ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার
-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
প্রসঙ্গ: পীর ছাহিব উনার যাহিরী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি লক্ষ্য করবেনা। বরং উনার বাতিনী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি সর্বদা মুতাওয়াজ্জেহ্ বা রুজু থাকবে।
(এ কথার অর্থ এটা নয় যে, পীর ছাহিব উনারা যাহিরীভাবে ইসলামী শরীয়ত উনার খিলাফ কাজ করবেন। আর বাতিনীভাবে ওলী আল্লাহ্ থাকবেন। বরং যিনি পীর ছাহিব হবেন তিনি যাহিরী ও বাতিনী উভয় অবস্থায় ইসলামী শরীয়ত উনার পূর্ণ পাবন্দ হবেন। যে ব্যক্তি যাহিরী ও বাতিনী উভয় দিক থেকে ইসলামী শরীয়ত উনার পাবন্দ নয় সে ওলী আল্লাহ্ নয়, বরং তার বিপরীত হবে। মূলত একথার দ্বারা ওই কথার প্রতি ইশারা করা হয়েছে যে, কাফিররা মহান আল্লাহ্ পাক উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যাহিরী অবস্থা (যমীনে চলাচল) লক্ষ্য করে বলতো, “তিনি কেমন রসূল! খাদ্য খান, বাজারে যান।” অর্থাৎ কাফিররা মহান আল্লাহ্ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যাহিরী অবস্থা লক্ষ্য করেছে কিন্তু বাতিনী বা হাক্বীক্বী অবস্থা লক্ষ্য করেনি। তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে এ আলোচনা।)
আখইয়ার তথা আউলিয়ায়ে কিরাম উনার হাক্বীক্বী পরিচয় বা যাহিরী ও বাতিনী অবস্থা প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
اجسادهم فى الارض واعينهم فى السماء واقد امهم فى الارض وقلوبهم فى السماء وانفسهم فى الارض وافئدتهم عند العرش وارواحهم فى الدنيا وعقولهم فى الاخرة ليس لهم الا امامهم قبورهم فى الدنيا ومقامهم عند ربهم عزوجل.
অর্থ : “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, উনাদের (আখইয়ার বা আউলিয়ায়ে কিরাম) দেহ মুবারক যমীনে অবস্থান করে আর উনাদের দৃষ্টি মুবারক থাকে আসমানে। উনাদের পা মুবারক থাকে মাটিতে কিন্তু ক্বালব বা অন্তর মুবারক সন্নিবেশিত থাকে আকাশে। নফস মুবারক থাকে পৃথিবীতে ক্বালব মুবারক থাকে আরশে। তাঁদের রূহ দুনিয়াতে বিচরণ করে কিন্তু আক্বল থাকে আখিরাতে। ইমামত বা সুশৃঙ্খলভাবে কায়েনাত পরিচালনা ব্যতীত আর কোন লক্ষ্য থাকেনা। সুতরাং তাঁদের মাযার শরীফ দুনিয়াতে হলেও মাকাম বা অবস্থান স্থল তাঁদের মহিয়ান গরীয়ান রবের নিকট।”(হিল্য়াতুল আউলিয়া ১ম জিঃ ১৬ পৃষ্ঠা)
মূলতঃ আল্লাহ্ পাক উনার মহান উদ্দেশ্য সাধন কল্পে আউলিয়া-ই-কিরামগণের দুনিয়ায় অবস্থান। সুতরাং তাঁরা দুনিয়ার বাতিনী অবস্থার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধকারী এবং সেখানে বিরাজিত বাতিনী তথা আভ্যন্তরীণ নিয়ামতরাজীই ভোগ করেন। আর সাধারণ লোকেরা দুনিয়ার জাহিরী অবস্থা দর্শনে বিমোহিত হয়ে পরকালের চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি হতে মাহ্রুম বা বঞ্চিত হয়।
এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, হাওয়ারীন তথা হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম-এর অনুসারীগণ হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামকে বলেন,
من اولياء الله؟ الذين لاخوف عليهم ولاهم يحزنون؟ قال عيسى عليه السلام الذين نظروا الى باطن الدنيا حين نظر الناس الى ظاهرها.
অর্থ : “আউলিয়া-ই-কিরাম কারা? যাদের সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, “তাঁদের কোন ভয় নেই ও চিন্তা-পেরেশানী নেই।” তখন হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম বললেন, যাঁরা দুনিয়ার বাতিন বা আভ্যন্তরীণের দিকে দৃষ্টি নিবব্ধ রাখেন। যখন লোকেরা তাদের জাহির বা বাহ্যিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখে তথা বাহ্যিক সৌন্দর্য্যরে মোহে মোহগ্রস্থ হয়।” (হিলয়াতুল আউলিয়া, ১ম জিঃ ১০ পৃষ্ঠা)
হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত আছে,
مر عمر بمعاذ بن جبل رضى الله تعالى عنهما وهو يبكى فقال ما يبكيك يا معاذ؟ فقال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول احب العباد الى الله تعالى الاتقياء الاخفياء الذين اذا غابوا م يفتقدوا واذا شهدوا لم يعرفوا اولئك هم ائمة اهدى ومصابيح العلم.
অর্থ : “একদা উমর ইবনুল খাত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হে মুয়াজ! তুমি কাঁদছো কেন? তখন তিনি বললেন, আমি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি আল্লাহ্ পাক উনার অতি প্রিয় বান্দা হচ্ছেন “আত্কিয়া আখফিয়া (গুপ্ত মুত্তাক্বী)। যখন তাঁরা অনুপস্থিত হন বা লোক চক্ষুর আড়ালে থাকেন তখনও তাঁদের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকে। আর যখন তাঁরা (লোক সমাজে) উপস্থিত হন তখন তাঁদেরকে চেনা যায়না। অর্থাৎ সাধারণ লোকেরা তাঁদের হাক্বীক্বী পরিচয় লাভ করতে পারেনা। আর তাঁরাই হচ্ছেন হিদায়েতের ইমাম তথা সঠিক পথ প্রদর্শণকারী এবং ইলমের বাতিস্বরূপ।” (হিলয়াতুল আউলিয়া ১ম জিঃ, ১৫ পৃষ্ঠা) প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, একদিন ইমামুল আইম্মা, হাকীমুল হাদীস হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমামুল মুহাক্কিকীন, হাকীমুল হাদীস হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি কোন এক স্থানে একত্রিত হয়েছিলেন। ইতোমধ্যে সুলতানুল আউলিয়া, আমীরুল কুলুব, হযরত হাবীব আজমী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেখানে হাজির হলেন। তাঁকে দেখে ইমামুল মুহাক্কিকীন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল আইম্মা হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বললেন, “আজ হাবীব আজমী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট দু’একটি কথা জিজ্ঞেস করবো।” হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তিনি এক ভিন্ন প্রকৃতির লোক। তাঁর কাছে কোন কিছু জিজ্ঞেস না করাই ভাল।” সুলতানুল আউলিয়া হযরত হাবীব আজমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের নিকট গিয়ে আসন গ্রহণ করার পরই ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে বললেন, “আচ্ছা শেখ ছাহিব! মনে করুন, এক ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের এক ওয়াক্ত আদায় করেনি, কোন্ ওয়াক্ত আদায় করেনি তাও তার স্মরণ নেই, এমতাবস্থায় লোকটি কি করবে?” সুলতানুল আউলিয়া হযরত হাবীব আজমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “মনে হয় লোকটি গাফিল। তাই তার কিছু শিক্ষার প্রয়োজন আছে। লোকটির পুরো পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই আদায় করতে হবে।” ইমামুল মুহাক্কিকীন হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর এ তাৎপর্যপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ জাওয়াব শুনে অবাক হয়ে গেলেন। (তাজকিরাতুল আউলিয়া) আউলিয়া-ই-কিরাম হচ্ছেন ইলমের প্রকৃত ধারক-বাহক। যদিও তাঁদের হাক্বীক্বী পরিচয় উপলব্ধি করা কঠিন। কেননা অনেকেই তাঁদের জাহিরী অবস্থা লক্ষ্য করে সাধারণ লোকদের গন্ডিভুক্ত মনে করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সাধারণ লোকদের মত দুনিয়ার যমীনে অবস্থান করতঃ সাধারণ লোকদের সাথে চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া ও জীবন-যাপন করলেও তাঁদের এ সমস্ত কার্য সম্পাদন করার পিছনে থাকে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ পালন তথা তাঁদের সন্তুষ্টি ও রেযামন্দী। আর সাধারণ লোকদের ক্ষেত্রে থাকে তাদের নফছানিয়াত তথা প্রবৃত্তির দাসত্ব। সুতরাং দুনিয়াবী প্রয়োজনীয় কাজ-কর্ম একইরূপ হলেও উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকে ভিন্নরূপ। একদা জনৈক আল্লাহ্ পাক উনার ওলী, বুযূর্গ ব্যক্তি অনেক মুরীদ-মুতাকিদ, মুহিব্বীন ও আশেকীন দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। তাঁদেরকে আল্লাহ্ পাক উনার মতে মত হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথে পথ হওয়ার জন্য মর্মস্পর্শী ও হৃদয় গ্রাহী ওয়াজ করছিলেন। অতঃপর এক পর্যায়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “দেখ, আজ সুদীর্ঘ দশ বৎসর হতে আমি কোন খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করিনা এবং স্ত্রীর নিকটবর্তী হইনা।” বুযূর্গ ব্যক্তির এ হিকমতপূর্ণ কথা তাঁর স্ত্রীর কর্ণগোচর হলো। যথারীতি মজলিস শেষ হলো। সকলেই স্ব-স্ব স্থানে চলে গেলেন। বুযূর্গ ব্যক্তির স্ত্রী তাঁকে বললেন, “আপনি লোকদেরকে কি বললেন? অথচ আপনি প্রতি দিনই পানাহার করেন। আর স্ত্রীর নিকটবর্তীও হয়ে থাকেন।” সেই বুযূর্গ ব্যক্তি বললেন, “আমি নফছের চাহিদা পূরণের জন্য এসব করিনা। আমি যা করি তা হচ্ছে, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ পালন এবং সন্তুষ্টি-রেযামন্দী হাছিলের জন্য।”
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪১)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)