কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-২৩

সংখ্যা: ১৯০তম সংখ্যা | বিভাগ:

[সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন-এর জন্যে এবং অসংখ্য দুরূদ ও সালাম আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি। আল্লাহ পাক-এর অশেষ রহ্মতে “গবেষণা কেন্দ্র মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ”-এর ফতওয়া বিভাগের তরফ থেকে বহুল প্রচারিত, হক্বের অতন্দ্র প্রহরী, বাতিলের আতঙ্ক ও আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদায় বিশ্বাসী এবং হানাফী মাযহাব-এর অনুসরণে প্রকাশিত একমাত্র দলীলভিত্তিক যামানার তাজদীদী মুখপত্র “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পত্রিকায় যথাক্রমে- ১. টুপির ফতওয়া (২য় সংখ্যা) ২. অঙ্গুলী চুম্বনের বিধান (৩য় সংখ্যা) ৩. নিয়ত করে মাজার শরীফ যিয়ারত করা (৪র্থ সংখ্যা) ৪. ছবি ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় হারাম হওয়ার ফতওয়া (৫ম-৭ম সংখ্যা) ৫. জুমুয়ার নামায ফরযে আইন ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতওয়া (৮ম-১০ম সংখ্যা) ৬. মহিলাদের মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী সম্পর্কে ফতওয়া (১১তম সংখ্যা) ৭. কদমবুছী ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১২তম সংখ্যা) ৮. তাহাজ্জুদ নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৩তম সংখ্যা) ৯. ফরয নামাযের পর মুনাজাত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৪-২০তম সংখ্যা) ১০. ইন্জেকশন নেয়া রোযা ভঙ্গের কারণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২১-২২তম সংখ্যা) ১১. তারাবীহ্-এর নামাযে বা অন্যান্য সময় কুরআন শরীফ খতম করে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়িয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২৩-২৪তম সংখ্যা) ১২. তারাবীহ্ নামায বিশ রাকায়াত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২৫-২৯তম সংখ্যা) ১৩. দাড়ী ও গোঁফের শরয়ী আহ্কাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩০-৩৪তম সংখ্যা) ১৪. প্রচলিত তাবলীগ জামায়াত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩৫-৪৬তম সংখ্যা) ১৫. আযান ও ছানী আযান মসজিদের ভিতরে দেয়ার আহ্কাম এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৪৭-৫০তম সংখ্যা) ১৬. দোয়াল্লীন-যোয়াল্লীন-এর শরয়ী ফায়সালা এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে  ফতওয়া (৫১-৫২তম সংখ্যা) ১৭. খাছ সুন্নতী টুপি ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে  ফতওয়া (৫৩-৫৯তম সংখ্যা) ১৮. নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে  ফতওয়া (৬০-৮২তম সংখ্যা) ১৯. ইমামাহ্ বা পাগড়ী মুবারকের আহ্কাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত ফতওয়া (৮৩-৯৬তম সংখ্যা) ২০. শরীয়তের দৃষ্টিতে আখিরী যোহ্র বা ইহ্তিয়াতুয্ যোহ্রের আহ্কাম এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৯৭-১০০তম সংখ্যা)  ২১. জানাযা নামাযের পর হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করার শরয়ী ফায়সালা ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১০১-১১১তম সংখ্যা) এবং  ২২. হিজাব বা পর্দা ফরযে আইন হওয়ার প্রমাণ ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১১২-১৩১তম সংখ্যা) ২৩. খাছ সুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তা এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৪০তম সংখ্যা) ২৪. হানাফী মাযহাব মতে ফজর নামাযে কুনূত বা কুনূতে নাযেলা পাঠ করা নাজায়িয ও নামায ফাসিদ হওয়ার কারণ এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৩২-১৫২তম সংখ্যা) ২৫. ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বকাপ ফুটবল বা খেলাধুলা’র শরয়ী আহকাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতওয়া (১৫৫তম সংখ্যা) ২৬. হানাফী মাযহাব মতে পুরুষের জন্য লাল রংয়ের পোশাক তথা রুমাল, পাগড়ী, কোর্তা, লুঙ্গি, চাদর ইত্যাদি পরিধান বা ব্যবহার করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৫৩-১৬০তম সংখ্যা)   ২৭.  ইসলামের  নামে গণতন্ত্র ও নির্বাচন করা, পদপ্রার্থী হওয়া, ভোট চাওয়া ও দেয়া হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৬১-১৭৫তম সংখ্যা) পেশ করার পর ১৬৮তম সংখ্যা থেকে-

২৮তম ফতওয়া হিসেবে

“কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” পেশ করে আসতে পারায় মহান আল্লাহ পাক-এর দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

“কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা, করানো ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” দেয়ার কারণ

সুন্নতের পথিকৃত, হক্বের অতন্দ্র প্রহরী, দ্বীন ইসলামের নির্ভীক সৈনিক, সারা জাহান থেকে কুফরী, শিরক ও বিদ্য়াতের মূলোৎপাটনকারী, বাতিলের আতঙ্ক এবং আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদায় বিশ্বাসী একমাত্র দলীলভিত্তিক তাজদীদী মুখপত্র- “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পত্রিকায় এ যাবৎ যত লেখা বা ফতওয়াই প্রকাশ বা পত্রস্থ হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ হবে তার প্রতিটিরই উদ্দেশ্য বা মাকছূদ এক ও অভিন্ন। অর্থাৎ “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এ এমন সব লেখাই পত্রস্থ হয়, যা মানুষের আক্বীদা ও আমলসমূহ পরিশুদ্ধ ও হিফাযতকরণে বিশেষ সহায়ক।

বর্তমানে ইহুদীদের এজেন্ট হিসেবে মুসলমানদের ঈমান আমলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে যারা, তারা হলো ‘ওহাবী সম্প্রদায়’। ইহুদীদের এজেন্ট ওহাবী মতাবলম্বী উলামায়ে ‘ছূ’রা হারাম টিভি চ্যানেলে, পত্র-পত্রিকা, কিতাবাদি ও বক্তব্য বা বিবৃতির মাধ্যমে একের পর এক হারামকে হালাল, হালালকে হারাম, জায়িযকে নাজায়িয, নাজায়িযকে জায়িয বলে প্রচার করছে। (নাঊযুবিল্লাহ)

স্মরণীয় যে, ইহুদীদের এজেন্ট, ওহাবী মতাবলম্বী দাজ্জালে কায্যাব তথা উলামায়ে ‘ছূ’রা প্রচার করছে “ছবি তোলার ব্যাপারে ধর্মীয় কোন নিষেধাজ্ঞা নেই”। (নাউযুবিল্লাহ) সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, “নির্বাচন কমিশনার বলেছে, ছবি তোলার বিরুদ্ধে বললে জেল-জরিমানা হবে, নির্বাচন কমিশনার ভোটার আই.ডি কার্ডের জন্য ছবিকে বাধ্যতামূলক করেছে এবং ছবির পক্ষে মসজিদে, মসজিদে প্রচারণা চালাবে বলেও মন্তব্য করেছে। আর উলামায়ে ‘ছূ’রা তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছে যে, “রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে পুরুষ-মহিলা সকলের জন্যেই ছবি তোলা জায়িয।” (নাঊযুবিল্লাহ) শুধু তাই নয়, তারা নিজেরাও অহরহ ছবি তুলে বা তোলায়।

অথচ তাদের উপরোক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, চরম বিভ্রান্তিকর ও কুফরীমূলক। তাদের এ বক্তব্যের কারণে তারা নিজেরা যেরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তদ্রুপ তাদের উক্ত কুফরীমূলক বক্তব্য ও বদ্ আমলের কারণে সাধারণ মুসলমানগণ ই’তিক্বাদী বা আক্বীদাগত ও আ’মালী বা আমলগত উভয় দিক থেকেই বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

কারণ, তাদের উক্ত বক্তব্যের কারণে যারা এ আক্বীদা পোষণ করবে যে, “রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ছবি তোলা জায়িয” তারা ঈমানহারা হয়ে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হবে। কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম বা নাজায়িযকে হালাল বা জায়িয বলা কুফরী। কেননা কিতাবে স্পষ্টই উল্লেখ আছে যে,

استحلال المعصية كفر.

অর্থাৎ, “গুনাহের কাজ বা হারামকে হালাল মনে করা কুফরী।” (শরহে আক্বাইদে নাসাফী।)

অতএব, বলার আর অপেক্ষাই রাখেনা যে, উলামায়ে “ছূ”দের উক্ত বক্তব্য সাধারণ মুসলমানদের আক্বীদা বা ঈমানের জন্য বিশেষভাবে হুমকিস্বরূপ।

অনুরূপ “ছবি তোলার ব্যাপারে ধর্মীয় কোন নিষেধ নেই বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সকলের জন্যে ছবি তোলা জায়িয” উলামায়ে “ছূ”দের এ কুফরীমূলক বক্তব্য মুসলমানদের আমলের ক্ষেত্রেও বিশেষ ক্ষতির কারণ। কেননা যারা তাদের উক্ত বক্তব্যের কারণে ছবি তুলবে (যদিও হারাম জেনেই তুলুক না কেন) তারা আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব কর্তৃক নিষিদ্ধকৃত কাজে তথা হারাম কাজে মশগুল হবে যা শক্ত আযাব বা কঠিন গুনাহের কারণ। কেননা হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

قال حدثنا الاعمش عن مسلم قال كنا مع مسروق فى دار يسار بن نمير فراى فى صفته تماثيل فقال سمعت عبد الله قال سمعت النبى صلى الله عليه وسلم يقول ان اشد الناس عذابا عند الله المصورون.

অর্থঃ হযরত আ’মাশ রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণনা করেন তিনি বলেন, আমি হযরত মাসরূক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে ইয়াসার ইবনে নুমাইর-এর ঘরে ছিলাম, তিনি উনার ঘরের মধ্যে প্রাণীর ছবি দেখতে পেলেন, অতঃপর বললেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক কঠিন শাস্তি দেবেন, যে ব্যক্তি প্রাণীর ছবি তোলে বা আঁকে।” (বুখারী শরীফ ২য় জিঃ, পৃঃ ৮৮০)

উক্ত হাদীছ শরীফ-এর ব্যাখ্যায় “উমদাতুল ক্বারী শরহে বুখারীতে” উল্লেখ আছে,

وفى التوضيح قال اصحابنا وغيرهم صورة الحيوان حرام اشد االتحريم وهم من الكبائر.

অর্থঃ ‘তাওদ্বীহ’ নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, হযরত উলামায়ে কিরামগণ প্রত্যেকেই বলেন, জীব জন্তুর ছবি বা প্রতিমূর্তি নির্মাণ করা হারাম বরং শক্ত হারাম এবং এটা কবীরা গুাহর অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, উলামায়ে “ছূ”দের উক্ত বক্তব্য ও বদ আমলের কারণে সাধারণ মুসলমানগণ ছবি তুলে প্রকাশ্য হারাম কাজে মশগুল হয়ে কঠিন আযাবের সম্মুখীন হবে যা আমলের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ক্ষতিকর।

কাজেই, যারা এ ধরনের কুফরী আক্বীদায় বিশ্বাসী ও কুফরী বক্তব্য প্রদানকারী তারা ও হক্ব সমঝদার মুসলমানগণ ঈমান ও আমলকে যেন হিফাযত করতে পারে অর্থাৎ মূর্তি বা ছবিসহ সকল বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা অনুযায়ী আক্বীদা পোষণ করতে পারে এবং কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস মোতাবেক আমল করে আল্লাহ পাক-এর রিযামন্দি হাছিল করতে পারে সে জন্যেই “কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত ফতওয়াটি” পুনরায় প্রকাশ করা হলো।

বাতিলপন্থীদের প্রাণীর ছবি সম্পর্কিত আপত্তিকর ও প্রতারণামূলক বক্তব্যসমূহের খন্ডনমূলক জবাব

পূর্ব প্রকাশিতের পর

বাতিলপন্থীদের আপত্তিকর ও

 প্রতারণামূলক বক্তব্য-২০

প্রতারক, ধোকাবাজ, গুমরাহ, জাহিল ও অপব্যাখ্যাকারী বাতিলপন্থী এ আর শাহ আলম মিথ্যা ও অপব্যাখ্যায় ভরা চটি বইয়ের ১১ পৃষ্ঠায় কিছু মানসূখ, অগ্রহনযোগ্য ও জাল বর্ণনা উল্লেখ করে প্রাণীর ছবি বা ভাস্কর্যকে জায়িযের অপচেষ্টা করেছে। যেমন সে লিখেছে,

১. রিসালতের যুগে হযরত রসূলে করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কা’বা শরীফের দেয়ালে অংকিত যীশুর (হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম)-এর প্রতিকৃতি বা প্রতিচ্ছবি মুছে ফেলতে নিষেধ করেন।

২. হযরত বিবি আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গৃহে নয় বছর বয়সে আসার সময় খেলনা পুতুল নিয়ে আসেন। এতে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরক্ত হলে হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা এগুলোকে হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালাম-এর ঘোড়া বলে অবহিত করেন।

৩.  যুদ্ধলব্ধ (গনিমতের) বিভিন্ন তেজসপত্র হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সময় মদীনা শরীফ আসে। মসজিদে নববী বা হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মসজিদে প্রাণীর প্রতিকৃতি খোদিত একটি আতরদানী ছিল। ৭৭৫ সালে  মাহদী এটি নষ্ট করে দেন।

৪.  বিজয়ী মুসলিম বাহিনী আইওয়ান কিসরা  প্রসাদে নানা রকম জীব জন্তুর নক্সাকৃতি ঝুলন্ত কার্পেটের সামনেই নামায আদায় করেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

৫. ৬৯৫ সালে আঃ মালিক প্রথম যে আরবী মুদ্রা প্রচলন করেন তাতে খলীফার প্রতিকৃতি পাওয়া যায়।

৬.   ৭১৯ খ্রীষ্টাব্দে কবি ওমর ইবনে রাবেয়া হজ্জ পালনের জন্য মক্কা শরীফে গেলে জীবন্ত প্রাণীর নক্সা সম্বলিত একটি তাবু দেখতে পান। তাবুটি ছিল উমাইয়া বংশীয় কোন রাজকুমারীর।

খ-মূলক জবাব:

বাতিলপন্থী শাহ আলমের উল্লেখিত ৬টি বক্তব্য গ্রহনযোগ্য নয়। এবং এ বর্ণনাগুলো দ্বারা প্রাণীর ছবি, মূর্তি বা ভাস্কর্য জায়িয প্রমাণিত হয় না। নিম্নে ধারাবাহিকভাবে বিষগুলোর পর্যালোচনা করে সঠিক ফায়সালা তুলে ধরা হলো-

১নং বর্ণনার জবাব

১নং বর্ণনার পর্যালোচনার শুরুতে বলতে হয় যে, শাহ আলমের উক্ত বর্ণনা অগ্রহনযোগ্য ও মানসূখ। আর তার স্বপক্ষে সে কোন দলীলও উল্লেখ করেনি। মূলতঃ উক্ত বর্ণনাটি সীরাতু ইবনে ইসহাক থেকে আল আযরাকী (৮৩৪ খৃ) তার ‘আখবার মক্কা’ গ্রন্থে লিখেন। এছাড়াও মিস্টার আলফ্রেড গিয়োম ইবনে ইসহাক ইংরেজিতে অনুবাদ করে তার নাম দেয় ঞযব ষরভব ড়ভ গঁযধসসধফ ‘দা লাইফ অফ মুহম্মদ’

