জুমাদাল উখরা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

সংখ্যা: ১০৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ

আরবী মাসসমূহের ষষ্ঠ মাস হচ্ছে “জুমাদাল উখ্রা।” ‘জুমাদা’ শব্দটি মুয়ান্নাছ (স্ত্রী লিঙ্গ) তার অর্থ ‘জমাট পানি’ বা ‘বরফ।’ সে হিসেবে তার পরে “উখরা” শব্দটিও ‘আখির’ শব্দ থেকে মুয়ান্নাছ এবং এর অর্থ শেষ।

            অধিকাংশ মতে  নুবুওওয়াতের  প্রায় তিন বৎসর পূর্বে ২০শে জুমাদাল উখরা  মুসলিম জাহানের রমণীকুল শিরোমণি খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হযরত খাদীজা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর  রেহেম শরীফে ধারণকৃত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সর্বকণিষ্ঠা কন্যা ছিলেন। রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং তাঁর এই উত্তম কন্যাটির নাম রাখেন ফাতিমা। এটি তাঁর মূল নাম। এছাড়াও আরো কয়েকটি লক্বব বা গুণবাচক নামে তিনি পরিচিতা হয়ে আছেন। যেমন, সাইয়্যিদা, ত্বহিরা, যাহ্্রা, যাকিয়া, রদ্বিয়া, মারদ্বিয়া ও বতুল।

            “সাইয়্যিদা”- অর্থ শ্রেষ্ঠা, সরদার। তিনি এ লক্ববে ভূষিত হয়েছিলেন এ কারণে যে, ‘তিনি দুনিয়ায় যেমন নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারিনী তেমনি বেহেশ্তেও হবেন রমণীকুলের সরদার বা সম্রাজ্ঞী।’

            “ত্বহিরা”- ত্বহিরা অর্থ পবিত্রা। এ লক্ববটি  বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ  উভয় প্রকার পবিত্রতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এ লক্ববটি দেয়ার একটা কারণ হলো এই যে, মহিলাদের সন্তান হওয়ার পর নামায তরক করতে হয়। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি আছরের নামায পড়ার পরই তাঁর প্রতিটি সন্তানই জন্মগ্রহণ করেছেন। অতঃপর মাগরিব থেকে যথারীতি তিনি নামায আদায় শুরু করেন। অর্থাৎ তাঁর এক ওয়াক্ত নামাযও তরক হয়নি।

            “যাহ্রা”-  অর্থ কুসুুমকলি বা ফুল। বাস্তবিক পক্ষে তিনি একটি অনুপম সুন্দর সুরভিত কুসুম কলির মতোই রূপে-গুণে সুষমা মন্ডিত ছিলেন।

            “যাকিয়া”- অর্থ বুদ্ধিমতি,  প্রখর মেধার অধিকারিনী। লক্ববটি দেয়া হয়েছিল এজন্য যে, তিনি কোন বিষয় শোনা মাত্রই তা  আয়ত্ত করে ফেলতেন।

            “রদ্বিয়া”-অর্থ সন্তুষ্ট। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে অবিচলভাবে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্ পাক-এর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির উপর পূর্ণ নির্ভরশীল।   “মারদ্বিয়া”- অর্থ সন্তুষ্টিপ্রাপ্তা। এ লক্ববটি এজন্য যে, তিনি আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হয়েছিলেন।       “বতুল”- অর্থ ভোগ-লিঞ্ঝা বর্জনকারিনী। তাঁর এ লক্ববটি হয়েছিল এ কারণে যে, তিনি পার্থিব ভোগ-লিঞ্ঝা ইত্যাদি সব কিছুই  একেবারে বর্জন করেছিলেন।

            তাঁর সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বেহেশ্তবাসিনী রমণীগণের সাইয়্যিদা হবেন।”          হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, “হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা আমার দেহের অংশ। যে ব্যক্তি হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে কষ্ট দেয় সে যেন আমাকেই কষ্ট দেয়। আর যে তাঁকে শান্তি দান করে সে যেন আমাকেই শান্তি দান করে।”     এসব হাদীস শরীফ দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে, হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর মর্যাদা এবং ফযীলত কত উর্ধ্বে।

            হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং ছূরত-সীরতের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিদর্শণসমূহই ফুটে উঠতো। জ্ঞানে-গুণে, কাজে-কর্মে, ত্যাগে-সাধনায়, কষ্ট-সহিষ্ণুতায় এবং মাধুর্যময় চরিত্র মহিমায় তিনি ছিলেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই আদর্শের উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি পিতা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মাতা উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর নিকট থেকেই শিক্ষা লাভ করেন।

            তাঁর বিবাহ্ হয়েছিল খুলাফা-ই-রাশিদীনের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সাথে। তাঁর দু’ছেলে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর মাধ্যমেই রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশ জারী রয়েছে এবং তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। তাঁদের বংশধরকেই সাইয়্যিদ বলা হয়।

             অতএব, হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা যে নারী জগতের এক বিস্ময়কর আদর্শ এবং সমগ্র নারীকুলের উর্ধ্বে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। শুধু ইহজগতেই নয় পরজগতেও তিনি হবেন বেহেশ্তবাসিনী রমণীকুলের সাইয়্যিদা।

রবীউল আউয়াল মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

রবিউস্ সানী মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

জুমাদাল উলা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

রজব মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

শা’বান মাস, শবে বরাত ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা