(ধারাবাহিক)
প্রথম যে আয়াত শরীফ নাযিল করেছেন তা সূরা আহ্যাব-এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
ينساء النبى لستن كاحد من النساء ان اتقيتن فلاتخضعن بالقول فيطمع الذى فى قلبه مرض وقلن قولا معروفا وقرن فى بيوتكن ولاتبرجن تبرج الجاهلية الاولى واقمن الصلوة واتين الزكوة واطعن الله ورسوله انما يريد الله ليذهب عنكم الرجس اهل البيت ويطهركم تطهيرا واذكرن ما يتلى فى بيوتكن من ايت الله والحكمة ان الله كان لطيفا خبيرا.
এই আয়াত শরীফ প্রথম আল্লাহ্ পাক নাযিল করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
ينساء النبى لستن كاحد من النساء.
“হে নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণ! আপনারা অন্যান্য মহিলাদের মত নন।” ان اتقيتن.
“আপনারা যদি পরহেযগারী ইখতিয়ার করে থাকেন,”
فلاتخضعن بالقول.
“(আর যদি কোন পুরুষের সাথে কথা বলতেই হয়), তাহলে নরম সূরে কথা বলবেন না।”
فيطمع الذى فى قلبه مرض.
“যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তারা রোগগ্রস্থ হয়ে যাবে, ওয়াস্ওয়াসা তাদের অন্তরে সৃষ্টি হয়ে যাবে, দুশ্চিন্তা, কুচিন্তা তাদের অন্তরে বৃদ্ধি পাবে।”
وقلن قولا معروفا.
“তাদের সাথে আপনারা স্পষ্টভাবে শক্ত করে কথা বুলন।” وقرن فى بيوتكن.
“ঘরের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকুন আপনারা।”
ولاتبرجن تبرج الجاهلية الاولى.
“সেই আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময় যখন মহিলারা নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বে-পর্দা হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, আপনারা সেরূপ বেড়াবেন না।”
واقمن الصلوة. “নামায কায়িম করুন।”
واتين الزكوة. “যাকাত আদায় করুন।” واطعن الله ورسوله
“আল্লাহ্ পাক এবং তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইতায়াত করুন।”
انما يريد الله ليذهب عنكم الرجس.
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক চান আপনাদের থেকে নাপাকী, অছন্দনীয়, অশ্লীলতা, বে-পর্দা, বেহায়ায়ী যা কিছু রয়েছে সেটা দূর করে দিতে।”
اهل البيت ويطهركم تطهيرا.
“আল্লাহ্ পাক আপনাদেরকে পবিত্রা করার মতই পবিত্রা করতে চান। অর্থাৎ এমন নিষ্কলুষ ও পবিত্রা যার মধ্যে কোন ত্রুটি নেই, বিন্দুতম অপবিত্রতার কোন চিহ্ন নেই, এমন পবিত্রা আল্লাহ্ পাক করতে চান।”
واذكرن ما يتلى فى بيوتكن من ايت الله والحكمة.
“আর আপনাদের বাড়ীতে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফের যে সমস্ত কথা বলা হয়, সেগুলি স্মরণ রাখুন, স্মরণ করুন। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলে থাকেন, যে আয়াত শরীফ নাযিল হয়ে থাকে, সেগুলি স্মরণ রাখুন।”
ان الله كان لطيفا خبيرا.
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সূক্ষ্ম সংবাদ রাখনেওয়ালা।”
এখানে এই আয়াত শরীফ আল্লাহ্ পাক প্রথম নাযিল করলেন কি প্রসঙ্গে? মুফাস্সিরীন-ই-কিরাম বলেছেন, “এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে।” একটা কারণ হচ্ছে যা বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, “হযরত সাওদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা যিনি সাধারণ মহিলাদের থেকে কিছুটা উচুঁ-লম্বা ছিলেন এবং স্বাস্থ্য কিছুটা ভাল ছিল। উনি সাধারণতঃ ঘর থেকে বের হলে উনাকে সহজে চেনা যেত। একদিন হযরত সাওদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ঘর থেকে বের হয়ে কোথাও গিয়েছেন। রাস্তায় সাক্ষাত হলো হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সাথে। যখন সাক্ষাত হলো তখন তিনি পর্দারত অবস্থায়ই ছিলেন, যদিও তখন পর্দা ফরয হয়নি। এরপরও উনারা সমস্ত শরীর, মাথা, হাত ও পা ঢেকেই চলতেন। তবুও হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “হে হযরত সাওদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! আপনি তো নিজেকে আমাদের কাছ থেকে চুপাতে পারবেন না। আপনাকে আমরা চিনতে পেরেছি। আপনি হযরত সাওদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা।”
উনি একথা প্রকাশ্যে বললেন, সেটা শুনে হযরত সাওদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ফিরে আসলেন। এসে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন যে, “হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আমাকে একথা বলেছেন আজকে।” ঠিক তার কিছুক্ষণ পর আয়াত শরীফ নাযিল হলো, পর্দার এই আয়াত শরীফ,
ينساء النبى لستن كاحد من النساء ………. الى اخر.
এই আয়াত শরীফ নাযিল হলো, একটা বর্ণনা। আর দ্বিতীয় বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, “হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন- আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করার পর মদীনা শরীফে এসে যখন স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন, তখন প্রত্যেকেই প্রত্যেকের অবস্থান স্থল ঠিক করে নিলেন। সে সময় দূর-দুরান্ত থেকে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ আসতে লাগলেন। পরিচিত-অপরিচিত, স্থানীয়-অস্থানীয় সকলেই এসে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত করতে লাগলেন। যেহেতু তখনও পর্দা করা ফরয হয়নি বা পর্দার আয়াত শরীফ নাযিল হয়নি। হযরত উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাগণও অনেক সময় উপস্থিত থাকতেন, সে সমস্ত চেনা-অচেনা, জানা-অজানা, নিকটবর্তী এবং দূরবর্তী ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের সম্মুখে। এ কারণে হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অস্বস্থিবোধ করতেন এবং প্রায় বলতেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার মনে হয় দূর-দূরান্ত থেকে যারা এসে থাকেন বা যারা অপরিচিত, অচেনা, অজানা তাদের সম্মুখে হযরত উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাগণ-এর আসাটা ঠিক নয়। উনারা মনে হয়, ভিতরে থাকলেই ভাল হতো। কিন্তু আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু
وما ينطق عن الهوى ان هو الا وحى يوحى.
“ওহী ছাড়া নিজের থেকে কোন কথা বলেননা।” সেহেতু তিনি চুপ করে থাকতেন। হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রায় একথা বলতেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ পাক আয়াত শরীফ নাযিল করে দিলেন,
ينساء النبى لستن كاحد من النساء ………. الى اخر.
এই আয়াত শরীফ নাযিল হয়ে গেল, আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে জানিয়ে দেয়া হলো,
وقرن فى بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجاهلية الاولى.
“যে আপনারা আইয়ামে জাহিলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করে, রাস্তায় ঘুরে বেড়াবেন না। ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকুন।” নাযিল হলে সকলেই সেটা মেনে নিলেন। যেহেতু এই আয়াত শরীফের মধ্যে খাছ করে উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাদের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু কুরআন শরীফের একটা উছূল রয়েছে, “নুযূল খাছ হুকুম আম।” অর্থাৎ আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে একটা বিষয়কে উপলক্ষ্য করে কিন্তু তার হুকুমটা আম। এরপরও এই আয়াত শরীফের আগে এবং পরে হযরত উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাদের যে ফযীলত, যে বুযূর্গী, যে সম্মান বর্ণনা করা হয়েছে, সেটা যারা আমল করবে তাদের জন্য আলাদা ফযীলত থাকবে। (অসমাপ্ত)
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য