এখানে মিঃ গিয়োম ইংরেজি অনুবাদে উক্ত বর্ণনাটি যে উল্লেখ করেছে আসলে তা ইবনে ইসহাকে নেই। এ থেকে উক্ত বর্ণনা গ্রহনীয় না হওয়ারই দাবি রাখে।

আল আযরাকীর ‘আখবার মক্কা’-এর দু’স্থানে বর্ণিত আছে, যা সনদসহ বর্ণনা করা হলো:

اخبرنى بعض الحجة عن مسافع بن شيبة بن عثمان ان النبى صلى الله عليه وسلم قال: يا شيبة امح كل صورة فيها الا ما تحت يدى قال قال فرفع يده عن عيسى بن مريم وامه.

অর্থ: আমাকে জনৈক দ্বার রক্ষক সংবাদ দিয়েছেন। তিনি মাসাফি ইবনে শাইবাহ ইবনে উছমান হতে বর্ণনা করেছেন যে, নিশ্চয়ই হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কা বিজয়ের দিন) বলেছিলেন, হে শাইবাহ! আমার হাতের নিচের ছবিছাড়া অন্যসহ ছবি মুছে ফেল। রাবী বলেন: হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত মুবারক সরিয়ে নিলে দেখা গেল হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস্ সালাম  ও তাঁর মাতা হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম-এর ছবি। (আখবার মক্কা লিল আযরাকী ১ম খ- ১৬৮ পৃষ্ঠা -প্রকাশনা দারুস সাক্বাফাহ আল মক্কাতুল মুকাররমাহ-১৯৯৬ ঈসায়ী)

حدثنى جدى عن سعيد بن سالم قال: حدثنى يزيد بن عياض بن جعدبة عن ابن شهاب ان النبى صلى الله عليه وسلم دخل الكعبة يوم الفتح … ووضع كفيه على صورة عيسى بن مريم وامه عليها السلام وقال: امحوا جميع الصور الا ما تحت يدى فرفع يديه عن عيسى بن مريم وامه.

অর্থ: আমার দাদা বর্ণনা করেছেন, হযরত সাঈদ ইবনে সালিম হতে। তিনি বলেন: আমাকে ইয়াযীদ ইবনে আয়াদ্ব ইবনে জু’দুবাহ বর্ননা করেছেন হযরত ইবনে শিহাব যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে। তিনি বলেন, হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন কা’বা শরীফে প্রবেশ করলেন ..। তিনি হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর মাতা-এর ছবির উপর দুহাত রাখলেন এবং বললেন: সকল ছবি মুছে ফেলো তবে আমার দু’হাতের নিচের ছবি ছাড়া।

তারপর তিনি হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর মাতার উপর থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। (উক্ত কিতাবের ১ম খ- ১৬৫ পৃষ্ঠা)

আযরাক্বীর ১ম বর্ণনার পর্যালোচনা:

সনদে بعص الحجبة ‘জনৈক দ্বাররক্ষক’ সম্পূর্ণ مجهول বা অজ্ঞাত বর্ণনাকারী। উছূলের নিয়ম মুতাবেক মাজহুল বা অজ্ঞাত বর্ণনাকারীর হাদীছ গ্রহনযোগ্য নয়।

মতনে উল্লেখ আছে يا شيبة হে শাইবাহ! অথচ এই ছাহাবী হযরত শাইবাহ বিন উছমান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু মক্কা বিজয়ের পরে হুনাইনের যুদ্ধের পর ইসলাম কবুল করেন। যিনি মক্কা বিজয়ের দিন মুশরিকদের পক্ষে অবস্থান করছিলেন এবং হুনাইনের যুদ্ধের পর ইসলাম কবুল করেন; তাকে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক মূর্তি মুছে ফেলার নির্দেশ প্রদান করা একেবারেই কল্পিত কাহিনী ছাড়া কিছু নয়। (উসুদুল গাবাহ লি ইবনিল আছীর ২য় খ- ৫৩৪ পৃষ্ঠা- দারুশ শা’ব বৈরুত, তাহযীবুল কামাল লিল মিযযি ১২ খ- ৬০৪-৬০৭ পৃষ্ঠা মুয়াস্সাসাহ আর রিসলাহ বৈরুত, ১৯৯১ ঈসায়ী) অতএব উক্ত বর্ণনা গ্রহনযোগ্য নয়।

আযরাক্বীর ২য় বর্ণনার পর্যালোচনা:

উক্ত বর্ণনার সর্বশেষ বর্ণনাকারী হযরত ইবনে শিহাব যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনি তাবিয়ী ছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময তার জন্মও হয়নি। আর এ বর্ননায় তার উপরের কোন ছাহাবী বর্ণনাকারী নেই। তাই তার এই হাদীছ مرسل মুরসাল। হাদীছ বিশারদগণের মতে, মুরসাল হাদীছ দুর্বল। (তাহযীবুত্ তাহযীব লিইবনি হাজার আসকালানী ৯ খ- ৫৪ পৃষ্ঠা)

