আল বাইয়্যিনাত বিভেদের দেয়াল তুলে সকলকে আলেমে দ্বীনে পরিণত করছে Divide and rule এই ছিল সাম্রাজ্যবাদী ইংল্যান্ডের শাসন এবং শোষনের মূলনীতি। কোন অঞ্চল, জাতিকে শাসন এবং শোষনের আওতাভুক্ত করতে বিভেদ তৈরী করে তাদের শক্তিমত্তা, অটুট বন্ধন টুটে দিয়ে দুর্বল থেকে দূর্বলতর করে দিয়ে খুব সহজেই তাদেরকে করায়ত্ত করা ছিল তাদের কূট কৌশল। ১৭৫৭ সালের পটভূমিকায়ই কেবল নয় বরং দু’শ বছরের সাম্রাজ্যবাদী শোষনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তারা এ কুটপ্রক্রিয়া ছলে বলে কৌশলে সবক্ষেত্রে বজায় রেখেছে। বিশেষতঃ শিক্ষাক্ষেত্রে তারা এ বিষয়ে আরো জোরদার পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৮১৩ সাল থেকে যখন ইংরেজ তত্ত্বাবধানে এদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন তিন ধারার মতের কথা উঠে। প্রথমতঃ দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমুন্নত করার কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে ভারত-উপমহাদেশের মোঘল আমল থেকে প্রচলিত মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করা হলে ইসলামী চেতনাবোধ সার্বজনীনভাবে উজ্জীবিত হতে পারত কিন্তু খুব সহজ বোধগম্য কারণেই ইংরেজরা তা করেনি। এরপর দ্বিতীয় মতটি ছিল তৎকালে মিশনারীরা খ্রীষ্টান বানাবার প্রক্রিয়ায় তথাকথিত যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল তা প্রবর্তন করা। কিন্তু বিষয়টি খুব বেশী রাখ-ঢাকের বাইরে হয়ে যায় বিধায়, মুসলিম রোষের ভয়ে তা থেকে বিরত থাকা হল। এরপর কৌশলগতভাবে পাশ্চাত্যের অনুকরণে প্রকৃতপক্ষে ইংরেজ পদলেহী কেরানী তৈরীর যে শিক্ষা-ব্যবস্থা প্রণয়নের তৃতীয় মতটি কার্যকর হল তা ছিল তাদের সুদূর প্রসারী মুসলিম বিদ্বেষী জঘন্য নীল-নকশা। ফা প্রতিভাত হয়েছে এর প্রণেতা লর্ড উইলিয়াম মেকলের কথায়। সে বলেছিল, “আমরা এদেশ থেকে চলে যাব ঠিকই, কিন্তু আমরা এদেশে এমন একটা জনগোষ্ঠী রেখে যাব, যারা রক্ত-গোশৃক্ত, চেহারায় হবে এদেশীয় কিন্তু তাদের চিন্তা চেতনায়, তারা হবে ইংরেজ।” তার বাস্তব চিত্র আজ পরিস্কারভাবে দৃশ্যমান। এদেশের সাধারণ-মানুষ আজ শার্ট-প্যান্ট ইত্যাদি পোশাকে অভ্যন্ত। অথচ এ পোশাক হতে পারত এদেশীয় ভৌগলিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অথবা সঙ্গত কারণে ধর্মীয় চেতনাবোধ থেকে। প্রথম ক্ষেত্রে হতে পারত ফতুয়া, লুঙ্গী আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে স্বভাবতই মুসলমানদের জন্য সুন্নতী পোশাক তথা লম্বা গোল কোর্তা, ফাড়া লুঙ্গী, পাগড়ী-রুমাল, চামড়ার চটি স্যান্ডেল ইত্যাদি। কিন্তু বর্ণিত দুটির একটিও আজ সাধারণের মাঝে দৃশ্যমান নয়। অফিসের পিয়নও আজ দাড়ি রাখতে ভয় পায়। এ ভয়, অপরজনের কাছ থেকে হুজুর ডাক শোনার ভয়: কফিল শুজর সমাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ভয়, তথাকথিত সাহেব সমাজ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভয়। বলা বাহুল্য, তথাকথিত এই সাহের সমাজ কথিত ইসলামী লেবাছে ভুষিতদের হুজুর সম্বোধন করে নিজেদেরকে নন হুজুর বলেই প্রতিপন্ন করে। আর এখানেই অনিবার্যভাবে তৈরী হয় একটা বিভেদের দেয়াল। বলার অপেক্ষা রাখেনা এ বিভেদ সে ইংরেজদের Divide and rule “বিভেদ তৈরী কর এবং শাসন কর” এ নীতির ভিত্তিতে প্রণীত সে পাশ্চাত্য কৃষ্টি সম্পৃক্ত শিক্ষা ব্যবস্থাবই কুফল। এর এতই করুণ পরিণতি যে মুসলমানের সন্তান, কথিত। পড়া-শোনা জানা উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি, রবি ঠাকুরের অনেক বড়। বড় কবিতা যার মুখস্থ, আন্তর্জাতিক ল’রিপোর্টের অনেক নজীর যার ঠোটস্থ, চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক রেফারেন্স বইয়ের অনেক জটিল-জটিল, বিশাল-বিশাল অধ্যায় যার কণ্ঠস্থ, আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যাপক পাঠে যে অভ্যস্থ; সামান্য মিলাদ-শরীফের দোয়া পড়তে সে নিতান্তই অসহায়, বাবার জানাযার নামাজের তিন-চার লাইনের আরবী নিয়ত পড়তে সে বড়ই অক্ষম, নিজ টাকায় কেনা কুরবানীর গরু, নিজ সংগ্রহের ছুরি দিয়ে জবাই। করতে সে নিতান্তই অপ্রস্তুত। অর্থাৎ কিমা মুসলমানের সন্তান। সাধারণ ধর্মীয় অনুষঙ্গ পালন করতে গিয়ে এখন অনেকটা পরাশ্রয়ী হয়ে পড়ছে। শুধু আকিকা আর সুন্নতে খৎনার আনুষ্ঠানিকতা নয়, নামাজ-কালাম, রোজা থেকে আরম্ভ করে যাবতীয় ইসলামী। বিধানের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের তৈরী আপন অজ্ঞতার বলয়ে বাস করে তথাকথিত হুজুর নির্ভর হয়ে একটা অব্যাহত হীনমন্যতায় ভুগছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষের নেই একথা সত্য; তার চেয়েও লজ্জাস্কর সত্য এই যে, এই অবস্থাকেই যুগে যুগে ধরে রাখতে চেয়েছে, ধর্মের নামে ব্যবসায়ী, স্বার্থান্বেষী, রাজনৈতিক ফায়দা লোভী ওলামায়ে “চু”। সেই চৌদ্দ শতকেই শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল। সাধারণের। মাতৃভাষা ফার্সীতে তিনি কুরআন শরীফের অনুবাদ করে। দিয়েছিলেন এই ছিল ওলামায়ে “হু “দের কাছে তাঁর অপরাধ। বলাবাহুল্য, এর ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান। যে প্রেক্ষিতে কুরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ প্রথম প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে। গিরিশ চন্দ্র সেন। কিন্তু সে ধারাবাহিকতায় আজও বিশ্বখ্যাত, গ্রহণযোগ্য তাফসীর গ্রন্থের অনুবাদ হয়নি বা প্রকাশ পায়নি। পঞ্চাশের উপর সহীহ্ হাদীসের কিতাবের সংখ্যা থাকলেও আজ পর্যন্ত কথিত সিহাহ সিত্তাহরও পরিপূর্ণ অনুবাদ হয়নি বা প্রকাশ পায়নি। এরপর যে ফতওয়া নিয়ে মুসলিম উম্মাহ বিপাকগ্রস্থ, এক মসজিদের হুজুর যে কথা বলেন, পার্শ্ববর্তী মসজিদের হুজুর। সেক্ষেত্রে ভিন্ন কথা শোনান, আবার একটু দূরবর্তী মসজিদের হুজুর নতুন কথা শোনান, সাধারণ মানুষ সেক্ষেত্রে বড়ই বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েন। প্রথম হুজুর যদি বলেন দুররুল মুখতার কিতাবের কথা, দ্বিতীয় হুজুর বলেন মজমুয়ায়ে ফতওয়ার। কথা, তৃতীয় হুজুর হয়তোবা বলেন ফতওয়ায়ে হিন্দিয়ার কথা। কিন্তু দুররুল মুখতার কিতাবের কথা বললে সাধারণ মানুষ উ। ৎসাহ পায়না, কারণ তাতে কি আছে তা সে জানতে পারেনা,