পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৩৩

সংখ্যা: ২৫২তম সংখ্যা | বিভাগ:

[সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন উনার জন্যে এবং অসংখ্য দুরূদ ও সালাম মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামউনার প্রতি। মহান আল্লাহ পাক উনার অশেষ রহ্মতে “গবেষণা কেন্দ্র মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ” উনার ফতওয়া বিভাগের তরফ থেকে বহুল প্রচারিত, হক্বের অতন্দ্র প্রহরী, বাতিলের আতঙ্ক ও আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদায় বিশ্বাসী এবং হানাফী মাযহাব-উনার অনুসরণে প্রকাশিত একমাত্র দলীলভিত্তিক যামানার তাজদীদী মুখপত্র “মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ” পত্রিকায় যথাক্রমে- ১. টুপির ফতওয়া (২য় সংখ্যা) ২. অঙ্গুলী চুম্বনের বিধান (৩য় সংখ্যা) ৩. নিয়ত করে মাজার শরীফ যিয়ারত করা (৪র্থ সংখ্যা) ৪. ছবি ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় হারাম হওয়ার ফতওয়া (৫ম-৭ম সংখ্যা) ৫. জুমুয়ার নামায ফরযে আইন ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতওয়া (৮ম-১০ম সংখ্যা) ৬. মহিলাদের মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী সম্পর্কে ফতওয়া (১১তম সংখ্যা) ৭. কদমবুছী ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১২তম সংখ্যা) ৮. তাহাজ্জুদ নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৩তম সংখ্যা) ৯. ফরয নামাযের পর মুনাজাত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৪-২০তম সংখ্যা) ১০. ইন্জেকশন নেয়া রোযা ভঙ্গের কারণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২১-২২তম সংখ্যা) ১১. তারাবীহ্-এর নামাযে বা অন্যান্য সময় কুরআন শরীফ খতম করে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়িয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২৩-২৪তম সংখ্যা) ১২. তারাবীহ্ নামায বিশ রাকায়াত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (২৫-২৯তম সংখ্যা) ১৩. দাড়ী ও গোঁফের শরয়ী আহ্কাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩০-৩৪তম সংখ্যা) ১৪. প্রচলিত তাবলীগ জামায়াত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩৫-৪৬তম সংখ্যা) ১৫. আযান ও ছানী আযান মসজিদের ভিতরে দেয়ার আহ্কাম এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৪৭-৫০তম সংখ্যা) ১৬. দোয়াল্লীন-যোয়াল্লীন উনার শরয়ী ফায়সালা এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৫১-৫২তম সংখ্যা) ১৭. খাছ সুন্নতী টুপি ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৫৩-৫৯তম সংখ্যা) ১৮. নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উনার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৬০-৮২তম সংখ্যা) ১৯. ইমামাহ্ বা পাগড়ী মুবারকের আহ্কাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত ফতওয়া (৮৩-৯৬তম সংখ্যা) ২০. শরীয়তের দৃষ্টিতে আখিরী যোহ্র বা ইহ্তিয়াতুয্ যোহ্রের আহ্কাম এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৯৭-১০০তম সংখ্যা) ২১. জানাযা নামাযের পর হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করার শরয়ী ফায়সালা ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১০১-১১১তম সংখ্যা) এবং ২২. হিজাব বা পর্দা ফরযে আইন হওয়ার প্রমাণ ও তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১১২-১৩১তম সংখ্যা) ২৩. খাছ সুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তা এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৪০তম সংখ্যা) ২৪. হানাফী মাযহাব মতে ফজর নামাযে কুনূত বা কুনূতে নাযেলা পাঠ করা নাজায়িয ও নামায ফাসিদ হওয়ার কারণ এবং তার প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৩২-১৫২তম সংখ্যা) ২৫. ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বকাপ ফুটবল বা খেলাধুলা’র শরয়ী আহকাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতওয়া (১৫৫তম সংখ্যা) ২৬. হানাফী মাযহাব মতে পুরুষের জন্য লাল রংয়ের পোশাক তথা রুমাল, পাগড়ী, কোর্তা, লুঙ্গি, চাদর ইত্যাদি পরিধান বা ব্যবহার করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৫৩-১৬০তম সংখ্যা)  ২৭. ইসলামের নামে গণতন্ত্র ও নির্বাচন করা, পদপ্রার্থী হওয়া, ভোট চাওয়া ও দেয়া হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৬১-১৭৫তম সংখ্যা) ২৮. কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৬৮-চলমান), ২৯. জুমুয়া ও ঈদাইনের খুৎবা আরবী ভাষায় দেয়া ওয়াজিব। আরবী ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় খুৎবা দেয়া মাকরূহ তাহরীমী ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৯২-১৯৩তম সংখ্যা) ৩০. কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান শবে বরাত-এর আহকাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (১৯৫-২১৩তম সংখ্যা), ৩১. পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও ক্বিয়াস উনাদের দৃষ্টিতে “কুলাঙ্গার, পাপিষ্ঠ ইয়াযীদ লা’নাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে শরীয়তের সঠিক ফায়ছালা ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” পেশ করার পর-

