ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার: পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৫)

সংখ্যা: ১০৭তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

প্রসঙ্গ: হাদিয়া হালাল হওয়া আবশ্যক।

(ধারাবাহিক)

ইমামুল আইম্মা, মুহ্ইস্ সুন্নাহ্, কুতুবুল আলম,  মুজাদ্দিদুয্ যামান, আওলার্দু রসূল, সাইয়্যিদুনা রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী  বলেন, “যাদের জীবিকা হারাম পন্থায় উপার্জিত নয় তারপরেও নাজায়িয ও হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণ হচ্ছে, স্বীয় কর্তব্য কাজে ফাঁকি দেয়া। অর্থাৎ যারা যে পেশায় নিয়োজিত তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব বা কাজ যথাযথভাবে সম্পাদন না করেও পুরোপুরি পারিশ্রমিক বা বেতন ভোগ করা প্রকারান্তরে হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করারই নামান্তর।”   তাজুল উদাবা, ইমামুল আছর, হুজ্জাতুল ইসলাম, মাহবুবে ইলাহী, সুলতানুল আরিফীন হযরত সহল ইবনে আব্দুল্লাহ্ তশতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “হারাম খাদ্য দ্বারা সাতটি অঙ্গ পাপী হয়ে থাকে। (এক) চোখ, (দুই) কান, (তিন) জিহ্বা, (চার) পেট, (পাঁচ) হাত, (ছয়) পা, (সাত) লজ্জাস্থান। হারাম খাদ্য ভক্ষণকারীর ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় পাপ কাজ অনুষ্ঠিত হয়। পক্ষান্তরে হালাল খাদ্য পানাহার দ্বারা উল্লিখিত সাতটি অঙ্গ নেক আমল ও ইবাদতের দিকে ধাবিত হয়।” (তাযকিরাতুল আউলিয়া)    হারাম খাদ্য গ্রহণকারী শুধু যে, হারাম ও নাজায়িয কর্মে লিপ্ত হয় তাই নয়। বরং তার হারাম খাদ্যের তাছির বা প্রভাব স্বীয় ঔরসজাত সন্তান-সন্তুতির উপরও প্রভাব বিস্তার করে। দামেস্কে একজন বুযূর্গ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর অনেক সন্তান-সন্তুতি ছিলো। তাঁরা সবাই ছিলো একান্ত পরহিযগার ও মুত্তাকী। তাদের সে পরহিযগার মুত্তাকীর ঘটনা কিংবদন্তীর মত প্রচলিত রয়েছে। তবে একজন সন্তান ছিলো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সে সর্বদা আপত্তিজনক কাজে লিপ্ত থাকতো। এমন কি কখন কখন মাতাল অবস্থায় সবার সামনে পড়ে থাকতো। তার এ অবস্থা দেখে সকল মুরীদ-মু’তাকিদ আশ্চর্যান্বিত হতেন। তবে সে বুযূর্গের ব্যক্তিত্বের প্রভাবে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না। এমনি অবস্থায় একদিন উক্ত বুযূর্গ ব্যক্তি অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিগণের মধ্যে দ্বীনের তালিম দিচ্ছিলেন। সে সময় উক্ত সন্তান শরাব পান করে মাতাল হয়ে অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় মজলিশে উপস্থিত হলো এবং নানা প্রকার অশালীন ভাষা ব্যবহার করে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়লো। তখন উপস্থিত একজন ব্যক্তি সবিনয়ে জানালেন যে, “হুযূর! আপনার অসন্তুষ্টি হতে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পানাহ্ চাই। আপনি আল্লাহ্ পাক-এর এমন খাছ ও মহান ওলী আপনার অন্যান্য সন্তান-সন্তুতিও আল্লাহ্ পাক-এর পরম বন্ধু। যাদের তাক্বওয়া পরহিযগারী দেখলে মানুষ অবাক হয়ে যায়। অথচ আপনার এ সন্তানের অবস্থা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আমরা এ বিষয়ের কোন হিক্বমত বুঝতে পারছি না।”

