গত পর্বের আলোচনায় বারানসীতে আওরঙ্গজেবের প্রতিষ্ঠিত মসজিদ প্রকৃত বিশ্বনাথের মন্দির, হিন্দুদের এ অবৈধ মিথ্যা প্রচারণার কথা বলা হয়েছিলো। শুধু তাই নয় হিন্দু মৌলবাদীরা আরো সরব প্রচার করে সুখ পায় যে, আওরঙ্গজেব হিন্দুদের উপর অনেক অত্যাচার করেছেন, জিজিয়া আরোপ করেছেন, হিন্দু উপসনালয় ধ্বংস করেছেন। এসব ধুয়া তুলে এখনো তারা মুসলমানদের উপর আক্রমণের জঙ্গী প্রচারণা তুঙ্গে উঠায়। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস কি বলে সে সম্পর্কে এবারের লেখা- বিজেপি এবং সংঘ পরিবার কাশির বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু সেখানে বাস্তবে কি ঘটেছিলো? বিএন পান্ডে এবং পট্টভি সীতারামাইয়া তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- কাশির কাছেই আওরঙ্গজেব শিবির স্থাপন করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন কিছু হিন্দু রাজা। পূজো দেবার পর কচ্ছের রাণীকে খুঁজে পাওয়া গেল না। পরে দেখা গেল প্রধান পুরোহিত কর্তৃক বিশ্বনাথ বিগ্রহের নিচের প্রকোষ্ঠে তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে। ক্ষুব্ধ হিন্দু রাজাদের সোচ্চার দাবি ছিল মন্দির অপবিত্র হয়েছে, বিগ্রহ সরিয়ে নেয়া হোক। আওরঙ্গজেব হিন্দু রাজাদের দাবি মেনে নেন, বিগ্রহ সরিয়ে মন্দির ভুলুক্তিত করেন। পুরোহিতকে শাস্তি দেন। মন্দির ভাঙ্গার পর ঐ স্থানেই মসজিদ নির্মিত হয়েছিলো এটিও একটি বানানো গল্প। মসজিদ একটি বানানো হয়েছিলো ভিন্ন সময়ে ভিন্ন জমিতে। এতো গেল হিন্দু মন্দিরের কথা। কিন্তু শরয়ী কারণে আওরঙ্গজেব যে মসজিদও ধ্বংস করেছিলেন এ তথ্য জানানো হয়না। গোলকুন্ডার মুসলিম নবাব তানাশাহ্ আওরঙ্গজেবকে দেয় খাজনা না দিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলে তার উপর একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। আওরঙ্গজেব সেই মসজিদ গুড়িয়ে দেন এবং খাজনার অর্থ উদ্ধার করে তা রাজকার্যে ব্যয় করেন। ঐতিহাসিক বিএন পান্ডে ভারতের বিভিন্ন হিন্দু মন্দিরের সংগ্রহশালার দলীল দস্তাবেজ ঘেঁটে আওরঙ্গজেবের অনেক ফরমান পেয়েছেন (ইসলাম অ্যান্ড ইন্ডিয়ান সিভিলাইজেশন- বিএন পান্ডে)। এতে দেখা যায় ১৬৫১ খ্রীঃ থেকে ১৬৮৫ খ্রীঃ এর মধ্যে উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির। নানদেড় জিলার মোহ্নপুরের দত্তাত্রেয় গুরু মন্দির, চিত্র কুটের বালাজি মন্দির, গৌহাটির উমানন্দ মন্দির, শত্রুঞ্চয় জৈন মন্দির, অসংখ্য গুরুদোয়ারা সহ প্রায় প্রতিটি ধর্মস্থানেই দূরবস্থা ঘোঁচানো বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আওরঙ্গজেব অর্থ কিংবা জায়গীর দান করেছেন। অনেক দুস্থ হিন্দুকে আওরঙ্গজেব ভূমি ও সম্পত্তি দান করে গিয়েছিলেন। ডাঃ কে কে দত্ত তার ‘সাম ফরমানস, সনদস্ অ্যান্ড পরওয়ানাস্’(১৫৭৮-১৮০২) গ্রন্থে ঐ ধরনের ৪৮টি দানপত্রের উল্লেখ করেছেন। অনুদানগুলি সবই ছিলো নিঃশর্ত ও স্থায়ী। গ্রহীতারা ছিলেন হিন্দু সন্নাসী ও তার শিষ্যরা, অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ, হিন্দু সৈনিক ও কানুনগোরা, প্রাপকদের মধ্যে যেমন ছিলেন হতদরিদ্র দুখরণ মিসির, তেমনই ছিলেন করমুক্ত ৫৫ বিঘা জমির গ্রহীতা লীলা ব্রাহ্মণ। বিনিময়ে এমন কি রাজানুগত্যের শর্তও আওরঙ্গজেব দাবি করেননি। অধ্যাপক গ্রেওয়াস ও গোস্বামী রচিত গ্রস্থ ‘দি মুঘলস্ অ্যান্ড দি যোগীশ অব জাখবর’ এ উল্লিখিত আছে, উত্তর পশ্চিম পাঞ্জাবের ছোট্ট গ্রাম জাখবরের বসবাসকারী নাথযোগীদের আওরঙ্গজেব প্রচুর করমুক্ত জমি দান করেন। কাশির বাঙ্গালী টোলার জঙ্গমবাড়ি মঠে রক্ষিত আওরঙ্গজেবের তিনটি ফরমান থেকে জানা যায়, তিনি ঐ মঠের জন্য তিনবার অর্থ দান, ভূমি দান ও পূর্বেকার তিনটি অনুদানকে পুনরায় কার্যকরী করেছেন। মহাবালেশ্বর মন্দিরে ২৪ ঘন্টা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার জন্য তিনি দৈনিক চার সের ঘি বরাদ্দ করেছিলেন। কাশির জঙ্গমদেবের (শিব) সম্পত্তি নাজিরবেন নামে একজন মুসলমান জবরদখল করায় শৈব সম্প্রদায় সম্রাটের কাছে নালিশ করলে আওরঙ্গজেব মুসলিমদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ না করে শৈবদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেবার আদেশ দিয়েছিলেন। জঙ্গম মন্দিরের পুরোহিতদের উপর উৎপীড়নের খবর পেয়ে তিনি ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই মার্চ তার বিখ্যাত বেনারস ফরমান জারি করে স্থানীয় শাসককে জানিয়েছিলেন যে, “সুস্পষ্ট আদেশ পাওয়ার পরে আপনি দেখবেন যে ঐসব জায়গায় কোনও ব্রাহ্মণ বা হিন্দু অধিবাসীর কার্যকলাপে যেন বে-আইনী হস্তক্ষেপ না করা হয়। তারা যেন পূর্বের মতো নিজেদের ধর্ম চর্চা চালিয়ে যেতে পারেন, যাতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র প্রদত্ত এই সাম্রাজ্যকে চিরস্থায়ী করার জন্য তারা শান্ত চিত্তে প্রার্থনা জানাতে পারেন। এই আদেশকে আপনি অত্যন্ত জরুরী জ্ঞান করবেন।’ জিজিয়া নিয়ে আওরঙ্গজেবের ভূমিকার উপর আরও আলোকপাত হওয়া দরকার। কারণ দেখা যাচ্ছে, দিনমজুর ও অন্যান্য গরিব লোকদেরও জিজিয়া থেকে রেহাই দেয়া হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের আমলে এটা লিপিবদ্ধ হয়েছিলো যে, এক ব্যক্তির যদি কোনও সম্পত্তি না থাকে এবং শ্রম (কর্ম) থেকে তার উপার্জন যদি নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন অপেক্ষা অধিক না হয়, তাহলে তার উপর জিজিয়া কর ধার্য হবে না। হিন্দু ব্রাহ্মণ, বৃদ্ধ ও নারীদের এই কর দিতে হতো না। ব্রাহ্মণদের উপর জিজিয়া কর ধার্য না করার কারণ হলো, তারা ছিলো হিন্দু সমাজের কুল পুরোহিত এবং মুসলিম শাসকেরা তাদের বিশেষ মর্যাদা স্বীকার করে নিয়ে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করেছিলো। আবার একই সঙ্গে আওরঙ্গজেব ৬৬ টি কর উঠিয়ে দিয়েছিলেন। এটাও অনেকে গোপন করেন। হিন্দুদের যেমন জিজিয়া দিতে হতো তেমনি মুসলমান শাসকদের পক্ষে মুসলমান প্রজাদের যুদ্ধ করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু হিন্দুদের পক্ষে তা বাধ্যতামূলক ছিলনা। ১৬৭৯ খ্রীষ্টাব্দে জিজিয়া কর বসানো হয়েছিল কিন্তু তারপর আওরঙ্গজেবের আমীর ওমরাহ্দের মধ্যে হিন্দু সংখ্যাবৃদ্ধি পায় এবং ইসলাম ধর্মান্তকরণের ঘটনা একেবারেই বৃদ্ধি পায়না। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে অনেক হিন্দু রাজাদের বিদ্রোহ হয়েছিলো। এজন্য অনেকে তাকে হিন্দু বিদ্বেষী বলে প্রচার করেন। কিন্তু তার রাজত্বকালে জাঠ, সতনামি, মারাঠা, বুন্দেলা বা শিখদের বিদ্রোহের পিছনে কোন ধর্মীয় অত্যাচারের ঘটনা ছিলোনা। এগুলো হয়েছিলো আর্থ-রাজনৈতিক কারণে বা আঞ্চলিক স্বাধীনতার দাবিতে। যা আকবরের আমলেও হয়েছিলো। পুরোনো হিন্দু রাজাদের আমলেও হয়েছিলো। এখন স্বাধীন ভারতেও মাঝে মাঝে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।
-মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান, ঢাকা।
ইলমে আকলিয়ার দৈন্য এবং বিলায়েতের অনুপস্থিতির কারণে প্রকৃত আলিমে দ্বীন তৈরি হচ্ছে না।
একই অঙ্গে বহু রূপে সজ্জিত স,আ, ত, ম আলাউদ্দিনের বিকৃত রুচি সম্পন্ন লিখার প্রতিবাদে