মাহে রবিউল আউয়াল শরীফ ও তার প্রাসঙ্গিক আলোচনা -হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ

সংখ্যা: ১১৭তম সংখ্যা | বিভাগ:

চান্দ্র মাসের তৃতীয়তম মাস পবিত্র রবিউল আউয়াল। এটি রহমত, বরকত, সাকীনা ও মাগফিরাত হাছিলের খাছ মাস। মহান আল্লাহ্ পাক বারোটি মাসের মধ্যে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসকে, সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে পবিত্র সোমবার দিনকে এবং তারিখ হিসেবে পবিত্র বারো তারিখকে তাঁর প্রিয়তম হাবীব, ইমামুল আম্বিয়া, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদত শরীফ ও রিহালত শরীফের দিন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট উক্ত মাস, দিন ও তারিখটি সর্বাপেক্ষা প্রিয়, পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ।

প্রকৃতপক্ষে এ মুবারক দিনটিই উম্মাহ্র জন্যে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বড় ও মহান খুশীর দিন যা ঈদে আকবর ও ঈদে আ’যম নামে অভিহিত। কারণ এ মুবারক দিনটি যদি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভাগমনের খুশী নিয়ে পাথির্ব জগতের অন্তর্ভুক্ত না হতো তাহলে শবে ক্বদর, শবে বরাত, ঈদুল ফির্ত, ঈদুল আয্হা, জুমুয়া ইত্যাদি ফযীলতপূর্ণ কোন দিন-রাত্রিরই আগমন ঘটতোনা। শুধু তাই নয় কুরআন শরীফ নাযিল হতোনা, দ্বীন ইসলাম হতোনা এবং কোন মু’মিন-মুসলমানের অস্তিত্বও থাকতোনা। কিছু লোক বলে থাকে, শরীয়তে ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আয্হা এ দু’টি ঈদের দিন ব্যতীত আর কোন ঈদের দিন নেই। তাই তারা ঈদে মীলাদুন্ নবী অর্থাৎ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ বা বিলাদত শরীফের পবিত্র দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে মানতে রাজী নয়। যারা বলে, শরীয়তে ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহা ব্যতীত আর কোন ঈদের দিন নেই তারা শরীয়ত সম্পর্কে নেহায়েতই বেখবর। শরীয়তে ঈদুল ফির্ত ও ঈদুল আযহা ছাড়াও আরো ঈদের দিন রয়েছে। তা হচ্ছে জুমুয়ার দিন, আরাফার দিন এবং সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে মহান যে ঈদের দিন তা হচ্ছে, পবিত্র ঈে মীলাদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।     এপ্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “হযরত ওবায়েদ বিন সাব্বাক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক জুমুয়ার দিনে বলেন, হে মুসলমান সম্প্রদায়! এটি এমন একটি দিন  (জুমুয়ার দিন) যাকে আল্লাহ্ পাক ঈদ স্বরূপ নির্ধারণ করেছেন।” (ইবনে মাযাহ্, মুয়াত্তা মালিক, মিশকাত)

হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে, “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা

اليوم اكملت لكم دينكم الاية.

অর্থঃ- “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম” সূরা মায়িদার এ আয়াত শরীফটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করলেন। তখন তাঁর নিকট এক ইহুদী বসা ছিল সে বলে উঠলো, “যদি এই আয়াত শরীফ আমাদের ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রতি নাযিল হতো তাহলে আমরা আয়াত শরীফ নাযিলের দিনটিকে “ঈদ” বলে ঘোষণা করতাম।”

এটা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, এ আয়াত শরীফ সেই দিন নাযিল হয়েছে যেদিন এক সাথে দু’ঈদ ছিল- (১) জুমুয়ার দিন এবং (২) আরাফার দিন।” (তিরমিযী)    উপরোক্ত হাদীস শরীফসমূহ দ্বারা জানা গেল যে, শুক্রবার দিনটি এবং আরাফার দিনটি হচ্ছে মুসলিম উম্মাহ্র জন্য ঈদ তথা খুশীর দিন। অর্থাৎ ঈদুল আয্হা ও ঈদুল ফিত্র এ দুই ঈদ যেভাবে হাদীস শরীফের দ্বারা প্রমাণিত ঠিক সেভাবেই তৃতীয় ঈদ হিসেবে জুমুয়ার দিন আর চতুর্থ ঈদ হিসেবে আরাফার দিন হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।

এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে, “হযরত আবূ লায়লা ইবনে আব্দুল মুনযির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন যে, হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জুমুয়ার দিন সকল দিনের সর্দার এবং সকল দিন অপেক্ষা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট অধিক শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। এটি ঈদুল আযহার দিন ও ঈদুল ফিত্রের দিন অপেক্ষাও আল্লাহ্ পাক-এর নিকট অধিক শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। এ দিনটিতে পাঁচটি (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয় রয়েছে, (১) এ দিনে আল্লাহ্ পাক হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টি করেছেন, (২) এ দিনে তাঁকে যমীনে প্রেরণ করেছেন, (৩) এ দিনে তাঁকে ওফাত দান করেছেন, (৪) এ দিনটিতে এমন একটি সময় রয়েছে যে সময়টিতে বান্দা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তাকে তা দান করেন যে পর্যন্ত না সে হারাম কিছু চায় এবং (৫) এ দিনেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। এমন কোন ফেরেশ্তা নেই, আসমান নেই, যমীন নেই, বাতাস নেই, পাহাড় নেই, সমুদ্র নেই, যে জুমুয়ার দিন সম্পর্কে ভীত নয়।” (ইবনে মাযাহ্, মিশকাত)

স্মরণীয়, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকার কারণে যদি জুমুয়ার দিন ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহার চেয়েও সম্মানিত, ফযীলতপ্রাপ্ত ও মহান হয় তাহলে যে মহান ব্যক্তিত্বের উছীলায় হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম-এর যমীনে আগমন ঘটলো সেই মহান ব্যক্তির সাথে যেই দিনটি সম্পর্কযুক্ত সেই দিনটির সম্মান, ফযীলত ও মহত্ত্ব কতটুকু হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফের বিশুদ্ধ কিতাব “মুস্তাদরেকে হাকিম” শরীফে বর্ণিত রয়েছে, “হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যখন যমীনে আসলেন, মুখতালিফ রেওয়ায়েত তিনি যমীনে এসে দু’শ থেকে তিনশ বছর পর্যন্ত আল্লাহ্ পাক-এর নিকট কান্নাকাটি, দোয়া, ইস্তিগফার করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এই বলে দোয়া করলেন যে,“আয় আল্লাহ্ পাক! সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উছীলায় আমার দোয়া কবুল করুন।” আল্লাহ্ পাক বললেন, “হে হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম! আপনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিভাবে চিনলেন?” হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! যখন আপনি আপনার কুদরতী হাতে আমাকে সৃষ্টি করলেন এবং আমার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন, তখন আমি আমার মাথা উপরের দিকে উত্তোলন করি এবং আরশের স্তম্ভের মধ্যে লেখা দেখি, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্’ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন আমি বুঝলাম যে, যাঁর নাম মুবারক আপনার মুবারক নামের সাথে সংযুক্ত করেছেন তিনি আপনার খুব প্রিয় হবেন।” আল্লাহ্ পাক বললেন, “আপনি সত্য কথাই বলেছেন। কারণ তিনি যদি না হতেন অর্থাৎ আমি যদি তাঁকে সৃষ্টি না করতাম তবে আপনাকেও সৃষ্টি করতাম না।” অন্য বর্ণনায় এসেছে, “বেহেশ্ত-দোযখ, আসমান-যমীন, লৌহ-কলম, জ্বিন-ইনসান ইত্যাদি কিছুই সৃষ্টি করতাম না।” অতএব, উল্লিখিত পাঁচটি কারণের জন্য জুমুয়ার দিন ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আয্হা অপেক্ষা যদি শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত হয় তাহলে যাঁকে সৃষ্টি না করলে উল্লিখিত পাঁচটি কারণ সংঘটিত হতোনা; অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস্ সালামসহ কায়েনাতের কোন কিছুই সৃষ্টি করা হতনা, দোয়া কবুল হওয়া এবং ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়া তো পরের প্রশ্ন? সেই নবী ও রসূলগণের সাইয়্যিদ, উম্মুল খলায়িক্ব, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেদিন যমীনে তাশরীফ নেন, আগমন করেন ও বিদায় গ্রহণ করেন সেদিনের সম্মান, ফযীলত ও মহত্ত্ব যে, সমস্ত দিন ও তারিখ থেকে লক্ষ-কোটি গুণ বেশী এতে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই।      নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম-এর বিলাদত দিবস উপলক্ষে খুশী প্রকাশ করা সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম-এর বক্তব্যকে উপস্থাপন করতঃ ইরশাদ করেন, والسلم على يوم ولدت.  অর্থঃ- “হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম বলেন, আমি যেদিন জন্মগ্রহণ করেছি সেদিন আমার প্রতি সালাম প্রেরণ করা হয়েছে।” (সূরা মরিয়ম/৩৩)

তাহলে যে নবীর উম্মত হওয়া বা উম্মতের বুযুর্গী-সম্মান হাছিল করার জন্য হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম পুনঃরায় যমীনে আগমন করবেন এবং যিনি নবী গণের নবী, রসূলগণের রসূল, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মীলাদ বা বিলাদত শরীফের দিন বা সেই উপলক্ষে তাঁর ছানা-ছীফত করা এবং ছলাত-সালাম পাঠের মাধ্যমে খুশী প্রকাশ করার মাসয়ালা কি হবে? কুরআন-সুন্নাহ্ সম্মত হবে? না তার খিলাফ হবে?   বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, তা নিঃসন্দেহে কুরআন ও সুন্নাহ্ সম্মত হবে এবং তা হবে রহমত, বরকত ও সাকীনা লাভের কারণ। এককথায় আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি-রেযামন্দী হাছিলের উছীলা বা মাধ্যম। আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে ঈদে আকবর ও ঈদে আ’যম পবিত্র ঈদে মীলাদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফাযায়িল-ফযীলত উপলব্ধি করার এবং তা যথাযথভাবে পালন করার মধ্য দিয়ে তাঁর রহমত, বরকত, সাকীনা, নিয়ামত, ফুয়ূজাত, মাগফিরাত হাছিল করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)

রবীউল আউয়াল মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

রবিউস্ সানী মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

জুমাদাল উলা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

জুমাদাল উখরা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

রজব মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা