রাহমানুর রহীম আল্লাহ্ পাকই সব প্রশংসার মালিক। যিনি আমাদের দিয়েছেন রমাদ্বান শরীফ। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সব ছলাত ও সালামের লক্ষ্যস্থল। রমাদ্বান শরীফের খুৎবায় যিনি বলেছেন, “হে মানবজাতি! একটি মহান ও বরকতপূর্ণ মাস তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করার জন্য হাযির হয়েছে।” এই মহান মাসের তাৎপর্য অনুধাবনে ও তার ফায়দা অন্বেষণে আমাদের সকলেরই তাই উদ্যোগী হওয়া দরকার। উপলব্ধি করা উচিৎ স্বয়ং আখিরী রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রহমত কামনা করেছেন যা এই মাসের প্রথম দশদিনে, উম্মতকে ক্ষমা প্রার্থনার কথা বলেছেন যা দ্বিতীয় দশদিনে এবং দোযখ থেকে নাজাতের আরজুর জন্য তাকিদ করেছেন যা তৃতীয় দশদিনে খাছভাবে সুযোগ পাওয়া যায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, পৃথিবীতে প্রথম ইবাদতসমূহের মাঝে রোযা অন্যতম। হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যে রোযা রাখতেন তা ‘আইয়ামে বীজ’ নামে পরিচিত। এরপর আহলে কিতাবগণ ছাড়াও রোযার দর্শন ও প্রক্রিয়া প্রতিফলিত হয় অন্যান্য ধর্মেও। প্রাচীন গ্রীক, পারস্য, মিশর, ভারতেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। অপরদিকে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম সিয়াম পালন করলেও তাঁর সিয়াম পালনের সে ধারবাহিকতা পাদ্রী সম্প্রদায় অব্যাহত রাখেনি। পাদ্রী পল, এরিনিয়াস সহ নানা পাদ্রীর নানা মত প্রবর্তনের পর চার্চ তাদের সিয়ামের দিন নির্ধারণ করে। এবং এখানেই শেষ নয়- ষষ্ঠ এডওয়ার্ড, প্রথম জেমস ও এলিজাবেথের সময় পার্লামেন্টও সিয়ামের ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ আরোপ করে। পার্লামেন্ট এই মর্মে ঘোষণা দেয় যে, ‘সিয়ামের দিন গোশ্ত খাওয়া যাবেনা।’ পার্লামেন্ট যুক্তি হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সহায়ক বলে উল্লেখ করে।
স্মর্তব্য, ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টকে বলা হয় গণতন্ত্রের জননী। আর আসমানী কিতাব হারিয়ে এবং কুরআন শরীফকে অস্বীকারের পর ডেমোক্রেটিক পার্লামেন্ট গঠন এবং অন্য বিষয়সহ ধর্মীয় ক্ষেত্রেও পার্লামেন্টের নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়া,;খ্রীষ্টানদের সীমাহীন গোমরাহীই প্রমাণ করে। বলা যায়, সেই একই পার্লামেন্টারী পদ্ধতিতে কাজ করে, ইসলামী আন্দোলনের ধুয়ো তুলেছে আমাদের তথাকথিত আলিম সমাজ। অথচ পবিত্র রমাদ্বান শরীফ বহুভাবে তাদেরকে হিদায়েতের দিক নির্দেশনা দেয়। ইহুদী-খ্রীষ্টানদের ন্যায় দেরীতে ইফতার করা, ছেহ্রী না করা, অবিরামভাবে না খাওয়াকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে হাদীস শরীফে। শুধু তাই নয়, ‘যে রোযা রেখে মিথ্যাচার পরিত্যাগ করলোনা তার রোযার কোন প্রয়োজন আল্লাহ্ পাক-এর কাছে নেই’ বলে বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীস শরীফে ব্যক্ত করা হয়েছে। অন্য হাদীস শরীফে আরো স্পষ্টভাষায় বলা হয়েছে, “অনেক সিয়াম পালনকারী এমন, যাদের ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকাই সার হয়েছে। তদ্রুপ অনেক ইবাদতকারী এমন, যাদের বিনিদ্র রজনীই ব্যর্থ হয়েছে।” (বুখারী, আবূ দাউদ,)
প্রসঙ্গক্রমে হাদীস শরীফদ্বয়ের আলোকে প্রশ্ন উঠে, যারা ইসলামের নামে হারাম গণতন্ত্র ও নির্বাচন করে, ছবি তোলে, লংমার্চ করে, ব্লাসফেমী আইন চায়, মৌলবাদী পরিচয়ে খুশি প্রকাশ করে, কুশপুত্তলিকা দাহ্ করে, হরতাল, অসহযোগ ইত্যাদি তাবৎ হারাম ও নাজায়িয কাজ করে এবং এইসব হারাম কাজ সমূহকেই ইসলামী আন্দোলন বলে ব্যক্ত করে তাদের সেই তথাকথিত আন্দোলনসমূহ যে কত অন্তসারশুণ্য ও ভয়াবহ পরিণামযুক্ত তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? মূলতঃ পরিণতি সে রকমই যেমন হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “রোযা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ। যদি না সে নিজেই তা ফুটো করে দেয়।” (নাসাঈ )
উল্লেখ্য, রোযার সাথে যাকাতের একটা অন্তর্নিহিত সম্পর্ক রয়েছে। কারণ যাকাতও পবিত্রতা ঘটায়। তবে এ পবিত্রতা মালের বা অর্থের। যাকাতই একমাত্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার ফলশ্রুতিতে পুঁজিবাদী, সুদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কুফল থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। সুদী তথা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা কোনদিনই সমাজের সাধারণ মানুষের জন্য সুখকর নয়। উদাহারণতঃ, ইউরোপ, আমেরিকার মত দেশেও আয় বন্টনের আনুপাতিক হার ১:৬০। প্রাপ্ত তথ্য মতে বিশ্বে মোট আয়ের শতকরা ৭৬% কেবল ১২-১৫% লোকের হাতে সীমাবদ্ধ। অপরদিকে বর্তমানে বাংলাদেশে কোটিপতি রয়েছে ২৫ হাজারেরও উর্ধ্বে। ১০ কোটি টাকার উপরে মালিক রয়েছে ২ হাজারেরও উর্ধ্বে। এরাই দেশের মোট ৪৫% সম্পদের মালিক। পক্ষান্তরে দারিদ্র সীমার নীচে বাস করছে ৬০%- ৮৭% লোক। উল্লেখ্য, দেশের তফসিলী ব্যাংক গুলোতেই আমানত আছে ৫৫,০০০ কোটি টাকা। তার সাথে আরো রয়েছে ৬০ হাজার কোটি কালো টাকা। এসব টাকা এবং অন্যান্য সব ক্ষেত্র থেকে বাংলাদেশে যাকাত, উশর ইত্যাদি আদায় হতে পারে ৩ হাজার কোটি টাকার উপরে। স্মর্তব্য যে, কিছুকাল পূর্বে এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিলো যে, কেবলমাত্র এক হাজার কোটি টাকার সূষ্ঠ প্রয়োগের দ্বারাই বাংলাদেশের দারিদ্র মোচন সম্ভব। কিন্তু তার পরেও যারা এ পথ পরিহার করে তাদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ্ পাক বলেন, “উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিসই কি তোমাদের পছন্দ?”
উল্লেখ্য, যোগ্যতা ও মর্যাদা সাপেক্ষে রোযাদারের রোযা তিন প্রকারে মূল্যায়িত হয়ে থাকে। পানাহার, কাম ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা সাধারণ লোকের রোযা বলে গণ্য হয়। এই বিরতির সাথে সাথে সর্বাঙ্গকে যাবতীয় ছগীরাহ্-কবীরাহ্ গুণাহ্ থেকে বিরত থাকা মধ্যম স্তরের ওলীআল্লাহ্গণের রোযা বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু এরপরেও যাবতীয় গাইরুল্লাহ্ থেকে ফারাক হয়ে দিলকে সর্বোতরূপেই আল্লাহ্ পাক-এর দিকে রুজু করাই হচ্ছে আখাসসুল খাছ ওলী আল্লাহ্, ছিদ্দীক এবং আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণের রোযার শান। অর্থাৎ ইলমে তাছাউফ শিক্ষার মাধ্যমে খাছ ওলী আল্লাহ্ হওয়ার দ্বারাই তথা জামানার মুজাদ্দিদের খাছ ছোহ্বত লাভের দ্বারাই হাক্বীক্বী রোযার স্বাদ লাভ সম্ভব।