ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৬)

সংখ্যা: ১০৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আবদুল হালীম

 প্রসঙ্গঃ হাদিয়া প্রদান সাধারণ দান-সদ্কা করা হতে  উত্তম। সাধারণ দান-সদ্কা হতে হাদীয়া প্রদান করা উত্তম। কেননা, দান-সদ্কা একটি সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ এটা গরীব-দুঃখী, অনাথ-এতিমদের প্রাপ্য। প্রক্ষান্তরে হাদিয়া ধনী-গরীব, আমীর-উমরা, সূফী-দরবেশ, আলিম-উলামা সকলের মাঝে সমভাবে প্রযোজ্য।

            সর্বোপরি নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ দান-সদ্কা গ্রহণ করেননা। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জন্য, তাঁর আল-আওলাদ, আহ্লে বাইত তথা বণী হাসিম সম্প্রদায়ের সকলকে দান-সদ্কা গ্রহণ করা থেকে বারণ করে দিয়েছেন। (মিশকাত শরীফ/১৬১)

            হযরত আবু হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যখন কোন খাদ্য আনা হতো তিনি তখন জিজ্ঞাসা করতেন, এটা হাদিয়া না সদ্কা? যখন বলা হতো সদ্কা, তখন তিনি তা খেতেন না বরংহযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের উদ্দেশ্যে বলতেন, তোমরা খাও। আর যখন  বলা হতো হাদিয়া, তখন তিনি তাতে হাত দিতেন এবং তাদের সাথে খেতেন।” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত/ ১৬১ )

            আর ‘আহলুল্লাহ্’ বা পীর-মাশায়িখ, সূফী-দরবেশগণ দুনিয়া হতে বেনিয়াজ। একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এর মুখাপেক্ষী। আল্লাহ্ পাক-এর উপর পরিপূর্ণভাবে তাওয়াক্কুলকারী বা নির্ভরশীল। দুনিয়াবী একান্ত প্রয়োজনেও তাঁরা কারো কাছে যাচ্না  করতে অভ্যস্ত নন। আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মারিফাত-মুহব্বত ও দিদার-ই তাঁদের পরম কাম্য।

            সুতরাং যে কাজে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামান্যতম অসন্তুষ্ট;  তা হতে তাঁরা সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। আর আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরমুখাপেক্ষী বা পরনির্ভরশীল হওয়া পছন্দ করেননা।     হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,

ومن يستعف يعفه الله ومن يستغن يغنه الله ومن يتصبر يصبره الله وما اعطى احد عطاء هو خير واسع من الصبر.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যাচ্না হতে বেঁচে থাকতে চায়; আল্লাহ্ পাক তাকে বেঁচে থাকার উপায় বের করে দেন এবং যে কারো মুখাপেক্ষী হতে চায়না আল্লাহ্ পাক তাকে কারো মুখাপেক্ষী করেননা। আর যে ব্যক্তি ধৈর্য্যধারণ করতে চায় আল্লাহ্ পাক তাকে ধৈর্য্যধারণ করার তাওফীক দান করেন। আর ধৈর্য্য অপেক্ষা উত্তম এবং প্রশস্ত কোন নিয়ামত কেউ লাভ করতে পারেনা।” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত/১৬২)

من اصابته فاقة فانزلها بالناس لم تسد فاقته ومن انزلها بالله اوشك الله له بالغنى اما بموت عاجل اوغنى اجل.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হয়েছে এবং এটা মানুষের নিকট প্রকাশ করেছে তার অভাব দূরীভূত হবেনা। আর যে এটা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট নিবেদন করেছে নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক-ই তাকে ধনী করবেন- হয় শীঘ্রই তার মৃত্যু দ্বারা অথবা সম্পদ দানের মাধ্যমে।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, মিশকাত শরীফ/১৬৩)

            হযরত আবু যর গিফারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “একদা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ডেকে এই অঙ্গীকার করালেন যে, তুমি মানুষের কাছে কোন সুওয়াল করবে না। এমনকি তিনি এটাও বললেন, তোমার চাবুক সম্পর্কে সুওয়াল করবেনা। যদি এটা পড়ে যায় তবে নিজে (বাহন হতে) অবতরণ করে উঠিয়ে নিবে।” (আহমদ, মিশকাত শরীফ /১৬৪)

من يكفل لى ان لا يسأل الناس شيأ فاتكفل له بالجنة.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আমার নিকট অঙ্গীকার করবে যে, সে মানুষের নিকট কিছু চাবে না তাহলে আমি তার জন্য জান্নাতের অঙ্গীকার করব।” (আবূ দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত শরীফ/১৬৩)             আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইত্যকার ঘোষণাই পীর-মাশায়িখ, সুফী-দরবেশগণকে মানুষের কাছে চাওয়া হতে বিরত রেখেছে। তাঁরা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অনাহারে, অর্ধাহারে অসহনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যে কাটালেও মানুষের কাছে নিজেদের প্রয়োজন প্রকাশ করতে নারাজ। তারা কাউকে বুঝতেই দেননা যে, ‘তারা অভাবগ্রস্থ।’ সুতরাং এ সমস্ত ব্যক্তিবর্গই হাদিয়া পাওয়ার সর্বাধিক হক্বদার।

হাদীস শরীফে সেটাই বর্ণিত আছে,

ليس المسكين الذى يطوف على الناس ترده اللقمة واللقمتان والتمرة والتمرتان ولكن المسكين الذى لايجد غنى يغنيه ولا يفطن به فيتصدق عليه ولا يقوم فيسأل الناس.

অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘সেই ব্যক্তি মিছকীন নয় যে মানুষের দ্বারে-দ্বারে ঘুরে এবং দু’এক লোকমা খাদ্য অথবা দু’একটি খেজুর পেলে ঘরে ফিরে। প্রকৃতপক্ষে মিছকীন (সাহায্য পাওয়ার হক্বদার) সেই ব্যক্তি যার এমন কোন সংস্থান নেই যা তার জন্য যথেষ্ট হয় অথচ (তার নীরবতার কারণে) তাকে চিনা যায়না, যাতে লোকে তাকে দান-সদ্কা করে এবং নিজেও কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেনা।” (বুখারী, মুসলিম মিশকাত /১৬১)

            তবে যদি কেউ হাদিয়া তথা স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে একান্ত মুহব্বতে দান করে তা প্রত্যাখান করেনা। বরং স্বাচ্ছন্দে তা গ্রহণ করে। কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা গ্রহণ করতে বলেছেন এবং সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।    উল্লেখ্য যে, পীর-মাশায়িখ, সূফী-দরবেশকে মুহব্বত করা, ভালবাসা, হাদিয়া প্রদান করা, সাহায্য-সহযোগিতা ও সদাচরণ করা এমন একটি বিশেষ আমল যা (বেমেছাল) তুলনাহীন। তাঁদেরকে হাদিয়া প্রদান সেই আমলের ভিতকে মজবুত করে যা সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হিসেবে স্বীকৃত।

            হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,

 احب الاعمال الى الله الحب فى الله والبغض فى الله.

 অর্থঃ- “আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ্ পাক-এর নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হচ্ছে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য মুহব্বত এবং আল্লাহ্ পাক-এর জন্য শত্রুতা।” (কানযুল উম্মাল ৯/৩)

            সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর এমন কতিপয় বান্দা আছেন যারা নবীও নন, শহীদও নন। অথচ ক্বিয়ামতের দিন তাদের নৈকট্য প্রাপ্তি এবং সু-উচ্চ মর্যাদা দেখে সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালাম এবং শহীদগণ পর্যন্ত অশ্চর্যান্বিত হবেন। তারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এমন লোকদের সাথে মুলাকাত করতেন, আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টির জন্য পরস্পর দান-সদ্কা করতেন, মুহব্বত করতেন  যাদের সাথে আত্মীয়তার কোন সম্পর্ক ছিলোনা বা দুনিয়াবী কোন প্রয়োজন থাকতনা। (শুধুমাত্র খালিছভাবে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টির জন্যই ছোহ্বত লাভ করতেন।)

            আল্লাহ্ পাক ক্বিয়ামতের দিন তাদের জন্য নূরের তৈরী মিম্বরের ব্যবস্থা করবেন যার উপরে তাঁরা উপবেশন করবেন। আর সেদিন সমস্ত লোক ভয়ে ভীত হবে কিন্তু তাঁদের কোন প্রকার ভয়ভীতি থাকবেনা। আর তারাই হচ্ছেন ওলী আল্লাহ্ বা আল্লাহ্ পাক-এর বন্ধু। তাঁদের কোন ভয় নেই, তাঁরা কোন প্রকার পেরেশানও হবেননা।” (কানযুল উম্মাল ৯/৭)

সুতরাং তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারীও যে সে মর্যাদা-মর্তবার অংশীদার হবেন তা বলাই বাহুল্য। সুলতানুল মাশায়িখ, হাবীবে রব্বুল আলামীন, হযরত শায়খ আহাদুদ্দীন কিরমানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহ্ পাক ক্বিয়ামতের দিন পীর-মাশায়িখ, সূফী-দরবেশগণকে লক্ষ্য করে বলবেন, “মিজান এবং পুলসিরাতের নিকট গিয়ে দেখ- পৃথিবীতে যারা তোমাদের সাথে সদাচরণ করেছে, তোমরা তাদেরকে সাথে নিয়ে জান্নাতে চলে যাও।” (সুবহানাল্লাহ্)

            তিনি আরো বলেন, এক ব্যক্তির প্রতি আদেশ হবে যে, “তাকে জান্নাতে নিয়ে যাও।” তখন সে ব্যক্তি আশ্চর্য হয়ে বলবে যে, “আজ আমি কোন্ কারণে এ সৌভাগ্য লাভ করলাম।” তখন ইরশাদ হবে, “যদিও তুমি পৃথিবীতে অনেক পাপ করেছিলে তথাপি তুমি যা উপার্জন করেছ এটা সুফী-দরবেশগণের মুহব্বতে তাঁদের জন্য খরচ করেছ। কাজেই সে সূফী-দরবেশগণের দোয়ার বরকতে তুমি আজ নাযাত পেলে।” (সুবহানাল্লাহ্) (ইসরারুল আউলিয়া)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার: পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৪)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার: পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৫)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৭)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৮)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৯)