জবাবে সে বুযূর্গ ব্যক্তি বললেন, “একদা আমাকে এক ব্যক্তি দাওয়াত করলো। সাধারণতঃ আমি তাহক্বীক করে দাওয়াত গ্রহণ করতাম। সেদিন আমার প্রতিবেশীর বিশেষ অনুরোধের কারণে তার দাওয়াত কবুল করলাম। আল্লাহ্ পাক-এর কি মহিমা, ঐ রাতেই উক্ত সন্তান তার মায়ের রেহেমে আসে। পরে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পেলাম, উক্ত খাদ্য হালাল ছিলোনা। সে হারাম খাদ্য গ্রহণের কারণে আমার এ সন্তানের অবস্থা এরূপ হয়েছে যা করার কিছু নেই।”   অনুরূপভাবে আল্লাহ্ পাক-এর একজন বিশিষ্ট বন্ধু ছিলেন। যার নাম হযরত আহমদ হার্ব রহমতুল্লাহি আলাইহি। যার তাক্বওয়া ও পরহিযগারী ছিলো (বেমেছাল) তুলনাহীন। তিনি পানাহারের ক্ষেত্রে এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, খাদ্যদ্রব্য সামনে উপস্থিত হলে তা পূঙ্খানুপূঙ্খ, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তাহক্বীক বা যাচাই-বাছাই করতেন। সামান্যতম সন্দেহ উদয় হলে সে খাদ্যদ্রব্য খেতেন না। একটি ঘটনার দ্বারা বিষয়টি আরো পরিস্কার হবে।

 একদা আমিরুল কুলূব, কামরুস্ সূফীয়া, মাহবুবে সুবহানী হযরত আহমদ হার্ব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মাতা মুরগীর গোশ্ত রান্না করে তার সম্মুখে রেখে বললেন, “বাবা! এ গোশ্ত নিশ্চিন্তে আহার কর। কেননা, এর মধ্যে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। যেহেতু এটা আমার পালিত মুরগী।” আমিরুল কুলূব, কামরুস্ সূফীয়া হযরত আহমদ হার্ব রহমতুল্লাহি আলাইহি তাতে হাত না দিয়ে বললেন, “আম্মা! আমি দেখেছি, এ মুরগীটি একদিন আমাদের প্রতিবেশীর ছাদের উপর গিয়ে তার শষ্যবীজ খেয়েছিলো। অতএব, এ মুরগীর গোশ্ত আমি কিছুতেই খেতে পারি না। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।” (তাযকিরাতুল আউলিয়া)             এ ধরণের বেমেছাল তাক্বওয়ার অধিকারী ব্যক্তিত্বের জীবনেও এক ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ঘটেছে। একবার নিশাপুরের আমীর-উমারা তথা নেতৃস্থানীয় কতিপয় লোক তাঁর সাথে মুলাকাতের  উদ্দেশ্যে আসেন। তিনি তাদেরকে অত্যন্ত আদর ও যতেœর সাথে আপ্যায়ন করলেন। তার এহেন আদব-আপ্যায়নে সকলে খুবই খুশি হলেন। কিন্তু আমিরুল কুলূব, কামরুস্ সূফীয়া হযরত আহমদ হার্ব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর একজন পুত্র শরাব পান করে মাতাল অবস্থায় বেহালা বাজাতে বাজাতে আমির-উমারাগণের সামন দিয়ে চলে গেল। অথচ তাদেরকে এতটুকু সম্মান প্রদর্শন করলো না। এতে তারা খুবই মনোক্ষুন্ন হলেন।

আমিরুল কুলূব, মাহবুবে সুবহানী, আত্কান্ নাছ হযরত আহমদ হার্ব রহমতুল্লাহি আলাইহি তাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে নিজের ওজর পেশ করলেন। তিনি বললেন, “একদিন আমি কিছু খাদ্য হাদিয়া (উপহার) পেয়ে তা আহার করলাম। পরে জানতে পারলাম উক্ত হাদিয়া রাজ অন্তপুর হতে এসেছে। আর সে রাতেই আমার এ পুত্র সন্তানটি তার মায়ের রেহেমে আসে। আর রাজগৃহ প্রদত্ত হারাম খাদ্যের তাছিরে আমার এ পুত্রটি বদ্ চরিত্রের অধিকারী হয়েছে। সুতরাং আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন।” (তাযকিরাতুল আউলিয়া)    স্মর্তব্য যে, প্রতিটি জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন তাছির বা প্রভাব আছে। সুতরাং যে ব্যক্তি যে জিনিসের সাথে সম্পৃক্ত হয় কিংবা যে জিনিসের সাথে মিলামিশা করে তারই তাছির (প্রভাব) তার উপর পতিত হয়।

এ প্রসঙ্গে ইমামুল আইম্মা, মুহ্ইস্ সুন্নাহ্, কুতুবুল আলম, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী একটি কাহিনীর অবতারণা করে বলেন, “জনৈক নাপিত এক বাদশাহ্র নিয়মিত চুল কাটতো। তার চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী একদা বাদশাহ্র চুল কাটতে কাটতে বললো, “বাদশাহ্ জাহাপনা! আপনার একান্ত আদরের দুলালীকে দিন, আমার ছেলের সাথে বিবাহ্ দেই।” কথা শুনে বাদশাহ্ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেন। জবাবে নাপিতকে বলার কোন ভাষা পেলেন না। বাদশাহ্ চিন্তা করতে লাগলেন। একজন নাপিত কি করে তার ছেলের বিবাহ্রে জন্য বাদশাহ্র একান্ত আদরের শাহজাদীর কথা চিন্তা করতে পারে? কিসে তাকে উদ্বুব্ধ করলো? ভাবতে ভাবতে বাদশাহ্ উক্ত ঘটনাটি স্বীয় উজিরে আজমকে জানালেন। উজিরে আজম তা শুনে তৎক্ষনাতই বললেন, “বাদশাহ্ জাহাপনা! আপনি কোন্ স্থানে বসে সে নাপিতের দ্বারা চুল কাটিয়েছেন?” বাদশাহ্ বললেন, “অন্যান্য দিন যে স্থানে চুল কাটাতাম আজকে সেখানে কাটাইনি। বরং অন্য একটি স্থানের প্রতি ইশারা করে বললেন, অমুক স্থানে আজ চুল কাটিয়েছি।” তখন উজিরে আজম বললেন,“ জাহাপনা! আপনি যদি উক্ত স্থানের মাটি সরাতে আদেশ করতেন তাহলে আশা করা যায় এর রহস্য উন্মোচন করা সহজ হতো।”

উজিরে আজমের পরামর্শ মুতাবিক বাদশাহ্ তখন উক্ত স্থান খনন করতে বললেন। যথাসময়ে বাদশাহ্র আদেশ পালিত হলো। দেখা গেলো, সেখানে অনেক সোনা-চাঁন্দি, মনি-মুক্তা মওজুদ। উজিরে আজম বললেন, “বাদশাহ্ জাহাপনা! মূলতঃ নাপিত এ স্থানে বসার কারণে এগুলোর প্রভাবেই আপনার শাহাজাদীকে স্বীয় ছেলের জন্য বিবাহ্র  প্রস্তাব দেয়ার সাহস পেয়েছে।”

আর বাস্তবে তাই হলো, সে স্থান হতে সে সব মনি-মুক্তা, সোনা-চাঁন্দি উঠিয়ে নেয়ার পর পরবর্তী সময়ে বাদশাহ্ আবারো চুল কাটালো; কিন্তু আজ নাপিত সে সম্পর্কে কোন কথাই বললো না। বরং অতীত দিনগুলোর মত স্বীয় কর্তব্য সম্পাদন করে কিছু না বলে স্ব-স্থানে চলে গেল।        সুতরাং হালালের তাছির পড়লে যেমন হালাল কাজের প্রতি প্রেরণা জন্মে; তেমনি হারামের তাছির পড়লে মানুষ ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় হারামের দিকে ধাবিত হয়। নানা  প্রকার অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। আর আল্লাহ্ পাক সেটাই বলেছেন,

والذى خبث لايخرج الا نكدا.

অর্থঃ- “যা অপবিত্র তা হতে অপবিত্র ব্যতীত কিছুই বের হয়না।” অর্থাৎ হারাম দিয়ে কখনও হালালের আশা করা যায়না। (সূরা আ’রাফ/৫৮)      তাই দেখা যায় অনেকে একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নেক কাজে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে পারে না। তার কারণ হচ্ছে তা হালাল পন্থায় অর্জিত নয়। আর হাদিয়া আদান-প্রদান অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় সম্পদ ব্যয়ের সর্বোৎকৃষ্ট পথ। এ পথে অতি সহসা তারাই ব্যয় করতে পারবে যাদের উপার্জন হালাল।

কাজেই আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন,হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মারিফত-মুহব্বত হাছিলের অভিলাষী ব্যক্তিদের একান্ত কর্তব্য হালাল উপার্জিত সম্পদ হতে হাদিয়া প্রদান করা। আর হাদিয়া গ্রহীতার ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত তাহক্বীক বা যাচাই-বাছাই করে হাদিয়া গ্রহণ করা।      আল্লাহ্ পাক জামানার মহান মুজাদ্দিদ ইমামুল আইম্মা, মুহ্ইস্ সুন্নাহ্, কুতুবুল আলম, মজাদ্দিদুয্ যামান, গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত হুযূর ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর উছীলায় সবাইকে হালাল খাওয়ার তাওফীক দান করুন। (আমীন)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার: পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৪)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৬)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৭)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৮)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৯)