মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৬০)

সংখ্যা: ২০১তম সংখ্যা | বিভাগ:

প্রসঙ্গ : স্বীয় শায়খ বা মুর্শিদ ক্বিবলা-উনার মুহব্বত ও সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত দশটি মাক্বাম হাছিল করার কোশেশ করবে।

রিয়াযত-মাশাক্কাত করার কুওওয়াত বা শক্তি হাছিলের উপায়

(গত সংখ্যার পর)

জিহ্বা

চতুর্থ নীতি হলো: নিজেকে দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখা। শায়খুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ হযরত সুফিয়ান ছাওরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, নিজ মুখে এমন কথা বলোনা যাতে নিজের দাঁতই ভেঙে যায়। অপরাপর আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা বলেছেন, নিজের মুখের রাশ এমনভাবে খুলে দিও না, যাতে নিজের ক্ষতি হতে পারে। এ সম্পর্কে একটি কবিতাও বলা হয়েছে, “নিজ জিহ্বা সংযত কর। আদৌ কথাই বলো না। কি জানি কোন বিপদ দেখা দেয়। কারণ, কথাই বড় শত্রু। সব বিপদ কথাই ডেকে আনে।” ইমামুল মুহাদ্দিসীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি এ ব্যাপারে যে কয়টি কবিতার লাইন উদ্ধৃত করেছেন, তার মর্ম এই, “নিজ নিজ জিহ্বা সংযত রাখ। কারণ, জিহ্বা মানুষকে হত্যা করার জন্যে আগে আগে দৌড়ায়। জিহ্বা মানুষের ভেদ প্রকাশ করে দেয়।”
ইবনে আব্দুল মুতি যে কবিতার লাইনগুলো পড়তেন, তার মর্ম এই, “মানুষের জিহ্বা বাঘের মতই পথের পাশে ওঁৎ পেতে থাকে এবং সুযোগ পেলেই পথিকের ঘাড়ে পড়ে সর্বনাশ সাধন করে।” সুতরাং জিহ্বাকে এমন কঠিন লাগাম দিয়ে বাঁধতে হবে, যেন সে সর্বনাশ করার শক্তি না রাখে। তাহলে তুমি সব বিপদ থেকে রেহাই পাবে। বর্ণিত আছে, জিহ্বা কোন কোন মানুষকে পীড়াপীড়ি করে তাকে প্রকাশ করার জন্যে।
পঞ্চম নীতি হলো: পরকালের বিপদাপদ ও পরিণাম আলোচনায় রত হওয়া। এক্ষেত্রে একটি রহস্য অবশ্য লক্ষণীয়। প্রথম, হয় মানুষ নিষিদ্ধ ও হারাম কথাবার্তায় লিপ্ত থাকবে। নয়তো, অনাবশ্যক বাজে কথায় লিপ্ত থাকবে। যদি সে হারাম কথাবার্তায় লিপ্ত হয়, তাহলে খোদার গযবে পড়বে।
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক  ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, শবে মি’রাজে আমি জাহান্নামে একটি দল দেখতে পেলাম। প্রশ্ন করলাম, হে জিবরীল আলাইহিস সালাম! এরা কারা? তিনি জবাব দিলেন, এরা মানুষের গোশত ভক্ষণকারী অর্থাৎ গীবতকারী দল।
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মা’আয ইবনে জাবাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বললেন-

اقطع لسانك عن حمله القران وطلب العلم ولا تمزق الناس بلسانك فتمزقك كلاب النار

অর্থাৎ নিজ জিহ্বাকে কুরআন শরীফ বহনকারী তথা হক্কানী আলিম ও তালিবুল ইলমকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করো। নিজ জিহ্বাকে মানুষের পেছনে লেলিয়ে দিও না। তা হলে জাহান্নামের কুকুর তোমাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। (মিনহাজুল আবিদীন-১১৪)
হযরত আবু কিলাবাতা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, গীবত মানুষের হিদায়েত লাভের ক্ষমতাকে বরবাদ করে দেয়। কাজেই, এর থেকে রেহাই পাবার জন্যে আল্লাহ পাক-উনার রহমত বা অনুগ্রহ প্রার্থনা করা চাই। এতো গেল নিষিদ্ধ কথার বিবরণ। এখন থাকে বৈধ ও নির্দোষ কথাবার্তার প্রশ্ন। তার চারটি অবস্থা-
প্রথমত: কিরামান-কাতিবীন ফেরেশতা আলাইহিমাস সালাম উনাদেরকে এমন কাজে নিয়োজিত রাখা, যার ভিতরে কোন কল্যাণ নেই। অথচ মানুষের উচিত, তাদের সমীহ করা ও লজ্জা করা। উনাদের কোন মতে অহেতুক কষ্ট দেয়া উচিত নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ما يلفظ من قول الا لديه رقيب عتيد

