-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
আরবী মাসের অষ্টম মাসের নাম শা’বান। শা’বান শব্দটি ‘শু’বুন’ মাদ্দাহ বা শব্দমূল থেকে এসেছে। এর অর্থ শাখা-প্রশাখা। অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মাসে নেক আমলের শাখা-প্রশাখা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এ কারণে এ মাসের নামকরণ হয়েছে শা’বান।
এ মাসটি হচ্ছে আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করার মাস। ক্বিবলা পরিবর্তনের মাস, বান্দার আমল আল্লাহ পাক উনার নিকট পেশ করার মাস। সর্বোপরি হাদীস শরীফে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘শা’বান’ হচ্ছে আমার মাস।” (দাইলামী শরীফ)
এ মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি শবে বরাত। এই একটি মাত্র রাতই শা’বান মাসের ফযীলত, মর্যাদা, মর্তবা বর্ণনার জন্যে যথেষ্ট। এ রাত সম্পর্কে আল্লাহ পাক উনার কালাম পাকে ইরশাদ করেন,
حم والكتب المبين انا انزلنه فى ليلة مباركة انا كنا منذرين فيها يفرق كل امر حكيم امرا من عندنا انا كتا مر سلين رحمة من ربك انه هو السميع العليم.
অর্থঃ- “হা-মীম! (এটি হুরূফে মুক্কাততায়াত। এর অর্থ আল্লাহ পাক ও উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই বেহতর জানেন এবং ঐ সকল বান্দা জানেন যাঁদেরকে আল্লাহ পাক কিংবা আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন।) শপথ প্রকাশ্য কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি কুরআন শরীফ নাযিল করেছি। অর্থাৎ নাযিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এক বরকতময় রাত্রিতে। নিশ্চয়ই আমিই ভীতি প্রদর্শনকারী। আমারই নির্দেশক্রমে উক্ত রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন বিষয় ফায়সালা করা হয়। নিশ্চয়ই আমি প্রেরণকারী । আপনার রবের পক্ষ হতে রহমত। নিশ্চয়ই তিনিই অধিক শোনেন এবং জানেন।” (সূরা দুখান/১-৬)
এ আয়াত শরীফে মুফাসসিরীন-ই-কিরাম বিশেষ করে রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন,
قد اخبر الله سجانه عن هذه الليلة المباركة التى هى ليلة النصف من شعبان انه تعالى يفرق فيها كل امر من اموره المحكمة.
অর্থঃ- “মহান আল্লাহ পাক ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ অর্থাৎ বরকতময় রাত্রি বলতে শা’বান মাসের মধ্য রাত অর্থাৎ শবে বরাতকে বুঝিয়েছেন। আল্লাহ পাক এ রাতে সকল প্রজ্ঞা সম্পন্ন বিষয়ের ফায়সালা করে থাকেন।” (ছফওয়াতুত তাফাসীর) কি কি বিষয়ের ফায়সালা করা হয়, সে সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
فيها ان يكتب كل مولود من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ان يكتب كل هالك من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ترفع اعمالهم وفيها تنزل ارذاقهم.
অর্থঃ- “এ বরাতের রাতে আগামী এক বৎসরে কতজন সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে এবং কতজন লোক মৃত্যুবরণ করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে বান্দার আমলসমূহ উপরে উঠানো হয় এবং এ রাতে বান্দার রিযিকের ফায়সালা করা হয়।” (মিশকাত) ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান’ বা লাইলাতুল বরাতের রাতে আল্লাহ পাক অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং অসংখ্য পাপীকে ক্ষমা করেন। তবে সাত ব্যক্তির দোয়া আল্লাহ পাক এ বরকতপূর্ণ রাতেও কবুল করেন না, যদি না তারা খালিছ তওবা করে। এরা হচ্ছে- (১) যাদুকর (গণক, জ্যোতিষ), (২) শরাবখোর, (৩) যিনাখোর, (৪) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, (৫) চোগলখোর, (৬) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, (৭) ঐ ব্যক্তি, যে শরয়ী ওজর ব্যতীত কোন মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশী কথা বন্ধ রাখে। অন্য হাদীস শরীফে আরো দু’ব্যক্তির কথা উল্লেখ আছে- (ক) মুশরিক অর্থাৎ যারা আল¬াহ পাক উনার সাথে শরীক করে, (খ) যে শরীয়তের কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করে।
শবে বরাত হচ্ছে দোয়া কবুলের খাছ রাত। বান্দার সর্বপ্রকার নেক দোয়া, নেক আরজু আল্লাহ পাক এ রাতেই কবুল ও পুরণ করে থাকেন। তাই বান্দার উচিত এ মুবারক রাতে জাগ্রত থেকে যার যা নেক দোয়া, নেক আরজু রয়েছে তা দরবারে ইলাহীর নিকট পেশ করা। তবে দৃঢ়তার সাথে খালিছভাবে তা চাওয়া। কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ না করা। ইয়াক্বীন রাখা, আমার সব দোয়া এবং সব আরজুই আল্লাহ পাক অবশ্যই কবুল করবেন এবং অবশ্যই পূরণ করে দিবেন। মূলতঃ বান্দার কোন দোয়াই আল্লাহ পাক ফিরিয়ে দেননা। সবই কবুল করে থাকেন। বান্দা কোনটা বুঝে এবং কোনটা বুঝে না। যেটা হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “দোয়া তিনভাবে কবুল করা হয়- (১) বান্দা যা দোয়া করে আল্লাহ পাক বান্দাকে তা দিয়ে দেন তখন বান্দা বুঝতে পারে যে, তার দোয়া কবুল হয়েছে। (২) বান্দা যা চায় আল্লাহ পাক বান্দাকে তা না দিয়ে বান্দার জন্য যা বেশী মঙ্গল বা বেশী জরুরী তা তাকে দিয়ে দেন। তখন বান্দা বুঝতে পারেনা, তার দোয়া কবুল হয়েছে বা হয়নি। (৩) বান্দার দোয়াগুলো পরকালের জন্যে জমা করে রাখা হয়। এক্ষেত্রেও বান্দা বুঝতে পারেনা যে, তার দোয়া কবুল হয়েছে। কারণ আল্লাহ পাকই একমাত্র জানেন পরকালে কে কি অবস্থার সম্মুখীন হবে। শবে বরাতের আমল আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যখন শা’বান মাসের ১৫ তারিখ সমাগত হয়, তখন তোমরা ঐ রাতে নামায পড় এবং দিনে রোযা রাখ। কেননা আল্লাহ পাক ঐ দিন সূর্যাস্তের সময় প্রথম আসমানে অবতরণ করেন অর্থাৎ আল্লাহ পাক উনার খাছ রহমত নাযিল করে সকলকে সম্বোধন করে বলতে থাকেন, তোমাদের মধ্যে কেউ ক্ষমা প্রার্থী আছ কি? আজ আমি তাকে ক্ষমা করবো। কেউ রিযিক প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তাকে রিযিক প্রদান করবো। তোমাদের মাঝে কেউ বিপদগ্রস্ত আছ কি? আমি তার বিপদ দূর করবো। ফজর হওয়া পর্যন্ত এরূপ ঘোষণা দিতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ) এ হাদীস শরীফ দ্বারা বরাতের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দিগী করা এবং দিনে রোযা রাখা সুন্নত প্রমাণিত হলো। অতএব, এ রাতে পুরুষেরা ইশার নামায আদায় করবে মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে। আর মেয়েরা নামায আদায় করবে নিজ ঘরে। অতঃপর ছওয়াব রেছানী করতঃ ১০০ থেকে ৫০০ বার দরূদ শরীফ পাঠ করবে। অতঃপর কমপক্ষে এক ঘন্টা যিকির করবে। তরীক্বতপন্থীগণ নিজ নিজ তরীক্বার