সম্পাদকীয়

সংখ্যা: ৯৮তম সংখ্যা |

          সব প্রশংসা মহান রব্বুল আলামীনের। যিনি আসমান ও যমীনের সার্বভৌমত্বের মালিক। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অফুরন্ত দরুদ ও সালাম। যিনি পরিপূর্ণ দ্বীন ও জীবন ব্যবস্থা এবং হিদায়েত নিয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। যিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি জিহাদ না করে এবং জিহাদ সম্পর্কে পরামর্শ না করে মৃত্যুমুখে পতিত হয় সে ব্যক্তি মুনাফিকীর একটি শাখার উপরে মৃত্যুবরণ করে।”

          শুধু তরবারীর জিহাদই কাঙ্খিত ও শ্রেষ্ঠ নয়, শ্রেষ্ঠ জিহাদের আরো দিক রয়েছে। প্রবল প্রতাপ, প্রতিপত্তিশালী ও পরাক্রমশালী জালিম শাসনকর্তার সামনে সত্য কথা উচ্চারণ করাকেও উত্তম জিহাদ বলা হয়েছে। তবে মুহাক্কিকগণ এও মন্তব্য করেছেন যে, প্রায় গোটা উম্মাহই যখন ভুল মত, মতবাদ তথা প্রক্রিয়ার উপর অভ্যস্থ হয়ে পড়ে, সেটাকেই ধর্মের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মনে করে, তখন সে প্রবাহমান প্রবল জনমতের বিরুদ্ধে সত্যিকারের ধর্মীয় ফায়সালা তুলে ধরাও বিশেষ উত্তম জিহাদ।

          বলাবাহুল্য, জিহাদের এ প্রক্রিয়াটি বিশেষ কষ্টসাধ্য ও জটিল। কারণ, খোদা-তায়ালার মারিফত-মুহব্বত ও রুহানিয়াত থেকে বঞ্চিত ধর্মব্যবসায়ী, নামধারী আলিম সমাজ কখনোই চলমান জনমতের বিপরীতে ইসলামী অভিমতকে তুলে ধরার প্রয়াস পায়না, যদিও ইসলামিক ফায়সালা বিপরীত হয়ে থাকে। এতে প্রচলিত জনমত নিজেদের ধারণকৃত বিশ্বাসে উপস্থিত অনৈসলামিক রূপটি খুঁজে পেতে করুণভাবে ব্যর্থ হয়।

          সুতরাং সেক্ষেত্রে সত্যিকারের ইসলামী মূল্যবোধের কথা তুলে ধরলে, ধর্ম ব্যবসায়ী আলিম সমাজপুষ্ট প্রচলিত জনমতের ফুঁসে উঠাও বিচিত্র নয়। এরূপ অবস্থায় তাই সত্যিকারের ছহীহ্ ফতওয়া প্রকাশ করা চরম স্তরের জিহাদ বটে। বলার অপেক্ষা রাখেনা, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী কর্তৃক “ইসলামের নামে গণতন্ত্র তথা নির্বাচন হারাম” একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী জিহাদী পদক্ষেপ।

          একথা সত্য যে, সত্যিকার জিহাদী প্রক্রিয়ায় খোদা-তায়ালার রহমতই শুধু নয় বরং গায়েবী মদদ যুক্ত থাকে। ইসলামের নামে গণতন্ত্র তথা নির্বাচন করা হারাম, ভোট আমানত নয়, নির্বাচন ঈমানী পরীক্ষা নয়, এ কথা সম্যক উপলব্ধির জন্য বর্তমান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট।

          জনমনে নির্বাচন এখন ব্যাপক সহিংসতাপূর্ণ একটি আতঙ্কের বিষয়। প্রায় তের কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৪ জেলায়, প্রায় ৩১ হাজার ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৯ হাজার ৯৬০টি ভোট কেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০ হাজার সেনা সদস্য, ১০ হাজার বি. ডি. আর এবং ৬৫ হাজার পুলিশ কাজ করার কথা বলা হয়েছে। এদিকে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী দেশে অবৈধ অস্ত্রের সংখ্যা আড়াই লাখ। এর মধ্যে পুলিশের উদ্ধারকৃত অস্ত্রের হার শতকরা ১.২৫ ভাগ মাত্র। এছাড়া পুলিশ ৬৮ হাজার ৭৭ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করলেও  শীর্ষ সন্ত্রাসীরা থেকে গেছে ধরা ছোয়ার বাইরে।

          প্রাপ্ত তথ্য থেকে আরো জানা যায় যে, বর্তমান নির্বাচনে প্রার্থীদের থেকে ব্যয়িত হবে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশী।  এতদ্বপ্রেক্ষিতে নির্বাচনকে সন্ত্রাস, কালো টাকা আর অসৎ প্রচারণা থেকে আলাদা করতে না পারার কারণে, নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে শুধু সাধারণ মানুষই বীতশ্রদ্ধ নয় সাথে দীর্ঘদিনের ত্যাগী, নিরলস, নিবেদিত রাজনৈতিক নেতারাও প্রবাহমান গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অসারতার প্রমাণ পেয়েছেন। বলাবাহুল্য প্রতিটি গণতান্ত্রিক দলেরই দাবীকৃত নীতি ও আদর্শ থাকে। সে প্রেক্ষিতে যিনি তাতে যতবেশী নিবেদিত ও প্রজ্ঞাবান তিনিই তত বেশী মূল্যায়িত হবার দাবী রাখেন। পাশাপাশি দলের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, কথিত নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক নেতা কোনদিনই তার গৃহীত রাজনৈতিক আদর্শ, দল ও নেতার বিরুদ্ধাচরণ করবেনা এটাই গৃহীত। কিন্তু এ ধারার বাইরে বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যেভাবে দলবদল, দলত্যাগ, বিদ্রোহ, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের পরিবর্তে পেশী শক্তি ও কালো টাকার মালিকদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে এবং নির্বাচনে কালো টাকা সন্ত্রাস আর অরাজকতার অনুষঙ্গ যোগ হচ্ছে তাতে করে কোন সচেতন মানুষ এ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সমর্থন করতে পারেনা।