প্রাণীর ছবি নাজায়িযের ছহীহ ও মশহুর হাদীছ শরীফগুলোর বিপরীতে উক্ত বর্ণনা মোটেও গ্রহনযোগ্য নয়।

উক্ত হাদীছ শরীফের মধ্যে একজন রাবী চরম বিতর্কিত রয়েছে। তিনি হলেন ইয়াযীদ ইবনে আয়াদ্ব ইবনে জু’দুরাহ।

এ সম্পর্কে তাহযীবুল তাহযীব লিইবনি হাজার আসকালানী ১১ খ- ৩২৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে,

قال مالك: كذاب. قال يحيى بن معين: ضعيف ليس بشىء قال احمد بن صالح: اظنه كان يضع للناس يعنى الحديث. قال البخارى ومسلم: منكر الحديث. وقال النسائى: عامة ما يروية غير محفوظ.

অর্থ: হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন: উক্ত বর্ণনাকারী মিথ্যুক। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দ্বঈফ বা দুর্বল, যার গ্রহনযোগ্যতা নেই। হযরত আহমদ বিন ছালিহ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন: সে মানুষের জন্য হাদীছ বানাতো। হযরত ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিমা বলেন: ছিকাহ রাবীর বিপরীতে দূর্বল হাদীছ বর্ণনাকারী। হযরত ইমাম নাসায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন: তার অধিকাংশ বর্ণনা ছিকাহ রাবীর বর্ণনার অনুকূলে নয়।

অতএব, প্রমাণিত হলো যে, আর আযরাকীর উক্ত বর্ণনা দুটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ বর্ণনা দ্বারা হুকুম সাব্যস্ত করা মোটেই শরীয়ত সমর্থিত নয়।

২নং বর্ণনার জবাব

২নং বর্ণনার পর্যালোচনায় বলতে হয় যে, বাতিলপন্থী শাহ আলমের প্রদত্ত ২নং দলীল ছবি বা মূর্তি জায়িয প্রমাণ করে না।

মূলত উক্ত বর্ণনাখানা “আছ ছহীহুল বুখারী কিতাবুল আদব বাবুল ইনবিসাত ইলান নাস ২য় খ- ৯০৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে,

عن عائشة رضى الله تعالى عنها قالت كنت العب بالبنات عند رسول الله صلى الله عليه وسلم وكان لى صواحب يلعبن معى وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا دخل ينقمعن منه فيسربهن الى فيلعبن معى.

অর্থ: “হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘরে পুতুল নিয়ে খেলতাম। আমার সাথীরাও আমার সাথে খেলত। যখনই সাইয়্যিদুনা হযরত রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতেন, তখনই তারা পর্দার আড়ালে লুকাতো। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে আমার কাছে পাঠাতেন, তাই আবারো তারা আমার সাথে খেলত।”

মূর্তি, ছবি বা ভাস্কর্যকে জায়িয প্রমাণ করতে গিয়ে উক্ত হাদীছ শরীফকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করা জিহালত বৈ কিছুই নয়। কারণ উক্ত হাদীছ শরীফখানা মানসূখ হওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত। যেমন উক্ত হাদীছ শরীফ-এর ব্যাখ্যায় ‘শরহুল কিরমানী আলাল বুখারীতে উল্লেখ আছে-

واستدل بالحديث على جواز اتخاذ المعتبة من اجل لعب البنات بهن … انه منسوخ بحديث الصور.

অর্থ: “শিশুদের জন্য খেলনা পতুল বা মূর্তি ব্যবহার করাকে বৈধ প্রমাণ করতে গিয়ে কেউ কেউ উক্ত হাদীছ শরীফকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে। … অথচ উক্ত হাদীছ শরীফখানা ছবি ও মূর্তি সম্পর্কিত অসংখ্য হাদীছ শরীফ দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এর হুকুম এখন আর বলবৎ নেই।” (হাশিয়াতুল বুখারী ২য় খ- ৯০৫ পৃষ্ঠা ৬নং হাশিয়াহ)

অতএব, প্রমাণিত হলো যে, পুতুল নিয়ে খেলা সম্পর্কিত হাদীছ শরীফখানা সকলের মতেই মানসূখ। কেননা অসংখ্য হাদীছ শরীফে মূর্তি পুতুল ইত্যাদি তৈরি করতে সরাসরি নিষেধ করা হয়েছে এবং তৈরি করাকে কঠিন গুণাহের কারণ বলা হয়েছে। তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে পতুল তৈরি করা এবং খেলাও নাজায়িয ও হারাম। আর খেলনা পুতুলও যদি কারো ঘরে প্রকাশ্যে থাকে তবে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করবে না ও নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে। উক্ত নামায দোহরায়ে পড়া ওয়াজিব হবে।

