর্থ : হযরত আবূ কাতাদাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “পবিত্র আশূরা শরীফ উনার রোযা পালনে আমি মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে আশা করি যে, তিনি (উম্মতের) বিগত বছরের গুনাহখতা ক্ষমা করে দিবেন।” (মুসলিম শরীফ)

عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم صوموا التاسع والعاشر وخالفوا فيه اليهود.

অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমরা ৯ ও ১০ই মুহররম শরীফ রোযা রেখে ইহুদীদের খিলাফ তথা বিপরীত আমল কর।” (তিরমিযী শরীফ)

২। রোযাদারদেরকে ইফতার করানো : রোযাদারদেরকে ইফতার করানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

من فطر فيه صائما فكانـما افطر عنده جميع امة (سيدنا حبيبنا شفيعنا مولانا) محمد صلى الله عليه وسلم

অর্থ : “পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে, তিনি যেন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সমস্ত উম্মতকে ইফতার করালো।” সুবহানাল্লাহ!

৩। পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়ানো : পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়ানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت عبد الله بن مسعود رضى الله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من وسع على عياله فى النفقة يوم عاشوراء وسع الله عليه سائر سنته

অর্থ : “যে ব্যক্তি আশূরা শরীফ উনার দিন তার পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়াবে-পরাবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি সারা বৎসর ওই ব্যক্তিকে সচ্ছলতা দান করবেন।” (তবারানী শরীফ, শুয়াবুল ঈমান, মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ, মুমিন কে মাহে ওয়া সাল ইত্যাদি)

৪ ও ৫। গরিবদের পানাহার করানো ও ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানো : গরিবদের পানাহার করানো ও ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

من مسح فيه على رأس يتيم واطعم جائعا وسقى شربة من ماء اطعم الله من موائد الجنة وسقاه الله تعالى من الرحيق السلسبيل

অর্থ  :  “পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন কোন মুসলমান যদি কোন ইয়াতীমের মাথায় হাত স্পর্শ করে, কোন ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়ায় এবং কোন পিপাসার্তকে পানি পান করায় তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে জান্নাত উনার দস্তরখানায় খাদ্য খাওয়াবেন এবং ‘সালসাবীল’ ঝর্ণা থেকে পানীয় (শরবত) পান করাবেন।”

৬। চোখে (ইছমিদ) সুরমা দেয়া : চোখে সুরমা দেয়া সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

من اكتحل يوم عاشوراء بكحل فيه مسك لـم يشك عينه الى قبيل من ذلك اليوم.

অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন মিশক মিশ্রিত সুরমা চোখে দিবে, সেদিন হতে পরবর্তী এক বৎসর তার চোখে কোন প্রকার রোগ হবেনা।” (মাক্বাছিদে হাসানা, শুয়াবুল ঈমান, দায়লামী, মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ্)

৭। গোসল করা : পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিনে গোসল করা সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

من اغتسل فيه عفى ولـم يـمرض الا مرض الـموت وامن من الكسل والتعليل

অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন গোসল করবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দান করবেন। মৃত্যু ব্যতীত তার কোন কঠিন রোগ হবেনা এবং সে অলসতা ও দুঃখ-কষ্ট হতে নিরাপদ থাকবে।”

অতএব, পবিত্র মুহররমুল হারাম মাস এবং উনার মধ্যস্থিত পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিনের ফাযায়িল-ফযীলত ও আমল উনাদের সম্পর্কে জেনে সে মুতাবিক আমল করে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি হাছিল করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর দায়িত্ব-কর্তব্য।

মুহম্মদ মিজানুর রহমান

সদর, চাঁদপুর

সুওয়াল: ছারছিনা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক পত্রিকা ৬০ বর্ষ ১লা সংখ্যা ১৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!

মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং উনার সম্মানিতা আহলিয়া হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনাদের শান মুবারকে উপরোক্ত বক্তব্য উল্লেখ করাটা কি শুদ্ধ হয়েছে?

জাওয়াব: পাক্ষিক পত্রিকায় প্রকাশিত উক্ত আর্টিকেলের বক্তব্যটি আদৌ শুদ্ধ হয়নি। বরং সম্পূর্ণ ভুল ও কাট্টা কুফরী হয়েছে। এ ধরণের বক্তব্য ও আক্বীদা থেকে তওবা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয।

হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা পরস্পর হচ্ছেন মানবজাতির আদি পিতা ও মাতা আলাইহিমাস সালাম। শুধু তাই নয়, উনারা উভয়ে হচ্ছেন কুল মাখলূক্বাতের নবী ও রসূল, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়া মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত আদি পিতা ও আদি মাতা আলাইহিমাস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ! উনারা উভয়েই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত সৃষ্টি, মনোনীত বান্দা ও মনোনীত বান্দী।

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ان الله اصطفى ادم ونوحا وال ابراهيم وال عمران على العالـمين

অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনাকে এবং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার বংশধর উনাদেরকে ও হযরত ইমরান আলাইহিস সালাম উনার বংশধর উনাদেরকে তামাম আলমের বুকে মনোনীত করেছেন। (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৩)

অর্থাৎ  হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত ও সম্মানিত নবী ও রসূল আলাইহিস সালাম এবং মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত খলীফা বা প্রতিনিধি আলাইহিস সালাম। তিনি এমন মনোনীতভাবে সৃষ্টি যে মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে স্বীয় কুদরতী হাত মুবারক দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং উনার মধ্যে রূহ মুবারক ফুঁকে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! শুধু তাই নয় উনাকে সৃষ্টি করার পর উনার সম্মানার্থে এবং উনার সম্মান ও মর্যাদা বহিপ্রকাশার্থে উনাকে সিজদা করার জন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি লক্ষ লক্ষ বছর যাবৎ ইবাদত গোযার এবং তাসবীহ-তাহলীল পাঠে মশগুল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে এবং উনাদের রসূল আলাইহিমুস সালামসহ উনাদের সকলকে আদেশ মুবারক করেছিলেন। সুবহানাল্লাহ!

সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হযরত আদম আলাইহি সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার কিরূপ বেমেছাল মর্যাদা সম্পন্ন মনোনীত নবী, রসূল ও খলীফা বা প্রতিনিধি। আর উনারই সম্মানে সম্মানিত হচ্ছেন উনার মহিয়সী আহলিয়া হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম। উনাকেও মহান আল্লাহ পাক তিনি বেমেছাল বুযুর্গী, সম্মান দিয়ে এবং জান্নাতবাসিনী  ৭০ জন সম্মানিতা হুর উনাদের খুবছূরত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, এরূপ বেমেছাল মর্যাদাসম্পন্ন, মনোনীত, শ্রেষ্ঠতম বান্দা ও বান্দী হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং উনার আহলিয়া হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম উনাদের সম্পর্কে কি করে এ কথা বলা যেতে পারে যে, উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!

যেকোন মুসলমান ব্যক্তি সে তার মুসলমান পিতা-মাতা সম্পর্কে উক্তরূপ কথা বলতে পারে না। যদি তাই হয় তাহলে যাঁরা শুধু মুসলমানদেরই পিতা-মাতা নন বরং হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্মানিত পিতা ও মাতা আলাইহিমাস সালাম উনাদের সম্পর্কে কি করে উক্ত বক্তব্য ও লিখনী প্রকাশ করা যেতে পারে। পবিত্র দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে ইলমহীন, আক্বলহীন, সমঝহীন, গ-মূর্খ, জাহিল, নাদান ও নির্বোধ ব্যক্তির পক্ষেই কেবল উক্তরূপ কুফরী বক্তব্য ও লেখনী প্রকাশ করা সম্ভব। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!

স্মরণীয় যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কেউই মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশ-নিষেধ মুবারকের খিলাফ বা বিপরীত কোন কাজ কখনো করেননি। এটাই হচ্ছে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা তথা সকল মু’মিন-মুসলমানদের আক্বীদা। এর বিপরীত আক্বীদাই হচ্ছে ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফেরকার আক্বীদা। কাজেই, মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত নবী ও রসূল হযরত আবুল বাশার আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার ওহী মুবারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উনার পরিপূর্ণ অনুগত, ফরমাবরদার, আজ্ঞাবহ, আদেশ-নিষেধ মুবারক পালনকারী। কাজেই, তিনি কখনো মহান আল্লাহ পাক উনার কোন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেননি এবং তিনি কোন নাফরমানীও করেননি।

হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি যদি মহান পাক উনার কোন আদেশ কিংবা নিষেধ অমান্য করে থাকেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নাফরমান হয়ে থাকেন তাহলে হযরত নবী ও রসূল হিসেবে উনাদের খুছূছিয়াত বা বৈশিষ্ট্য মুবারক থাকলো কোথায়! পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে কোথাও কি উল্লেখ আছে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং হযরত হওওয়া আলাইহাস সালাম উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন? আদৌ নেই। মনে রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার প্রতি উক্ত মিথ্যা তোহমত দেয়ার পরিণাম নিঃসন্দেহে কাট্টা কুফরী এবং কাফির ও জাহান্নামী হওয়ার এক বিশেষ কারণ।

উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের অর্থ বর্ণনায় সবখানে লুগাতী বা অভিধানগত অর্থ প্রযোজ্য ও গ্রহণযোগ্য নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষে লুগাতী অর্থ পরিহার করে তাফছীলী বা তা’বীলী অর্থ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় অর্থ শুদ্ধ হবে না। বিশেষ করে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার সম্পর্কে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্পর্কে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত হযরত আব্বা ও হযরত আম্মা আলাইহিমাস সালাম উনাদের সম্পর্কে, হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সম্পর্কে, হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের সম্পর্কে এমন অর্থ গ্রহণ করা যাবে না, যে অর্থ গ্রহণ করলে উনাদের শান-মান, মর্যাদা-মর্তবা, বুযুর্গী সম্মানের খিলাফ হয়। উদাহরণস্বরূপ পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ উনার ৪৫নং আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার শান মুবারকে مكر শব্দ মুবারক উনার লুগাতী বা আভিধানিক অর্থ “ধোকাবাজি প্রতারণা বা ষড়যন্ত্র” গ্রহণ না করে ‘হিকমত বা কৌশল’ গ্রহণ করতে হবে। একইভাবে উপরে বর্ণিত সকল মনোনীত ও সম্মানিত বান্দা-বান্দী উনাদের শান মুবারক সম্মত অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হবে।

মূলতঃ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের মর্যাদা বা শান মুবারক বিরোধী কথা-বার্তা যারা বলে থাকে বা লিখে থাকে তারা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ এবং পবিত্র আক্বায়িদ শরীফ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই তা বলে থাকে। যেমন কেউ বলে থাকে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি গন্ধম খেয়ে ভুল করেছিলেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! আবার কেউ বলে থাকে যে, তিনি গন্ধম খেয়ে একটা গুণাহ করেছিলেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! আবার অত্র সুওয়ালে বলা হয়েছে যে, তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিষেধাজ্ঞা না মেনে নাফরমান হয়ে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!

প্রকৃতপক্ষে হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার শান মুবারক বিরোধী উল্লেখিত বক্তব্যসমূহের একটিও সঠিক নয়।

কেননা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وما ارسلنا من قبلك من رسول الا نوحى اليه

অর্থ: আমি আপনার (নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্বে প্রত্যেক রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি ওহী মুবারক প্রেরণ করেছি। (পবিত্র সূরা আম্বিয়া শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২৫)

অর্থাৎ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের যাবতীয় কার্যাবলী সম্মানিত ওহী মুবারক দ্বারা তথা মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে পরিচালিত হতো। যার পরিপ্রেক্ষিতে আক্বায়িদ শাস্ত্রের সমস্ত কিতাবে উল্লেখ রয়েছে-

الانبياء عليهم السلام كلهم معصومون

অর্থ: হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই মা’ছূম বা নিস্পাপ। সুবহানাল্লাহ! (শরহে আক্বায়িদে নাসাফী, তাকমীলুল ঈমান ইত্যাদি)

আরো উল্লেখ রয়েছে-

الانبياء عليهم السلام كلهم منزهون عن الصغائر والكبائر والكفر والقبائح

অর্থ: হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই ছগীরা, কবীরা, কুফর-শিরক এবং অপছন্দনীয় কাজ থেকেও পবিত্র। সুবহানাল্লাহ! (আল ফিক্বহুল আকবর)

কাজেই, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে পবিত্র আক্বায়িদ শাস্ত্র অনুযায়ী হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি আক্বীদা পোষন করতে হবে। অন্যথায় কারো পক্ষে মু’মিন-মুসলমান থাকা সম্ভব হবে না।

যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ কিতাব মুসলিম শরীফ ও মিশকাত শরীফ ইত্যাদি কিতাবসমূহের মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ গ্রহনের পর হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সাথে সাক্ষাৎ মুবারক হলো। তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার যথাযথ প্রশংসা করে বললেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে সৃষ্টি করে জান্নাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অতঃপর আপনিই মানব জাতিকে যমীনে নিয়ে আসার কারণ ঘটিয়েছেন। উত্তরে হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি এটা কিভাবে জানলেন? বললেন, তাওরাত শরীফ-এ পেয়েছি। হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে সৃষ্টির কতকাল পূর্বে তাওরাত শরীফ লিপিবদ্ধ করেছেন তা আপনি জানেন? হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম তিনি বললেন, চল্লিশ বৎসর পূর্বে। তখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, যে বিষয়টি আমাকে সৃষ্টির চল্লিশ বৎসর পূর্বে মহান আল্লাহ পাক তিনি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন সে বিষয়টি সম্পর্কে কেন আমার কাছে জানতে চাচ্ছেন? অতঃপর নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার উপর জয়ী হলেন। সুবহানাল্লাহ!

স্মরণযোগ্য যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম উনাদের স্বপ্ন মুবারকও যেখানে ওহী মুবারকের অন্তর্ভুক্ত সেখানে উনাদের জাগ্রত অবস্থার বিষয়গুলো কি ওহী মুবারকের বাইরে ছিল? কখনই নয়। যদি তাই হয় তাহলে ওহী মুবারকের ফায়সালাকৃত বিষয়ের জন্য উনাদেরকে দোষারোপ করা কি করে শুদ্ধ হতে পারে?

কাজেই, উনাদের সাথে যদি ভুল বা গুনাহর বিষয়টি সম্পৃক্ত করা হয় তাহলে একইসাথে এটাও সম্পৃক্ত হয়ে যায় যে, মহান আল্লাহ পাক তিনিই ওহী মুবারক নাযিলে ভুল করেছেন এবং তিনিই উনাদেরকে গুনাহ করিয়েছেন। নাঊযুবিল্লাহ! নাঊযুবিল্লাহ! নাঊযুবিল্লাহ! যা চিন্তা-কল্পনা করাও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

অনুরূপ অন্যান্য হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ঘটনাও। মানুষ সঠিক ইতিহাস না জানার কারণে এবং পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সঠিক ব্যাখ্যা না বুঝার কারণে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকে বেয়াদবিমূলক কুফরী কথা-বার্তা বলে থাকে। নাউযুবিল্লাহ!

হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে কতটুকু আদব রক্ষা করতে হবে, সে প্রসঙ্গে কিতাবে ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত তরীকত হযরত ইমাম সাররি সাকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ঘটনা উল্লেখ করা হয়, যিনি উনার যামানায় মহান আল্লাহ পাক উনার লক্ষ্যস্থল ওলীআল্লাহ ছিলেন। যিনি ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত তরীক্বত ছিলেন। তিনি একবার স্বপ্নে মহান আল্লাহ পাক উনার নবী হযরত ইয়া’কুব আলাইহিস সালাম উনাকে দেখেন। দেখে তিনি পরিপূর্ণ আদবের সাথে জানতে চেয়েছিলেন, হে মহান আল্লাহ পাক উনার নবী হযরত ইয়া’কুব আলাইহিস সালাম! আমরা বিশ্বাস করি আপনার অন্তরে মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত পরিপূর্ণভাবেই রয়েছে তা সত্বেও আপনি আপনার ছেলে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনার জুদায়ীর (বিচ্ছেদের) কারণে উনার মুহব্বতে চল্লিশ বছর যাবৎ কেঁঁদে কেঁদে আপনার চক্ষু মুবারক নষ্ট করেছিলেন তার হাক্বীক্বত কি? একথা বলার সাথে সাথে গইব থেকে নেদা (আওয়াজ) হলো, “হে সাররি সাকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি! হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারক অনুযায়ী কথা বলুন।” এরপর হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনাকে উনার সামনে পেশ করা হলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান এবং এভাবে একাধারা তের দিন তের রাত বেহুঁশ থাকার পর হুঁশ ফিরে পান। তখন গইব থেকে পুনরায় নেদা হয়, “মহান আল্লাহ পাক উনার হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকে এরূপ কথা বললে এরূপই অবস্থা হয়ে থাকে।” (তাযকিরাতুল আউলিয়া)