অর্থ: কেউ এমন কোন কথা বলোনা, যা রক্ষিত রাখার জন্যে তার কাছে রিপোর্টার থাকে না।
দ্বিতীয়: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-উনার কাছে বাজে কথাও পৌঁছানো হয়। তাই তা থেকে বান্দার বিরত থাকা উচিত। খোদাকে তার ভয় করা কর্তব্য। বর্ণিত আছে, এক বুযুর্গ কোন এক ব্যক্তিকে বেহুদা কথায় লিপ্ত দেখে বললেন, চুপ থাক; কারণ, খোদার দরবারে এ কথাগুলো পৌঁছতেছে। তুমি জেনে শুনেই বাজে কথা বলে চলেছ।
তৃতীয়ত: মহান খোদার দরবারে কিয়ামতের দিন এ সব পেশ করা হবে। সে দিন কঠিন বিপদের দিন। তখন মানুষ পিপাসার্ত ও নগ্ন থাকবে। জান্নাত থেকে থাকবে বিচ্ছিন্ন ও নিয়ামত থেকে থাকবে বঞ্চিত।
চতুর্থত: সে ধরনের বাজে কথাবার্তার উপরে অভিসম্পাত, যেগুলো খোদার সমীপে দলীল হবে এবং লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই বলা হয়েছে, বাহুল্য কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কারণ, তার হিসাব দীর্ঘ হবে। যে ব্যক্তি উপদেশ পেতে চায়, তার জন্যে এ উপদেশটিই যথেষ্ট। (মিনহাজুল আবিদীন/১১৫)

অন্তর:

ইমামুল মুহাদ্দিসীন ওয়াল ফুক্বাহা হযরত হারিস মুহাসিবী রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বীয় বিশ্বখ্যাত কিতাব ‘রিসালাতুল মুসতারশিদীন’-এর ১৭৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, অনেক আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমই বলেছেন, “ক্বলব বা অন্তরের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি ঘরের মত যার মধ্যে ৬টি দরজা-জানালা রয়েছে। কাজেই, তুমি সদা সতর্ক থাকবে যেন সেই ঘরে কোন কিছুই প্রবেশ করতে না পারে। যদি প্রবেশ করতে পারে তাহলে সেই ঘরে সংরক্ষিত মূল্যবান সম্পদসমূহ নষ্ট করে ফেলবে। আর ক্বলব বা অন্তরই হচ্ছে সেই ঘর। আর দরজা-জানালা হচ্ছে- জিহ্বা, চোখ, কান, নাক, দু’হাত এবং দু’পা। সেই দরজা-জানালাসমূহ হতে যদি একটিও না জেনে খুলে রাখ তাহলে অবশ্যই ঘর সদৃশ সেই অন্তর বিনষ্ট হয়ে যাবে।”
মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, অন্তরের রক্ষণাবেক্ষণ ও তার পরিশুদ্ধিতার উপায় উপকরণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, বাসনা কামনা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টির প্রশ্নে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এটাই হল মূল। এ বস্তুটির গতিবিধি খুব সূক্ষ্ম, এর সংশোধন খুবই কঠিন এবং এর অবস্থাগুলোও অটল। তাই এর জন্য পাঁচটি নীতি জেনে রাখা দরকার।
প্রথম নীতি হলো: স্বয়ং আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

يعلم خائنة الاعين وما تخفى الصدور

অর্থ: তিনি চোখের লুকোচুরিও জানেন। এও জানেন যে, কার অন্তরে কি লুকিয়ে আছে। আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদন করেন-

والله يعلم ما فى قلوبكم

অর্থ: তোমাদের অন্তরে যা লুকানো রয়েছে, আল্লাহ পাক তা জানেন। তিনি আরো বলেন-

انه عليم بذات الصدور

অর্থ: তিনি তো অন্তরের ভেদও ভালভাবে জানেন।
কুরআন শরীফ-এ বার বার ‘আলীম’ ‘খবীর’ ইত্যাদি শব্দ ইসমে মুবালাগা দ্বারা অন্তরের রহস্য জানার কথাই বলেছেন। আবিদের সতর্কতা অবলম্বনের জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট। কারণ, অদৃশ্য সবকিছুর যিনি খবর রাখেন, উনার সামনে হৃদয়ের কারসাজি বড়ই সাংঘাতিক ব্যাপার। কাজেই, নিজের অন্তর সম্পর্কে যতটুকু জান, তা নিয়ে চিন্তা গবেষণায় নিয়োজিত হও।
দ্বিতীয় নীতি হলো: নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-