ছবক অনুযায়ী যিকির করবে আর যারা তরীক্বতপন্থী নয় তারা আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারকের যিকির অর্থাৎ ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ যিকির করবে এবং নফী ইছবাত অর্থাৎ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ যিকির করবে। অতঃপর দোয়া-মুনাজাত করবে। এতে গুনাহ-খতা মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। অতঃপর লাইলাতুল বরাতের নিয়তে দুই দুই রাকায়াত করে কমপক্ষে বার রাকায়াত নামায আদায় করবে। অতঃপর চার রাকায়াত ‘ছলাতুত তাসবীহ’-এর নামায আদায় করবে। অতঃপর দোয়া-মুনাজাত করবে এতে যার যা নেক আরজু রয়েছে তা আল্লাহ পাক উনার নিকট চাইবে। সর্বোপরি আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি-রেযামন্দী তলব করবে। মুনাজাত শেষ করার পর পুরুষগণ নিকটস্থ কোন কবরস্থান যিয়ারত করবে আর মহিলাগণ ঘরে মুনাজাতের মধ্যে মৃত পূর্বপুরুষগণের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করবে। অতঃপর আঁ বা বার রাকায়াত তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে বিতর নামায আদায় করবে এবং বিতর নামাযের পর বসে দু’রাকায়াত হালকী নফল নামায আদায় করবে যাকে হালক্বী নফল বলা হয়। অতঃপর কিছু সময় কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করবে আর তিলাওয়াত জানা না থাকলে তিলাওয়াত শ্রবণ করবে। অতঃপর ছুবহে ছাদিকের পূর্বেই আখিরী মুনাজাত করবে। অতঃপর দিনে রোযা রাখার জন্য সাহরী খাবে। সাহরী খাওয়ার পর ছুবহে ছাদিক হতে যে দশ/পনের মিনিট বাকি থাকে তাতে চুপে চুপে ইস্তিগফার ও দরূদ শরীফ পাঠ করতে থাকবে। অতঃপর ছুবহে ছাদিক হলে ফজরের নামায আদায় করবে।
উল্লেখ্য, কেউ কেউ বলে ‘শবে বরাত’-এর ব্যাখ্যা কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে কোথাও নেই। তাই তারা শবে বরাতের রাতে ইবাদত-বন্দিগী করার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে থাকে। তাদের এরূপ ভুল বক্তব্য ও মন্তব্যের জবাবে বলতে হয় যে, হ্যাঁ, ‘শবে বরাত’ শব্দ দু’টি যেরূপ কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের কোথাও নেই তদ্রুপ ‘নামায ও রোযা’ শব্দ দু’টিও কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের কোথাও নেই। এখন ‘শবে বরায়াত’ বিরোধী লোকেরা কি নামায ও রোযা শব্দদ্বয় কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে না থাকার কারণে ছেড়ে দিবে? মূলতঃ শবে বরাত, নামায, রোযা ইত্যাদি শব্দগুলো ফার্সী ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফার্সীতে ‘শব’ অর্থ রাত্রি, আর বরাত অর্থ ভাগ্য বা মুক্তি। অর্থাৎ ভাগ্য রজনী বা মুক্তির রাত। তাই তা কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে নেই। কারণ কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের ভাষা হচ্ছে আরবী। কুরআন শরীফে শবে বরাতকে ‘লাইলাতুম মুবারকাহ’ বা বরকতময় রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হাদীস শরীফে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান’ বা শা’বান মাসের মধ্য রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব, প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত যাবতীয় কবীরা গুণাহ হতে খালিছ তওবা করতঃ ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শা’বান’ বা লাইলাতুল বরাতের খাছ ফুয়ুযাত, বারাকাত, নিয়ামত, রহমত ও মাগফিরাত হাছিল করা।
রবীউল আউয়াল মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
রবিউস্ সানী মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
জুমাদাল উলা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা