পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (পর্ব-১)

সংখ্যা: ২৬৪তম সংখ্যা | বিভাগ:

[সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন উনার জন্যে এবং অসংখ্য দুরূদ ও সালাম মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামউনার প্রতি। মহান আল্লাহ পাক উনার অশেষ রহ্মতে “গবেষণা কেন্দ্র মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ” উনার ফতওয়া বিভাগের তরফ থেকে বহুল প্রচারিত, হক্বের অতন্দ্র প্রহরী, বাতিলের আতঙ্ক ও আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদায় বিশ্বাসী এবং হানাফী মাযহাব-উনার অনুসরণে প্রকাশিত একমাত্র দলীলভিত্তিক যামানার তাজদীদী মুখপত্র “মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ” পত্রিকায় যথাক্রমে- ১. টুপির ফতওয়া (২য় সংখ্যা) ২. অঙ্গুলী চুম্বনের বিধান (৩য় সংখ্যা) ৩. নিয়ত করে মাজার শরীফ যিয়ারত করা (৪র্থ সংখ্যা) ৪. ছবি ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় হারাম হওয়ার ফতওয়া (৫ম-৭ম সংখ্যা) ৫. জুমুয়ার নামায ফরযে আইন ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতওয়া (৮ম-১০ম সংখ্যা) ৬. মহিলাদের মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী সম্পর্কে ফতওয়া (১১তম সংখ্যা) ৭. কদমবুছী ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১২তম সংখ্যা) ৮. তাহাজ্জুদ নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৩তম সংখ্যা) ৯. ফরয নামাযের পর মুনাজাত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৪-২০তম সংখ্যা) ১০. ইন্জেকশন নেয়া রোযা ভঙ্গের কারণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২১-২২তম সংখ্যা) ১১. তারাবীহ্-এর নামাযে বা অন্যান্য সময় কুরআন শরীফ খতম করে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়িয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২৩-২৪তম সংখ্যা) ১২. তারাবীহ্ নামায বিশ রাকায়াত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২৫-২৯তম সংখ্যা) ১৩. দাড়ী ও গোঁফের শরয়ী আহ্কাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩০-৩৪তম সংখ্যা) ১৪. প্রচলিত তাবলীগ জামায়াত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩৫-৪৬তম সংখ্যা) ১৫. আযান ও ছানী আযান মসজিদের ভিতরে দেয়ার আহ্কাম এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৪৭-৫০তম সংখ্যা) ১৬. দোয়াল্লীন-যোয়াল্লীন উনার শরয়ী ফায়সালা এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৫১-৫২তম সংখ্যা) ১৭. খাছ সুন্নতী টুপি ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৫৩-৫৯তম সংখ্যা) ১৮. নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উনার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৬০-৮২তম সংখ্যা) ১৯. ইমামাহ্ বা পাগড়ী মুবারকের আহ্কাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত ফতওয়া (৮৩-৯৬তম সংখ্যা) ২০. শরীয়তের দৃষ্টিতে আখিরী যোহ্র বা ইহ্তিয়াতুয্ যোহ্রের আহ্কাম এবং তার সংশ্লিষ্ট ঢ়িবষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৯৭-১০০তম সংখ্যা) ২১. জানাযা নামাযের পর হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করার শরয়ী ফায়সালা ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১০১-১১১তম সংখ্যা) ২২. হিজাব বা পর্দা ফরযে আইন হওয়ার প্রমাণ ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১১২-১৩১তম সংখ্যা) ২৩. খাছ সুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তা এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৪০তম সংখ্যা) ২৪. হানাফী মাযহাব মতে ফজর নামাযে কুনূত বা কুনূতে নাযেলা পাঠ করা নাজায়িয ও নামায ফাসিদ হওয়ার কারণ এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৩২-১৫২তম সংখ্যা) ২৫. ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বকাপ ফুটবল বা খেলাধুলা’র শরয়ী আহকাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতওয়া (১৫৫তম সংখ্যা) ২৬. হানাফী মাযহাব মতে পুরুষের জন্য লাল রংয়ের পোশাক তথা রুমাল, পাগড়ী, কোর্তা, লুঙ্গি, চাদর ইত্যাদি পরিধান বা ব্যবহার করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৫৩-১৬০তম সংখ্যা)  ২৭. ইসলামের নামে গণতন্ত্র ও নির্বাচন করা, পদপ্রার্থী হওয়া, ভোট চাওয়া ও দেয়া হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৬১-১৭৫তম সংখ্যা) ২৮. কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৬৮-২৩৭), ২৯. জুমুয়া ও ঈদাইনের খুৎবা আরবী ভাষায় দেয়া ওয়াজিব। আরবী ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় খুৎবা দেয়া মাকরূহ তাহরীমী ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৯২-১৯৩তম সংখ্যা) ৩০. কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান শবে বরাত-এর আহকাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৯৫-২১৩তম সংখ্যা), ৩১. পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও ক্বিয়াস উনাদের দৃষ্টিতে “কুলাঙ্গার, পাপিষ্ঠ ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে শরীয়তের সঠিক ফায়ছালা ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” (২০৩তম সংখ্যা), ৩২. কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে “হানাফী মাযহাব মতে নামাযে সূরা ফাতিহা পাঠ করার পর ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ে ‘আমীন’ অনুচ্চ আওয়াজে বা চুপে চুপে পাঠ করাই শরীয়ত উনার নির্দেশ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” (২১২তম সংখ্যা), ৩৩. “পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” (২২০তম সংখ্যা-চলমান), ৩৪. “পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত ও দিনের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” (২৩৮-চলমান) পেশ করার পাশাপাশি-

