পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৫০

সংখ্যা: ২৭০তম সংখ্যা | বিভাগ:

৩২তম ফতওয়া হিসেবে

“পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”-

পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার মধ্যে পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ

উনাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

 

সম্মানিত ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সম্মানিত শরীয়ত উনার সঠিক মাসয়ালাগুলো যা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে সুপ্ত বা পুশিদা বা গুপ্ত যা বুঝা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য এবং আওয়ামুন্নাস বা সাধারণ মানুষের জন্য অস্পষ্ট সেগুলো স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করেন। যা পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ সম্মানিত শরীয়ত উনার একাংশ অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মতই অকাট্য দলীল। সুবহানাল্লাহ!

নিম্নে এ সম্পর্কিত কিছু প্রমাণ উল্লেখ করা হলো-

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

(১০৯৮)

এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ‘তাওজীহ’ নামক কিতাবে উল্লেখ আছে-

وَهُوَ اِتِّفَاقُ الْـمُجْتَهِدِيْنَ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْ عَصْرٍ عَلٰى حُكْمٍ شَرْعِيٍّ.

অর্থ: “সমস্ত ইমাম মুজতাহিদ উনারা যেকোনো সময়ে কোনো একটি শরয়ী মাসয়ালার ক্ষেত্রে ঐক্যমত পোষণ করেন, তাকে ইজমা শরীফ বলে।”

উল্লেখ্য, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম অথবা যে কোনো সময়ের মুজতাহিদ আলিম উনাদের ইজমা শরীফ হোক তা মানা ওয়াজিব। কেননা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কথা বর্ণিত নেই।

(১০৯৯)

পবিত্র ‘সূরা বাক্বারা শরীফ’ ১৪৩ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَّسَطًا

অর্থ: “আর আমি অনুরূপভাবে আপনাদেরকে করেছি মধ্যবর্তী উম্মত।”

(১১০০-১১০২)

“তাফসীরে আহমদী” উনার ৩৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

قَدْ اِسْتَدَلَّ الشَّيْخُ أَبُو الْـمَنْصُوْرِ بِالْاٰيَةِ عَلٰى أَنَّ الْاِجْمَاعَ حُجَّةٌ

অর্থ: শায়েখ আবুল মানছুর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা পবিত্র ইজমা সম্মানিত শরীয়ত উনার দলীল হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করেছেন। অনুরূপ তাফসীরে বায়যাবী শরীফ ও মাদারিক শরীফ উনাদের মধ্যেও উল্লেখ আছে।

(১১০৩)

ছহীহ বুখারী শরীফ উনার ৪র্থ খ-, ১৬৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

قَوْلُ اللهِ تَعَالٰـى وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَّسَطًا وَمَا أَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِلُزُوْمِ الْـجَمَاعَةِ وَهُمْ أَهْلُ الْعِلْمِ

অর্থ: “আর আমি অনুরূপভাবে আপনাদেরকে করেছি মধ্যবর্তী উম্মত, মহান আল্লাহ পাক উনার এই ইরশাদ মুবারক এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পক্ষ থেকে বড় জামায়াত বা দলকে অনুসরণ করার নির্দেশ মুবারক সম্বলিত পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা মূলত আহলুল ইলম বা মাযহাবের ইমামদেরকে অনুসরণ করার কথাই বুঝানো হয়েছে।” সুবহানাল্লাহ!

(১১০৪)

ছহীহ বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ উনাদের মধ্যে উল্লেখ আছে-

لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِّنْ اُمَّتِـىْ ظَاهِرِيْنَ عَلَى الْـحَقِّ حَتّٰـى تَقُوْمُ السَّاعَةُ.

অর্থ: “আমার উম্মতের একদল মুসলমান ক্বিয়ামত পর্যন্ত হক্বের উপর ইস্তিক্বামত থাকবেন।”

(১১০৫)

আল্লামা ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছহীহ মুসলিম শরীফ উনার ব্যাখ্যা গ্রন্থের ১৭৩ পৃষ্ঠায় লিখেন-

فِيْهِ دَلِيْلٌ لِكَوْنِ الْإِجْمَاعِ حُجَّةً وَهُوَ أَصَحُّ مَا اِسْتَدَلَّ بِهٖ لَه مِنَ الْـحَدِيْثِ

অর্থ: এ ছহীহ পবিত্র হাদীছ শরীফ হতে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুসলমান মুজতাহিদ উনাদের জন্য সম্মানিত ইজমা শরীফ সম্মানিত শরীয়ত উনার একটি দলীল।

(১১০৬)

ছহীহ বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ ও মিশকাত শরীফ উনার ৪৬১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

تَلْزَمُ جَـمَاعَةُ الـمُسْلِمِيْـنَ وَاِمَامِهِمْ

অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, প্রত্যেক মুসলমান উনাদের জন্য  মুসলমানের বৃহৎ দল (চার মাযহাব) ও তাদের ইমামের পথ অবলম্বন করা লাযিম বা ওয়াজিব।

(১১০৭)

ছহীহ নাসাঈ শরীফ ও মিশকাত শরীফ উনার ৫৫৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

أَلَا مَنْ سَرَّه بِـحُبْوْبَةِ الْـجَنَّةِ فَلْيَلْزِمْهُ الْـجَمَاعَةَ

অর্থ: যে ব্যক্তি সম্মানিত জান্নাত উনার উত্তম স্থান নিতে ইচ্ছা করে তার জন্য মুসলমানের বৃহৎ দল (চার মাযহাব) উনাকে অনুসরণ করা ওয়াজিব।

(১১০৮-১১০৯)

ছহীহ তিরমিযী শরীফ ও মিশকাত শরীফ উনার ৩০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

إِنَّ اللهَ لَا يَجْمَعُ اُمَّتِـىْ عَلٰى ضَلَاَلةٍ. وَيَدُ اللهِ عَلَى الْـجَمَاعَةِ وَمَنْ شَذَّ شُذَّ فِـى النَّارِ.

অর্থ: (নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন), নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি আমার সকল উম্মতকে গোমরাহীর উপর একমত করবেন না। বৃহৎ দলের (চার মাযহাবের) উপর মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত আছে। যে ব্যক্তি মুসলমানদের বড় দলের (চার মাযহাবের) অনুসরণ না করবে সে জাহান্নামে যাবে। নাউযুবিল্লাহ!

(১১১০-১১১২)

ছহীহ আবূ দাউদ শরীফ, মুসনাদে আহমদ শরীফ ও মিশকাত শরীফ উনার ৩১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

مَنْ فَارَقَ الْـجَمَاعَةَ شِبْرًا فَقَدْ خَلَعَ رَقَبَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهٖ وَعَلَيْكُمْ بِالْـجَمَاعَةِ العَامَّةِ

অর্থ: (নুরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন) তোমাদের জন্য মুসলমানদের বড় দল (চার মাযহাব) উনাদের পথ অনুসরণ করা ওয়াজিব। যে ব্যক্তি মুসলমান উনাদের বড় দলের (চার মাযহাবের) পথ থেকে সামান্য সরে যাবে, সে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম থেকেই দূরে সরে যাবে। নাউযুবিল্লাহ!

(১১১৩)

‘তাফসীরে মাযহারী’ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-

فَأَنَّ أَهْلَ السُّنَّةِ وَالجَمَاعَةِ قَدْ اِفْتَرَقَ بَعْدَ القُرُوْنِ الثَّلٰثَةِ أَوِ الْأَرْبَعَةِ عَلٰى أَرْبَعَةِ مَذَاهِبَ وَلَـمْ يَبْقَ فُرُوعَ الْـمَسَائِلِ سِوَى هٰذِهِ الـمَذْهَبِ الْأَرْبَعَةِ فَقَدْ اِنْعَقَدَ الْإِجْـمَاعُ الـمُرَكَّبُ عَلٰى بُطْلَانِ قَوْلٍ يُـخَالِفُ كُلَّهُمْ وَقَدْ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَـجْتَمِعُ اُمَّتِـىْ عَلٰى ضَلَالَةِ وَقَالَ اللهُ تَعَالٰى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ نُوَلِّهٖ مَا تَوَلّٰـى وَنُصْلِهٖ جَهَنَّمَ

অর্থ: “তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীর পর আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত (সম্প্রদায়) চার মাযহাবে বিভক্ত হয়েছেন এবং মাসয়ালা মাসায়িল সম্মন্ধে এ চার মাযহাব ভিন্ন অন্য মাযহাব বাতিল হয়েছে। এ ব্যাপারে ইজমা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, চার মাযহাব ভিন্ন অন্য সকল মাযহাব এবং উনাদের বিরোধী সকল কথাই বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আমার সকল উম্মত মহান আল্লাহ পাক উনার দয়া ইহসানে গোমরাহীর উপর একমত হবে না। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি মু’মিনদের প্রচলিত পথ বা ইজমা-ক্বিয়াসের বিরোধিতা করবে আমি তাকে সেদিকেই ফিরাবো যে দিকে সে ফিরেছে, আর আমি তাকে জাহান্নামে পৌছায়ে দিব।”

(১১১৪)

বিখ্যাত ‘তাহতাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে-

قَالَ بَعْضُ الـمُفَسِّرِيْنَ فَعَلَيْكُمْ يَا مَعْشَرَ الْـمُوْمِنِيْـنَ اِتِّبَاعُ الْفِرْقَاةِ النَّاجِيَةِ اَلْـمُسَمَّاةُ بِأَهْلِ السُّنَّةِ وَالْـجَمَاعَةِ فَأَنَّ نَعْرَةَ اللهِ تَعَالٰـى وَحِفْظَه وَتَوْفِيقَه فِي مُوَافِقِهِمْ وَخِذْلَانَه وَسَخَطَه وَصْفَةٍ فِيْ مُـخَالِفَتِهِمْ وَهٰذِهِ الطَّائِفَةُ النَّاجِيَةُ قَدْ اِجْتَمَعَتِ اليَوْمَ فِي الْـمَذْهَبِ الْأَرْبَعَةِ هُمُ الْـحـَنَفِيُّوْنَ وَالْـمَالِكِيُّوْنَ وَالشَّافِعِيُّوْنَ وَالْـحَنْبَلِيُّوْنَ وَمَنْ كَانَ خَارِجًا مِّنْ هٰذِهِ الْـمَذَاهِبِ الْأَرْبَعَةِ فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْبِدْعَةِ وَالنَّارُ.

অর্থ: কোনো কোনো ব্যাখ্যাকার বলেন- হে মুসলমান সম্প্রদায়! জান্নাতী (নাজিয়া) ফিরকার তাবেদারী করা তোমাদের জন্য ফরয ওয়াজিব। যারা সম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনার অনুসরণ করেন মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত ও সাহায্য তাদের উপর আছে। যারা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের খিলাফ তারা মহান আল্লাহ পাক উনার অসন্তুষ্টির মধ্যে পড়বে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত ও নাজী ফিরকাহ বর্তমান যুগে হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী এ চার মাযহাবে বিভক্ত হয়েছেন। যারা এ চার মাযহাবের কোনো একটি অবলম্বন না করবে তারা বিদয়াতী ও জাহান্নামী হবে।

(১১১৫)

ইবনে হাম্মাম রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘তাহরীর’ গ্রন্থে লিখেন-

اِنْعَقَدَ الْإِجْمَاعُ عَلٰى عَدَمِ الْعَمَلِ بِالْـمَذْهَبِ الْـمُخَالِفَةِ لِأَئِمَّةِ الأَرْبَعَةِ

অর্থ: সমস্ত আলিম উনাদের ইজমা হয়েছে যে, চার মাযহাব উনাদের ইমাম উনাদের ভিন্ন অন্য কোনো মাযহাব অবলম্বন করা জায়িয নেই।

(১১১৬)

আল্লামা ইবনে আবেদীন ‘আশবাহ ওয়ান নাযায়ির’ গ্রন্থে লিখেন-

مَنْ خَالَفَ الأَئِمَّةَ الْأَرْبَعَةَ فَهُوَ مُخَالِفُ الْإِجْـمَاعِ

অর্থ: “যে ব্যক্তি চার ইমাম উনাদের মাযহাবের বিরুদ্ধে কোন মাযহাব সৃষ্টি করলো, সে মূলত: ইজমা শরীফ উনারই বিরোধিতা করলো।

(১১১৭)

বিখ্যাত ‘তালবীহ’ কিতাবে উল্লেখ আছে, “বহু অকাট্য ছহীহ প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে যে, বহু সংখ্যক ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা যে সমস্ত মাসয়ালার স্পষ্ট দলীল পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে না পেতেন সেগুলো পবিত্র ক্বিয়াস অনুযায়ী ফায়সালা করতেন। এরূপ বহুবার সংগঠিত হয়েছে এবং কারও বিনা আপত্তি ও বিনা ইনকারে তা প্রচলিত হয়েছে যার ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে।”

তাই পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ দলীল হওয়ার ব্যাপারে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের পবিত্র ইজমা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন-

(১১১৮)

ছহীহ মুসলিম শরীফ উনার ব্যাখ্যাকার ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘তাহযীবুল আসমা’ কিতাবে লিখেন, “ইমামুল হারামাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, বিচক্ষণ আলিম উনাদের মত এই যে, পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ অমান্যকারীরা উম্মতের আলিম ও শরীয়ত বাহক শ্রেণীর মধ্যে গন্য হতে পারে না। কেননা তারা বহু অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত পবিত্র ক্বিয়াস শরীফকে অমান্য করে থাকে। অথচ সম্মানিত শরীয়ত উনার অধিকাংশ মাসয়ালা মাসায়িল পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে। কেননা সম্মানিত শরীয়ত উনার নয় দশমাংশ মাসয়ালা মাসায়িল পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে স্পষ্ট উল্লেখ নেই যা পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনার দ্বারাই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে, সুতরাং পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ অমান্যকারীরা সাধারণ উম্মত শ্রেণীভুক্ত মাত্র।”

(১১১৯)

ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বুখারী শরীফের বিখ্যাত শরাহ “ফাতহুল বারীর” টিকায় ১৩তম খণ্ডের ২৩২ পৃষ্ঠায় লিখেন- “হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম এবং পরবর্তী ফক্বীহ ইমাম উনারা সকলেই পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ করেছেন। সুতরাং বিজ্ঞ ইমাম মুজতাহিদ উনারা একমতে যা স্বীকার ও সাব্যস্ত করেন, তা অবশ্যই দলীল হবে।”

(১১২০)

আল্লামা আব্দুর রহমান রহমতুল্লাহি আলাইহি  তিনি বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘ইবনে খলদুনের’ ভূমিকায় ৪৯৬-৪৯৭ পৃষ্ঠায় লিখেন, পবিত্র ইজমা শরীফ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের তুল্য সম্মানিত শরীয়ত উনার একটি দলীল। তাই অনেক সময় পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে স্পষ্ট মিমাংসা না পাওয়া গেলে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা অবশ্যই পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ করতেন। এতে উনাদের পবিত্র ইজমা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই উনারা পবিত্র ইজমা শরীফ অমান্যকারীদের মতকে প্রত্যাখ্যান করতেন।”

(১১২১)

মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা শাহ ওয়ালী মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “ইকদুলজীদ” কিতাবের ৬ পৃষ্ঠায় লিখেন, “সম্মানিত শরীয়ত উনার (আমলী) পালনীয় বিষয়গুলো যে সমস্ত বিস্তারিত দলীল থেকে অবগত হওয়া যায় এটা মূলে চারটি। যথা: পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ।”

(১১২২)

তিনি উক্ত কিতাবের ৮৭ পৃষ্ঠায় লিখেন, “পবিত্র ইজমা শরীফ অমাণ্যকারীরা (সম্মানিত শরীয়ত উনার বহির্ভুত দল) এবং পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ অমান্যকারী দল ‘শিয়া’ ফিরকার অন্তর্ভুক্ত। যারা সাইয়্যিদুনা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবার আলাইহিস সালাম উনাকে এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাদেরকে গালি দেয়। নাউযুবিল্লাহ! অনেক হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মানে না। সুতরাং পবিত্র ইজমা শরীফ, পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ অমাণন্যকারীদের কোনো ফতওয়াই মান্য করা জায়িয নেই।”

(১১২৩)

হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিখ্যাত ১২৯ পৃষ্ঠায় লিখেন, “মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুম চার প্রকারে জানা যেতে পারে অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের মাধ্যমে। পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ এ তিনটির মূল হলো পবিত্র কুরআন শরীফ।” সুবহানাল্লাহ!

(১১২৪)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اَلْعِلْمُ ثَلاَثَةٌ اٰيَةٌ مُّـحْكَمَةٌ أَوْ سُنَّةٌ قَائِمَةٌ أَوْ فَرِيْضَةٌ عَادِلَةٌ وَمَا سِوٰى ذٰلِكَ فَضْلٌ

অর্থ: ইলমে (দ্বীন) তিন প্রকার: (১) পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মুহকামা আয়াত শরীফ (২) নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত সুন্নত পবিত্র হাদীছ শরীফ যা দ্বারা মাসয়ালাসমূহ প্রকাশ হয় (৩) ফারীদ্বায়ে আদিলা (অতিরিক্ত ফরয। যেমন মাযহাব মানা, বাইয়াত হওয়া)। (মিশকাত শরীফ ৩৫ পৃষ্ঠা)

(১১২৫-১১২৬)

উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত “ফারীদ্বায়ে আদিলাহ” দ্বারা মিশকাত শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘মিরকাত ও আশয়াতুল লুময়াতে’ পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ অর্থাৎ মাযহাবকেই বুঝিয়েছেন।

(১১২৭)

