(ধারাবাহিক)
হযরত কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তিনদিন রোজা রাখার পর তুমি যে খাদ্য খেলে, তা ছিল এক শারাবী বা মাতালের। কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালার অনুগ্রহ তোমার উপর বর্ষিত হলো। তাই তাঁর ইচ্ছা ছিলনা যে, এ খাদ্য তোমার পাকস্থলি বা পেটে থাকুক। এখন আবার ঐ রোজা রাখা শুরু কর এবং অদৃশ্য থেকে যা কিছু মিলে তা খাও। ”
সুতরাং (মুর্শিদের নির্দেশানুযায়ী) তিনি আবার তিনদিন রোজা রাখলেন এবং সন্ধ্যার সময় পর্যন্ত খাদ্যের জন্য কিছুই আসলো না। রাতের এক প্রহর অতিক্রান্ত হবার পরও যখন কিছু মিললো না তখন দুর্বলতা বেড়ে গেল এবং অত্যাধিক ক্ষুধায় দরুণ পেটে জ্বালা শুরু হল। ঐ অবস্থায় তিনি যমীনের উপর হাত রাখলেন। এতে তালুতে কয়েকটি কঙ্কর উঠে এলে তিনি সেগুলো মুখে দিলে চিনিতে পরিণত হয়ে গেল। সাথে সাথে খেয়াল হলো এটাও বোধ হয় শয়তানী ধোকা। তাই তিনি সেগুলো ফেলে দিলেন এবং পূণরায় ইবাদতে মশগুল হয়ে গেলেন। যখন মধ্য রাত্রি হলো তখন ক্ষুধা আরো বৃদ্ধি পেল। তখন আবার তিনি যমীন থেকে কিছু কঙ্কর উঠিযে মুখে দিলেন। পূর্বের মত ঐ কঙ্করও চিনি হয়ে গেল। দ্বিতীয়বারও তিনি তা শয়তানের ধোকা ভেবে মুখ থেকে ফেলে দিলেন। এবং তিনবার এরূপ করলেন প্রত্যেকবারেই তাঁর থেকে এ কারামত প্রকাশ পেলো। তৃতীয়বারের মাথায় বিশ্বাস হলো, নিশ্চয়ই ইহা আল্লাহ্ পাক-এর দান। তাই তিনি সেগুলো খেলেন।
একদিন এ ঘটনা মুর্শিদকে জানালেন। তিনি বললেন, ভাল করেছ। যে কঙ্কর বা চিনি দিয়ে তুমি ইফতার করেছ উহা অদৃশ্য থেকে এসেছিল যাও, এখন থেকে তুমিও শকর বা মিষ্টির আকর হয়ে গেলে। ঐ দিন থেকেই তাঁকে লোকগণ গন্জে শকর বলে অভিহিত করে থাকে। “সিয়ারুল আওলিয়া” কিতাবেও তাই লিখা আছে।
তাঁর গন্জে শকর নাম বা লক্বর হওয়ার আরো একটি ঘটনা এইরূপভাবে মশহুর আছে। একদা কিছু সওদাগর তাদের লস্কর, সিপাহী নিয়ে কোথাও নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলো। হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তাদের থেকে কিছু শকর বা চিনি চাইলেন। সওদাগররা বললো আমাদের উঠের কোথাও চিনি নেই। বরং লবন রয়েছে। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা লবনই হবে। যখন সওদাগররা তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছল তখন উঠের উপর থেকে তাদের সামান বা বোঝা নামিয়ে খুলে দেখলো তাদের বস্তার সব লবন হয়েগেছে। তখন তারা আবার দৌড়াদৌড়ি করে হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট আসলেন এবং তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা ক্ষমা প্রার্থনা করে বস্তার লবনগুলোকে চিনি করে দেয়ার জন্য দোয়ার দরখাস্ত জানালো। তিনি বললেন, চিনিই হয়ে যাবে।
খানখাঁনা নওয়াব মুহম্মদ বীরম খাঁ একজন উচ্চ পদস্থ সম্পন্ন সম্মানিত, সফলকাম পদ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও দরবেশ-ফকীরদের সাথে তাঁর আচার-ব্যবহার অত্যন্ত ভাল ছিল। আল্লাহ্ পাক-এর রাজত্বের প্রতি সমীহ্ এবং তার মাখলুকের প্রতি ঔদার্য ও দয়া প্রদর্শন করার দিক থেকে তিনি অগ্রণী ছিলেন। দুনিয়াবী জিন্দেগী তিনি নেকবখ্ত হিসেবে গুজার করেছেন এবং দুনিয়া থেকেই শহীদি মৃত্যুর স্বাদ সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করে গিয়েছিলেন। হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন “গন্জে শকর” হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর একটি কবিতার লাইনে তিনি এই ভাবে ব্যক্ত করেছেন, “লবণ এবং শকরের (চিনির) খাজিনা ভান্ডার হচ্ছেন- শায়খ বাবা ফরিদুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি। যিনি চিনিকে লবণে এবং লবণকে চিনিতে পরিণত করেছেন। চিনিকে লবণ আর লবণকে চিনিতে পরিণত করার পর তিনি মাকামে উঁচ্ এর (একটি জায়গায়) জামে মসজিদের নিকটে “মাকুস” পদ্ধতিতে চল্লিশ দিন পর্যন্ত এইভাবে ইবাদত-বন্দেগী করতে লাগলেন যে, প্রতি রাত জামে মসজিদের সন্নিকটবর্তী গাছের সাহায্যে যেটা কিনা মসজিদেরই সন্নিকটবর্তী ছিল, প্রত্যেক রাতে সেই গাছের সাহায্যে কুয়োর মধ্যে নিজেকে ঝুলিয়ে রাখতেন ফজর পর্যন্ত। অর্থাৎ সারারাত তাঁর মাথার মোবারক যমীনমুখী হয়ে থাকতো আর পা যুগল উর্দ্ধমুখী হয়ে যেতো। এইভাবে তিনি ফজরের সময় নিজেকে কুয়ো থেকে চাড়িয়ে নিতেন। (এ ধরণের ইবাদত-বন্দেগীকে “সালাতে মাকসু” বলে।) শরীয়তে যদিও এ রকম ইবাদত-বন্দেগীর কথা উল্লেখ নেই কিন্তু পূর্ববর্তী সুফিয়ানে কিরামদের মধ্যে অনেকেই নিজের নফ্সকে শায়েস্তা করার জন্য বা তাকে বশে আনার জন্য ইবাদতের এ ধরণের পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। (অসমাপ্ত)
বিশ্ব সমাদৃত, হযরত আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের অনুপম মোবারক চরিত গ্রন্থ- আখবারুল আখইয়ার
বিশ্ব সমাদৃত, হযরত আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের অনুপম মোবারক চরিত গ্রন্থ- আখবারুল আখইয়ার