৩নং বর্ণনার জবাব

এ আর শাহ আলম কিন্তু কোন রিফারেন্স উল্লেখ করেনি। আর তার প্রদত্ত এই ৩নং বর্ণনায় জালিয়াতী ও অর্থে বিকৃতরূপ দেয়া হয়েছে। মূলত ইবারতে تماثيل ‘তামাছীল’ শব্দ রয়েছে। আর এ শব্দটি আমভাবে প্রাণী ও প্রাণহীন উভয় প্রকার ছবির ব্যাপারে ব্যবহৃত হয়। বর্ণিত উদ্ধৃতিতে تماثيل অর্থ হবে প্রাণহীন বস্তুর নকশা। যেমনটি ইবনু রুস্তার ভূগোল বিষয়গ্রন্থ কিতাবুল আলাক্ব ওয়ান নাফীসা ৭ম খ- ৬৬ পৃষ্ঠায় লেখা আছে,

وحدث عن عبد الله بن محمد بن عمار عن ابيه عن جده قال اتى عمر بن الخطاب بمجمرة فضة فيها تماثيل من الشام فدفعها الى سعد وقال اجمر بها فى الجمعة وفى رمضان قال: فكان سعد يجمر بها وكانت توضع بين يدى عمر بن الخطاب رضى الله تعالى عنه.

অর্থ:  হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুহম্মদ বিন আম্মার তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, শাম (সিরিয়া) হতে হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে একটি রূপার ধুপদানী আনা হয় যাতে (প্রাণহীন বস্তুর) ছবি ছিল। হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সেটি সা’দকে দিয়ে বলেন, এটি দিয়ে জুুমুয়ার দিন ও রমাদ্বান মাসে সুবাসিত কর। রাবী বলেন, হযরত সা’দ সেটি দিয়ে সুবাসিত করত এবং তা হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর সামনে রাখা হতো।

অতএব, বাতিলপন্থী আলম কর্তৃক প্রদত্ত দলীল প্রাণীর ছবি হারাম ও নাজায়িযের পক্ষেই বলে প্রমাণিত হলো।

৪নং বর্ণনার জবাব

পশ্চিমা বামপন্থী প্রিয় শাহ আলম তার ঐতিহাসিক বর্ণনাটি মূলত মি. আর্ণল্ড-এর ইবিড ৮ পৃষ্ঠা থেকে নিয়েছে। যাতে যতসব আজেবাজে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাছাড়া তার দাবি অনুযায়ী আইওয়ান কিসরা দখলকারী হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যে প্রাণীর ছবিযুক্ত কক্ষে নামায আদায় করেছেন এমন কথা কোথাও উল্লেখ নেই।

তাই তার এ দাবী দ্বারা ছবি, ভাস্কর্য ইত্যাদি জায়িয প্রমাণিত হয় না।

৫নং বর্ণনার জবাব

খলীফা আব্দুল মালিক ফাসিক ছিল বলে বিশুদ্ধ তথ্যসূত্রে জানা যায়। আর ফাসিকের পক্ষেই নিজের প্রতিকৃতি মুদ্রায় স্থাপন করা সম্ভব। ফাসিকের কাজ শরীয়ত সমর্থিত নয়।

অতএব, আব্দুল মালিক শরীয়তের দলীল নয়। তাই বাতিল শাহ আলম কর্তৃক প্রদত্ত এসমস্ত অযৌক্তিক উদ্ধৃতি দ্বারা প্রাণীর ছবি জায়িয প্রমাণিত হয় না।

৬নং বর্ণনার জবাব

শাহ আলমের এ উদ্ধৃতি চরম জিহালতীপূর্ণ। কারণ, কোন ব্যক্তি কোথাও প্রাণীর নক্সা দেখতে পেলেই যদি প্রাণীর ছবি হালাল হয়, তাহলে তো মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফে  থাকার পরও অনেক নাফরমান লোককে কুফরী, শিরকী করতে দেখা যায়। তাহলে কি কুফরী, শিরকী করতে হবে।

পবিত্র স্থানে থাকার পরও অনেক লোক ব্যভিচার, চুরি, ডাকাতি, মদ, জুয়া ইত্যাদি হারাম কাজ করে থাকে। এমনকি মুনাফিক সরদার উবাই বিন সুলুল ও তার চেলারা মদীনা শরীফেই অবস্থান করেছিল। তাই বলে কি পবিত্র স্থানে মুনাফিকী করা বা হারাম কাজ করা জায়িয হবে? শাহ আলম সাহেব জবাব দেবেন কি?

অতএব, উক্ত উদ্ধৃতি দ্বারা প্রাণীর ছবি হালাল প্রমাণিত হয় না। বরং শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রাণীর ছবি, ভাস্কর্য ও মূর্তি ইত্যাদি হারাম ও নাজায়িয

বাতিলপন্থীদের আপত্তিকর ও

 প্রতারণামূলক বক্তব্য-২১

মাসিক পৃথিবী মে/২০০৯ সংখ্যার ৪০-৪১ পৃষ্ঠায় প্রাণীর ছবিকে জায়িয বলা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ।

যেমন: সেখানে বলা হয়েছে-

১. ঘ. প্রাণীর ছবিযুক্ত বস্তুর অসম্মানজনক ব্যবহার বৈধ। যেমন বিছানার চাদর, পাপোষ, বা ফ্লোরমেটে ব্যবহৃত ছবি।

২. তবে পাসপোর্ট ও আইডিকার্ডসহ নানা প্রয়োজনে প্রয়োজনমাফিক ছবি তোলা জায়িয।

খণ্ডনমূলক জবাব:

১. সম্মানজনক হোক বা অসম্মানজনক হোক কোন অবস্থাতেই প্রাণীর ছবিযুক্ত জিনিস ব্যবহার করা যাবে না। তাই, বিছানার চাদর, পাপোষ বা ফ্লোরমেটে ব্যবহৃত ছবি কখনোই শরীয়ত সমর্থিত নয়।

وفى التوضيح قال اصحابنا وغيرهم صورة الحيوان حرام اشد التحريم وهم من الكبائر سواء صنعه لما يمتهن او لغير فحرام بكل حال لان فيه مضاهاة لخلق الله وسواء كان فى ثوب او بساط او دينار او درهم او فلس او اناء او حائط.

