-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
চান্দ্র মাসের এগারতম মাসটির নাম যিলক্বদ। এ নামেই বাংলা ভাষাভাষি লোকেরা মাসটিকে অভিহিত করে থাকে। আসলে মাসটির আরবী সহীহ্ উচ্চারণ হচ্ছে- “যুল ক্বা’দাহ্।” যার অর্থঃ বসে থাকার মাস এবং এ অর্থের সাথে মাসটির নাম করণের মিল রয়েছে। তাহলো এই যে, এ মাসে আরবরা ঘরে বসে থাকতো এবং মাসটির হুরমত রক্ষা করার নিমিত্তে যুদ্ধ বিগ্রহ হতে বিরত থাকতো।
প্রকাশ থাকে যে, আল্লাহ্ পাক-এর ঘোষণাকৃত চারটি হারাম বা সম্মানিত মাসের প্রথম মাসটিই হচ্ছে যিলক্বদ মাস। তাই এ মাসের ফযীলত-বুযুর্গীর কথা নতুন করে বর্ণনার অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,
اكرموا ذى القعدة فانه اول من شهور الحرام.
অর্থঃ- “তোমরা যিলক্বদ মাসকে সম্মান কর। কেননা এটি সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে প্রথম মাস।”
এ মাসে ঝগড়া-ফাসাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, কাটাকাটি-মারামারি হারাম। এক কথায় শরীয়ত বিরোধী সকল প্রকার কার্যকলাপ হতে পবিত্র ও মুক্ত থেকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত-বন্দেগীতে মনোনিবেশ করাই এ মাসের দাবী। এ মাসের ফযীলতসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ ফযীলত হচ্ছে, স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসেই একাধিকবার ওমরাহ্ আদায় করেছেন।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,
عن انس رضى الله تعالى عنه قال اعتمر رسول الله صلى الله عليه وسلم اربع عمر كلهن فى ذى القعدة الا التى كانت مع حجته الخ.
অর্থঃ- “হযরত আনাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৪বার ওমরাহ্ করেছেন। প্রত্যেকটি করেছেন যিলক্বদ মাসে। তবে হজ্বের সাথে যেটি করেছেন তা ব্যতীত।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ)
অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওমরাহ্ আদায় করেছেন ৪ বার আর হজ্ব আদায় করেছেন ১ বার। ৩টি ওমরাহ্ আদায় করেছেন যথাক্রমে, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম হিজরীতে এবং শেষোক্ত ওমরাহ্টি আদায় করেছেন ১০ হিজরীতে হজ্বের সাথে। এখানে একটি মাসয়ালা মনে রাখা আবশ্যক যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্ব ও ওমরাহ্ আদায়ের সময়ই কেবল নিজ মাথা মোবারক মুন্ডন করেছেন। এছাড়া তাঁর হায়াত মোবারকে আর কোন সময় মাথা মুন্ডন করেননি বা চুল ছোট ছোট করে রাখেননি বরং সর্বদা তিনি বাবরী চুল রাখতেন। এজন্য শুধু হজ্ব ও ওমরাহ্ পালনের সময়ই চুল মুন্ডন করা সুন্নত এবং দ্বিগুণ ছওয়াব লাভের কারণ তবে হজ্ব ও ওমরাহ্তে চুল ছোটও করতে পারে তবে এতে একগুণ ছওয়াব হাছিল হবে।
উল্লেখ্য, বছরের যে কোন সময়ে ওমরাহ্ আদায় করা যায়। তবে ৯ই যিলহজ্ব হতে ১৩ ই যিলহজ্ব পর্যন্ত ওমরাহ্ করা মাকরূহ্ তাহরীমী। কেননা, এই কয়দিন হজ্বের জন্য নির্দিষ্ট।
অতএব, যাদের সামর্থ আছে তাদের ফরয হজ্ব আদায় করার পর একাধিক ওমরাহ্ আদায় করা সুন্নতের শামীল। এবং তা যদি যিলক্বদ মাসে আদায় করে তাও সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত হবে এবং সে অধিক ফযীলত হাছিল করবে।
প্রতি মাসের নফল রোযার ন্যায় এ মাসেরও নফল রোযার ফযীলত হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি যিলক্বদ মাসের মধ্যে একদিন রোযা রাখবে আল্লাহ্ পাক তার আমল নামায় একটি মকবুল হজ্বের ছওয়াব লিখে দিবেন।” (সুবহানাল্লাহ্)
নফল নামাযের ফযীলত সম্পর্কেও হাদীস শরীফে এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি যিলক্বদ মাসের প্রত্যেক রাত্রিতে দু’রাকায়াত নামায সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাছ তিনবার পাঠ করে আদায় করবে আল্লাহ্ পাক তার আমলনামায় একজন হাজী ও একজন শহীদের ছওয়াবের সমপরিমাণ ছওয়াব লিখে দিবেন এবং এই আমলকারী রোজ হাশরে আল্লাহ্ তায়ালার আরশের ছায়ায় স্থান লাভ করবে।” (সুবহানাল্লাহ্)
মূলতঃ এ মাসটি হজ্বেরই একটি মাস। সুতরাং যাদের প্রতি হজ্ব ফরয, তাদেরকে হজ্ব আদায় করার জন্য একান্তভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতঃ পবিত্র মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফে উপস্থিত হয়ে আল্লাহ্ পাক-এর কুদরতে কামিলা অবলোকন করার তাওফিক লাভের যথাযথ শুকরানা আদায় পূর্বক আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রেজামন্দী হাছিলের জন্য মন-প্রাণ কুরবান করে দিতে হবে।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে এ তাওফিক দান করুন।