 

৩৫তম ফতওয়া হিসেবে

 

“পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। আলহামদুলিল্লাহ।

খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া দেয়ার কারণ:

সুন্নতের পথিকৃত, হক্বের অতন্দ্র প্রহরী, দ্বীন ইসলাম উনার নির্ভীক সৈনিক, সারা জাহান থেকে কুফরী, শিরকী ও বিদ্য়াতের মূলোৎপাটনকারী, বাতিলের আতঙ্ক এবং আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদায় বিশ্বাসী একমাত্র দলীলভিত্তিক তাজদীদী মুখপত্র- “মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ” পত্রিকায় এ যাবৎ যত লেখা বা ফতওয়াই প্রকাশ বা পত্রস্থ হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ হবে তার প্রতিটিরই উদ্দেশ্য বা মাকছূদ এক ও অভিন্ন। অর্থাৎ “মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ” উনার মধ্যে এমনসব লেখাই পত্রস্থ হয়, যা মানুষের আক্বীদা ও আমলসমূহ পরিশুদ্ধ ও হিফাযতকরণে বিশেষ সহায়ক।

বর্তমানে ইহুদীদের এজেন্ট হিসেবে মুসলমানদের ঈমান আমলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে যারা, তারা হলো “উলামায়ে সূ”। ইহুদীদের এজেন্ট উলামায়ে ‘সূ’রা হারাম টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকা, কিতাবাদি ও বক্তব্য বা বিবৃতির মাধ্যমে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বলছে। অর্থাৎ তাদের বক্তব্য হচ্ছে সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্য  বাল্য বিবাহকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তাই বাল্য বিবাহ করা বা দেয়া যাবে না। নাউযুবিল্লাহ!

অথচ তাদের উপরোক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, চরম বিভ্রান্তিকর ও কুফরীমূলক। তাদের এসব বক্তব্যের কারণে তারা নিজেরা যেরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তদ্রুপ তাদের উক্ত কুফরীমূলক বক্তব্য ও বদ্ আমলের কারণে সাধারণ মুসলমানগণ ই’তিক্বাদী বা আক্বীদাগত ও আ’মালী বা আমলগত উভয় দিক থেকেই বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং হবে। নাউযুবিল্লাহ!

কারণ, তাদের উক্ত বক্তব্যের কারণে যারা এ আক্বীদা পোষণ করবে যে, সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে বাল্যবিবাহকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তাই বাল্যবিবাহ করা বা দেয়া যাবে না। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! তারা ঈমানহারা হয়ে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হবে। কারণ বাল্য বিবাহ শুধু জায়িযই নয় বরং খাছ সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত। আর সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে হালাল বা জায়িয বিষয়কে হারাম বা নাজায়িয বলা এবং হারাম বা নাজায়িযকে হালাল বা জায়িয বলা কুফরী। কেননা কিতাবে স্পষ্টই উল্লেখ আছে যে-

استحلال الـمعصية كفر.

অর্থাৎ “গুনাহের কাজ বা হারামকে হালাল মনে করা কুফরী।” (শরহে আক্বাইদে নাসাফী শরীফ)

অতএব, বলার আর অপেক্ষাই রাখেনা যে, উলামায়ে “সূ”দের উক্ত বক্তব্য সাধারণ মুসলমান উনাদের আক্বীদা বা ঈমানের জন্য বিশেষভাবে হুমকিস্বরূপ।

উল্লেখ্য, বাল্যবিবাহ করতে বা দিতে হবে এরূপ বাধ্যবাধকতা সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে নেই। তবে বাল্যবিবাহ যেহেতু সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে জায়িয ও সুন্নত তাই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বলা যাবে না। বললে কুফরী হবে, ঈমান নষ্ট হবে। নাউযুবিল্লাহ!

অনুরূপ উলামায়ে “সূ”দের এ কুফরীমূলক বক্তব্য মুসলমানদের আমলের ক্ষেত্রেও বিশেষ ক্ষতির কারণ। কেননা যারা তাদের উক্ত বক্তব্যের কারণে প্রয়োজন থাকা স্বত্বেও বাল্যবিবাহ থেকে বিরত থাকবে তারা একটি খাছ সুন্নত পালন করা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অশ্লীল, অশালীন, অসামাজিক কাজে মশগুল হতে পারে। নাউযুবিল্লাহ!

কাজেই, যারা এ ধরনের কুফরী আক্বীদায় বিশ্বাসী ও কুফরী বক্তব্য প্রদানকারী তারা ও হক্ব সমঝদার মুসলমানগণ তারা তাদের ঈমান ও আমলকে যেন হিফাযত করতে পারে অর্থাৎ সকল বিষয়ে সম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা অনুযায়ী আক্বীদা পোষণ করতে পারে এবং পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ মোতাবেক আমল করে মহান আল্লাহ পাক উনার রিযামন্দি হাছিল করতে পারে সে জন্যেই “পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত ফতওয়াটি”  প্রকাশ করা হলো।

 

সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার আলোকে নিকাহ বা বিবাহ-শাদীর ফযীলত

গুরুত্ব ও আহকাম:

 

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَمِنْ ايَاتِه انْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا اِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ ِانَّ فِى ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