অর্থ: ‘তাওজীহ’ নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, জীব জন্তুর ছবি বা প্রতিমূর্তি নির্মাণ করা নিষেধ, বরং কঠোর নিষিদ্ধ কাজ (অর্থাৎ হারাম) এটা কবীরাহ গুনাহ। চাই ওটাকে যত্ন বা সম্মান প্রদর্শন করুক কিংবা অন্য যে কোন উদ্দেশ্যেই বানিয়ে থাকুক। কেননা এরূপ কাজে আল্লাহ পাক-এর সৃষ্টির অনুকরণ করা হয়। ওটা বস্ত্রে, বিছানায়, মোহরে, মুদ্রায়, পয়সায়, পাত্রে কিংবা প্রাচীর গাত্রে যে কোন স্থানে আঁকা বা নির্মাণ করা হারাম। (উমদাতুল ক্বারী, ফতওয়ায়ে ছিদ্দীকিয়া ৩৭৮ পৃষ্ঠা, আল জাওয়াজির ২য় জিঃ ৩৩ পৃষ্ঠা)

রঈসুল মুহাদ্দিছীন, আল্লামা ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত মুসলিম শরীফ-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ “শরহে নববী” ৭ম জিঃ ৮১ পৃষ্ঠায় লিখেন,

تصوير صورة الحيوان حرام شديد التحريم وهو من الكبائر لانه متوعد عليه بهذا الوعيد الشديد المذكور فى الاحاديث وسواء صنعه بما يمتهن او بغيره فصنعته حرام بكل حال لان فيه مضاهاة لخلق الله تعالى.

অর্থ: প্রাণীর ছবি তৈরী করা শক্ত হারাম ও কবীরা গুণাহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা হাদীছ শরীফসমূহে এ ব্যাপারে কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাণীর ছবি সম্মানের জন্য তৈরী করুক অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে তার একই হুকুম। অর্থাৎ সর্বাবস্থায়ই প্রাণীর ছবি উঠানো হারাম। কেননা এতে স্রষ্টার সাদৃশ্যতা প্রকাশ পায়।”

قال اصحابنا وغيرهم من العلماء تصوير صورة للحيوان حرام شديد التحريم وهو من الكبائر لانه متوعد عليه بهذا الوعيد الشديد المذكور فى الاحاديث سواء صنعه فى ثوب او بساط او دينار او درهم

অর্থ: আমাদের মাশায়িখগণ ও উলামাগণ বলেছেন যে, প্রাণীর ছবি তৈরি করা হারাম, এমনকি গুরুতর হারাম। এটা কবীরাহ গুনাহ। কেননা এরূপ কাজের জন্য বিশেষ ভীতিপ্রদ অবস্থা হাদীছ শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। ওটা কাপড়ে, বিছনায়, মোহরে, টাকা-পয়সায় কিংবা যেকোন স্থানে আঁকা থাকুক না কেন তা সমান কথা। (মিরকাত শরহে মিশকাত, ফতওয়ায়ে ছিদ্দীকিয়া ৩৭৯ পৃষ্ঠা, নাইলুল আওতার ২য় জিঃ ১০৫ পৃষ্ঠা)

২. তাদের ২নং ভ্রান্ত ফতওয়ার জবাবে বলতে হয় যে, ইসলাম পরিপূর্ণ দ্বীন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْـمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيْتُ لَكُمُ اِلاسْلامَ دِيْنًا.

অর্থঃ “আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সমাপ্ত করলাম। তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সমাপ্ত করলাম। আর ইসলামকেই তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করে সন্তুষ্ট রইলাম।” (সূরা মায়িদা-৩)

অর্থাৎ দ্বীন ইসলামে সব বিষয়ের ফায়সালাই রয়েছে। তাছাড়া আল্লাহ পাক যে শুধু দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন তাই নয়। বরং এর সাথে সাথে দ্বীন ইসলামকে সহজও করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِى الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ

অর্থঃ ‘আল্লাহ পাক তোমাদের জন্য দ্বীনকে কঠিন করেননি।’ (সূরা হজ্জ-৭৮)

অন্যত্র আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন,

يُرِيْدُ اللهُ  بِكُمُ الْيُسْرَ وَلا يُرِيْدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

অর্থঃ ‘আল্লাহ পাক তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।’ (সূরা বাক্বারা-১৮৫)

অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,

لا اِكْرَاهَ  فِى الدِّيْنِ

অর্থাৎ “দ্বীনের মধ্যে কোন প্রকার কাঠিন্যতাা নেই।” (সূরা বাক্বারা- ২৫৬)

