প্রসঙ্গ: পীর ছাহেবের জাহিরী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি লক্ষ্য করবেনা। বরং তাঁর বাতিনী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি সর্বদা মুতাওয়াজ্জেহ্ বা রুজু থাকবে। (এ কথার অর্থ এটা নয় যে, পীর ছাহেবগণ জাহিরীভাবে শরীয়তের খিলাফ কাজ করবেন। আর বাতিনীভাবে ওলী আল্লাহ্ থাকবেন। বরং যিনি পীর ছাহেব হবেন তিনি জাহিরী ও বাতিনী উভয় অবস্থায় শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দ হবেন। যে ব্যক্তি জাহিরী ও বাতিনী উভয় দিক থেকে শরীয়তের পাবন্দ নয় সে ওলী আল্লাহ্ নয়, বরং তার বিপরীত হবে। মূলতঃ একথার দ্বারা ঐ কথার প্রতি ইশারা করা হয়েছে যে, কাফিররা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরী অবস্থা (যমীনে চলাচল) লক্ষ্য করে বলতো, “তিনি কেমন রসূল! খাদ্য খান, বাজারে যান।” অর্থাৎ কাফিররা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরী অবস্থা লক্ষ্য করেছে কিন্তু বাতিনী বা হাক্বীক্বী অবস্থা লক্ষ্য করেনি। এ বিষয়ের ব্যাখ্যা সম্পর্কে এ আলোচনা।) ইমামে রব্বানী, কাইয়্যূমে আউয়াল, আফজালুল আউলিয়া হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “মানবীয় গুণাবলীসমূহ আল্লাহ্ পাক-এর ওলীগণের পর্দা বা আবরণ। সাধারণ লোকেরা যে সমস্ত কাজ করে ছূরতান তাঁরাও ঐসব কাজ করেন। এসব কাজ বেলায়েত বা ওলীত্বের প্রতিবন্ধক নয়। তাঁদের ক্রোধও দৃশ্যতঃ অন্যান্যদের ক্রোধের ন্যায় হয়ে থাকে।” যখন আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ ইরশাদ করেন, “আমিও (ছূরতান) ঐরূপ রাগান্বিত হই যেমন অন্যান্য লোকেরা রাগান্বিত হয়।” তখন আল্লাহ্ পাক-এর ওলীগণও এরূপ অবস্থার সম্মুখীন হবেন এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে বুযুর্গ ব্যক্তিগণের খাওয়া-দাওয়া, পরিবার-পরিজনদের সাথে মেলামেশা, আচার-আচরণ ইত্যাদি ছূরতান সাধারণ মানুষের মতই হয়ে থাকে; কিন্তু তাঁদের বাতিনী অবস্থা ভিন্নতর। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ পাক স্বীয় নবী আলাইহিমুস্ সালামগণের সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
وما جعلنهم جسدا لايأكلون الطعام.
অর্থঃ- “আমি তাঁদের শরীরকে এমন বানাইনি যে, তাঁরা খাওয়া-দাওয়া করবেনা।” (সূরা আম্বিয়া/৮)
অপরপক্ষে কাফিররা প্রকাশ্যে বলতো, “এই রসূলদের কি হয়েছে যে, তাঁরা খাবার খায় এবং বাজারে চলাফেরা করে?”