উপরোক্ত ওয়াকিয়ার দ্বারা প্রতিভাত হয় যে, হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্পর্কে কি পরিমাণ আদবের সাথে কথা বলতে হবে এবং উনাদের সাথে বেয়াদবির কি পরিণতি? সত্যিই তা চিন্তা-ফিকিরের বিষয়। বেয়াদব সম্পর্কে হযরত জালালুদ্দীন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

بے ادب محروم گشت از لطف رب.

অর্থ: “বেয়াদব মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত থেকে বঞ্চিত।” (মসনবী শরীফ)

উল্লেখ্য যে, হযরত ইমাম সাররি সাকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত তরীক্বত ও মহান আল্লাহ পাক উনার লক্ষ্যস্থল ওলী হওয়া সত্বেও উনার প্রতি সতর্কবাণী ও সাবধানবাণী উচ্চারিত হয়েছে। উনার ওয়াকিয়া বা ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি কি পরিমাণ আদব রক্ষা করা উচিত।

মূলতঃ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ভুল করা তো দূরের কথা, কোন প্রকার অপছন্দনীয় কাজও উনারা করতেন না। বরং সর্বপ্রকার অপছন্দনীয় কাজ থেকেও উনারা বেঁচে থাকতেন বা পবিত্র থাকতেন, সে প্রসঙ্গে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র  সীরত মুবারক থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়- “একবার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হুজরা শরীফে বসা ছিলেন। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লাম উনার সাথে সাক্ষাত মুবারক করার অনুমতি চাইলেন। এ সংবাদ উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট পৌঁছালেন। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, সে ব্যক্তিকে অপেক্ষা করতে বলুন। একথা বলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পাগড়ী মুবারক, জামা বা কোর্তা মুবারক ইত্যাদি গুছগাছ করে নিলেন। এমনকি হুজরা শরীফ থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে পানির গামলাতে নিজের চেহারা মুবারক দেখে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তা দেখে সে সময় উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনিও কি এরূপ করেন? তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “কিরূপ করি?” উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, “এরূপ পরিপাটি।” এর জাওয়াবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমরা মহান আল্লাহ পাক উনার নবী। আমাদের কোন কাজ কারো অপছন্দ হলে, সে ঈমান হারা হয়ে যাবে।” (আল্ মুরশিদুল আমীন)

অতএব, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা যে কতটুকু অপছন্দনীয় কাজ থেকে বেঁচে থাকতেন, এ হাদীছ শরীফ উনার বর্ণিত ঘটনা তারই প্রমাণ। তাহলে কি করে এ কথা বলা যেতে পারে বা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে যে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা ভুল-ত্রুটি বা নাফরমানী করেছিলেন? বস্তুতঃ এরূপ আক্বীদা পোষণ করা সম্পূর্ণই হারাম ও কাট্টা কুফরী।

কাজেই, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকের খিলাফ কোন অর্থ গ্রহণ করা যাবেনা বরং এমন অর্থ ব্যবহার বা গ্রহণ করতে হবে, যাতে উনাদের শান মুবারক সমুন্নত থাকে।

যেমন পবিত্র সূরা আনআম ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তরজমা বর্ণনায় অনেকে মূর্তিপূজক আযর নামক ব্যক্তিটিকে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা বলে উল্লেখ করে থাকে। নাউযুবিল্লাহ! যা সম্পূর্ণরূপে ভুল ও কুফরী। কেননা তা মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম এবং সর্বোপরি সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের পবিত্রতম শান বা মর্যাদা মুবারক উনার প্রকাশ্য বিরোধী।

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وتقلبك فى الساجدين

অর্থ : মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে (নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে) সিজদাকারীগণ উনাদের মধ্যে স্থানান্তরিত করেছেন। (পবিত্র সূরা শুআরা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২১৯)

এ পবিত্র আয়াতে কারীমা দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্ব পুরুষ আলাইহিমুস সালাম এবং পূর্ব মহিলা আলাইহিন্নাস সালাম উনারা সকলেই পরিপূর্ণ ঈমানদার ও দ্বীনদার ছিলেন। শুধু এতটুকুই নয় বরং উনারা অনেকেই হযরত রসূল ও হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম ছিলেন। আর বাকী উনারা উনাদের যামানার লক্ষস্থল ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বা ছিলেন। সুবহানাল্লাহ! উনাদের কেউই কাফির মুশরিক ছিলেন না।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لـم ازل انقل من اصلاب الطاهرين الى ارحام الطاهرات

অর্থ : আমি সর্বদা পূতঃপবিত্র পুরুষ  ও মহিলা উনাদের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছি। (তাফসীরে কবীর)

এছাড়া আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা হচ্ছে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কারো পিতা ও মাতা উনারা কেউই কাফির-মুশরিক ছিলেন না। তাহলে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্ব পিতা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা তিনি কি করে মূর্তিপূজক তথা মুশরিক হতে পারেন!

অতএব বলার অপেক্ষা রাখেনা, উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে আযর নামক ব্যক্তিটি আসলে উনার পিতা ছিলো না; বরং উনার চাচা ছিল। সুতরাং উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ابيه  অর্থ উনার পিতা নয় বরং উনার চাচা। আর উনার পিতা হচ্ছেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম।

অনুরূপভাবে সূরা ত্ব-হা শরীফ উনার ১২১নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার শেষাংশে

وعصى ادم ربه فغوى

উনার তরজমা বর্ণনায় অনেকে বলে থাকে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি উনার পালনকর্তার আদেশ লঙ্ঘন করলেন, ফলে তিনি পথভ্রান্ত হয়ে গেলেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!

এ তরজমা মহান আল্লাহ পাক উনার প্রথম নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র শান মুবারক উনার খিলাফ হওয়ার কারণে প্রকাশ্য কুফরী। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা হচ্ছে সমস্ত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা পবিত্র ওহী মুবারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উনারা পবিত্র ওহী মুবারক ছাড়া কোন কথা বলেননি এবং কোন কাজ করেননি। তাই উনারা সমস্ত গুনাহখতা, ভুল-ভ্রান্তির উর্ধ্বে। উনারা মা’ছূম বা নিষ্পাপ। তাছাড়া হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে নবী-রসূল হিসেবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই, হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার নাফরমানী বা অবাধ্যতাজনিত  কাজ সংঘঠিত হয় কি করে এবং তিনি পথভ্রান্ত বা পথহারা হন কি করে!

প্রকৃতপক্ষে উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ছহীহ অর্থ হচ্ছে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি উনার রব তায়ালা উনার আদেশ মুবারক দৃঢ়তার সাথে পালন করলেন অতঃপর যমীনে তাশরীফ মুবারক আনলেন।

একইভাবে সূরা দ্বুহা শরীফ উনার ৭নং পবিত্র আয়াত শরীফ-

ووجدك ضالا فهدى

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তরজমা বর্ণনায় অনেকেই বলে ও লিখে থাকে যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার প্রিয়তম রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পথহারা পেয়েছেন অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!

এ তরজমা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে জঘণ্য কুফরীর শামিল। কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তো সৃষ্টিই হয়েছেন মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হিসেবে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে; যা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্ট বর্ণিত রয়েছে।

সুতরাং যে সমস্ত ব্যক্তিত্ব উনারা সৃষ্টিই হয়েছেন নবীউল্লাহ, রসূলুল্লাহ, হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে তিনি পথহারা, বিভ্রান্ত হন কি করে! এ তরজমা কোন মুসলমান করতে পারেনা। কেউ করলে তাকে খালিছ তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। অন্যথায় জাহান্নাম ব্যতীত তার জন্য কোন জায়ঠিকানা থাকবে না।

প্রকৃতপক্ষে উক্ত আয়াত শরীফ উনার সঠিক অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে কিতাববিহীন পেয়েছেন অতঃপর কিতাব প্রদান করেছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয়তম রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী উনাদেরকে রাবী বলা হয়। এই রাবীগণ উনাদের মধ্যে যাঁরা প্রথম শ্রেণীর, উনাদেরকে বলা হয় ছেক্বাহ রাবী।

পবিত্র হাদীছ শরীফ বিশারদগণ উনারা ছেক্বাহ্ রাবী হওয়ার জন্য যে মানদ- নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে মূল বিষয় হচ্ছে- (১) আদালত ও (২) জব্ত। জব্ত হচ্ছে- প্রখর স্মরণশক্তি। তা এমন যে, একবার শুনলে আর ভুলেনা।      আর আদালত-এর মধ্যে যে শর্তসমূহ রয়েছে, তার মধ্যে প্রধান হলো দু’টি। যথা- (ক) তাক্বওয়া, (খ) মুরুওওয়াত। (ক) তাক্বওয়া হচ্ছে- কুফর-শিরক, বিদ্য়াত ও ফাসিকী কাজ থেকে বেঁচে থাকার সাথে সাথে কবীরাহ গুণাহ থেকে, এমনকি ছগীরাহ গুণাহও বার বার করা থেকে বেঁচে থাকা। পবিত্র হাদীছ শরীফ সম্পর্কে মিথ্যা না বলা। সাধারণ কাজে মিথ্যা না বলা। অজ্ঞাতনামা না হওয়া, অপরিচিত না হওয়া। গাফলতী না থাকা। বদ আক্বীদা সম্পন্ন না হওয়া। বে-আমল না হওয়া।  (খ) আর মুরুওওয়াত হচ্ছে- অশ্লীল-অশালীন, অশোভনীয়, অপছন্দনীয় আচার-আচরণ, উঠা-বসা, চাল-চলন, যেখানে-সেখানে ইস্তিঞ্জা করতে বসা, হাট-বাজারে গিয়ে চিৎকার করা, রাস্তা-ঘাটে লোকজনের সাথে অনর্থক ঝগড়া-ঝাটি করা ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া এমনকি দৃষ্টিকটু কাজ থেকে বিরত থাকা। যেমন- রাস্তায় হেঁটে হেঁটে খাদ্য খাওয়া, রাস্তায় অট্টহাস্য করা, চিৎকার করা ইত্যাদি। (তাদরীবুর রাবী, মুকাদ্দামাতুশ শায়েখ, মীযানুল আখবার, নূরুল আনোয়ার, মুকাদ্দামাতুল মিশকাত)

এখন ফিকিরের বিষয় এই যে, পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী ছেক্বাহ্ রাবী যদি এত গুণ ও যোগ্যতাসম্পন্ন এবং তাক্বওয়াধারী হন অর্থাৎ পবিত্র হাদীছ শরীফ বিশারদ এই উম্মতের নিকট যদি ছেক্বাহ রাবী হিসেবে পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী হওয়ার জন্য ছগীরাহ্ গুণাহ্ বার বার না করা ও দৃষ্টিকটু সাধারণ অপছন্দনীয় কাজও না করা শর্ত হয়, তাহলে যে সমস্ত ব্যক্তিত্ব উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার নবী হবেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম বর্ণনা করবেন, উনাদের জন্য মহান আল্লাহ পাক কি মানদ- নির্ধারণ করেছেন বা উনাদের ক্ষেত্রে কি পরিমান মা’ছূম ও মাহ্ফূজ হওয়া নির্দিষ্ট করেছেন তা অনুধাবনীয়।

অতএব, যে কোন লোকের জন্যই হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ উনাদের শান মুবারক উনার বিন্দুমাত্র খিলাফ কথাবার্তা বলা ও আক্বীদা পোষণ করা সম্পূর্ণ নাজায়িয, হারাম ও কাট্টা কুফরী। এ ধরণের কুফরী কথা ও আক্বীদা থেকে বেঁচে থাকা সমস্ত মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয।