অর্থ: মহান আল্লাহ পাক উনার নিদর্শনসমূহের মধ্যে এটাও একটি নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের জন্য  তোমাদের থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের মাধ্যমে শান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে মুহব্বত ও স্নেহ-মমতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই চিন্তাশীল লোকদের জন্য এতে বহু নির্দশন মুবারক রয়েছে। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা রূম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২১)

পবিত্র সূরা রূম শরীফ উনার উল্লিখিত পবিত্র আয়াত শরীফ এবং অন্যান্য পবিত্র আয়াত শরীফ হতে এটা সুষ্পষ্টরূপে বুঝা যায় যে, মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্টি আশরাফুল মাখলূক্বাত মানব জাতিকে মহিলা ও পুরুষ রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং মহিলাকে পুরুষের আহলিয়া (স্ত্রী) রূপে  মাতৃরূপে কন্যা ও ভগ্নিরূপে স্থান দিয়ে মহিলা জাতিকে অনেক সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। তিনিই পুরুষ ও মহিলা উভয়ের মধ্যে মুহব্বত ও স্নেহ-দয়া মায়া মমতা ইত্যাদি দান করেছেন এবং একের উপর অন্যের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, যাতে মানব জাতি মহান আল্লাহ পাক উনার নিয়ামত সমূহের শুকরিয়া আদায় করত উনার প্রদত্ত সুশৃঙ্খল নিয়ম-কানুন অনুযায়ী পরস্পর পরস্পরের হক সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে আদায় করে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সুখ শান্তি, খ¦ইর, বরকত লাভ করতে পারে এবং সাথে সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের খাছ রেযামন্দি ও সন্তুষ্টি মুবারক হাছিল করতে পারে। সুবহানাল্লাহ!

সম্মানিত দ্বীন ইসলাম মানব জাতিকে পারিবারিক আইন সম্পর্কে যত সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল নিয়ম কানুন শিক্ষা দিয়েছেন এবং নারী জাতির প্রতি যে সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করেছেন বিশ্বের কোনো ধর্মেই তা খুঁজে পাওয়া যায় না। মহিলাদেরকে পিতা, মাতা ও আত্মীয় স্বজনের সম্পত্তি হতে এক অংশ এবং স্বামীর সম্পত্তি হতেও এক নির্দিষ্ট অংশ দেয়ার হুকুম দিয়েছেন।  এছাড়াও পুরুষকে তাঁর আহলিয়ার মোহরানা, খোরাক, পোশাক, বাসস্থান প্রদান করার সাথে সাথে তাদের ইজ্জত-সম্মান হিফাযত করত সৎব্যবহার ও স্নেহ সহানুভতির সাথে জীবন যাপন করার মুবারক আদেশ দিয়েছেন। কোন অবস্থায়ই আহলিয়ার মুখম-লে আঘাত না করার আদেশ, জাহিলি যুগের অভ্যাস মত একসঙ্গে তিন বা ততোধিক তালাক না দেয়ার নির্দেশ, ইদ্দতকালে খোরপোষ প্রদানের আদেশ, মোহর আদায় না করে থাকলে ওয়ারিছগণকে তা পরিশোধ করার নির্দেশ, একাধিক আহলিয়ার উপর সমতা রক্ষা করার নির্দেশ, আহলিয়ার খোলা ও তাফভীজ তালাকের অধিকার, মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের পরেই মাতার হক্ব আদায় করার নির্দেশ, মাতার পায়ের নিচে জান্নাত অর্থাৎ উনার হক্ব আদায় ও খিদমত করার মাধ্যমে জান্নাত প্রাপ্তির ঘোষণা; বিধবা, অবিবাহিতা, নাবালিগা, ইয়াতীম ভগ্নি, কন্যা ও নিকট আত্মীয়দের তত্ত্বাবধান, খোরপোষ প্রদান ও সদাচরণের নির্দেশ ইত্যাদি নারী জাতির যথাযথ হক্ব মান মর্যাদা একমাত্র সম্মানিত দ্বীন ইসলামেই রয়েছে। কিন্তু পুরুষের মান-ইজ্জত ও অধিকার এতটুকুও ক্ষুণœ করা হয়নি। পুরুষ ও মহিলাকে স্বভাব সুলভ সমঅধিকার দেয়া হলেও খ¦ালিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আহালকে তার আহলিয়ার সকল বিষয়ের দেখাশুনার দায়িত্ব দিয়েছেন। যেমন ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وللرجال عليهن درجة

অর্থ: আর নারীদের উপরে পুরুষদের মর্যাদা রয়েছে। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২২৮)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

الرجال قوامون على النساء

অর্থ: “পুরুষদেরকে মহিলাদের উপর কর্তত্ব বা দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।” সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৪) অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের পরেই আহাল বা স্বামীর স্থান দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ মু’মিন মুসলমান আহাল বা স্বামীর সম্মানিত শরীয়তসম্মত খিদমত বা তাবিদারী ও সন্তুষ্টির উপর পরকালের খ¦ইর বরকত প্রাপ্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

 

নিকাহ বা বিবাহের উদ্দেশ্য এবং উপকারিতা

 

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ اِلَيْهَا.

অর্থ: “তিনি মহান আল্লাহ পাক যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ (হযরত আবুল বাশার ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম) উনার থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং উনার থেকে উনার সম্মানিতা আহলিয়া উনাকে পয়দা করেছেন এ জন্য যে, তিনি যেন উনার সম্মানিতা আহলিয়া উনার মাধ্যমে ইতমিনান বা শান্তি লাভ করেন। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা আ’রাফ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৮৯)

উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে খাছ করে আমাদের সম্মানিত ও পবিত্র আদি পিতা-মাতা উনাদের উল্লেখ থাকলেও এর দ্বারা সমস্ত আদম সন্তানকেই বুঝানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

هن لباس لكم وانتم لباس لهن

অর্থ: “মহিলাগণ তোমাদের আবরণ এবং তোমরাও মহিলাদের আবরণ অর্থাৎ পুরুষ ও মহিলা একে অন্যের পরিপূরক, অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরের পবিত্র ঈমান, আমল, ইজ্জত ও আবরু হিফাযতের মাধ্যম।” সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৮৭)

অন্যত্র আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

نسائكم حرث لكم

অর্থ: “তোমাদের আহলিয়া উনারা তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র স্বরূপ।” অর্থাৎ বিবাহের আর এক উদ্দেশ্য হচ্ছে নছব বা বংশধারা জারি করা। সুবহানাল্লাহ!

আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّـهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا

অর্থ: “তোমরা আহলিয়াদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করো। যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ করো তবে জেনে রেখো, অতিসত্বর তোমরা যা অপছন্দ করো তাতে মহান আল্লাহ পাক তিনি অনেক খ¦ইর, বরকত দান করবেন।” সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৯)

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

النكاح من سنتى فمن رغب عن سنتى فليس منى

অর্থ: বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জীবনযাপন করা আমার সুন্নত মুবারক। যে ব্যক্তি আমার সুন্নত মুবারক উনাকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করে সে আমার দলভুক্ত নয়।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

الدنيا كلها متاع وخير متاع الدنيا المرأة الصالحة.

অর্থ: “দুনিয়ার সমস্ত কিছুই সম্পদ এবং দুনিয়ার সমস্ত সম্পদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো নেককার আহলিয়া (স্ত্রী)। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

المرأة اذا صلت خمسها وصامت شهرها واحسنت فرجها واطاعت بعلها فلتدخل من اى ابواب الجنة شائت.

অর্থ: “যে আহলিয়া যথাযথভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে, রমাদ্বান শরীফ মাসে রোযা রাখে, নিজের ইজ্জত-আবরু সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করে, আহাল বা স্বামীর হক যথাযথভাবে আদায় করত আহাল বা স্বামীর আনুগত্য করে চলে সে ইচ্ছামত সম্মানিত বেহেশত উনার যে কোনো দরজা দিয়ে অবাধে প্রবেশ করার অধিকার লাভ করবে। সুবহানাল্লাহ! (মিশকাত শরীফ)

উল্লেখ্য যে, যে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের উল্লিখিত পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ পাঠ করবে সে নিকাহ বা বিবাহের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা জানতে ও বুঝতে পারবে। নিকাহ বা বিবাহ শুধু একটি সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ই নয়, এটা একটি পবিত্র ইবাদতও বটে। নিকাহ বা বিবাহ মানুষকে গুনাহ হতে রক্ষা করে, চক্ষু ও মনের চাঞ্চল্য দূর করে এবং ইহকাল ও পরকালে প্রকৃত সুখ শান্তি প্রদান করে। সুবহানাল্লাহ!

মুসলমান উনাদের নিকাহ বা বিবাহের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি মুবারক হাছিলের লক্ষ্যে উনাদের নির্দেশিত নিয়মে নিজেকে পরিচালিত করে নেক সন্তান লাভ করা, যে সন্তান তার ইহকাল ও পরকালে কামিয়াবীর কারণ হবে। এছাড়া সন্তানের মাধ্যম দিয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার মহাসম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের রেযামন্দী বা সন্তুষ্টি হাছিল করে পরকালে কঠিন আযাব গযব থেকে নিজেদেরকে হিফাযত করবে। সুবহানাল্লাহ!

অতএব, নিকাহ বা বিবাহের এত সব উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও যে  ব্যক্তি বা সমাজ মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের নির্দেশসমূহ অমান্য করে নিজেদের ইচ্ছামত এবং বিধর্মীয় রীতিনীতি মোতাবেক নাজায়িয বা হারামভাবে পারিবারিক জীবন যাপন করবে এবং যাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হবে দুনিয়াবী ফায়দা হাছিল অর্থাৎ শ্বশুর পক্ষ হতে যৌতুক নিয়ে জীবন-যাপন করা। তাদের জন্য তাদের আহলিয়া ও সন্তানাদি দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তির পরিবর্তে দুঃখ-কষ্ট ও বিপদেরই কারণ হবে। নাউযুবিল্লাহ!