কাজেই যাদের দৃষ্টি আহ্লুল্লাহ্ বা আল্লাহ্ পাক-এর ওলীগণের জাহির বা বাহ্যিক অবস্থার দিকে পড়েছে তারা বঞ্চিত হয়েছে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আর তারাই সৌভাগ্যের অধিকারী, যারা আহ্লুল্লাহ্গণের বাহ্যিক অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করেনা বরং তাঁদের দৃষ্টির তীক্ষèতা, ঐ সমস্ত বুযুর্গদের বাতিনী ছিফত বা গোপন গুণাবলী পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাঁরা মিশরের নীল নদ সমতূল্য, মাহজুবীন্ বা পর্দার আবরিত ব্যক্তিদের জন্য যে পানি বিপদ সংকুল ও তুফান সদৃশ মাহবুবীন্ বা প্রিয় লোকদের জন্য তাই জীবন দানকারী সলীল সমতুল্য। মানবীয় গুণাবলী বড়ই আশ্চর্য ধরণের। মানবীয় স্বভাব আহ্লুল্লাহ্ বা আউলিয়া-ই-কিরামের মধ্যে যতটুকু প্রকাশ পায় অন্যান্যদের মধ্যে ততটুকু প্রকাশিত হয়না। এর কারণ এই যে, ময়লা এবং আবর্জনা যদি কমও হয় সেটা সমতল এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে অধিক দৃষ্টিগোচর হয়। পক্ষান্তরে, অসমতল ও অপরিস্কার স্থানে ময়লা-আবর্জনা যদি অধিকও হয় তবুও তা দেখা যায়না। বস্তুতঃ মানবীয় গুণাবলীর অসৎ ও অন্ধকারময় দিকগুলো, সাধারণ লোকদের মধ্যে পূর্ণরূপে প্রবেশ করে এবং শরীরসহ ক্বালব ও রূহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। অপরপক্ষে, বিশেষ লোকদের মধ্যে এই অন্ধকার, কেবল তাদের শরীর ও নফ্সের মধ্যেই সীমিত থাকে এবং আখাসসুল খাছ বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নফ্সও এই জুলমাত বা অন্ধকার হতে মুক্ত থাকে। কেবলমাত্র তাঁদের শরীরই এর দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়। লক্ষ্যণীয় যে, এই জুলুমাত সাধারণ লোকদের জন্য ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে এবং বিশেষ লোকদের জন্য তা পূর্ণতা ও সজীবতার কারণ হয়। বিশেষ ব্যক্তিদের এই অন্ধকার সাধারণ লোকদের অন্ধকারসমূহকে দূরীভূত করে। তাদের ক্বালবসমূহে পবিত্রতা আনে এবং নফ্সসমূহে তায্কীয়া বা পরিচ্ছন্নতা প্রদান করে। যদি এই জুলুমাত না হতো তাহলে আউলিয়া-ই-কিরাম তথা বিশেষ ব্যক্তিগণের সাথে সাধারণ লোকদের কোন সম্পর্কই থাকতো না, ফলে ইফাদাহ্ বা উপকার দেয়া এবং ইফতিফাদা বা উপকার গ্রহণ করার রাস্তা বন্ধ হয়ে যেত। আর এই জুলুমাত বিশেষ ব্যক্তিদের মধ্যে এই পর্যায়ের থাকেনা, যা তাঁদেরকে কলুষিত করে। বরং এই কারণে যে অনুশোচনা ও ইস্তিগফার তাঁরা করেন সেটা এমনই হয় যে, যার ফলশ্রুতিতে সমস্ত ময়লা এবং আবর্জনা দূরীভূত হয়ে যায় এবং আরো অধিক তরক্কী বা উন্নতি লাভ হয়। এই জুলুমাত বা অন্ধকার ফেরেশ্তাগণের মধ্যে নেই। যার ফলে তাঁদের উন্নতির রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে। চতুস্পদ জন্তুর ন্যায় বে-খবর সাধারণ লোকেরা আহ্লুল্লাহ্দের মানবীয় গুণাবলীকে নিজেদের মানবীয় গুণাবলীর মত মনে করে এবং এ কারণে তারা বঞ্চিত এবং অপমানিত হয়ে থাকে। অদৃশ্য বস্তুকে দৃশ্যমান মনে করাতেই এ রকম ভুলের সৃষ্টি হয়। (মাব্দা ওয়া মা’আদ/৬১)
উল্লেখ্য, আহ্লুল্লাহ্ বা আল্লাহ্ পাক-এর পরিবারগণের কোন কাজকেই সাধারণ লোকদের কাজের ন্যায় মনে করা উচিত নয়। আল্লাহ্ পাক-এর জনৈক ওলী তাঁর খাদেমসহ কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে একটি ছোট ছেলে পিছন থেকে সে বুযুর্গ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে তাঁর শান-মান, মর্যাদা-মর্তবার খিলাফ মন্তব্য করলো। যা উক্ত আল্লাহ্ পাক-এর ওলী, বুযূর্গ ব্যক্তির কর্ণগোচর হলো। তিনি স্বীয় খাদেমকে বললেন, “ছেলেটিকে প্রহার কর।” খাদেম তাঁর এরূপ আদেশ শুনে অপ্রস্তুত হলো। আর এরূপ সাত-পাঁচ ভাবতেই ঐ ছেলেটি মাটির সাথে মিশে গেলো। তা দেখে তিনি বললেন, “ছেলেটিকে প্রহার করতে বললাম অথচ তুমি না করার কারণে ছেলেটি মাটির সাথে মিশে গেলো।” খাদেম এ দৃশ্য দেখে আশ্চর্যান্বিত হলো। কাতর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “হুযূর বেয়াদবী ক্ষমা চাই। আমি আপনার এরূপ কাজের কোন হিকমত বুঝতে পারলামনা।” তখন সে বুযূর্গ ব্যক্তি বললেন, “ছেলেটি আমার শানে বেয়াদবী করেছে। সেজন্য তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ্ পাক ফেরেশ্তা পাঠালেন। তা দেখে আমি তাকে প্রহার করার জন্য তোমাকে আদেশ দিলাম। কেননা আল্লাহ্ পাক-এর শাস্তি ছিল তার জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ। তুমি যদি তাকে প্রহার করতে তবে তার বদলা হয়ে যেত। সে কঠিন শাস্তি হতে অব্যহতি পেত। কিন্তু তুমি যখন তা করলে না তখন আল্লাহ্ পাক তাঁর ফেরেশ্তা দিয়ে তাকে যমীনের সাথে মিশিয়ে দিলেন।” পীর কামিল, মুর্শিদে মুকাম্মিল, ইমামুল আইম্মা, মুহ্ইস্ সুন্নাহ্, কুতুবুল আলম, মুফ্তিয়্যূল আ’যম, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, তাজুল মুফাস্সিরীন, সিরাজু হাজিহীল উম্মাহ্, লিসানুল্লাহ্, হুজ্জাতুল ইসলাম, মুজ্তাহিদে মিল্লাত ওয়াদ্ দ্বীন, খলীফাতুল্লাহ্ ফিল র্আদ, আমিরুল মু’মিনীন ফী ইল্মিল ফিক্বহি ওয়াত্ তাছাউফ, দাফিউল বিদ্য়াত, রসূলে নুমা, ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ তরীক্বত, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, হাবীবুল্লাহ্, ইমামূছ ছিদ্দীক্বীন ওয়াল মুসলিমীন, ছহেবে সুলতানিন্ নাছীর, মুজাদ্দিদুয্ যামান, ক্বাইউমুয্ যামান, জাব্বারিয়ুল আউয়াল, ক্ববিউল আউয়াল, জামিউল আলক্বাব, আওলাদে রসূল, ইমার্মু রাসিখীন, সুলতানুল আরিফীন, খাজিনার্তু রহমত, গাউছুল আযম, ফখরুল ফুক্বাহা, সুলতানুল ওয়ায়েজীন, বুরহানুল আশিকীন, সাইয়্যিদুত্ ত্বয়িফা, হাক্বীমুল হাদীস রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী আউলিয়া-ই-কিরামগণের হাক্বীক্বী পরিচয় তথা জাহির-বাতিন অবস্থা প্রসঙ্গে আরো সুন্দর ও সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “তিন ব্যক্তি।” “একজন নদীর এ তীরে খুব এত্মিনানের সাথে বসে আছে।” “অপর তীরে অনুরূপ এক ব্যক্তি খুবই এত্মিনানের সাথে বসে আছে।” আর “নদীতে এক ব্যক্তি অপর তীরে পৌঁছার জন্য জীবন-মরণ সাঁতার দিচ্ছে।” দৃশ্যতঃ উভয় তীরের লোকের অবস্থা একরূপ কিন্তু হাক্বীক্বীভাবে দু’জন এক নয়। কেননা, যে নদীর অপর তীরে বসে আছে সে নদী পার হয়ে এত্মিনানের সাথে বসে আছে। আর এ তীরে বসা ব্যক্তি নদীতে পা রাখেনি। কিন্তু নদীতে সাঁতার দানকারীর অবস্থা ভিন্নতর তথা কোশেশে লিপ্ত। অর্থাৎ আউলিয়া-ই-কিরামগণের জাহিরী অবস্থা সাধারণ লোকের মত দৃশ্যতঃ এক ও অভিন্ন হলেও তাঁদের বাতিনী হাল বা অবস্থার মাঝে আসমান-যমীন ব্যবধান।” সুতরাং তাঁদের জাহিরী হাল (বাহ্যিক অবস্থা) দেখে যারা তাঁদেরকে সাধারণ মানুষের মত মনে করবে তারা সফলতা লাভ করতে পারবেনা। পক্ষান্তরে যারা তাঁদের জাহিরী হালের প্রতি লক্ষ্য না করে বাতিনী হালের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে তারাই সফলতার শীর্ষস্থানে উন্নীত হতে পারবে।
والله ورسوله اعلم.
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪১)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)