{দলীলসমূহঃ- (১)  তাফসীরে আহকামুল কুরআন জাসসাস্, (২) তাফসীরে কুরতুবী, (৩) তাফসীরে মাযহারী, (৪) তাফসীরে রুহুল বয়ান, (৫) তাফসীরে রুহুল মায়ানী, (৬) তাফসীরে খাযিন, (৭) তাফসীরে বাগবী, (৮) তাফসীরে কবীর, (৯) তাফসীরে তাবারী, (১০) তাফসীরে যাদুল মাছীর, (১১) তাফসীরে দুররে মনছুর, (১২) তাফসীরে ইবনে কাছীর, (১৩) শরহে আক্বাইদে নছফী, (১৪) ফিক্বহে আকবর, (১৫) তাকমীলুল ঈমান, (১৬) আক্বাইদে হাক্কাহ, (১৭) তাযকিরাতুল আউলিয়া, (১৮) মসনবী শরীফ, (১৯) আল মুরশিদুল আমীন, (২০) তাদরীবুর রাবী, (২১) মুকাদ্দামাতুশ্ শায়েখ, (২২) মীযানুল আখবার, (২৩) মুকাদ্দামাতুল মিশকাত, (২৪) নূরুল আনোয়ার, (২৫) রু’ইয়াতুল হাদীস, (২৬) নুখবাতুল ফিকির, (২৭) কিফায়া, (২৮) কাশফুল আসরার ইত্যাদি।}

সুওয়াল: যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ উনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তা তার বক্তব্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, “ছায়া ছিলনা” সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ নাকি মিথ্যা ও বানোয়াট। নাউযুবিল্লাহ! এখন জানার বিষয় হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টি যারা অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার কি ফায়ছালা? আর ছায়া ছিল না সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ কোন পর্যায়ের? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

সুওয়াল: আপনারাই কেবল বলেন যে, ক্বলবী যিকির করা ফরয। এছাড়া কোন ইমাম, খতীব, ওয়ায়িয, মাওলানা, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসিরে কুরআন তাদের কাউকে তো ক্বলবী যিকির ফরয বলতে শোনা যায় না। যার কারণে তারা নিজেরা যেমন ক্বলবী যিকির করে না তদ্রƒপ তাদের যারা অনুসারী সাধারণ মুসলমান ও মুছল্লীবৃন্দ তারাও ক্বলবী যিকির সম্পর্কে জানে না এবং ক্বলবী যিকির করেও না। এক্ষেত্রে ক্বলবী যিকির যারা করছে না, তাদের আমলের কোন ত্রুটি বা ক্ষতি হবে কিনা? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।

সুওয়াল: উছমান গণী ছালেহী মৌলুভী নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য হচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোন দিন সবুজ পাগড়ী পরিধান করেননি এবং সবুজ পাগড়ী সম্পর্কে কোন হাদীছ শরীফও বর্ণিত নেই। উক্ত মৌলভীর বক্তব্য কি সঠিক? দয়া করে জানাবেন।

সুওয়াল: সিলেট দরগাহ সংলগ্ন খারিজী মাদরাসা জামিয়া কাসিমুল উলূমের মুহতামিম আবুল কালাম যাকারিয়া ও সুবহানীঘাট ফুলতলী মাসলাকের মাদরাসা ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মুহম্মদ কুতুবুল আলম স্বাক্ষরিত একটি লিখিত ফতওয়া আমার হস্তগত হয়। সেখানে তারা একটি হাদীছ শরীফ ও মা লা বুদ্দা মিনহু কিতাবের বরাত দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, “ফরয নামাযের দুই সিজদার মধ্যখানে اللهم اغفرلى وارحمنى واجبرنى واهدنى وارزقنى وعافنى وارفعنى এ দোয়াটি সম্পূর্ণটাই পড়া জায়িয। উল্লেখ্য আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে তাদের লিখিত ফতওয়াটির ফটোকপি সুওয়ালের সাথে প্রেরণ করা হলো। এখন আমার সুওয়াল হলো-সত্যিই কি ফরয নামাযের দু’ সিজদার মধ্যখানে উক্ত দোয়াটি সম্পূর্ণ পড়া জায়িয? দলীল ভিত্তিক জাওয়াব দিয়ে আমাদের ফরয ইবাদত নামাযকে হিফাযত করবেন বলে আমরা আশাবাদী।