“তাযকীরুল ইখওয়ান” নামক কিতাবের ১৮৭-১৮৮ পৃষ্ঠায় যে সকল মাসয়ালাগুলি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে স্পষ্টভাবে বর্ণিত নেই সে সম্পর্কে উল্লেখ আছে-

ایسی بات پر مجتھدوں کے قیاس صحیح کے مطابق عمل کرلے پھر وہ مجتھد بھی ایسا ھو کہ جسکا اجتھاد امت کے اکثر عالم مسلمانوں نے قبول کیا جیسے امام اعظم، امام شافعی، امام مالک اور امام احمد رحمہ اللہ تعالی

অর্থাৎ- “যে মাসয়ালাগুলো পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে স্পষ্টভাবে বর্ণিত নেই এমন বিষয়গুলোতে মুজতাহিদ উনাদের ছহীহ ক্বিয়াস মোতাবেক আমল করবে। কিন্তু মুজতাহিদ এমন দক্ষ হতে হবে যাদের ইজতিহাদ অধিকাংশ মুসলিম আলিম সম্প্রদায় গ্রহণ করেছেন। যেমন ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ।”

অতএব, ইমাম মুজতাহিদ উনাদের পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াসী মাসয়ালাসমূহ মানা ও অনুসরণ করা ফরয। এটাই প্রকৃত তাক্বলীদ যা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত।

(১১২৮)

‘তাফসীরে কবীর’ উনার ৩য় জিলদ ২৫১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

اِعْلَمْ أَنَّ قَوْلَه تَعَالٰى فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِيْ شَيْءٍ فَرُدُّوْهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُوْلِ يَدُلُّ عِنْدَنَا عَلٰى أَنَّ الْقِيَاسَ حُجَّةٌ عَلٰى قَوْلِهٖ ذٰلِكَ هُوَ الْقِيَاسُ فَثَبَتَتْ أَنَّ الْاٰيَةَ دَالَّةٌ عَلَى الأَمْرِ بِالْقِيَاسِ

অর্থ: “জেনে রাখ যে, মহান আল্লাহ পাাক উনার হুকুম “তোমরা যখন কোন বিষয়ে মতানৈক্য করো তবে তা মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের দিকে ফিরাও” এটি প্রমাণ করছে যে, পবিত্র ক্বিয়াস বাস্তবিকই সম্মানিত শরীয়ত উনার একটি দলীল এবং উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে পবিত্র ক্বিয়াস করার প্রতি আদেশ বুঝানো হচ্ছে এবং পূর্ব বর্ণিত আয়াত শরীফ-

اَطِيْعُوا اللّٰـهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ

উনার সাথে মিলালে নিশ্চয়ই উনার এরূপ ব্যাখ্যা হবে যে, বিরোধজনক মাসয়ালাগুলোর ব্যবস্থার জন্য উল্লিখিত আহকামের দিকে রুজু (দৃষ্টি) কর; একেই পবিত্র ক্বিয়াস বলা হয়। সুতরাং উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফে অবশ্যই ক্বিয়াস শরীফ উনার জন্য হুকুম করা হয়েছে।”

(১১২৯-১১৩৭)

তাফসীরে বুরহান-৯৩ ও ৯৪ পৃষ্ঠা, তাফসীরে বায়যাবী ২য় জিলদ ২৯৫ পৃষ্ঠা, তাফসীরে রূহুল মায়ানী ১ম জিলদ ১১৭ পৃষ্ঠা, তাফসীরে আহমাদী ২৯১ পৃষ্ঠা, তাফসীরে মুনীর ১ জিলদ ১৫৬ পৃষ্ঠা, তাফসীরে নিশাপুরী ৫ম জিলদ ৮১ পৃষ্ঠা, তাফসীরে জুমাল ১ম জিলদ ৩৯৫ পৃষ্ঠা, তাফসীরে খাযিন ১ম জিলদ ৪৬০ পৃষ্ঠা, তাফসীরে সিরাজুম মুনীর ১ম জিলদ ৩৪৭ পৃষ্ঠায় উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় লিখিত আছে যে, “বিরোধজনক বিষয়গুলোকে মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের দিকে রুজু করার অর্থ এই যে, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার নযীর ধরে বিরোধজনক মাসয়ালার মিমাংসা করো। একেই পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ বলা হয়।”

(১১৩৮)

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَلَوْ رَدُّوْهُ إِلَـى الرَّسُوْلِ وَإِلٰـى أُولِـى الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِيْنَ يَسْتَنْبِطُونَه مِنْهُمْ

