হাফিযে হাদীস, মুফতী, মাওলানা মুহম্মদ ফযলুল হক।
ورفعنالك ذكرك.
অর্থঃ- “হে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনার যিকিরকে বুলন্দ করেছি।” (সূরা আলাম নাশরাহ/৪)
শাফিয়ুল উমাম, রউফুর রহীম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অস্তিত্ব মুবারকের প্রতিটি মুহূর্ত অসংখ্য মু’জিযা দ্বারা সমৃদ্ধ। শুধু তাই নয়, তাঁর মুবারক বিলাদতের রাত্রেই লক্ষ-কোটি মু’জিযা সংঘটিত হয়েছে। নিম্নে তার যৎকিঞ্চিত আলোকপাত করা হলো- (১) হযরত ইবনে আবুল আস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, আমার মা আমাকে বলেছেন যে, যখন হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর গৃহে রহমাতুল্লিল আলামীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিলাদত গ্রহণ করেন, তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ঘরের চারদিক নূরের আলোকে উদ্ভাসিত হয়। তারকারাজি এমনভাবে ঝুকে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল যেন আমার উপর আছড়ে পড়বে। বিলাদতের সময় হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর শরীর মুবারক থেকে একটি নূর বিচ্ছূরিত হয়ে সমগ্র গৃহকে আলোকোজ্জ্বল করে তোলে। (বাইহাকী, তিবরানী, আবু নয়ীম) (২) সাইয়্যিদুল কাওনাইন, খাইরুল বাশার হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদতের সময় বছরা পর্যন্ত সমস্ত কিছু আলোকিত হয়ে যায়। (হাকিম, বাইহাকী, ফয়জুল কাদীর, শরহে জামিউস্ সগীর ৩য় জিঃ ৭৬৮) (৩) ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন যে, হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেছেন, সাইয়্যিদুল খালায়িক, রহমতে আলম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রেহেম শরীফে ধারণ করার পর বিলাদত পর্যন্ত আমার ব্যথা-বেদনা হয়নি। বিলাদতের সময় হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত দিয়ে মাটিতে ভর দেন এবং সিজদা অবস্থায় তিনি তাশরীফ আনেন। (উমদাতুন নুকুল, নূরে মুহম্মদী) (৪) আফজালুল কায়িনাত, হাবীবে আযম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদতের সময় উপস্থিত হলে আল্লাহ পাক-এর আদেশে সকল ফেরেশ্তা আল্লাহ পাক-এর সামনে হাজির হন। শয়তানকে সত্তরটি শিকল পড়ানো হয়। তাকে কাস্পিয়ান সাগরে উপুড় করে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। সকল দুষ্ট ও অবাধ্য মাখলুককেও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। সূর্যকে সেদিন অসাধারণ আলো প্রদান করা হয় এবং তার প্রান্তে শুন্য পরিমন্ডলে সত্তর হাজার হুরকে দাঁড় করানো হয়, যারা তাঁর বিলাদত শরীফের অপেক্ষায় ছিলেন। আল্লাহ পাক সে বছর তার হাবীবের বিলাদতের সম্মানার্থে সকল নারীর পুত্র সন্তান নির্ধারণ করে দেন। এটাও ঠিক করেন, কোন বৃক্ষ ফলহীন থাকবে না। অশান্তির স্থানে শান্তি স্থাপিত হবে। (আবু নয়ীম, খাসায়েসুল কুবরা ১ম /৯০) (৫) ছহিবে বাহ্র ওয়া বার , মুত্তালা আলাল গায়িব যে রাত্রে বিলাদত লাভ করেন, সেদিন আল্লাহ তায়ালা হাউজে কাউসারের কিনারে সত্তর হাজার মেশক আম্বরের বৃক্ষ স্থাপন করেন। (৬) সকল প্রতিমা উপুড় হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। (৭) বায়তুল্লাহ শরীফ থেকে এ আওয়াজ কয়েকদিন পর্যন্ত ভেসে আসতে থাকে, এখন পূর্ণ চন্দ্র এসেছে, এখন আমার জিয়ারতকারীরা আসবে। বায়তুল্লাহ শরীফের ভূ-কম্পন তিনদিন ও তিনরাতে শেষ হয়। (৮) বিলাদতের সেই মুবারক রাতে দুনিয়ার সকল বাদশাহদের সিংহাসন ভেঙ্গে যায় এবং সকলেই বোবা হয়ে যায়। (৯) হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বিলাদতের সময়ের ঘটনাবলী বর্ণনায় বলেন, সূর্যের মত উজ্জ্বল মুখমন্ডল বিশিষ্ট তিন ব্যক্তি আগমন করলেন, একজনের হাতে রুপার পাত্র যা হতে মেশকের খোশবু আসছিল, দ্বিতীয় জনের হাতে পান্নার চতুস্কোন প্লেট, প্রতি কোনে একটি সাদা মোতি জড়ানো ছিল। কেউ বলল, এটা সারা বিশ্ব; পূর্ব-পশ্চিম, জলস্থল। হে আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব! আপনি এটি ধারণ করুণ! যেদিক দিয়ে ইচ্ছা। তিনি মাঝখানে ধরলেন, আওয়াজ এল? কা’বার কছম! মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ধারণ করেছেন। আল্লাহ পাক তার জন্য কা’বাকে কিবলা এবং বাসস্থান করেছেন। তৃতীয় জনের হাতে উত্তমরূপে ভাজ করা সাদা রেশমী বস্ত্র থেকে সুন্দর একটি আংটি বের করলেন। অতঃপর আংটিটি লোটার পানিতে সাতবার ধৌত করে সুলতানুন নাছির হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুই কাঁধের মাঝখানে মোহর এঁকে দিলেন। (১০) বিলাদতের বর্ণনায় ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, সেই রাত্রে আমি প্রতিমার ভিতর থেকে আওয়াজ শুনেছি, নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পয়দা হয়েছেন। বাদশাহরা লাঞ্ছিত হয়েছে। গোমরাহী ও শিরক মিটে গেছে। (১১) বিলাদত রাত্রের বর্ণনায় সম্রাট নাজ্জাশী বলেছেন, সে রাত্রে স্বপ্নে দেখি, হঠাৎ মাটি ভেদ করে একটি গ্রীবা ও মাথা বের হয়ে বলল; হস্তি বাহিনী ধ্বংস হয়েছে। —- নবী মক্কী (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিলাদত লাভ করেছেন, এখন যে তাঁকে মেনে চলবে, সে কামিয়াব আর যে অবাধ্য হবে —– এতটুকু বলে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। (১২) যখন হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম জন্ম গ্রহণ করেন তখন শয়তানের তিন আকাশে প্রবেশাধিকার রহিত হয়। আর হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিলাদত লাভ করলে শয়তানের জন্যে সাত আকাশের দরজাই বন্ধ করে দেয়া হয়। আল্লাহ পাক যেন আমাদেরকে সেই সম্মানিত রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালনি, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আওলাদা, যিনি যামানার মুজাদ্দিদ ও ইমাম তাঁর উছিলায় হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাক্বীক্বী মর্যাদা-মর্তবা উপলদ্ধি করার এবং তাঁর পরিপূর্ণ ইত্তিবার মাধ্যমে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খালিছ সন্তুষ্টি খাছভাবে নসীব করেন আমিন। (নি’মাতুল কুবরা, তিবরানী শরীফ, আবু নাঈম, ফয়জুল কাদীর, ওমদাতুল নুকুল, নূরে মুহম্মদী, খাসায়েসুল কুবরা, হাকিম)
-মাওলানা মুহম্মদ মামুনুর রহমান