          পাশাপাশি অধিকতর উৎসাহী যে মহলটি মনে করেন যে, কেবল মাত্র তৃতীয় বিশ্বেই এরূপটি হয় গণতন্ত্রের তীর্থস্থান উন্নত বিশ্বে এরূপ নজীর নেই, তাদের সে মন্তব্যও সম্প্রতি করুণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

          গত ডিসেম্বরের মার্কিন নির্বাচনে জর্জ বুশ জন রায় বা নির্বাচক মন্ডলীর রায়ে নির্বাচিত হননি; তিনি ফ্লোরিডার ফেডারেল সুপ্রীম কোর্টের পক্ষপাতদুষ্ট রায়ে নির্বাচিত হয়েছেন বলে অভিযোগ। এদিকে বুশের ভাই জেব বুশ ফ্লোরিডার গভর্নর হওয়ায় ব্যালট পেপার গণনার কারচুপিরও কথা উঠেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী সঙ্কট এবারই প্রথম নয়। ১৯৬০, ১৯৮৮ সালেও এরূপটি হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ নিক্সন তার আত্মজীবনী “মেমেরিস অব রিচার্ড নিক্সন” এ পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কয়েকটি রাজ্যে ভোটে ংঁনংঃধহঃরধষ ভৎধঁফ হয়েছে। এদিকে সার্বিয়াতে কস্তুনিচা জেতার পরও নির্বাচন কমিশনার তার বিজয় চেপে রেখেছিল। মেক্সিকো সহ আরো অনেক দেশেই দেখা গিয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতি।

          সুতরাং গণতন্ত্রের বিকাশে ইউ, এস, আই, ডি, ও ইউ, এন, ডি পি এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করলেও আমাদের আজকে প্রখর বাস্তবতার প্রেক্ষিতে নিজেদের অস্তিত্বের খাতিরেই বুঝতে হবে যে নির্বাচনী প্রথার মাঝেই রয়েছে ভিত্তিহীনতা আর অরাজকতা। উদাহরণতঃ বলা যায়, মার্কিন নির্বাচনে আলগোর ২ লাখ ৪০ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকলেও ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মাত্র ১৬শ ভোটের জটিলতায় তিনি নির্বাচিত হননি। সুতরাং গণতন্ত্রে যে গণমানুষের অভিলাষ বাস্তবায়িত হয়না সেটাও আজকে অনিবার্যভাবে উপলব্ধির সময় এসেছে।

          কাজেই বাংলাদেশে কুড়িগ্রামের বেরুবাড়ী ইউনিয়নের মহিলাদের ৪৫ বছর পর এবং কয়েক যুগ পর মাদারীপুরের কালিকাপুর ইউনিয়নের মহিলা ভোটারদের বর্তমান নির্বাচনে ভোটের ব্যবস্থা করে যে আহামরি কাজ হয়েছে তা বলার জো নেই। এদিকে যারা “ফতওয়া ছিল এবং থাকবে” বলে শ্লোগান সর্বস্ব প্রচারণা দ্বারা নির্বাচনী ভিত তৈরী করতে চেয়েছিলো, এ বিষয়ে তাদের বিস্ময়কর নীরবতা এবং নিস্ক্রিয়তা এটাই  প্রমাণ করে যে তারা বরাবরই লংমার্চ, হরতাল, মৌলবাদ, নির্বাচন, গণতন্ত্র, ব্লাসফেমী ইত্যাদি হারাম কাজকে হালাল করার ব্যাপারেই তৎপর। হারামের বিরুদ্ধে তাদের কোন উচ্চারণ নেই।

          তদুপরি বহু কোশেশের পর তথাকথিত ইসলামিক দলগুলোর, পঞ্চাশেরও কম আসনে শুধুমাত্র প্রার্থীতা পেশ এটাই প্রমাণ করে যে তারা জনবিচ্ছিন্ন, তাদের পিছনে কোনদিনই গণজাগরণ সম্ভব নয়। মূলতঃ এরা মৌসুমী ও ব্যবসায়ীক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়, মুখে জিহাদের কথা বললেও আসলে এদের ভেতরে জিহাদের বিন্দুমাত্র তৎপরতা নেই। তাই এরা গোপনে “ভোট ও নির্বাচন ইসলামে জায়েয নেই” বললেও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে ভয় পায় বরং তা জায়েয রূপে ঘোষণা দেয়।

          বলার অপেক্ষা রাখেনা, এতে এযাবৎ অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে সব ভোটারদের কবীরাহ গুণাহ্ তাদের উপরই বর্তায়। এক সমীক্ষানুযায়ী শুধুমাত্র গত ৭টি সংসদীয় নির্বাচনে চল্লিশ কোটিরও বেশী  ভোটারের এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটারদের কবীরাহ গুণাহ্র ভার তাদের উপরই গিয়ে পড়ে।

          সুতরাং হারামকে হালালকারী এসব ওলামায়ে “ছূ”দের দ্বারা কোনদিনই ইসলাম আশা করা যায়না বরং সেক্ষেত্রে অনিবার্যভাবেই আমাদেরকে মুখাপেক্ষী হতে হবে যামানার মুজাদ্দিদের অকাট্য তাজদীদের এবং তাঁর মুবারক ছোহবতের দিকে।