অর্থ: “যদি তারা এটি (বিরোধীয় বিষয়) রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ও উলিল আমর উনাদের প্রতি উপস্থিত করতো তবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র ওহী উনার মাধ্যমে আর উলিল আমর (হক্কানী-রব্বানী আলিম) উনারা ইজতিহাদ উনার মাধ্যমে এটা ফায়ছালা করতে পারতেন।” (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৩)

(১১৩৯-১১৪১)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত ‘উলুল আমর’ এর অর্থ তাফসীরে দুররে মানছূর ২ জিলদ ১৮৬ পৃষ্ঠায়, তাফসীরে ইবনে জারীর ৫ম জিলদ ১০৭ পৃষ্ঠায়, তাফসীরে কবীর ২৮০ পৃষ্ঠায় হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে ‘ফক্বীহ বা ইমাম-মুজতাহিদ’ বলে উল্লেখ আছে এবং উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত اِسْتِنْبَاطٌ ‘ইস্তিম্বাত’ শব্দের দ্বারা ছাবিত হয় যে, ইমাম-মুজতাহিদ উনাদেরকে ‘ইস্তিম্বাত’ (ইজতিহাদ বা ক্বিয়াস করে মাসয়ালা বাহির) করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর এটাই পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ সম্মানিত শরীয়ত উনার দলীল হওয়ার প্রমাণ এবং সাধারণদের জন্য ইমাম-মুজতাহিদ উনাদের তাক্বলীদ (অনুসরণ) করা ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ।”

(১১৪২)

যেমন ‘তাফসীরে কবীর’ ২০০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

اَلْاٰيَةُ دَالَّةٌ عَلٰى أُمُوْرٍ (أَحَدُهَا) (۱) إِنَّ فِيْ أَحْكَامِ الحَوَادِثِ مَا لَا يَعْرِفُ بِالنَّصِّ بَلْ بِالْاِسْتِنْبَاطِ (۲) أَنَّ الاِسْتِنْبَاطَ حُجَّةٌ. (۳) اَلْعَامِّيُّ يـَجِبُ عَلَيْهِ تَقْلِيْدُ الْعُلَمَاءِ فِيْ أَحْكَامِ الْـحَوَادِثِ (۴) أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ مُكَلِّفًا بِاِسْتِنْبَاطِ الْأَحْكَامِ إِلٰى وَذٰلِكَ يُوْجِبُ أَنَّ الرَّسُوْلَ وَاُولِـى الْأَمْرِ كُلُّهُمْ مُكَلِّفُوْنَ بِالْاِسْتِنْبَاطِ.

অর্থ: “উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ‘ইস্তিম্বাত’ শব্দ দ্বারা বুঝানো হয়েছে- (১) অনেকগুলি সম্মানিত শরীয়ত উনার বিষয় নছ (পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ) উনাদের দ্বারা জানা যায় না বরং ক্বিয়াস বা গবেষণার দ্বারা জানা যায় (২) ক্বিয়াস বা গবেষণাটাও বাস্তবিকই সম্মানিত শরীয়ত উনার দলীল (৩) সাধারণ লোকদের সম্মানিত শরীয়তের নতুন বিষয়সমূহে আলিম উনাদের অনুসরণ করা ওয়াজিব। (৪) নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র ওহী মুবারক উনার মাধ্যমে সব বিষয় ফায়ছালা করেন এবং করবেন। অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র ওহী মুবারক উনার মাধ্যমে সব বিষয় ফায়ছালা করবেন। আর উলিল আমর বা ইমাম-মুজতাহিদ উনাদের জন্য ‘ইস্তিম্বাত’ (ক্বিয়াস) করে মাসয়ালা বের করা ওয়াজিব ছিল।”

(১১৪৩-১১৪৪)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় তাফসীরে খাযিন ১ম জিলদ ৪৭১ পৃষ্ঠায়, তাফসীরে ফতহুল বায়ান ২য় জিলদ ১৮৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

وَفِـى الْاٰيَةِ دَلِيْلٌ عَلٰى جَوَازِ الْقِيَاسِ وَاِنَّ مِنَ الْعِلْمِ مَا يُدْرِكُ بِالنَّصِّ وَهُوَ الْكِتَابُ وَالسُّنَّةُ وَمِنْهُ مَا يُدْرِكُ بِالْاِسْتِنْبَاطِ وَهُوَ الْقِيَاسُ عَلَيْهِمَا.