 

৩২তম ফতওয়া হিসেবে

 

“পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”-

পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব উনার উপর মউত পর্যন্ত ইস্তিক্বামত থাকা ফরয

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

 

পবিত্র তাফসীর শরীফ উনাদের নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে ‘আত-তাক্বলীদু গাইরুশ্ শারয়ী তথা শরীয়াত বহির্ভুত অনুসরণ’ উনার বিষয়ে পবিত্র আয়াত শরীফসমূহ উনাদের ছহীহ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আহকাম

 

পবিত্র কুরআন মাজীদ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস উনাদের দলীল-আদিল্লাহ উনাদের বিপরীতে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো শায়তান ও তাগূতী যাবতীয় বাতিল মত-পথ মেনে চলাকে ‘আত-তাকলীদু গাইরুশ শারয়ী তথা শারীয়াত বহির্ভুত অনুসরণ’ বলে। একে ‘তাকলীদুন নাফ্স’ ও ‘তাকলীদুল হাওয়া’ তথা প্রবৃত্তির অনুসরণও বলা হয়ে থাকে।

নিম্নে পবিত্র তাফসীর শরীফ উনাদের নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে ‘আত-তাক্বলীদু গাইরুশ শারয়ী  তথা শরীয়াত বহির্ভূত অনুসরণ’ উনার সম্পর্কে পবিত্র আয়াত শরীফ সমূহ উল্লেখ করে উনাদের ছহীহ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আহকাম বা বিধি-বিধান আলোচনা করা হলো-

পবিত্র আয়াত শরীফ নম্বর- ৬

وان تطع اكثر من فى الارض يضلوك عن سبيل الله ان يتبعون الا الظن وان هم الا يخرصون.

অর্থ: আর যদি আপনার উম্মতগণ পৃথিবীর অধিকাংশ লোকদেরকে অনুসরণ করে তবে তারা আপনার উম্মতদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথ থেকে বিপথগামী করে দিবে। তারা শুধু জল্পনা-কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পুর্ণ অনুমানভিত্তিক কথা-বার্তা বলে থাকে। (পবিত্র সূরাতুল আনয়াম শরীফ- ১১৬)

অত্র পবিত্র আয়াত উনার বিশুদ্ধ

তাফসীর বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

(৬১১)

}وَاِنْ تُطِعْ اَكْثَرَ مَن فِى الارض} اى الكفار لانهم الاكثرون {يُضِلُّوْكَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ} دينه {اِن يَّتَّبِعُوْنَ اِلاَّ الظن} وهو ظنهم ان اٰباءهم كانوا على الحق فهم يقلدونهم {وَاِنْ هُمْ اِلاَّ يَخْرُصُوْنَ} يكذبون فى ان الله حرم عليهم كذا واحل لهم كذا.

অর্থ: (আর যদি আপনার উম্মত পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ করে) অর্থাৎ কাফিরদেরকে, কেননা তারা সংখ্যায় অধিক। (তবে তারা আপনার উম্মতদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথ থেকে বিপথগামী করে দিবে।) উনার থেকে প্রদত্ত দীন ইসলাম থেকে। (তারা শুধু জল্পনা-কল্পনার অনুসরণ করে) তাদের ধারনা যে তাদের কাফির বাপ-দাদারা হক্বের উপর ছিল ও আছে, তাই তারা তাদের তাক্বলীদ বা অনুসরণ করে থাকে (এবং সম্পুর্ণ অনুমান ভিত্তিক কথা-বার্তা বলে থাকে।) তারা মিথ্যা বলে যে, মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি অমুক বিষয়টি তাদের জন্য হারাম করেছেন এবং অমুকটি তাদের জন্য হালাল করেছেন। নাঊযুবিল্লাহ। (মাদারিকুত তানযীল ওয়া হাক্বায়িকুত তা’বীল অর্থাৎ তাফসীরুন নাসাফী পবিত্র সূরাতুল আনয়াম শরীফ- ১১৬ লেখক: হযরত আবুল বারাকাত আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন মাহমূদ নাসাফী হানাফী মাতুরীদী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ৭১০ হিজরী)

(৬১২)

}وان تطع اكثر من فى الارض} يعنى المشركين {يضلوك عن سبيل الله} دين الله الذى رضيه لك، وذلك انَّهم جادلوه فى اكل الميتة، وقالوا: اتأكلون ما قتلتم ولا تأكلون ما قتل ربُّكم؟ {ان يتبعون الاَّ الظن} فى تحليل الميتة {وان هم الاَّ يخرصون} يكذبون فى تحليل ما حرَّمه الله.

অর্থ: (আর যদি আপনার উম্মত পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ করে) অর্থাৎ মুশরিকদের তথা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সাথে অংশিদার স্থাপনকারীদের, (তবে তারা আপনার উম্মতদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথ থেকে বিপথগামী করে দিবে।) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দীন ইসলাম, যে দীন ইসলাম আপনাকে দিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। তা এমন যে, মুশরিকরা মৃত জন্তুর গোস্ত সম্পর্কে ঝগড়া করে এবং তারা বলে: তোমরা যা যবাই করছ তা তোমরা ভক্ষণ করছ অথচ তোমাদের রব তায়ালা যা যবাই করছেন তা ভক্ষণ করছ না কেন? অর্থাৎ মুশরিকরা মৃত জন্তুকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার কর্তৃক যবাই মনে করে। (তারা শুধু জল্পনা-কল্পনার অনুসরণ করে) যবাই ছাড়া মৃত প্রাণীকে হালাল করার ব্যাপারে (এবং সম্পুর্ণ অনুমান ভিত্তিক কথা-বার্তা বলে থাকে।) মহান আল্লাহ তায়ালা যা কিছু হারাম করেছেন তাকে তারা হালাল বলে মিথ্যার অনুসরণ করছে। নাঊযু বিল্লাহ। (্আল্ ওয়াজীয ফী তাফসীরিল কিতাবিল আযীয অর্থাৎ তাফসীরুন নীসাবূরী পবিত্র সূরাতুল আনয়াম শরীফ- ১১৬ লেখক: হযরত আবুল হাসান আলী বিন আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন আলী ওয়াহিদী নীসাবূরী শাফিয়ী আশয়ারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ৪৬৮ হিজরী)

(৬১৩)

يقول تعالى لنبيه محمد صلى الله عليه وسلم محذرا عن طاعة اكثر الناس: {وَاِنْ تُطِعْ اَكْثَرَ مَنْ فِى الارْضِ يُضِلُّوْكَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ} فان اكثرهم قد انحرفوا فى اديانهم واعمالهم وعلومهم. فاديانهم فاسدة واعمالهم تبع لاهوائهم وعلومهم ليس فيها تحقيق ولا ايصال لسواء الطريق. بل غايتهم انهم يتبعون الظن الذى لا يغنى من الحق شيئا، ويتخرصون فى القول على الله ما لا يعلمون، ومن كان بهذه المثابة، فحرى ان يحذِّر الله منه عبادَه، ويصف لهم احوالهم لان هذا وان كان خطابا للنبى صلى الله عليه وسلم فان امته اسوة له فى سائر الاحكام التى ليست من خصائصه.

অর্থ: মহান আল্লাহ তিনি উনার হাবীব নূরে মুজাস্সাম হযরত নাবিউল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেন যে, তিনি যেন উম্মতগণকে অধিকাংশ লোকদের অনুসরণ করা থেকে সতর্ক করেন যে: (আর যদি আপনার উম্মত পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ করে, তবে তারা আপনার উম্মতদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথ থেকে বিপথগামী করে দিবে) যেহেতু নিশ্চয়ই তাদের অধিকাংশরাই তাদের দীন তথা সঠিক জীবন ব্যবস্থা, আমল ও ইল্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে বিপথে গেছে। তাই তাদের দীন বা মনগড়া জীবন ব্যবস্থা সমূহ বাতিল, তাদের আমল সমূহ নাফসের অনুসরণে এবং তাদের জ্ঞানসমূহ যার মধ্যে কোন সত্যতা নেই, অবশ্যই তা মন্দ বা খারাপ বা বাতিল পথ। বরং তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে: তারা জল্পনা-কল্পনার অনুসরণ করে, যাতে হক্ব বা সত্যের কোন অংশই নেই। আর তারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ব্যাপারে এমন সমস্ত মিথ্যা কথা বলে যা তারা জানে না।

এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে কাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাধ্যমে উনার বান্দাগণকে সতর্ক করেছেন। এবং তিনি তাদের অবস্থাদীর গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন। কেননা, পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হযরত নাবিউল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যেহেতু নিশ্চয়ই তিনি উম্মতগণের জন্য সকল বিধি-বিধানের ব্যাপারে আদর্শ। মূলত: অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলো উনার বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। (্তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান অর্থাৎ তাফসীরুস সা’দী পবিত্র সূরাতুল আনয়াম শরীফ- ১১৬ লেখক: হযরত আব্দুর রহমান বিন নাছির বিন আব্দুল্লাহ সা’দী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ১৩৭৬ হিজরী)

(৬১৪)

قوله تعالى: {وان تطع اكثر من فى الارض} سبب نزولها: ان الكفار قالوا للمسلمين: اتأكلون ما قتلتم ولا تأكلون ما قتل ربُّكم؟ فنزلت هذه الاٰية ذكره الفراء. والمراد ب {اكثر من فى الارض} الكفار. وفى ماذا يطيعهم فيه اربعة اقوال: احدها: فى اكل الميتة، والثانى: فى اكل ما ذبحوا للاصنام، والثالث: فى عبادة الاوثان، والرابع: فى اتباع ملل الاٰباء.

অর্থ: মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ইরশাদ মুবারক: (আর যদি আপনার উম্মত পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ করে) অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ অবতীর্ণের কারণ: কাফিররা মুসলমান উনাদেরকে বলত, তোমরা যা যবাই করছ তা তোমরা খাচ্ছো অথচ মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি যা যবাই করেন তা তোমরা খাচ্ছো না কেন? এ প্রশ্নের জওয়াবে অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ নাযিল হয়। ইহা হযরত ফাররা রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন। এখানে (জমিনের অধিকাংশ লোক) দ্বারা কাফিরদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কাফির-মুশরিকরা যা অনুসরণ করত এ ব্যাপারে চারটি মত রয়েছে। প্রথম: তারা মৃত পশুর গোস্ত ভক্ষণ করত, দ্বিতীয়: প্রতিমার নামে যবাইকৃত পশু ভক্ষণ করত, তৃতীয়: তারা মূর্তি পূজা করত, চতুর্থ: তারা তাদের বাপ-দাদাদের কুফরী-র্শিকী নিয়ম-পদ্ধতির অনুসরণ করত। (্যাদুল মাসীর ফী ইলমিত তাফসীর অর্থাৎ তাফসীরুল্ জাওযী পবিত্র সূরাতুল আনয়াম শরীফ- ১১৬ লেখক: হযরত জামালুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আলী বিন মুহাম্মাদ জাওযী হাম্বালী আশয়ারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ৫৯৭ হিজরী)

(৬১৫)

}وَاِن تُطِعْ اَكْثَرَ مَن فِى الارض} يعنى اهل ارض مكة فيما يدعونه الى ملة اٰبائه. ويقال: وان تطع اكثر من فى الارض يعنى الكفار لان اكثر من فى الارض كانوا الكفار {يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ الله} يعنى يصرفوك عن دين الاسلام {اِن يَّتَّبِعُوْنَ اِلاَّ الظن} يعنى ان اكثرهم يتبعون اكابرهم بالظن، ويتبعونهم فيما لا يعلمون انهم على الحق، فان قيل: كيف يعذبون وهم ظانون على غير يقين؟ قيل لهم: لانهم اقتصروا على الظن والجهل لانهم اتبعوا اهواءهم ولم يتفكروا فى طلب الحق.

অর্থ: (আর যদি আপনার উম্মত পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ করে) পবিত্র মক্কা শরীফ উনার জমিনের কাফিরা, যারা তাদের অনুসারীদেরকে তাদের বাপ-দাদাদের অনুসরণ করতে আহ্বান করত। তাফসীরে বলা হয়: ‘যদি আপনার উম্মত অধিকাংশ লোকদেরকে অনুসরণ করে’ অর্থাৎ কাফিরদেরকে, কেননা যমীনের অধিকাংশ লোকরাই হচ্ছে কাফির। (তবে তারা আপনার উম্মতদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথ থেকে বিপথগামী করে দিবে) অর্থাৎ তারা উম্মতদেরকে দ্বীন ইসলাম থেকে ফিরিয়ে দিবে। (তারা শুধু জল্পনা-কল্পনার অনুসরণ করে) অর্থাৎ তারা ধারনাপ্রসূত তাদের আকাবির বা মুরব্বীদেরকে অনুসরণ করে। তারা যা জানে না এ ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করে এ ধারনায় যে তারা হক্ব বা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। নাঊযু বিল্লাহ। যদি প্রশ্ন করা হয়: তাদেরকে কেন আযাব দেয়া হবে, কেননা তারা তো ইয়াক্বীন ছাড়াই ধারনা করত? তার উত্তরে বলা হবে: তারা শাস্তির উপযুক্ত এজন্য যে, তারা তাদের ধারনা ও মুর্খতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে সন্তুষ্ট ছিল। যেহেতু তারা তাদের নাফসের অনুসরণ করেছে, আর হক্ব বা সত্য অন্বেষণ করতে কোন চিন্তা-ভাবনা করেনি। (্বাহরুল উলূম অর্থাৎ তাফসীরুন সামারকান্দী পবিত্র সূরাতুল আনয়াম শরীফ- ১১৬ লেখক: হযরত আবুল লাইছ নছর বিন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন ইবরাহীম সামারকান্দী হানাফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ৩৭৩ হিজরী)

অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ এবং উনার তাফসীর থেকে যা প্রমাণিত হলো তা হচ্ছে: এখানে মূলত: উম্মতদেরকে নছীহত করা হয়েছে এবং কাফির, মুশরিক ও যাবতীয় বিধর্মীদেরকে অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ পৃথিবীর অধিকাংশ লোকরা মূলত: কাফির ও মুশরিক। কাফির-মুশরিক ও যাবতীয় বিধর্মীরাই কল্পনার বশবর্তী হয়ে নাফসের অনুসরণ করে। তারাই নাহক্ব বাপ-দাদা ও আকাবির বা মুরব্বীদেরকে অনুসরণ করে। তাই অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে হযরত ইমাম-মুজতাহিদ, মুরশিদ, শায়েখ, উলামা, আউলিয়া উনাদেরকে অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়নি। বরং কাফির, মুশরিক ও যাবতীয় নাহক্ব মতাদর্শীদেরকে অনুসরণ করতেই নিষেধ করা হয়েছে। এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তাফসীর থেকে তাই প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইমাম-মুজতাহিদ, উলামা ও আউলিয়া কিরাম রহমাতুল্লাহি আলাইহিম উনাদেরকে অনুসরণ করতে হবে, আর তার বিপরীতে কাফির, মুশরিক, ইয়াহূদী, নাছারা, মাজূসী, হিন্দু, বৈদ্ধ, নাহক্ব আকাবির, নাহক্ব মুরব্বী ও যাবতীয় বিধর্মী ও বাতিল মতাবলম্বীদেরকে অনুসরণ করা যাবে না।

পবিত্র আয়াত শরীফ নম্বর- ৭

اتخذوا احبارهم و رهبانهم اربابا من دون الله و المسيح ابن مريم وما امروا الا ليعبدوا الها واحدا لا اله الا هو سبحنه عما يشركون.

অর্থ: তারা (মুশরিক, ইহুদী ও নাছারারা) মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে ছেড়ে তাদের বিদ্বান ও দরবেশ (সাধু) দেরকে এবং হযরত মাসীহ বিন র্মাইয়াম হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ তারা আদিষ্ট ছিলো একমাত্র ইলাহ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ইবাদত করার জন্য। তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ বা মা’বূদ নেই। তারা উনার সম্পর্কে যা শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পূত:পবিত্র। (পবিত্র সূরাতুত তাওবাহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ নং- ৩১)

অত্র পবিত্র আয়াত উনার বিশুদ্ধ

তাফসীর বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

(৬১৬)

)اِتَّخَذُوْا اَحْبَارهمْ) عُلَمَاء الْيَهُود (وَرُهْبَانهمْ) عُبَّاد النَّصَارٰى (اَرْبَابًا مِنْ دُون الله) حَيْثُ اتَّبَعُوهُمْ فِى تَحْلِيل مَا حَرَّمَ الله وَتَحْرِيم مَا اَحَلَّ (وَالْمَسِيح ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا اُمِرُوْا) فِى التَّوْرَاة وَالْاِنْجِيْل (اِلَّا لِيَعْبُدُوْا) اَىْ بِاَنْ يَّعْبُدُوْا (اِلٰهًا وَّاحِدًا لَا اِلٰه اِلَّا هُوَ سُبْحَانه) تَنْزِيهًا لَه.

অর্থ: (তারা অর্থাৎ মুশরিক, ইহুদী ও নাছারারা গ্রহণ করেছে তাদের আহবারদেরকে) ইয়াহূদীদের উলামা বা বিদ্বানদেরকে (ও তাদের রুহবানদেরকে) নাছারা বা খ্রিষ্টানদের দরবেশদেরকে (রব হিসেবে, মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে বাদ দিয়ে) যেহেতু তারা কোন কিছুকে হালাল জেনে তাদেরকে অনুসরণ করত, অথচ তা মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি তাদের জন্য হারাম করেছিলেন। অনুরূপ মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি যা হালাল করেছেন, তা তারা হারাম ভেবে অনুসরণ করত। (এবং হযরত মাসীহ বিন র্মাইয়াম হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকেও রব হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ তারা আদিষ্ট ছিলো) পবিত্র তাওরাত শরীফ ও পবিত্র ইনযীল শরীফ উনার দ্বারা নির্দেশিত হয়েছিল (তারা ইবাদত করবে) যাতে তারা ইবাদত করে (একমাত্র ইলাহ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ বা মা’বূদ নেই। তারা উনার সম্পর্কে যা শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পূত:পবিত্র) তাদের কৃত অংশিদারিত্ব থেকে তিনি পূত:পবিত্র ও পবিত্রতম। (তাফসীরুল জালালাঈন পবিত্র সূরাতুল তাওবাহ শরীফ- ৩১)

(৬১৭)

و”الحَبْر” هو لقب عند اليهود وهو العالم. ويقال فى اللغة حِبر او حَبْرُ اى رجل يدقق الكلام ويزنه باسلوب عالم. والرهبان عند النصارى والمقصود بهم المنقطعون للعبادة، فالحَبر عالِم اليهود والراهب عابد النصارى،  اما عالم النصارى فيسمى “قسيس” ولذلك قال الحق سبحانه وتعالى: {قِسِّيْسِيْنَ وَرُهْبَانًا} [سورة المائدة شريف: ৮২ الاية الشريفة[

অর্থ: ‘হাব্র’ ইহা হচ্ছে ইয়াহূদী আলিমদের লক্বব বা উপাধি। অভিধানে ইহাকে ‘হাবরুন’ ও ‘হিবরুন’ হিসেবে দুই ক্বিরায়াতে পড়া হয়েছে। হিব্র বা হাব্র এমন ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি সুক্ষ কথা বলেন। এ শব্দটির অর্থ করা হয়েছে আলিম হিসেবে। আর ‘রুহবান’ হল নাছারা বা খ্রিষ্টান আলিমরা। নাছারাদের মধ্যে যারা সারা জীবন ইবাদতে কাটিয়েছে এখানে তাদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অতএব, হাব্র বা হিব্র হচ্ছে ইয়াহূদী আলিমরা আর ‘রাহিব’ হচ্ছে খ্রিষ্টানদের আবিদ বা ইবাদতকারীরা। এছাড়াও খ্রিষ্টানদের আলিমকে ক্বিস্সীস বলা হয়ে থাকে। আর এজন্যই মহান আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা তিনি পবিত্র সূরাতুল মায়িদাহ শরীফ উনার ৮২ নম্বর আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন: ‘খ্রিষ্টানদের মধ্যে কতক আলিম ও দরবেশ রয়েছে’। (তাফসীরুশ শা’রাবী পবিত্র সূরাতুল তাওবাহ শরীফ- ৩১ লেখক: মুহাম্মাদ মুতাওয়ালী শা’রাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ১৪১৮ হিজরী)

(৬১৮)

}اِتَّخَذُوْا اَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ اَرْبَابًا} اى علماءهم وقرّاءهم، والاحبار: العلماء واحدها حِبر وحَبر بكسر الحاء وفتحها، والرهبان من النصارى اصحاب الصوامع فان قيل: انهم لم يعبدوا الاحبار والرهبان؟ قلنا: معناه أنهم أطاعوهم في معصية الله واستحلوا ما احلّوا وحرّموا ما حرّموا فاتخذوهم كالارباب. رُوى عن عدى بن حاتم رضى الله عنه قال: اتيتُ رسولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم وفى عنقى صليب من ذهب فقال لى يا عدى رضى الله عنه اطرح هذا الوثن من عنقك فطرحته ثم انتهيت اليه وهو يقرأ “اِتَّخَذُوا اَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ اَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ” حتى فرغ منها، قلت له: انّا لسنا نعبدهم، فقال: اليس يُحرمون ما احلّ الله فتحرمونه ويحلّون ما حرّم الله فتستحلونه؟ قال قلت: بلى قال: فتلك عبادتهم.

}وَالْمَسِيْحَ ابْنَ مَرْيَمَ} اى اتخذوه الٰها {وَمَا اُمِرُوْا اِِلَّا لِيَعْبُدُوْا اِلٰهًا وَّاحِدًا لا اِلٰهَ اِلَّا هُوَ سُبْحَانَه عَمَّا يُشْرِكُوْنَ{.

অর্থ: (তারা অর্থাৎ মুশরিক, ইহুদী ও নাছারারা তাদের আহবারদেরকে ও তাদের রুহবানদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে) অর্থাৎ তাদের উলামাদেরকে ও তাদের ক্বারীদেরকে। আহবার হচ্ছে ইয়াহূদী উলামারা। এর একবচন হচ্ছে হা বর্ণে যের ও যবর যোগে হিব্র ও হাব্র শব্দ দুটি। রুহবান হচ্ছে খ্রিষ্টানদের মধ্যে গির্জার অধিকারীরা। যদি প্রশ্ন করা হয়: তারা তো আহবার বা ইয়াহূদী আলিম ও রুহবান বা খ্রিষ্টান আবিদদের ইবাদত করে না। আমরা তার উত্তরে বলব: ইহার অর্থ হচ্ছে- নিশ্চয়ই তারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সাথে নাফরমানীর ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করে, তারা যে সমস্ত বিষয়কে হালাল বলে তারা তা-ই হালাল বলে মেনে নেয় এবং তারা যে সমস্ত বিষয়কে হারাম বলে তারা তা-ই হারাম বলে মেনে নেয়, অতএব তাদের এই মেনে নেয়াকেই রব বলে মেনে নেয়ার শামিল। ছাহাবী হযরত আদী বিন হাতিম রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি একদা নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হযরত রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকটে আসলাম এমতাবস্থায় যে, তখন আমার গলায় একটি সোনার টাই বা ক্রুশ ছিল। ইহা দেখে তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন: হে হযরত আদী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু! আপনি এই মূর্তিকে আপনার গলা থেকে খুলে ফেলে দিন। তাই আমি ইহা খুলে ফেলে দিলাম এবং উনার নিকট ফিরে আসলাম। তখন তিনি অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ ‘তারা অর্থাৎ মুশরিক, ইহুদী ও নাছারারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে বাদ দিয়ে তাদের আহবারদেরকে ও তাদের রুহবানদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে’ তিলাওয়াত করলেন, এমনকি তিলাওয়াত করা শেষ করলেন। তখন আমি উনার কাছে আরয করলাম, আমরা তো আহবার ও রুহবানদের ইবাদত করি না। জাওয়াবে তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন: এমনটি কি নয়, মহান আল্লাহ তায়ালা যা কিছু হালাল করেছেন তারা সেগুলোকে হারাম মনে করে, আর তোমরাও সেগুলোকে হারাম মনে করে থাক; অনুরূপ মহান আল্লাহ তায়ালা যা কিছু হারাম করেছেন তারা সেগুলোকে হালাল মনে করে, আর তোমরাও সেগুলোকে হালাল মনে করে থাক? আমি বললাম: হ্যাঁ বিষয়টি এমনই। তখন নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হযরত রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন: ইহাই তো আহবার ও রুহবানদের ইবাদত করা। (এবং হযরত মাসীহ বিন র্মাইয়াম হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকেও) অর্থাৎ খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে ইলাহ বা মা’বূদ হিসেবে গ্রহণ করেছে। (অথচ তারা আদিষ্ট ছিলো তারা ইবাদত করবে একমাত্র ইলাহ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ বা মা’বূদ নেই। তারা উনার সম্পর্কে যা শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পূত:পবিত্র)। (মায়ালিমুত তানযীল অর্থাৎ তাফসীরুল বাগবী পবিত্র সূরাতুল তাওবাহ শরীফ- ৩১ লেখক: মুহইস্ সুন্নাহ হযরত আবূ মুহাম্মাদ হুসাঈন বিন মাসঊদ বাগবী শাফিয়ী আশয়ারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ৫১০ হিজরী)

অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ এবং উনার তাফসীর থেকে যা প্রমাণিত হলো তা হচ্ছে: মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে ও উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে বাদ দিয়ে আহবার বা ইয়াহূদী আলিম ও রুহবান বা খ্রিষ্টান দরবেশদেরকে অনুসরণ করা মূলত: হারাম-নাজায়িয ও কুফরী-শিরকীর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি উনাদেরকে বাদ দিয়ে মুসলমান নামধারী কোন আলিম ক্বারী মুফতী মুহাদ্দিছ মুফাসসির ফক্বীহ শায়েখ পীর কবি সাহিত্যিক ইত্যাদী কাউকে অনুসরণ করাও হারাম-নাজায়িয ও কুফরী-শিরকীর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অন্যান্য অসংখ্য পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, নেককার-পরহেযগার ইমাম মুজতাহিদ ফক্বীহ মুফতী উনাদেরকে ইত্তিবা’ বা অনুসরণ-অনুকরণ করা ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত। আর ইহাই তো মাযহাব মান্য করা।

পবিত্র আয়াত শরীফ নম্বর- ৮

فلا تك فى مرية مما يعبد هؤلاء ما يعبدون الا كما يعبد اباؤهم من قبل وانا لموفوهم نصيبهم غير منقوص.

অর্থ: অতএব, তারা যেসবের উপাসনা করে সে ব্যাপারে তোমরা কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ে পড়বে না। তাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদারা যেমন পূজা-উপাসনা করতো, এরাও তেমন করছে। আর নিশ্চয়ই আমি তাদের আযাবের ভাগ কিছুমাত্র কম না করেই পুরোপুরি দান করব। (পবিত্র সূরাহ হূদ শরীফ- ১০৯)

অত্র পবিত্র আয়াত উনার বিশুদ্ধ

তাফসীরবা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

(৬১৯)

لفظ الخطاب للنبى صلى الله عليه وسلم والمعنى له ولامته … {مرية} الشك و{هؤلاء} اشارة الى كفار العرب عبدة الاصنام ثم قال: {ما يعبدون الا كما يعبد اٰباؤهم من قبل} المعنى انهم مقلدون لا برهان عندهم ولا حجة وانما عبادتهم تشبهًا منهم باٰبائهم لا عن بصيرة.

অর্থ: এখানে প্রকাশ্য সম্বোধন দ্বারা বাহ্যিকভাবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন ইমামুল মুরসালীন খাতামুন নাবিয়্যীন নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন করা হয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হাক্বীক্বী অর্থে উনার উম্মত উনাদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। … (র্মিইয়াহ) অর্থ সন্দেহ-সংশয় (হাউলা বা তারা) ইহা দ্বারা মূর্তিপূজারী আরব কাফিরদেরকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অতপর ইরশাদ মুবারক হয়েছে: (তাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদারা যেমন পূজা-উপাসনা করতো, এরাও তেমন করছে) যার অর্থ হচ্ছে- তারা এমন মুক্বাল্লিদ বা অনুসারী যার স্বপক্ষে তাদের কাছে কোন দলীল-প্রমাণ নেই। তাদের মূর্তি পূজা-উপাসনা তাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদাদের পূজা-উপাসনার মতই ছিল, যা এমনিতেই অপরিকল্পিত ভাবে হত। (আল্ মুর্হারারুল ওয়াজীয অর্থাৎ তাফসীরে ইবনু আত্বিয়্যাহ পবিত্র সূরাহ হূদ শরীফ- ১০৯ লেখক: হযরত আবূ মুহাম্মাদ আব্দুল হক্ব বিন গালিব বিন আব্দুর রহমান বিন তামাম বিন আত্বিয়্যাহ আন্দালুসী মাহারিবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ৫৪২ হিজরী)

(৬২০)

}مما يعبد هؤلاء} الـمشركون من الاصنام انه باطل وضلال، اِنما يقلِّدون اٰباءهم.

অর্থ: (তারা যেসবের উপাসনা করে) মূর্তি পূজারী মুশরিক বা অংশি স্থাপনকারীরা। নিশ্চয়ই তারা বাত্বিল ও গুমরাহ। তারা তো তাদের মূর্তিপূজারী বাপ-দাদাদের অনুসরণ করে থাকে। (যাদুল মাসীর ফী ইলমিত তাফসীর অর্থাৎ তাফসীরুল জাওযী পবিত্র সূরাহ হূদ শরীফ- ১০৯ লেখক: হযরত জামালুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আলী বিন মুহাম্মাদ জাওযী হাম্বালী আশয়ারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়াফাত: ৫৯৭ হিজরী)

(৬২১)

يقول تعالى: {فَلا تَكُ فِى مِرْيَةٍ مِمَّا يَعْبُدُ هٰؤُلاءِ} المشركون انه باطل وجَهل وضلال، فانهم انما يعبدون ما يعبد اٰباؤهم من قبل اى ليس لهم مُستَنَد فيما هم فيه الا اتباع الاٰباء فى الجهالات.

অর্থ: মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ইরশাদ মুবারক: (অতএব, তারা যেসবের উপাসনা করে সে ব্যাপারে তোমরা কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ে পড়বে না) মুশরিক বা অংশিদার স্থাপনকারীরা হচ্ছে বাত্বিল, মুর্খ ও গুমরাহ। কেননা, তারা তাদেরই পূজা-উপাসনা করে, ইতিপূর্বে তাদের বাপ-দাদারা যার উপাসনা করত। অজ্ঞতার সাথে বাপ-দাদাদের অনুসরণ ছাড়া এ ব্যাপারে তাদের কোন দলীল-প্রমাণ ছিল না। (তাফসীরুল কুরআনিল আযীম অর্থাৎ তাফসীরে ইবনে কাছীর পবিত্র সূরাহ হূদ শরীফ- ১০৯ লেখক: হযরত আবুল ফিদা ইসমাঈল বিন উমর বিন কাছীর কুরাশী দামেশক্বী শাফিয়ী আশয়ারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বিলাদত: ৭০০ হিজরী ওয়াফাত: ৭৭৪ হিজরী)

(৬২২)

وانما هم مقلدون لاٰبائهم يعبدون ما كانوا يعبدون من الاصنام والاوثان.

অর্থ: নিশ্চয়ই তারা তাদের পূর্ব বাপ-দাদাদের মূর্তিপূজার অনুসারী, যেই বাপ-দাদারা মূর্তি, প্রতিমা, দেব-দেবী ইত্যাদীর পূজা-অর্চনা করত। নাঊযু বিল্লাহ। (আইসারুত্ তাফাসীর লিকালামিল আলিয়্যিল কাবীর অর্থাৎ তাফসীরুল জাযায়িরী পবিত্র সূরাহ হূদ শরীফ- ১০৯ লেখক: হযরত জাবির বিন মূসা বিন আব্দুল ক্বাদির বিন জাবির আবূ বকর জাযায়িরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

অত্র পবিত্র আয়াত শরীফ এবং উনার তাফসীর থেকে যা প্রমাণিত হলো তা হচ্ছে: আরবের কাফির, মুশরিক, বাতিল, গুমরাহ, জাহিল বা মুর্খরা তাদের বাপ-দাদাদেরকে অনুসরণ করে মূর্তি পূজা-অর্চনা করত। এতে তাদের কোন দলীল-প্রমাণের প্রয়োজন হত না। কুফরী, শিরকী ও যাবতীয় নাফরমানীমূলক কাজে তারা তাদের বাপ-দাদাদেরকে অন্ধ বিশ্বাসে অনুসরণ করত। ঈমান-কুফ্র, হালাল-হারাম, ভালো-মন্দ ইত্যাদী বিবেচনা করত না। এমন তাক্বলীদ বা অনুসরণই হচ্ছে ‘আত-তাক্বলীদু গাইরুশ শারয়ী তথা শারীয়াত বহির্ভুত অনুসরণ’। যা করতে মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি ও উনার প্রিয়তম রসূল নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

 

অসমাপ্ত

পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন]

কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম-নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-২৮

কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শবে বরাত-এর আহকাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-১

কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম-নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-২৯

কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শবে বরাত-এর আহকাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-২

কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস-এর দৃষ্টিতে প্রাণীর মূর্তি তৈরি করা ও ছবি আঁকা, তোলা, তোলানো, রাখা, রাখানো, দেখা, দেখানো হারাম-নাজায়িয হওয়ার অকাট্য প্রমাণ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৩০