(ধারাবাহিক)
ঠিক এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। এক মহিলা ছাহাবী, উনি এসেছেন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে। এসে বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্, ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন, তালাক দিয়েছেন; কিন্তু আমার একটা সন্তান রয়েছে। স্বামী চাচ্ছেন, আমার থেকে সে সন্তানটা নিয়ে যেতে। কিন্তু সন্তানটা আমাকে ছাড়া কোন মতেই থাকতে রাজি নয়। সে আমার দুধ পান করে, আমার কোলে বসলে একটা শান্তি লাগে এবং তাকে দেখলে আমার এত্মিনান হয়। এখন পিতা চাচ্ছেন, অর্থাৎ স্বামী চাচ্ছেন সন্তানকে নিয়ে যেতে, এখন কি করব?” ঠিক এই মুহূর্তে সেই পুরুষ যিনি মহিলা ছাহাবীকে ছেড়ে দিয়েছিলেন, উনি এসে উপস্থিত হলেন। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “বেশ, এক কাজ কর, তোমরা দু’জন দুই পার্শ্বে দাঁড়াও।” স্বামী এবং স্ত্রীকে দাঁড় করালেন, সন্তানটাকে মধ্যখানে ছেড়ে দিলেন। সন্তানকে বললেন, “তোমার যাকে পছন্দ হয় তুমি তার কাছে যাও।” বাচ্চা শিশু যেহেতু তার বুঝার কিছুই ছিলনা। সে সন্তানটা আস্তে আস্তে হেঁটে তার মা’র কোলে গিয়ে উঠলো। যখন মা’র কোলে উঠলো তখন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, “এ সন্তান তোমার কাছেই থাকবে যতদিন পর্যন্ত তোমার দ্বিতীয় বিবাহ্ না হবে। তোমার কাছ থেকে কেউ তাকে নিতে পারবে না।” সে স্বামী বলেছিল যে, “হুজুর! সন্তান তো পিতার।” আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, “হ্যাঁ, তবে যেহেতু এ সন্তান তার মা’র কাছে থাকতে চাচ্ছে কাজেই তার কাছেই থাকতে দাও।” সন্তানকে সে মা নিয়ে চলে গেল।
যেটা ফিকিরের বিষয় সেটা হচ্ছে যে, সন্তান সাধারণত যখন দুধ পান করে তখন তার মা’র প্রতি ঝুকে থাকে, মা’র প্রতি আকর্ষিত হয়ে থাকে। কাজেই মার যতটুকু হক্ব রয়েছে সন্তানের প্রতি, সন্তানেরও হক্ব রয়েছে মা’র প্রতি।
কাজেই একজন যদি অন্যজনের হক্ব আদায় করে তাহলে অপরজনও তার হক্ব আদায় করবে। যেমন, ছোটবেলা মা তার সন্তানের হক্ব আদায় করে ঠিক বড়বেলা সন্তানও তার মা’র হক্ব আদায় করে। আর যদি সন্তানের হক্ব আদায় করতে মা কোন ত্রুটি করে সেজন্য আল্লাহ্ পাক সে ব্যবস্থা রেখেছেন। আবার সন্তানও যখন পিতা-মাতার হক্ব যথাযথ আদায় করবে না তারও ব্যবস্থা রয়েছে। কাজেই প্রত্যেকেরই হক্ব যা রয়েছে তা যথাযথ আদায় করতে হবে। আল্লাহ্ পাক মাতা-পিতার অনেক ফযীলত দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি সদাচরণ করতে আদেশ করেছেন। ঠিক তার বিপরীতটাও রয়েছে। কেননা প্রত্যেক সন্তানই যদি বেঁচে থাকে একদিন সে পিতা-মাতা হয়ে থাকে। আর অনেক পিতা-মাতাই চলে গেছেন। যারা রয়েছেন তাদের অনেকেরই পিতা-মাতা নেই। তবে অনেকের সন্তান রয়েছে এ অবস্থাও প্রত্যেকেরই একদিন না একদিন হয়ে থাকে, তবে সাধারণভাবে ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে, সন্তানকে পিতা-মাতা দেখবে, কতটুকু দেখবে সেটা কুরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক বলেছেন। আল্লাহ্ পাক বলেন,
وان جاهدك على ان تشرك بى ما ليس لك به علم فلاتطعهما.
অর্থঃ- “যদি কোন পিতা-মাতা (সন্তানকে) র্শিক (গুণাহ্র কাজ) করার জন্য কোশেশ(আদেশ-নির্দেশ) করে, যে বিষয়ে তাদের ইল্ম নেই, তা অবশ্যই অনুসরণ (পালন) করবে না।” (সূরা লুক্বমান/১৫)
আর হাদীস শরীফে এসেছে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لاطاعة لمخلوق فى معصية الخالق.