অর্থ: “উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফখানা পবিত্র ক্বিয়াস জায়িয হওয়ার প্রমাণ এবং সম্মানিত শরীয়ত উনার অনেক বিষয় আছে যা নছ অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দ্বারা সরাসরি জানা যায় এবং অনেক বিষয় পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে গবেষণা দ্বারা জানা যায়। ‘এটাই ক্বিয়াস শরীফ।”

কেননা ইস্তিম্বাতের অর্থ পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার নযীর ধরে কোন বিষয়ের হুকুম বের করা, আর একেই পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ বলে।”

(১১৪৫)

হযরত ইমাম শারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ‘মিজান’ কিতাবের ২৯ পৃষ্ঠায় লিখেন-

جَعَلَ اَقْوَالُ الْـمُجْتَهِدِيْنَ كَاَنَّـهَا نُصُوْصُ الشَّارِعِ فِيْ جَوَازِ الْعَمَلِ بِهَا إِلٰى يُوَيَّدُ ذٰلِكَ قَوْلُ عُلَمَائِنَا لَوْ صَلَّى اِنْسَانٌ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ إِلٰى أَرْبَعَ جِهَاتٍ بِالْاِجْتِهَادِ فَلَاقَضَاءَ مَعَ اِنْ ثَلَاثَ جِهَاتٍ مِنْهَا غَيْرَ الْقِبْلَةِ بَقِيْنَ وَيُوَيَّدُ ذٰلِكَ أَيْضًا أَجْمَعَ عَلَيْهِ اَهْلُ الْكَشْفِ مِنْ اَنَّ الْـمُجْتَهِدِيْنَ هُمُ الَّذِيْنَ وَرَّثُوا الْأَنْبِيَاءَ حَقِيقَةً فِيْ عُلُوْمِ الْوَحْيِ اِلٰـى فَقَامَ اِجْتِهَادُهُمْ مَقَامَ النُّصُوْصِ الشَّارِعِ فِـىْ وُجُوْبِ الْعَمَلِ بِهٖ فَاِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَبَاحَ لَـهُمُ الْاِجْتِهَادَ فِي الْاَحْكَامِ تَبْعًا لَقَوْلِهٖ تَعَالٰى “وَلَوْ رَدُّوْهُ إِلَـى الرَّسُوْلِ وَإِلٰـى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِيْنَ يَسْتَنْبِطُونَه مِنْهُمْ” وَمَعْلُوْمٌ أَنَّ الْاِسْتِنْبَاطَ مِنْ مَقَامَ الْـمُجْتَهِدِيْنَ فَهُوَ تَشْرِيْعٌ مِّنْ أَمْرِ الشَّارِعِ.

অর্থ: “সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে নছ (পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ) উনাদের মতই মুজতাহিদ উনাদের মতগুলি পালন করা জায়িয। যেমন কেউ যদি অজানা অবস্থায় চার রাকায়াত নামায ইজতিহাদ করে ৪ দিকে পড়ে তবে তা শুদ্ধ হবে, যদিও তার তিন দিক অবশ্যই ক্বিবলা ছিল না এবং কাশফধারীগণ এতে একমত যে, মুজতাহিদগণই হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের ইলমে ওহীর (দ্বীনের) প্রকৃত ওয়ারিছ এবং সম্মানিত শরীয়ত উনার নছ তুল্যই ইমাম মুজতাহিদ উনাদের ইজতিহাদ অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। কেননা স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সম্মানিত শরীয়ত বিষয়ে ইমাম মুজাতিহদ উনাদের ইজতিহাদ করার জন্য অনুমতি মুবারক দিয়েছেন। যেমন ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

وَلَوْ رَدُّوْهُ إِلَـى الرَّسُوْلِ وَإِلٰـى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِيْنَ يَسْتَنْبِطُونَه مِنْهُمْ) “وَمَعْلُوْمٌ أَنَّ الْاِسْتِنْبَاطَ مِنْ مَقَامَ الْـمُجْتَهِدِيْنَ فَهُوَ تَشْرِيْعٌ مِّنْ أَمْرِ الشَّارِعِ(.

অর্থ: “যদি তারা এটি (বিরোধীয় বিষয়) রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ও উলিল আমর উনাদের প্রতি উপস্থিত করতো তবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র ওহী উনার মাধ্যমে আর উলিল আমর (হক্কানী-রব্বানী আলিম) উনারা ইজতিহাদ উনার মাধ্যমে এটা ফায়ছালা করতে পারতেন।” (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৩) এবং জেনে রাখুন যে, গবেষণা (ক্বিয়াস) মুজতাহিদ উনাদের কাজ। অতএব এটা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নির্দেশ মুবারক অনুযায়ী শরীয়তভুক্ত।

(১১৪৬)

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوْا فِي الدِّيْنِ وَلِيُنْذِرُوْا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوْا إِلَيْهِمْ

অর্থ: “তোমাদের প্রত্যেক দল হতে কিছু লোক বের হয়ে দ্বীন শিক্ষা করে ফিরে এসে নিজ নিজ ক্বওমকে দ্বীন শিক্ষা দেয় না কেন?”