আর হাদীছ শরীফে উল্লেখ আছে,

ان الدين يسر

অর্থাৎ, ‘দ্বীন বা শরীয়ত হচ্ছে সহজ।’

তাই ইসলাম কোন ক্ষেত্রেই যেমন বাড়াবাড়ি বা জোড় জবরদস্তী করেনি বা করার অনুমতিও দেয়নি তেমনিভাবে কঠিনও করেনি। বরং সহজ করে দিয়েছে। যেমন- ফরয নামাযের সময় ক্বিয়াম করা বা দাঁড়ানো হচ্ছে ফরয। এখন কেউ যদি এরূপ হয় যে, সে দাড়াতে সক্ষম নয় তার ব্যাপারে শরীয়তের ফায়ছালা কি? তার ব্যাপারে শরীয়তের ফায়ছালা হলো সে যদি দাড়াতে না পারে তবে সে বসে বসেই নামায আদায় করবে। যেহেতু সে দাড়ানোর ব্যাপারে মাজুর বা অক্ষম।

অনুরূপভাবে হারাম খাওয়া সকলের জন্যই হারাম। কিন্তু কেউ যদি একাধারে তিনদিন না খেয়ে থাকে তার নিকট যদি কোন হালাল খাদ্য মওজুদ না থাকে তবে তার ব্যাপারে শরীয়তের ফায়ছালা কি” তার ব্যাপারে শরীয়তের ফায়ছালা হলো- এমতাবস্থায় হারামটা তার জন্য মুবাহ হয়ে যায় জীবন রক্ষার্থে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক বলেন,

فَاتَّقُوا الله مَا اسْتَطَعْتُمْ

অর্থাৎ, “তোমরা আল্লাহ পাককে ভয় কর তোমাদের সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী। (সূরা তাগাবুন-১৬)

অর্থাৎ সাধ্যের বাইরে শরীয়ত কাউকে কোন আদেশ করেনি।

আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন,

لاَ يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا  اِلاَّ وُسْعَهَا

অর্থাৎ, আল্লাহ পাক কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না। (সূরা বাক্বারা-২৮৬)

 আর উছুলের কিতাবে উল্লেখ আছে,

الضرورة تبيح الـمحذورات

অর্থাৎ, জরুরত হারামকে ‘মুবাহ’ করে দেয়। (উছূলে বাযদূবী, উছূলে কারখী)

শরীয়তের পরিভাষায় এরূপ অবস্থাকে ‘মাজুর বা অপরাগতা’ বলা হয়। ফিক্বাহ-এর কিতাবসমুহে এরূপ অসংখ্য মা’জুর এর মাসয়ালা বর্ণিত রয়েছে।

তাই পাসপোর্ট-এর ব্যাপারে শরীয়তের ফায়সালা হলো  যদি কারো পক্ষে দেশে থেকে জরুরত আন্দাজ হালাল কামাই করা সম্ভব না হয় এবং কেউ এরূপ অসুস্থ হয় যে- দেশে তাকে চিকিৎসা করে ভাল করা সম্ভব নয় বিদেশে নিলে ভাল হবে এক্ষেত্রে মা’জুর হিসেবে ছবিসহ পাসপোর্ট করে বিদেশ যেতে পারবে। এছাড়া ভ্রমণ বা জরুরত ব্যতীত অন্যকোন কারণে ছবিসহ পাসপোর্ট করা জায়িয নেই।

আর আইডি কার্ড-এর ব্যাপারে শরীয়তের ফায়সালা হলো, সাধারণভাবে কোন প্রকার আইডি কার্ড বা পরিচয় পত্রের জন্যই ছবি তোলা জায়িয নেই। ভোটার আইডি কার্ড ও ন্যাশনাল আইডি কার্ডের জন্যও ছবি তোলা জায়িয নেই। কারণ এগুলো কোনটাই জরুরতের মধ্যে পড়ে না। কাজেই সাধারণভাবে এক্ষেত্রে মা’জুরের মাসয়ালাও গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে হ্যাঁ সরকার বা কোম্পানী অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যদি জোরপূর্বক ছবিসহ পরিচয় পত্র করতে বাধ্য করে আর পরিচয় পত্র না করলে যদি চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে সেক্ষেত্রে সে মা’জুর বলে গণ্য হবে।

(অসমাপ্ত)

পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা শরীফ এবং মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খ¦তামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের মানহানীকারীদের একমাত্র শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আখাছ্ছুল খাছ সম্মানিত বিশেষ ফতওয়া মুবারক (৩০তম পর্ব)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা শরীফ এবং মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত ও দিন মুবারক উনাদের সম্মানিত আমল মুবারকসমূহ উনাদের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৫৭তম পর্ব)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা শরীফ এবং মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে- মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক যারা ভাঙবে, ভাঙ্গার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে বা সমর্থন করবে তাদের প্রত্যেকের শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া- (পর্ব-৩১)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা শরীফ ও মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৭৫

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা’ শরীফ এবং মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে-মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সুন্নতী লিবাস বা পোশাক পরিধান করা প্রত্যেক ঈমানদার পুরুষ ও মহিলা উনাদের জন্য ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (পর্ব-৮)