-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
প্রসঙ্গঃ পীর ছাহেবের মজলিসে যেখানে জায়গা খালি পাবে সেখানেই বসে পড়বে। কেননা, আগতদের জন্য শুন্যস্থানই নির্দিষ্ট থাকে। (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
কুতুবুল আলম, সুলতানুল আউলিয়া, শাইখুল ইসলাম, হযরত কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আমি অধম একদা আজমীর শরীফে মাওলানা সালাহুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। আমার মুর্শিদও উক্ত মজলিসে ছিলেন। বালা-মুসিবত সম্বন্ধে আলোচনা চলছিলো। হযরত মাওলানা সালাহুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি ইরশাদ করলেন, ‘‘একবার সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও গিয়েছিলেন। সেখানে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ঘরের মধ্যে তাঁকে বেষ্টন করে বসেছিলেন। পরে আরো তিনজন লোক আসলো। তাদের মধ্য হতে একজন আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহু, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেষ্টনীর মাঝে স্থান পেলেন অপর দু’জনের বসার মত জায়গা ঐ বেষ্টনীতে ছিলনা। তাদের মধ্যে দ্বিতীয়জন বেষ্টনীর বাইরে বসলেন তৃতীয়জন চলে গেল। তখন হযরত জীব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম উপস্থিত হয়ে বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! “যারা এই বেষ্টনীর মধ্যে বসা আছে তাদেরকে আল্লাহ্ পাক ক্ষমা করেছেন এবং যে ব্যক্তি বেষ্টনীর বাইরে বসে আছে তাকেও আল্লাহ্ পাক তাঁর করুণা ও দয়া দ্বারা ক্ষমা করেছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি চলে গেছে সে দূর্ভাগা। সে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আল্লাহ্ পাকও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।” (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
উল্লেখ্য, যিনি যত মর্যাদা সম্পন্ন তার মজলিসও তত ফযীলতপূর্ণ ও বরকতময়। আর মুরীদের জন্য স্বীয় পীর ছাহেবই হচ্ছেন দুনিয়ার যমীনে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। কাজেই তাঁর মজলিসের শ্রেষ্ঠত্ব ও বরকতের প্রতি লক্ষ্য রেখে যতটুকু জায়গা পাবে তাতেই বসে পড়বে। আশা করা যায় তাতে তার মকছুদ পূর্ণ হবে। আর মজলিসে উপবেশনকারীদেরও উচিত আগত ব্যক্তির বসার জন্য স্থান করে দেয়া।
কেননা, আল্লাহ্ পাক বলেন, احسن كما احسن الله اليك.
অর্থঃ- “ইহ্সান (দয়া) কর যেমনভাবে আল্লাহ্ পাক তোমার প্রতি ইহ্সান করেছেন।” (সূরা কাসাস/৭৭)
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
الخلق عيال الله فاحب الخلق الى الله من احسن الى عياله.
অর্থঃ- “আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সমস্ত মাখলুক আল্লাহ্ পাক-এর পরিবার। সুতরাং মাখলুকাতের মধ্যে আল্লাহ্ পাক-এর নিকট সেই সর্বাপেক্ষা প্রিয়, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর পরিবারের সাথে সদ্ব্যবহার করে।” (শুয়াবুল ঈমান, মিশকাত/৪২৫)
স্মর্তব্য যে, আল্লাহ্ পাক-এর পরিবারের প্রতি সদাচরণ করলে যেমন আল্লাহ্ পাক খুশী হন, খুশী হন তাঁর প্রিয় হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তেমনিভাবে মুরীদের প্রতি সদাচরণ করলে, সহানুভূতি প্রদর্শন করলে পীর ছাহেবও খুশী হন। সর্বোপরি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ হচ্ছে- আগত ব্যক্তিদের জন্য জায়গা করে দেয়া।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
يايها الذين امنوا اذا قيل لكم تفسحوا فى المجلس فافسحوا يفسح الله لكم واذا قيل انشزوا فانشزوا يرفع الله الذين امنوا منكم.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয় যে, মজলিসের স্থান প্রশস্ত করে দাও। তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও। তাহলে আল্লাহ্ পাক তোমাদের প্রশস্ততা দান করবেন। আর যখন বলা হবে, উঠে যাও তখন উঠে যেও। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার আল্লাহ্ পাক তাঁদের মর্যাদা উঁচু করে দিবেন।” (সূরা মুজাদালা/১১)
এ প্রশস্ততা পরকালে তো প্রকাশ হবেই এমনকি ইহ্কালে সাংসারিক জীবনেও প্রশস্ততা বা প্রাচুর্য্যরে বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে।
উদ্ধৃত আয়াত শরীফ থেকে আরো একটি বিষয় পরিস্কার হয়ে গেল যে, পীর ছাহেবের মজলিসে স্থান সংকুলান না হওয়া কিংবা অন্য কোন কারণে পীর ছাহেব যদি কাউকে উঠে যেতে বলেন বা কারো উঠে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন অথবা কাউকে বসার জায়গা করে দিতে বলেন, তাতে কোন প্রকার চু-চেরা না করে উঠে যাওয়া অথবা জায়গা করে দেয়া আবশ্যক। যা আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশ, আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ।
একদা আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে সুফ্ফায় অবস্থান করছিলেন। মসজিদে অনেক লোকের সমাগম ছিল। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কতিপয় ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁরা বসার মত জায়গা পেলেননা। আর মজলিসের লোকজন বসার মত স্থান করে দিলেন না। আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্বিকার এ দৃশ্য দেখে কয়েকজন লোককে মজলিস থেকে উঠে যেতে আদেশ দিলেন। মুনাফিকরা তা শুনে বলাবলি করতে লাগলো যে, “এটা কেমন ‘ইনসাফ’ হলো?” ইত্যাদি ইত্যাদি। আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাও বলেছিলেন যে, “আল্লাহ্ পাক তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুন, যে আপন ভাইয়ের জন্য জায়গা খালি করে দেয়।” তার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত আয়াত শরীফ নাযিল হয়।” (তাফসীরে ইবনে কাসির)
চু-চেরা কিল-কাল করা মুনাফিকের খাছলত বা বদ্ অভ্যাস। সুতরাং পীর ছাহেবের কাজ-কর্ম, কথা বার্তায় প্রশ্ন উত্থাপন করা মুরীদের বদ্ বখতির কারণ।
মজলিসে উপবেশনকারীদের উচিত এলোমেলো করে না বসে সুশৃঙ্খলভাবে বসা। যাতে পরবর্তীতে আগমনকারীগণের বসতে কোন প্রকার অসুবিধার সৃষ্টি না হয়। হযরত জাবির ইবনে সামুরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন,
جاء رسول الله صلى الله عليه وسلم واصحابه جلوس فقال مالى اراكم عزين.
অর্থঃ- “একদা আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরীফ আনলেন। এ সময় হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম বসা ছিলেন। তিনি তাঁদেরকে খেতাব বা উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের কি হলো যে, আমি তোমাদেরকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি।” (আবূ দাউদ, মিশকাত/৪০৫)
আগত ব্যক্তি মজলিসের শেষ প্রান্তে বসবে। পূর্বে উপবেশনকারী ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সামনে গিয়ে মজলিসের মধ্যস্থলে বসা নিষেধ, যা লানতের কারণ। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “হযরত জাবির ইবনে সামুরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন,
كنا اذا اتينا النبى صلى الله عليه وسلم جلس احدنا حيث ينتهى.
অর্থঃ- “যখন আমরা আখিরী নবী, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে আসতাম তখন আমাদের প্রত্যেকেই মজলিসের শেষ প্রান্তে বসত।” (আবূ দাউদ, মিশকাত/৪০৫)
হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত আছে,
عن حذيفة قال ملعون على لسان محمد صلى الله عليه وسلم من قعد وسط الحلقة.
অর্থঃ- “হযরত হুজাইফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, শাফিউল উমাম, ফখরে মউজুদাত, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভাষায় সে ব্যক্তি অভিশপ্ত যে মজলিসের মাঝখানে গিয়ে বসে।” (তিরমিযী, আবূ দাউদ, মিশকাত/৪০৪)
আর পীর ছাহেবের উপস্থিতিতে মজলিসে উপবেশনকারী কারো সাথে কথা বলার প্রয়োজন হলে পীর ছাহেবের অনুমতি নিয়ে তাকে ডেকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে বলবে। মজলিসে উপবেশনকারীর সাথে কথা বলা কিংবা পীর ছাহেবের অনুমতি ব্যতীত সেখান থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া চরম বেয়াদবী।
আগত ব্যক্তিদের জন্য জায়গা করে দেয়া এবং জায়গা করার নিমিত্তে খানিকটা সরে বসা সুন্নত। ছহেবে রসূলিল্লাহ্, হযরত ওয়াসেল ইবনে খত্তাব কুরাঈশী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “একদা এক ব্যক্তি মসজিদে গিয়ে দেখেন, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাকী অবস্থান করছেন। তাঁকে দেখে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খানিকটা সরে বসলেন। এটা দেখে সেই ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! জায়গা তো অনেক রয়েছে।” তখন আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “মু’মিন বান্দা যখন তার ভাইকে দেখবে তখন খানিকটা সরে যাওয়া তার কর্তব্য।” (হায়াতুস্ ছাহাবাহ্)
আমিরুল মু’মিনীন, খলিফাতুল মুসলিমীন, আফজালুন্ নাছ বা’দাল আম্বিয়া, খলীফাতু রসূলিল্লাহ্ হযরত আবূ বকর ছিদ্দিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বাবুল ইল্ম ওয়াল হিকাম হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দেখে স্বীয় জায়গা হতে কিছুটা সরে বসলেন এবং বললেন, “হে আবুল হাসান! এখানে বসুন।” (হায়াতুস্ ছাহাবাহ্)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪১)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)