(১১৪৭-১১৪৮)

 উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় ‘তাফসীরে খাযিন’ এবং ‘তাফসীরে মুয়ালিমের ১ম জিলদ ১৩৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “কতিপয় লোকের দ্বীনের ফক্বীহ ও মুজতাহিদ হওয়া ফরযে কিফায়া এবং অন্যান্যদের জন্য উনাদের অনুসরণ করা ওয়াজিব। এটাই তাক্বলীদ আর যাদের তাক্বলীদ করবে উনারাই ইমাম।”

(১১৪৯)

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

فَاسْأَلُوْا أَهْلَ الذِّكْرِ اِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ

অর্থ: “যদি তোমরা না জান তবে যিনি জানেন উনাকে জিজ্ঞাসা করো।” (পবিত্র সূরা আম্বিয়া শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭)

(১১৫০)

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় বিখ্যাত তাফসীরে কবীর ২য় জিলদ ২৮০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

أَحَدُهَا اَنَّ فِيْ أَحْكَامِ الْـحَوَادِثِ مَا لَا يَعْرِفُ بِالنَّصِّ بَلْ لِلْاِسْتِنْبَاطِ وَثَانِيُهَا أَنَّ الْاِسْتِنْبَاطَ حُجَّةٌ وَثَاِلثُهَا اَنَّ الْعَامِّيَّ يَـجِبُ تَقْلِيْدُ الْعُلَمَاءِ فِيْ تَقْلِيْدِ الْـحَوَادِثِ

অর্থ: “উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ এ কয়েকটি বিষয় সাব্যস্ত হয়। (১ম) কতগুলি বিষয়ের ব্যবস্থা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দ্বারা স্পষ্টভাবে জানা যায় না বরং তা ইজতিহাদ ও ক্বিয়াসের দ্বারা জানা যায়। (২য়) পবিত্র ক্বিয়াস সম্মানিত শরীয়ত উনার একটি দলীল (৩য়) সমস্যাযুক্ত বিষয়সমূহে সাধারণের জন্য মুজতাহিদ আলিম উনাদের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব।”

(১১৫১)

‘তাফসীরে আযীযী’ ১২৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

کسانیکہ اطاعت انھا بحکم خدا فرض ست شش گروہ اند  واز انجملہ مجتھدین شریعت وشیوخ  طریقت اندکہ حکم ایشاں بطریق واجب مخیر لازم الاتباع ست برعوام است زیراکہ فھم اسرار شریعت ودقائق معرفۃ ایشاں را میسر نیست کما قال اللہ تعالی “فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ”

অর্থ: “যাদের আদেশ পালন করা মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুমে ফরয উনারা ৬ শ্রেণীভুক্ত। তন্মধ্যে সম্মানিত শরীয়ত উনার মুজতাহিদ ও ত্বরীক্বতের খাঁটি শায়েখ উনাদের কোন একজনকে সাধারণ উম্মতের জন্য অনুসরণ করা ওয়াজিব। কারণ সাধারণের পক্ষে সম্মানিত শরীয়ত উনার নিগুঢ় তত্ত্ব বুঝা অসম্ভব। আর এ কারণেই মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমরা যারা জাননা, তারা যারা জানেন তাদের জিজ্ঞাসা করে জেনে নাও।”

অসমাপ্ত-পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন

সম্মানিত ও পবিত্র কুরআন শরীফ, সম্মানিত ও পবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা’ শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খ্বাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের যারা মানহানী করবে, তাদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারা নামধারী মুসলমান হোক বা কাফির হোক অথবা নাস্তিক হোক কিংবা যেকোনো ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন। তাদের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি যারা তাদেরকে সমর্থন করবে, তাদেরও একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ বিষয়ে কারো কোনো প্রকার ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আখাছ্ছুল খাছ সম্মানিত বিশেষ ফতওয়া মুবারক- (২য় পর্ব)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৪৮

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক উনার ও উনার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে এবং বিশেষ করে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক যারা ভাঙবে, ভাঙ্গার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে বা সমর্থন করবে তাদের প্রত্যেকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া- (পর্ব-৪)

পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (পর্ব-৫)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ শরীফ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত, দিন, সময় ও মুহূর্তের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩০তম পর্ব)