তাই মহান আল্লাহ পাক তিনি ঈমানদারকে লক্ষ্য করে ইরশাদ মুবারক করেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কোনো কোনো আহলিয়া এবং সন্তান তোমাদের দুশমন অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অর্থাৎ উনাদের হুকুম পালন করা হতে তারা তোমাদেরকে বাঁধা দিবে। অতএব, তাদের অনিষ্টতা হতে সাবধান থাকো।” (পবিত্র সূরা তাগাবূন শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৪)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّـهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ

অর্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের ধনসম্পদসমূহ ও সন্তানসমূহ তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ (পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে) মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট বিরাট পুরস্কার রয়েছে।” সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা তাগাবূন শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ ۖ وَمَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ

অর্থ: “যে ব্যক্তি আখিরাতের ফসল চায়, আমি (মহান আল্লাহ পাক) তাদের ফসল বাড়িয়ে দেই, আর যে দুনিয়ার ফসল চায় আমি তাকে তার কিছু অংশ দেই কিন্তু আখিরাতে তার জন্য কোন অংশ নেই।” (পবিত্র সূরা শুয়ারা শরীফ:: পবিত্র আয়াত শরীফ ২০)। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোনো নেক কাজ করে মহান আল্লাহ পাক তিনি তার এক নেকীর দশগুণ বা ততোধিক আখিরাতে দিবেন এবং দুনিয়ায়ও সে ঐ নেক কাজের বরকত ও সুফল লাভ করবে। সুবহানাল্লাহ! কিন্তু যে শুধু দুনিয়ার জন্যই কোনো কাজ করবে সে দুনিয়ায় তার কর্মের ততটুকু ফল পাবে যা তার জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে, পরকালে সে কোনো প্রতিদান পাবে না। নাউযুবিল্লাহ!

কিরূপ মেয়েকে নিকাহ বা

বিবাহ করা উচিত

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّـهُ

অর্থ: নেককার আহলিয়াগণ উনারা আহালদের অনুগতা হন, হিফাযতকারী হন, আহালদের অনুপস্থিতিতে যা মহান আল্লাহ পাক তিনি হিফাযত করতে বলেছেন। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৪)

এ বিষয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

تنكح المرأة لاربع لمالها ولحسبها ولجملها ولدينها فاظفر بذات الدين

অর্থ: চারটি বিষয় বিবেচনা করে মেয়ে বা মহিলাকে নিকাহ বা বিবাহ করতে হবে। মাল-সম্পদ, বংশ বা নছবনামা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারী। তোমরা দ্বীনদারীকে প্রাধান্য দিবে। সুবহানাল্লাহ!

বাস্তবিকই দ্বীনদার আহলিয়াগণ সম্মানিত দ্বীন ইসলাম থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা দ্বারা স্বামীর অনুগতা, বিনীতা, শিষ্টাচারিণী, ন্যায়পরায়ণতা, সতী-সাধ্বী ইত্যাদি সৎগুণের অধিকারিণী হয়ে সুখের সংসার গড়ে তুলতে পারেন। কাজেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদেশ ও নির্দেশ মুবারক মুতাবিক দ্বীনদার আহিলয়াকেই বিবাহ করা উচিত অর্থাৎ ফরয।

নিকাহ বা বিবাহের আহকাম

সাধারণ অবস্থায় অর্থাৎ আহলিয়ার খোরপোষ, মোহর ও আহলিয়ার অধিকার আদায়ে সক্ষম হলে বিয়ে করা খাছ সুন্নত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

النكاح من سنتى

অর্থ: নিকাহ বা বিবাহ হচ্ছে আমার সুন্নত মুবারক। সুবহানাল্লাহ! (সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ)

অন্যত্র নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

فمن رغب عن سنتى فليس منى.

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার সুন্নত মুবারক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল অর্থাৎ অস্বীকার করলো সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। (বুখারী শরীফ ২য় খ- ৭৫২ পৃষ্ঠা)

যদি কেউ নিকাহ বা বিবাহ না করলে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা হয় তাহলে তার জন্য নিকাহ বা বিবাহ করা সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে ফরয।

বাদায়ে প্রণেতা হযরত ইমাম কাসানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

لَاخِلَافَ اَنَّ النِّكَاحَ فَرْضٌ حَالَةَ التَّوَقَانِ حَتّٰى اَنَّ مَنْ تاقت نفسه الى النساء بحيث لايمكنه الصبر عنهن وهو قادر على الـمهر والنفقة ولم يتزوج يأثم.

অর্থ: যদি কোনো ব্যক্তির আহলিয়ার মোহর আদায় ও খোরপোষ দেয়ার সামর্থ্য থাকে, আর বেগানা নারী থেকে নিজেকে হিফাযত করার মতো ধৈর্য্যশক্তি না থাকে তবে এ অবস্থায় তার উপর নিকাহ বা বিবাহ করা ফরয হওয়ার ব্যাপারে কারো কোনো ইখতিলাফ নেই।

আর যদি কারো অধিক পরিমাণ আশঙ্কা না হয়। কিন্তু নফসের ওয়াছওয়াছার কারণে যে কোনো সময়ে ব্যভিচারের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে তার জন্য বিবাহ করা সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে ওয়াজিব। উপরোক্ত দু’অবস্থাই মোহর ও খোর পোষের সামর্থ্য থাকতে হবে।

পক্ষান্তরে যদি বিয়ের পর আহলিয়াকে পবিত্র শরীয়ত মুতাবিক চালানো সম্ভব না হয় এবং আহলিয়া বা স্ত্রীর উপর যুলুম অত্যাচার ও তার হক নষ্ট করার প্রবল আশাঙ্কা হয় তাহলে বিবাহ করা নাজায়িয ও হারাম। (বাদায়েউছ ছানায়ে-৩/৩১১ আল বাহরুর রায়েক-৩/১৪০ বিবাহ অধ্যায়)

আর এক্ষেত্রে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ওই ব্যক্তিকে ধারাবাহিকভাবে রোযা রাখার উপদেশ দিয়েছেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

يا معشر الشباب من استطاع منكم الباءة فليتزوج فانه اغض للبصر واحصن للفرج ومن لم يستطع فعليه بالصوم فانه له وجاء.

