মহান আল্লাহ্ পাক-এর জন্যই সমস্ত প্রশংসা। যিনি তাঁর মাহবুব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুহব্বতে সব সময়ই বিভোর। “হে হাবীব, আর কেউই নয়, শুধু আপনি আর আমি” বারে ইলাহীর ইত্যকার মুহব্বতী সম্বোধন স্বীয় হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তাঁর মুহব্বতের অনন্যতা প্রকাশ করে।
মশহুর সেই হাদীসে কুদূসীর কথা আমরা সবাই জানি, “হে হাবীব, আপনাকে যদি আমি সৃষ্টি না করতাম তাহলে কূল-মাখলুকাত কিছুই সৃষ্টি করতাম না।”
মূলতঃ এই হাদীস শরীফে শুধু হুব্বুল আওয়ালীন ওয়াল আখিরীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর মুহব্বতের কথাই প্রকাশ পায়নি সাথে তাঁর অনন্য মর্যাদার কথাও সন্নিবেশিত হয়েছে। যা কুরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক সরাসরি ইরশাদ করেছেন, “আমি আপনার মর্যাদাকে সমুন্নত করেছি।” (সূরা ইনশিরাহ/৪)
এতটুকু সমুন্নত যে, খোদ কালিমা শরীফেই আল্লাহ্ পাক-এর সাথে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুবারক সংযুক্ত হয়েছে। তাই ফক্বীহগণের ফতওয়া, কিয়ামত পর্যন্ত যদি কেউ ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু’ পাঠ করে কিন্তু ‘মুহম্মদুর রসূলূল্লাহ’ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাঠ না করে তবে সে মুসলমান হবেনা।
উল্লেখ্য, সাইয়্যিদুল জিননি ওয়াল ইনস হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অধিকাংশ মহল খুব কমই ফিকির করে থাকে এবং আপাতদৃষ্টি নিয়েই তাঁকে মূল্যায়ন করার অপচেষ্টা করে থাকে। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) অথচ এটি কাফিরদের খাছলত। কাফিররা সাইয়্যিদুল বাররী ওয়াল বাহর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করতে, উদাসীন, গাফিল ও অবুঝ থাকত। আল্লাহ্ পাক তাদের প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন “…… তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, তাদের সঙ্গী লোকটির (ছাহিবে খুলুকে আযীম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর) মস্তিষ্কে কোন বিকৃতি নেই। তিনি তো ভীতি প্রদর্শনকারী প্রকৃষ্টভাবে।” (সূরা আরাফ/১৮৪)
অন্যত্র আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে আরো পরিষ্কার ভাষায় ইরশাদ হচ্ছে, “বলুন, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর নামে এক একজন করে ও দু-দুজন করে দাঁড়াও, অতঃপর চিন্তা-ভাবনা কর। তোমাদের সঙ্গী (খাইরুল আলম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে কোন উম্মাদনা নেই। তিনি তো আসন্ন কঠোর শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেন মাত্র।” (সূরা ছাবা- ৪৬) মূলতঃ সাইয়্যিদুল খ¦লায়িক হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে যথাযথ ফিকিরই তাঁর শান-মান অনুধাবনে, তাঁর প্রতি আদব প্রদর্শনে, তার সীরাত উপলব্ধিতে ও তাঁর সুন্নত অনুসরণে প্রবৃত্ত করতে পারে। বহুল পঠিত সূরা কাউছারে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ ফরমান, “(হে আমার হাবীব!) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউছার দান করেছি।” (সূরা কাউছার/১)
হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, রূèরু॥ হচ্ছে দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণ ও ভালাই। যতই সূক্ষ্মভাবে ফিকির করা যায় ততই এই বিষয়টি সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ বলে প্রমাণিত হয়।
যদি কেউ মনে করেন যে, সে যুগে বিদ্যুৎ ছিলনা, উন্নত যানবাহন ছিলনা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিলনা তথা আজকের মত নানা বস্তুতান্ত্রিক ও নাগরিক সুবিধা ছিলনা। খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাদের আক্বলের জন্য বলা যায়, এই যে পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা দেখি বাস-ট্রাক, নৌ ও বিমান দুর্ঘটনা, হাজার হাজার যাত্রী আহত-নিহত হওয়ার কথা, তাছাড়া-যানবাহনের কালো ধুয়ায় পরিবেশ দূষণ, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ শর্ট সার্কিট থেকে অগণিত জান এবং হাজার হাজার কোটি টাকার মালের ক্ষতি, ইলেক্টনিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে খুব স্বল্প নফ্সানিয়াত আনন্দের বিপরীতে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, পরকীয়া, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও ভিত্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া; এসবই মূলতঃ আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগের প্রভাব। অথচ তুলনামূলক পরিসংখ্যানে এমনটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে ঘোড়া, উট ব্যবহারে মুখোমুখি সংঘর্ষে মানুষ মারা গেছে, যেসব বাহনের দ্বারা আজকের মত যান-বাহনজনিত দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথবা মোমবাতী বা প্রদীপের আলো থেকে অগ্নিকান্ডে ব্যাপকহারে জান-মালের ক্ষতি হয়েছে বা সুন্নতী আবহের বলয়ে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধ যে অনাবিল, অকৃত্রিম পারিবারিক বন্ধন ও নিবিড় সামাজিক মূল্যবোধ উপহার দেয় তা আজকেও তথাকথিত প্রগতিবাদীদের কাছে এক লোভনীয় ও বিস্ময়ের বিষয়! সুতরাং সাক্বিয়ে কাউছার হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সম্পৃক্ত সবকিছুই সবচেয়ে ভাল; এই কথাই আমাদেরকে গভীরভাবে অনুধাবন ও বিশ্বাস করতে হবে।
আমাদের বুঝতে হবে যে, মহান আল্লাহ্ পাক সাইয়্যিদুস্ সাক্বালাইন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য যে যুগ, যে জিনিস, যে উপযোগ, যে খাদ্য, যে পোশাক, যে বাহন, যে গৃহ, যে আসবাব, যে আবহাওয়া যে ভৌগলিক অবস্থান, যে সঙ্গী, যে আচরণ, সর্বোত্তম মনে করেছেন তার সাথেই সম্পৃক্ত করেছেন। এবং এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের রসূল, (ছাহিবু জামিয়ূল আলক্বাব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল আল আমীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাঝে যে আমল, যে আচরণ, যে আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে তাই আল্লাহ্ পাক ও তাঁর আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একান্ত পছন্দ।”
তাই এ কথা বলার কোন অবকাশ নেই যে, আজকের যুগে যদি সরওয়ারে কায়েনাত হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতেন, বা অমুক জায়গায়, তমুক জায়গায় তথা বাংলাদেশে আসতেন তাহলে তিনি সে যুগে, সে স্থানে যেরূপটি করেছেন সেরূপটি না করে এরূপ করতেন, ওরূপ করতেন। মূলতঃ একথাটি নিতান্ত গর্হীত ও উদ্ধত তথা কুফরী মূলক। কারণ কুরআন শরীফে বলা হয়ছে, “রিছালত কোথায় রাখতে হবে, কিভাবে রাখতে হবে সেটা আল্লাহ্ পাকই ভাল জানেন।” কাজেই উক্ত বক্তব্য পেশ করা প্রকৃতপক্ষে ইবলিসেরই কিয়াসের নামান্তর। স্মর্তব্য আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে সমুদয় ইল্ম প্রাপ্ত, নবীউল উম্মী হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এই বিষয়টি সম্পর্কে উম্মাহকে রীতিমত সতর্কও করেছেন। বলেছেন, “আমার যামানা সর্বোত্তম এবং এর পরের জামানা এবং এর পরের যামানা।