“কোন মানুষের জন্য জায়েয নেই যে, আল্লাহ্ পাক-এর নাফরমানী করে কোন মাখলুকাতের আনুগত্য করা।” (মিশকাত শরীফ)
যখন শরীয়তের খেলাফ কোন আদেশ করে পিতা-মাতা সেটা কিন্তু পালন করা যাবে না। যদিও পিতা-মাতার অনেক হক্ব রয়েছে এরপরও তা পালন করা যাবে না। পিতা-মাতাকে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে যেন কোন সন্তানকে পিতা-মাতা শরীয়তের খেলাফ কোন আদেশ না করে।
এ প্রসঙ্গে বলা হয়, হযরত আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যিনি আশারায়ে মুবাশ্শারা-এর অন্তর্ভূক্ত। যাঁর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, যখন উনি শাহাদত বরণ করতেছিলেন উনাকে বলা হয়েছিল, “হে ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আপনি একজন খলীফা নির্দিষ্ট করে দিয়ে যান।” হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছিলেন যে, “দেখ, আজকে যদি আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বেঁেচ থাকতেন আমি উনাকে খলীফা নির্দিষ্ট করে দিয়ে যেতাম।” যেহেতু উনি নেই সেহেতু ছয় জনের নাম উনি বলে গেলেন। সেই আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সম্পর্কে বলা হয়, মূলতঃ উনি উনার পিতার নামে মশহুর নন। “ইবনুল জাররাহ্” জাররাহ্ হচ্ছেন, উনার দাদার নাম। বলা হয়েছে, যুদ্ধের ময়দানে উনার পিতা কুফরী অবস্থায় ইন্তিকাল করেছেন। হযরত আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন জিহাদের ময়দানে গেলেন, বলা হয়েছে, বদরের যুদ্ধে গেলেন। সেখানে যাওয়ার পর উনার পিতা অনেক কোশেশ করতেছিল উনাকে শহীদ করার জন্য। কিন্তু উনি এড়িয়ে চলতেছিলেন, বার বার সরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন এক অবস্থা হয়ে গেল, মুখোমুখি হয়ে গেলেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও। কিন্তু সে অবস্থায় তাকে অর্থাৎ উনার পিতাকে হত্যা না করে উনার কোন উপায় ছিল না। উনি তরবারী দিয়ে দু’ভাগ করে ফেললেন, পিতাকে হত্যা করে ফেললেন। ঘটনা ঘটে গেল, অনেকে দেখলেন। পরবর্তীতে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ এসে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! হযরত আবূ উবায়দা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এমন এক কাজ করেছেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।” যে কি কাজ করেছেন, “উনার পিতাকে উনি হত্যা করে ফেলেছেন।” এই একটা ঘটনা ঘটে যায়।
আর দ্বিতীয় আরেকটা ঘটনা ঘটে যায়, সেটা হচ্ছে, যিনি আফজালুন্ নাছ বাদাল আম্বিয়া, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। উনার পিতা হযরত আবূ কুহাফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যিনি পরবর্তীতে ঈমান এনেছিলেন। উনার পিতা তখনও ঈমান আনেননি এমতাবস্থায় একদিন কোন এক প্রসঙ্গে উনার পিতা এমন কতকগুলি খেলাফে শরা’ বা শরীয়তের খেলাফ কুফরী কথা উচ্চারণ করতেছিলেন, কোন কোন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্পর্কেও কিছু আপত্তিমূলক কথা-বার্তা বললেন।
হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আফজালুন্ নাছ-এর মত একজন জামালী মেজাজের লোক উত্তেজিত হয়ে উনার পিতাকে একটি চড়-থাপ্পর বা আঘাত করেছিলেন। সেটা কিছু লোক দেখলো এবং উনার পিতা স্বয়ং এসে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে নালিশ করলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্, ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার ছেলে আবূ বকর আমাকে আঘাত করেছে এবং তার সাক্ষীও রয়েছে।” যখন এই ঘটনা ঘটে গেল, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে জিজ্ঞেস করা হলো, উনি বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! সত্যিই আমি আঘাত করেছি। তবে যদি তখন আমার কাছে তরবারী থাকতো অর্থাৎ যদি তখন আমার কাছে তরবারী থাকতো তাহলে আমি তরবারী দিয়ে আঘাত করে উনাকে দ্বিখন্ডিত করে দিতাম। উনি এমন কথা উচ্চারণ করেছেন যেটা বরদাশ্ত করা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। উনার একমাত্র শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড কিন্তু আমি তো সেটা দেইনি। আমি আঘাত করেছি মাত্র।”
আর এদিকে হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর যে ঘটনা ঘটে গেল। উনাকে যখন বলা হলো, উনি বললেন, তখন আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না উনাকে হত্যা না করে থাকা। আমি অনেক কোশেশ করেছি উনাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এবং এড়িয়েছি অনেকবার। কারণ যদি আমি উনাকে হত্যা না করতাম তাহলে উনি আমাকে শহীদ করতেন এবং আরো কিছু মুসলমান যারা ছিলেন তাদেরকেও শহীদ করে দিতেন। সে জন্য আমি একমাত্র মুসলমানদের স্বার্থে আল্লাহ্ পাক এবং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টির জন্য উনাকে হত্যা করেছি। আমার অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না। উনারা যখন একথা বললেন, তখন তার স্বাক্ষী কোথায়? স্বাক্ষী তো কেউ নেই। উনারা একা একা কথা বললেন, ইসলামের মাসয়ালা হচ্ছে, শরীয়তের মাসয়ালা হচ্ছে, একাধিক স্বাক্ষী থাকা। দু’জন স্বাক্ষী থাকতে হবে। স্বাক্ষী নেই কি করা হবে এখন, ঠিক তখনই আল্লাহ্ পাক আয়াত শরীফ নাযিল করে দিলেন। (অসমাপ্ত)
ওয়াজ শরীফ: কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য