অর্থ: হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে নেয়। কেননা উহা চক্ষুকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষা করে। আর যে সামার্থ্য রাখে না সে যেন রোযা রাখে। কেননা রোযা (যদি লাগাতার হয়) নফছ বা প্রবৃত্তিকে দমন করে রাখে। সুবহানাল্লাহ! (ছহীহ বুখারী শরীফ-২/৭৫৮, ছহীহ মুসলিম শরীফ-১/৪৪৯)

সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে বালিগ বা বালিগার সংজ্ঞা

সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে ১২ বৎসরের নি¤œ বয়স্ক বালককে নাবালিগ ও ৯ বৎসরের নি¤œ বয়স্কা বালিকাকে নাবালিগা ধরা হয়। ১৫ বৎসরের মধ্যে যদি বালিগ হওয়ার চিহ্ন দেখা না যায় তবে ছেলে বা মেয়ের বয়স ১৫ বৎসর পূর্ণ হলেই বালিগ বা বালিগা বলে গণ্য হবে।

হযরত উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন-

اِذَا بَلَغَتِ الْجَارِيَةُ تِسْعَ سِنِينَ فَهِىَ امْرَأَةٌ

অর্থ: “মেয়েদের বয়স যখন নয় (৯) বছর হবে তখন সে মহিলা হিসেবে অর্থাৎ প্রাপ্ত বয়স্কা বলে গণ্য হবে।” (তিরমিযী ১১০৯, সুনানু কুবরা বায়হাক্বী ১৪২৫, ফতহুল বারী ২/৭১২)

বালকের বালিগ হওয়ার আলামত: ১। ইহতিলাম হওয়া, ২। মনিস্খলন হওয়া ৩। তার দ্বারা কোন স্ত্রীলোক হামেলা হওয়া।

বালিকার বালিগা হওয়ার আলামত: ১। স্বাভাবিক মাজুরতা প্রকাশ পাওয়া ২। ইহতিলাম হওয়া ৩। হামেলা হওয়া।

‘বাল্যবিবাহ’ শব্দের অর্থ

বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান নামক গ্রন্থের ৪৫২ পৃষ্ঠায় বাল্য শব্দের অর্থ লেখা আছে এভাবে-

বাল্য: শৈশব, ছেলেবেলা, বালক বয়স।

বাল্যকাল: বালক বয়স।

বাল্য বিবাহ: শৈশবে সংঘটিত বিবাহ, অপরিণত বয়সে কৃত বিবাহ।

বাল্য শিক্ষা: বালক বয়সের শিক্ষা।

উপরোক্ত শাব্দিক অর্থ দ্বারা এটাই বুঝা যাচ্ছে যে, অপ্রাপ্ত বয়সের বিবাহকেই বাল্য বিবাহ বলে। এখন তা শিশুকালেও হতে পারে, শৈশবকালেও হতে পারে বা কিশোরকালেও হতে পারে।

সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে বিবাহের

বয়স নির্দিষ্ট করা হয়নি

সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে যে কোনো বয়সের ছেলে মেয়ের মধ্যেই বিবাহ বন্ধন বৈধ বা জায়িয। অর্থাৎ পবিত্র ও সম্মানিত শরীয়তসম্মত। কেননা পবিত্র ও সম্মানিত শরীয়ত তথা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের মধ্যে কোথাও বিবাহের বয়স নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে এরূপ একটি জঈফ দলীলও কেউ পেশ করতে পারবে না।

পক্ষান্তরে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে বিবাহের বয়স নির্দিষ্ট করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র “সূরা নিসা শরীফ” উনার ৩নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَاِنْ خِفْتُمْ َاِلَّا تُقْسِطُوا فِى الْيَتَامٰى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنٰى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ

অর্থ: “আর যদি তোমরা ভয় কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের হক্ব যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারজন পর্যন্ত।” (পবিত্র সূরা নিসা শরফি: পবিত্র শরীফ নং ৩)

এবার জানা দরকার ইয়াতীম কাকে বলে, ‘লিসানুল আরব’ অভিধানে ইয়াতীমের সংজ্ঞায় বর্ণিত আছে-

اليتيم: الذي يموت أبوه حتى يبلغ الحلم، فإذا بلغ زال عنه اسم اليتيم، واليتيمة ما لم تتزوج، فإذا تزوجت زال عنها اسم اليتيمة.

অর্থ: ইয়াতীম এমন সন্তানকে বলা হয়, যার পিতা মারা গিয়েছে, বালেগ হওয়া অবধি সে ইয়াতীম হিসাবে গণ্য হবে, বালেগ হওয়ার পর ইয়াতীম নামটি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।  আর মেয়ে সন্তান বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত ইয়াতীম বলে গণ্য হবে, বিয়ের পর তাকে আর ইয়াতীম বলা হবে না।” (লিসানুল আরব ১২/৬৪৫)

পবিত্র  হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইয়াতীম প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে-

قَالَ حَضرت عَلِيُّ بْنُ ابِى طَالِبٍ عليه السلام حَفِظْتُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ ‏لا يُتْمَ بَعْدَ احْتِلاَمٍ

