সম্পাদকীয়

সংখ্যা: ৯১তম সংখ্যা | বিভাগ:

মস্ত প্রশংসা রব্বুল আলামীনের। যিনি আলীমুল হাকীম। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অফুরন্ত দরূদ ও সালাম। যিনি পরিপূর্ণ দ্বীন নিয়ে দুনিয়ায় আবির্ভূত হয়েছেন।

          আল্লাহ্ পাক বলেন, “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সমূহকে পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকেই একমাত্র দ্বীন হিসেবে ঘোষণা করলাম।” (সূরা মায়িদা)

          ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দ্বীন। পৃথিবীতে উদ্ভূতও প্রচারিত অন্য কোন মতবাদ পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠা পায়নি। কিন্তু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ প্রচারিত ইসলামের পরিপূর্ণ রূপায়ণ ঘটিয়েছেন।

          ইসলামের স্বর্ণযুগের সেই স্মৃতি আজো তাই পথহারা বঞ্চিত মুসলমানের অমিয় চেতনার উৎস। পাশাপাশি বিগত দিনে ইসলামের রাহে দ্বিধাহীন চিত্তে জীবন বিসর্জন তথা শাহাদাতের অগণিত ঘটনা আজো ক্ষয়িষ্ণু ঈমানী চেতনায় আলোড়ন তৈরী করে, এখনো জীবন দান তথা শাহাদাত বরণের প্রেরণায় প্রগাঢ়ভাবে উদীপ্ত করে।

          এ বোধের স্পর্শকাতরতায় তাই ইসলামের নামে যেনোতেনো ইস্যূতেই জজবাধারীর উপস্থিতিতে উৎসাহের আধিক্যের অভাব হয়না।  দ্বীনের পথে এ উৎসাহ ও জজবা অবশ্যই দ্বীনের এক বড় সম্পদ হিসেবে গণ্য হতে পারত। কিন্তু বলা প্রয়োজন, এ জজবার স্বরূপ অনুধাবণ এবং সঠিক পথে একে সুচারুরূপে পরিচালনা ও প্রয়োগের ব্যর্থতাই আমাদেরকে থেকে থেকে দুঃখজনক ঘটনা তথা করুণ পরিণতিতে পর্যবসিত করে। তাই সুস্থ বোধের বিকাশ প্রয়োজন যে, স্থান কাল পাত্রের প্রেক্ষাপটে কেবল রক্তদানের মানসিকতায় অমিততেজা জ্বিহাদী জজবাই কাঙ্খিত নয় বরং বাঞ্ছিত হচ্ছে হিকমত ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন।

          অনুস্মরণীয় মুহাক্কিকগণ তার যথেষ্ট নজীর  রেখেছেন। উৎসাহধারীদের পুনঃ পুনঃ অনুরোধের প্রেক্ষিতে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি জবাব দিয়েছিলেন, “এ মুহুর্তে জ্বিহাদ ঘোষণা করা হলে জালিম ইংরেজ সরকার নিমিষে সব আলিমকে ক্বতল করে ফেলবে। এ যাবৎ পালিত ইসলামের অনুষঙ্গের উপর নতুন বিধি-নিষেধ আরোপ করবে এবং আরো কঠোরতা প্রয়োগ করবে।” সে সময়েই সরাসরি জ্বিহাদে না গিয়ে ইল্মের বিস্তার ঘটিয়ে জনমত তৈরী করে জ্বিহাদের বীজ বপন করে তিনি প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর উত্তরসূরী আমিরুল মু’মিনীন, মুজাহিদে আ’যম, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি খিলাফত কায়েমে সমর্থ হয়েছিলেন।

          প্রসঙ্গতঃ অভিজ্ঞ মহল মনে করেন যে, যে কাজ নিজ সত্ত্বার দিক দিয়ে বৈধ এবং কোন কোন স্তরে প্রশংসনীয়ও বটে, কিন্তু সে কাজ করলে যদি ফ্যাসাদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে কিংবা তার ফলশ্রুতিতে পরিণতি আরো বিপর্যয়কর হয়, তবে তা থেকে বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয়।

          স্মরণ রাখা দরকার, গণতান্ত্রিক সরকার আর ইসলাম, এতদুভয়ের মাঝে একটা বিরাট ব্যবধান বিদ্যমান। অতএব, গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ইসলামী হুকুম আরোপ করা তথা ফতওয়া প্রয়োগ করা অনেক ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। তদুপরি ইসলামী খিলাফতে ফতওয়া প্রদান এবং তা প্রয়োগ করার অধিকার শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট যোগ্য বিভাগই সংরক্ষণ করেন।

          বিশেষতঃ আজকে যারা ইসলামী আন্দোলনের নামে হাজারো অনৈসলামিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত, যারা ইসলামের নামে ছবি তোলা, লংমার্চ, হরতাল, ব্লাসফেমী, নির্বাচন, মসজিদে মুছল্লী পুলিশ হত্যা, মেয়েলোকের আঁচলে জোট বাধা ইত্যাদি বিদ্য়াত ও বেশরা কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট, তারা কোন মতেই ফতওয়া প্রদান এবং তা প্রয়োগের যোগ্যতা রাখেনা। কুরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক বলেন, “তোমরা ঐ কথা বল কেন, যা নিজেরা পালন করনা।”

          তবে গনতান্ত্রিক সরকারের একটি দাবী হচ্ছে ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষণ করা। সুতরাং সম্পূর্ণ ও অপ্রাসঙ্গিক ফতওয়া প্রদান ও প্রয়োগ নিরুৎসাহিত করণের নামে যেন ফতওয়ার দ্বারকেই রূদ্ধ না করা হয়। অন্যথায় তা কেবল ধর্মীয় স্বাধীনতাতেই হস্তক্ষেপ করা হবেনা বরং তা হবে সুস্পষ্ট ধর্মীয় সংঘাত তৈরীর তাজা রসদ।

          বলাবাহুল্য, গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় আইনের উৎস যেমন আইনসভা, সুপ্রীম কোর্ট তার অভিভাবক মাত্র, তেমনি প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে কোর্ট ইসলামী আইন তথা ফতওয়ার পর্যালোচনা করছে মাত্র। কিন্তু সুপ্রীম কোর্ট যেমন আইন সভাকে গুরুত্বহীন বলতে পারেনা, তেমনি ইসলামী আইনের উৎস কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াসের ধারা বা ফতওয়া তথা যোগ্যতাধারী সংশ্লিষ্ট মহল বা মুফতীদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারেনা কোনভাবেই। পাশাপাশি ফতওয়া দানের অধিকারের ক্ষেত্রে অনাবশ্যক সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং এই অধিকারকে সংকীর্ণগন্ডীতে আবদ্ধ করার  প্রবনতাও প্রভূত অসন্তোষ ও অরাজকতার অবকাশ ঘটাবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।

          ফতওয়া নিয়ে উদ্ভূত জটিলতার পেছনে প্রজ্ঞাপুর্ণ শরয়ী ইল্মের ঘাটতিই কেবল নয়, পাশাপাশি কু-প্রবৃত্তি সংশোধনের অভাবের ক্ষেত্রে ইল্মে তাছাউফ শুণ্যতাই মূল কারণ। ইতিহাস বলে- সব মুহাক্কিক মুফতীগণই ইল্মে তাছাউফে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। যামানার মুজাদ্দিদের উছীলায় মহান আল্লাহ্ পাক আমাদের সে নিয়ামত নছীব করতঃ সহীহ ও সুস্থ ফতওয়া অনুশীলন করার তাওফিক দিন। (আমীন)

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়