কাজেই আমাদের নফ্সানিয়াত, কমজোরী তথা ঈমানী দুর্বলতার কারণে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগের সব অনুষঙ্গ অনুকরণ সম্ভব না হলেও তা-ই সর্বোত্তম মনে করতে হবে এবং পরবর্তী যুগের প্রেক্ষাপটে তা নতুন রূপে দাঁড়াত এরূপ বেয়াদবি জনিত ধারণা হতে পরহিয হতে হবে। যেহেতু ছাহিবু হুসনিল খুলুক্ব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ পাক সর্বোত্তম ভালাই বা কাউছারই দান করেছেন। মূলতঃ ফখরে মওজুদাত আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুহব্বত বিদ্বেষী-ওহাবী মহলটিই কাউছার শব্দের মমার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়। তারা ব্যর্থ হয় এ কথা অনুধাবনে যে, আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত কাউছারের বদৌলতে আছলুল-ক্বায়িনাত হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আব্বা হযরত খাজা আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং মাতা হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা সহ তাঁর পূর্ব-পুরুষের কেউ কাফির ছিলেন না, সবাই শুধু জান্নাতীই নন বরং বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত জান্নাতী ও মহা-পবিত্র ছিলেন। যা হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আমার পূর্ব-পুরুষগণের মাঝে কেউ মূর্তি পূজক ও অশালীন কাজের সাথে জড়িত ছিলেন না।” সংশ্লিষ্ট মহল আরো বুঝতে ব্যর্থ হয় যে, আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত কাউছার-এর বদৌলতে এটা খুবই সহজ কথা যে, ছাহিবুছ ছিদ্বক হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মায়ের রেহেম শরীফ থেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দুনিয়াতে আসেননি, তিনি মাটির তৈরী নন- নূরের তৈরী। তাঁর পেশাব-পায়খানা, রক্ত মুবারক সবই শুধু পাকই নয় বরং জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে যাওয়ার চরম উছীলা।
অতীব আফসোস ও দুঃখের বিষয়, আমরা উম্মত দাবী করেও ফখরুল আওয়ালীন ওয়াল আখিরীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা অনুধাবনে প্রবৃত্ত হইনা। আর তাই অনিবার্য ভাবে আমরাও আমাদের কাঙ্খিত সম্মান ও বাঞ্ছিত সমৃদ্ধি নিয়ে জীবন-যাপন করতে পারছিনা। আজকে ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, মধ্যপ্রাচ্য সহ গোটা মুসলিম বিশ্বে মুসলমানদের অবমাননা ও লাঞ্ছনার মূলে উল্লিখিত কারণই নিহিত।
আর এ বিষয়টিকে আরও ত্বরান্বিত এবং ব্যাপক করেছে আলিম দাবীদার এক ধরণের উলামায়ে ‘ছূ’। তারা সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা দানে সদিচ্ছুক নয়, তাঁর সুন্নত অনুসরণে সচেষ্ট নয়, কিন্তু বিজাতীয় ও বিধর্মীয় আদর্শ ও কর্মসূচী- লংমার্চ, হরতাল, মৌলবাদ, ব্লাসফেমী, ছবি, নির্বাচন ও গণতন্ত্র ইত্যাদি পালনে বড়ই সক্রিয়। যাদের সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- “আখিরী যামানায় এক শ্রেণীর দাজ্জাল বের হবে, যারা এমন সব কথা বলবে, যা তোমরা শুননি এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও শুনেনি। তোমরা তাদের থেকে দূরে থাক; তাদেরকেও তোমাদের থেকে দূরে রাখ। তাহলে তারা তোমাদের গোমরাহ করতে পারবেনা।” (মিশকাত ) পাশাপাশি মনে রাখা কর্তব্য, হামিলু লিওয়ায়িল হামদ, হাবীবে আ’যম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সার্বক্ষণিক রূহানী সংযোগ সমৃদ্ধ ও তাঁর মহান সুন্নত দ্বারা সুশোভিত মুজাদ্দিদে যামানের নেক ছোহবতের মাধ্যমেই আমাদের পক্ষে পাওয়া সম্ভব সনদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাত ও সিফত সম্পর্কিত ইল্ম ও ফিকির, তাঁর হাক্বীক্বত সম্পর্কিত মা’রিফাত এবং তাঁর পূর্ণ অনুসরণ ও সুন্নত পালনের কুয়ত। পবিত্র ঈদ-ই-মীলাদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে সেসব নিয়ামত হাছিলই হোক আমাদের অন্তরের আরজু। (আমীন)