অর্থ: ইমামুল আউওয়াল মিন আহলে বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে আমি পবিত্র হাদীছ শরীফ হিফয করে রেখেছি যে, বালেগ হওয়ার পর  ইয়াতীম থাকে না।” (আবু দাউদ শরীফ ২৮৭৫, সুনানে কুবরা বায়হাক্বী ৬/৫৭ হাদীছ ১১৬৪২, মুজামুল কবীর তাবরানী ৩৪২২, সুনানে ছগীর লি বায়হাকী ২০৪৯, শরহুস সুন্নহ ৯/২০০, ফতহুল বারী ২/৩৪৬, উমদাতুল ক্বারী ২১/১০৭, কানযুল উম্মল ৬০৪৬) এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সনদ উত্তম ও সকল রাবী ছিক্বাহ।

উপরে বর্ণিত পবিত্র আয়াত শরীফে “ইয়াতীম” ও তার ব্যাখ্যায় পবিত্র হাদীছ শরীফ এবং লুগাত থেকে যা বোঝা গেলো, তা হচ্ছে-ইয়াতীম মেয়েদের বিবাহ করা যাবে। আর মেয়েদের মধ্যে ইয়াতীম হচ্ছে সেই সব মেয়ে যারা এখনো বালিগ হয়নি। অর্থাৎ অপ্রাপ্ত বয়স্কা।

এ প্রসঙ্গে একখানা ছহীহ পবিত্র হাদীছ শরীফ আছে যেখানে ইয়াতীমকে বিবাহের বিষয়টা উল্লেখ আছে-

عَنْ حضرت اَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله تعالى عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْيَتِيمَةُ تُسْتَأْمَرُ فِى نَفْسِهَا فَانْ صَمَتَتْ فَهُوَ إِذْنُهَا وَانْ أَبَتْ فَلاَ جَوَازَ عَلَيْهَا.‏ قَالَ وَفِى الْبَابِ عَنْ حضرت ابِى مُوسَى رضى الله عنه وَ حضرت ابْنِ عُمَرَ رضى الله عنه وَ ام الـمؤمنن عَائِشَةَ عليها السلام.‏ قَالَ اَبُو عِيسَى حَدِيثُ حضرت ابِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه حَدِيثٌ حَسَنٌ

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ইয়াতীম কুমারী থেকে তার বিবাহের ব্যাপারে সম্মতি গ্রহণ করতে হবে। যদি সে চুপ থাকে তবে তাই তার সম্মতি বলে গণ্য হবে। আর যদি অস্বীকার করে তবে তার উপর তা কার্যকারী হবে না। এই বিষয়ে হযরত আবূ মূসা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার, হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার এবং উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনাদের থেকেও পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে। ইমাম হযরত আবূ ঈসা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার থেকে বর্ণিত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা হাসান। (ছহীহ আবু দাউদ ১৮২৫, তিরমিযি শরীফ ১১০৯)

সুতরাং প্রমাণিত হলো ইয়াতীম মেয়েকেও বিবাহ করা যাবে, আর ইয়াতীম হচ্ছে তারা যারা এখনো বালিগ হয়নি। অর্থাৎ অপ্রাপ্ত বয়স্কা এ প্রসঙ্গে আরো একটি ছহীহ পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে-

وَقَالَ احْمَدُ وَاسْحَاقُ إِذَا بَلَغَتِ الْيَتِيمَةُ تِسْعَ سِنِينَ فَزُوِّجَتْ فَرَضِيَتْ فَالنِّكَاحُ جَائِزٌ وَلاَ خِيَارَ لَهَا إِذَا أَدْرَكَتْ وَاحْتَجَّا بِحَدِيثِ ام الـمؤمين حضرت عَائِشَةَ عليها السلام اَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم بَنَى بِهَا وَهِىَ بِنْتُ تِسْعِ سِنِينَ

অর্থ: হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ও হযরত ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যখন ইয়াতীম কণ্যার বয়স নয় (৯) বৎসর হয় আর তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয় এবং সে সম্মতি দান করে তবে এই বিয়ে জায়িয। সাবালিকা হওয়ার পর আর তার ইখতিয়ার থাকবে না। উনারা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার ঘটনাকে দলীল হিসাবে পেশ করেন যে, যখন উনার বয়স মুবারক নয় (৯) বৎসর হয়, তখন তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হুজরা মুবারকে তাশরীফ গ্রহণ করেন।

মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِى لَمْ يَحِضْنَ

অর্থ: “তোমাদের (তালাকপ্রাপ্তা) স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস। এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি (নাবালিগা) তাদেরও একই হুকুম। (পবিত্র সূরা ত্বলাক্ব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ নং ৪)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তাফসীরে উল্লেখ আছে-

لـما نزلت هذه الاية (والـمطلقات يتربصن بانفسهن ثلاثة قروء) (سورة البقرة الاية ۲۲۸) سألوا النَّبِيّ صلى الله عليه وسلم فقالوا يا رسول الله ارايت التى لم تحض والتى قد يئست من الـمحيض فاختلفوا فيهما فانزل الله تعالى

অর্থ: যখন পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ উনার ২২৮ নং পবিত্র আয়াত শরীফ অবতীর্ণ হয়েছিল তখন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনারা একমত হতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ঐ সমস্ত মেয়েরা যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি অর্থাৎ অপ্রাপ্ত বয়স্কা এবং ঐ সমস্ত মহিলা যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের হুকুম কি? তখন মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন-

{واللائى لم يحضن} فهن الابكار الحوارى اللاتى لم يبلغن الـمحيض {فعدتهن ثلاثة اشهر

অর্থ: (ঐ সমস্ত স্ত্রী লোক  যারা এখনো ঋতুর বয়সে পৌঁছায়নি) অর্থাৎ এমন কুমারী যারা নাবালিগা (অপ্রাপ্ত বয়স্ক) তাদের ইদ্দত তিন মাস।

পবিত্র সূরা নিসা শরীফ উনার ৩নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইয়াতীম ছেলে মেয়ের নিকাহ বা বিবাহের বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে নাবালিগ নাবালিগা অর্থাৎ অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা অপ্রাপ্তা বয়স্কা ছেলে মেয়ের নিকাহ বা বিবাহ বৈধ।

আর পবিত্র সূরা ত্বলাক্ব শরীফ উনার ৪নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে যেসকল মেয়েরা ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি সেসকল মেয়েদের নিকাহ বা বিয়ের বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যার অর্থ হলো নাবালিগা বা অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের নিকাহ বা বিাবহ বৈধ।

অতএব, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারাই প্রমাণিত হলো যে, সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে নিকাহ বা বিবাহের বয়স নির্দিষ্ট করা হয়নি। যেকোনো বয়সেই নিকাহ বা বিবাহ দেয়া বা করা জায়িয ও সম্মানিত শরীয়ত সম্মত।

তাছাড়া নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত আমল মুবারক দ্বারাও প্রমানিত যে, বিবাহের বয়স নির্দিষ্ট করা হয়নি বরং যেকোনো বয়সেই বিবাহ করা ও দেয়া জায়িয বা সম্মানিত শরীয়তসম্মত। যেমন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উম্মুল মু’মিনীন আল ঊলা  সাইয়্যিদাতুনা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম উনাদের মধ্যে যখন নিসবাতুল আযীম মুবারক সম্পন্ন হয়, তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়াবী বয়স মুবারক ছিলেন ২৫ বছর। আর উম্মুল মু’মিনীন আল ঊলা সাইয়্যিদাতুনা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম উনার দুনিয়াবী বয়স মুবারক ছিলেন ৪০ বছর। সুবহানাল্লাহ!

আবার যখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উম্মুল মু’মিনীন আছছালিছাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনাদের আযীমুশশান আক্বদ মুবারক সম্পন্ন হয়, তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়াবী বয়স মুবারক ছিলেন প্রায় ৫০ বৎসর ৭ মাস। আর উম্মুল মু’মিনীন আছছালিছাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার বয়স মুবারক ছিলেন ৬ বছর। সুবহানাল্লাহ!

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-

واخبرنا ابو عبد الله الحافظ انبا ابو عبد الله محمد بن يعقوب حدثنى ابو جعفر محمد بن الحجاج الوراق ثنا يحيى بن يحيى انبا ابو معاوية عن الاعمش عن ابراهيم عن الاسود عن عائشة عليها السلام قالت : تزوجها رسول الله صلى الله عليه و سلم وهي ابنة ست وبنى بها وهى ابنة تسع ومات عنها وهى ابنة ثمان عشرة سنة

অর্থ: হযরত হাফিয আবু আব্দুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে ইয়াকুব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, আমার কাছে আবু জাফর মুহম্মদ ইবনে হাজ্জাজ ওয়াজরাক্ব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেন, আমার কাছে ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন, যে, আবু মুআবিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আ’মাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত ইবরাহীম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত আসওয়াদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে ৬ বছর বয়স মুবারকে আক্বদ মুবারক করেন এবং উনাকে ৯ বছর বয়স মুবারকে ঘরে তুলে নেন। আর তিনি যখন পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন তখন উনার বয়স মুবারক ছিল ১৮ বছর। (ছহীহ মুসলিম শরীফ)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উল্লেখিত মুবারক আমল উনার মাধ্যম দিয়ে মূলত এটাই ছাবিত করে দেয়া হয়েছে যে, সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে বিবাহের বয়স মুবারক নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। যেকোনো বয়সের ছেলে যেকোনো বয়সের মেয়েকে বিবাহ করতে পারেন, ছেলের বয়স কম বা বেশী অথবা মেয়ের বয়স কম বা বেশী হলেও কোনো সমস্যা নেই। বরং প্রত্যেকটাই সুন্নত মুবারক উনার অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!

যদি তাই হয়ে থাকে তবে ৯৮ ভাগ মুসলমান ও রাষ্ট্রদ্বীন ইসলাম উনার দেশের সরকার কি করে বিবাহের বয়স নির্দিষ্ট করে দিতে পারে এবং বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করতে পারে? এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিবাহের বয়স নির্দিষ্ট করার ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে নতুন শরীয়ত জারী করা। যা কাট্টা কফুরীর অন্তর্ভুক্ত।

 

অসমাপ্ত

পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন

 

কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মুর্তি তৈরী করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-১১

কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মুর্তি তৈরী করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-১২

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা শরীফ এবং মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খ¦তামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের মানহানীকারীদের একমাত্র শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আখাছ্ছুল খাছ সম্মানিত বিশেষ ফতওয়া মুবারক (৩০তম পর্ব)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা শরীফ এবং মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত ও দিন মুবারক উনাদের সম্মানিত আমল মুবারকসমূহ উনাদের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৫৭তম পর্ব)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, মহাসম্মানিত ইজমা শরীফ এবং মহাসম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে- মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক যারা ভাঙবে, ভাঙ্গার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে বা সমর্থন করবে তাদের প্রত্যেকের শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া- (পর্ব-৩১)