ان الله تعالى لا ينظر الى صوركم وابصاركم وانما ينظر الى قلوبكم

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তোমাদের ছূরত শেকেল আর রঙ্গ রূপ দেখেন না। তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর।
সুতরাং অন্তর হলো, মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন উনার দৃষ্টির একমাত্র স্থান। উনার কথা ভেবে অবাক হই, মানুষকে দেখাবার জন্য চেহারার জৌলুস নিয়ে যে দিন-রাত মাথা ঘামায়, তার ময়লা সাফ করতে সদা ব্যস্ত থাকে, যথাসাধ্য চেহারাকে ঝকঝকে করার সাধনা চালায় যেন কেউ তাতে কোন রূপ দাগ দেখতে না পায়, অথচ আল্লাহ পাক উনাকে দেখাবার জন্যে যে অন্তর রয়েছে, তার দিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র করে না। সেটাকে ধুয়ে মুছে পাক-পবিত্র রাখা ও তা থেকে সব দাগ তুলে ফেলাতো দূরের কথা, বরং এমন কুৎসিত ও জঘন্য করে ফেলে রাখা হয় যা মানুষ দেখতে পেলেও তার থেকে বহুদূরে সরে যেতো।
তৃতীয় নীতি হলো: ইবাদত ও আনুগত্যের শক্তি শুধুমাত্র অন্তরই রাখে। এ ক্ষেত্রে সে অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাদশাহ এবং অন্যগুলো তার অনুগত গোলাম। সুতরাং কর্তার ভেতরে যোগ্যতা বহাল থাকলে অনুচররা তাকে অনুসরণ করবেই। বাদশাহ যদি চলে প্রজা-সাধারণ আপনা থেকেই সরল হয়ে যায়।
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, “দেহের অভ্যন্তরে একখ- গোশত রয়েছে। যখন সেটি পরিশুদ্ধ হয় তখন গোটা দেহ পরিশুদ্ধ হয় এবং যখন সেটি ব্যাধিগ্রস্ত হয়, তখন গোটা দেহ ব্যাধিগ্রস্ত হয়। মনে রেখ, সেটি হল অন্তর। মোট কথা, যখন গোটা দেহের ভাল-মন্দ তার উপর নির্ভরশীল, তখন যাবতীয় প্রয়াস তার পরিশুদ্ধতার সাধনায় ব্যয় করা উচিত।
চতুর্থ নীতি হলো: অন্তর মানুষের সব গুণাবলীর ভা-ার এবং বিরাট বিরাট ব্যাপারের উৎসস্থল। তার প্রথম গুণ হলো জ্ঞান বিবেক। আর সর্বপ্রধান গুণ হলো আল্লাহ পাক উনার মা’রিফাত যা ইহ ও পরকালের সর্ব কল্যাণের চাবিকাঠি। তারপর সে সব গুণ অন্তরে নিহিত রয়েছে, যা দিয়ে আল্লাহ পাক উনার সকল বান্দা নৈকট্য লাভ করতে পারে। তারপর ইবাদতের নিয়ত ঠিক রাখাও অন্তরের কাজ। কারণ, ছাওয়াব সর্বদা নিয়তের উপর নির্ভরশীল।
তারপর ইলম ও হিকমতের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যা বান্দার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন চারিত্রিক সৌন্দর্য ও প্রশংসনীয় কাজের উৎসও অন্তর। এ অন্তরের দ্বারাই অন্যান্য মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ হয়।
পঞ্চম নীতি হলো: আমি ভেবে-চিন্তে বুঝতে পেলাম, মানুষ ছাড়া অন্য কিছুর ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। মানুষের চির শত্রুটি তো অন্তরকে লক্ষ্যস্থলে পরিণত করেছে। সে সর্বদা অন্তরের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে এবং তার পিছনেই লেগে আছে। কারণ অন্তরের উপরেও শয়তানের হাত রয়েছে। তাই সে অন্তরকে কু-মন্ত্রণা ও দ্বিধা সংশয়ে লিপ্ত রাখে। মোট কথা, মানুষ সর্বদা দুদিকে আহ্বান শুনতে পায়। (মিনহাজুল আবিদীন-১৭)

(অসমাপ্ত)

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০৩) হুসনুল খুল্ক্ব বা সচ্চরিত্রবান মুরীদই শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সর্বাধিক নৈকট্যশীল ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত।

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০২) হুসনুল খুলক বা সচ্চরিত্রবান মুরীদই শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সর্বাধিক নৈকট্যশীল ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত।

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০৮)

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০৭)

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২০১) হুসনুল খুল্ক্ব বা সচ্চরিত্রবান মুরীদই শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সর্বাধিক নৈকট্যশীল ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত।