মাওলানা মুহম্মদ আফজালুল হক, নাজিমখান, কুড়িগ্রাম।
মুহম্মদ আব্দুল কাদের, পঞ্চগড়
মুহম্মদ শফিকুল আলম, ফরিদগঞ্জ, চাদঁপুর।
সুওয়ালঃ গত ০৩/০২/২০০১ঈঃ তারিখে “ওলামা-মাশায়েখগণ সারা দেশব্যাপী যে হরতাল পালন করেছে তা কতটুকু শরীয়তসম্মত? কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে জানার বাসনা রাখি।
জাওয়াব : ওলামা-মাশায়েখ-এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাঃ ‘ওলামা-মাশায়েখ’ এ উভয় শব্দটি বহুবচন। যেমন, ‘ওলামা’ শব্দটি ‘আলিম’ (জ্ঞানী) শব্দের বহুবচন। আর ‘মাশায়েখ’ শব্দটি ‘শায়খ’ (জ্ঞানবৃদ্ধ) শব্দের বহুবচন। মূলতঃ শব্দ দুটি পরস্পর সমার্থবোধক। কুরআন-সুন্নাহ্র বর্ণনায় যিনি আলিম তিনিই শায়খ বা যারা ওলামা তাঁরাই মাশায়েখ। তবে সমাজে একেকজন একেক নামে মাশহুর বা প্রসিদ্ধি লাভ করে থাকেন। মূলতঃ ইল্মের দু’টি ভাগ, ইল্মে ফিক্বাহ্ ও ইল্মে তাছাউফ। এ উভয় প্রকার ইল্ম যিনি হাছিল করেন তিনিই আলিম বা শায়খ।
উল্লেখ্য, যার মাধ্যমে অধিক পরিমাণে ইল্মে ফিক্বাহ্র বিকাশ ঘটে, তিনি আলিম বা ফক্বীহ্ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। আর যার মাধ্যমে ইল্মে তাছাউফের অধিক খিদমত হয় বা প্রকাশ ঘটে, তিনি শায়খ বা মুর্শিদ (পীর) হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
আলিম বা শায়খের পরিচয় সম্পর্কে কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
انما يخشى الله من عباده العلماء.
অর্থ: “আল্লাহ্ পাক-এর বান্দাদের মধ্যে ঐ সকল লোক আলিম যাঁরা আল্লাহ্ পাককে ভয় করেন।”(সূরা ফাতির/২৮)
আর হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ومن ارباب العلم؟ الذين يعملون بما يعلمون. وما اخرج العلم من قلوب العلماء؟ قال الطمع.
অর্থ: “আলিম কারা? যাঁরা ইল্ম অনুসারে আমল করেন। কোন জিনিস আলিমের অন্তর থেকে ইল্মকে বের করে দেয়? তিনি বললেন, দুনিয়ার লোভ।” অর্থাৎ দুনিয়ার ধন-সম্পদ, নাম-ধাম, ইজ্জত-সম্মান হাছিলের আকাঙ্খা।” (মিশকাত শরীফ)
বিশিষ্ট তাবেয়ী, আমীরুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ব তরীক্বত হযরত ইমাম হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করা হলো- আলিম কে? তিনি জবাবে বলেন,
انما الفقيه الزاهد فى الدنيا الراغب فى الاخرة البصير بذنبه المداوم على عبادة ربه الورع الكاف عن اعراض المسلمين العفيف عن اموالهم الناصح لجماعتهم.
অর্থ: “ফক্বীহ্ বা আলিম হলেন ঐ ব্যক্তি, যিনি দুনিয়া হতে বিরাগ, পরকালের প্রতি ঝুঁকে আছেন, গুণাহের প্রতি সতর্ক, সর্বদা মহান আল্লাহ্ পাক-এর ইবাদতে মশগুল, পরহেযগার বা সুন্নতের পাবন্দ, মুসলমানের মান-সম্মান নষ্ট করেন না, তাদের সম্পদের প্রতি লোভ করেন না এবং তাঁর অধীনস্থ লোকদেরকে নছীহত করেন।”(ফাযায়েলে ইল্ম)
অতএব, বুঝা গেল, যারা ইল্মে ফিক্বাহ্ ও ইল্মে তাছাউফের অধিকারী এবং আল্লাহ্ পাককে ভয় করে ইল্মে অনুযায়ী আমল করেন, তথা সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করেন তথা উপরোক্ত গুণাবলীর অধিকারী, তাঁরাই প্রকৃত ওলামা-মাশায়েখ।
আর বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ওলামা-মাশায়েখ তো দূরের কথা ইসলামের নামে সাধারণ মু’মিন-মুসলমানের জন্যও হরতাল করা জায়েয নেই বরং সম্পূর্ণ হারাম এবং ক্ষেত্র বিশেষে কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
কাজেই যে সকল ওলামা-মাশায়েখ হরতাল ডেকেছে বা পালন করেছে, তারা মূলতঃ ওলামা-মাশায়েখ নামের কলঙ্ক। তারা প্রকৃত ওলামা-মাশায়েখ নয়, তারা হচ্ছে- ওলামায়ে “ছু” তথা নিকৃষ্ট, দুনিয়ালোভী, ধর্মব্যবসায়ী নামধারী ওলামা-মাশায়েখের অন্তর্ভূক্ত।
হরতাল যেহেতু হারাম এবং বিজাতীয়দের প্রবর্তিত আমলের অন্তর্ভূক্ত, সেহেতু তা ওলামা-মাশায়েখ কি করে করতে পারে?
কারণ যিনি ওলামা-মাশায়েখ হবেন, তিনি স্বেচ্ছায় ও প্রকাশ্যভাবে কোন হারাম কাজ করতে পারেন না এবং কোন বিধর্মীকে অনুসরণ করতে পারেন না। বরং তিনি হবেন দ্বীন ইসলাম তথা শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দ।
শরীয়তের উছূল হচ্ছে- “কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস।” এ চারটি উছূলের ভিত্তিতে প্রতিটি আক্বীদা ও আমল যাঁদের হবে, যাঁরা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশিত মত ও পথের (সুন্নতের) উপর পরিপূর্ণ দায়েম-কায়েম হবেন এবং যাঁরা তার বিপরীত মনগড়া কোন আক্বীদা-আমল কিংবা কোন বিধর্মী-বিজাতীদের পোষণকৃত অথবা প্রবর্তিত আক্বীদা ও আমলের অনুসরণ করবেন না, তাঁরাই মূলতঃ হক্কানী-রব্বানী বা প্রকৃত ওলামা-মাশায়েখ।
হরতালের অর্থ ও তার উৎপত্তির ইতিহাস
হরতাল শব্দের অর্থ- বিশৃঙ্খলা, অত্যাচার, স্বেচ্ছাচার, অবাধ্যতা, অরাজকতা, প্রতিবন্ধকতা, প্রতিরোধ ইত্যাদি।
হরতালের ব্যাখ্যায় বলা হয়, বিক্ষোভ প্রকাশের জন্য যানবাহন, হাট-বাজার, দোকানপাট, অফিস-আদালত ইত্যাদি বন্ধ করা।
হরতাল গুজরাটি শব্দ। ‘হর’ অর্থ প্রত্যেক। ‘তাল’ অর্থ তালা। অর্থাৎ প্রতি দরজায় তালা।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনকাল হতেই দাবী আদায়ের কৌশল হিসেবে নানা প্রকার পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। যেমন, আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে ১৭৮৬ সালে ছাপাখানার কর্মচারীরা, জার্মানে ১৯২০ সালে রাজনৈতিক কারণে, বৃটেনে ১৯২৬ সালে কয়লা শ্রমিকরা, এছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকার নানা স্থানে বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের দাবী আদায় করার জন্য যে কৌশল অবলম্বন করেছিল, তার নাম দেয়া হয়েছে স্ট্রাইক।
আর ভারত উপমহাদেশে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, বৃটিশদের রাউলাট আইন বাতিল করার জন্য তার প্রতিবাদে যে পদ্ধতি অবলম্বন করে, তার নাম দেয়া হয় হরতাল। এ হরতাল পালিত হওয়ার কথা ছিল ১৯১৮ সালের ৩০শে মার্চ। পরে এ তারিখ পিছিয়ে ৬ই এপ্রিল করা হয়। ফলে কোন স্থানে ৩০শে মার্চ আবার কোন স্থানে ৬ই এপ্রিল সর্ব প্রথম হরতাল পালিত হয়।
বলাবাহুল্য, হরতাল গুজরাটি শব্দ। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু, সে দাবী আদায়ের পদ্ধতির নামকরণ করে হরতাল।
মূলতঃ স্ট্রাইক শব্দের প্রবর্তক হলো, ইহুদী-নাছারা। আর হরতাল শব্দের প্রবর্তক হলো, মুশরিক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
হরতাল হারাম হওয়ার কারণসমূহ
(১) বিজাতীয়দের উদ্ভাবিত পন্থা
হরতাল হচ্ছে, ইসলামী রীতিনীতি বর্হিভূত গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি বিজাতীয় ধ্যান-ধারণা ও অপকৌশল। যাতে শান্তি তো না-ই বরং অশান্তির পথকে প্রশস্ত করে। তাই এটি কোন মুসলমানের জন্য অনুসরনীয় নয়। মুসলমানের জন্য একমাত্র অনুসরণীয় হচ্ছে, “আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে মনোনীত ও নাযিলকৃত দ্বীন ইসলাম।” যা শান্তির ধর্ম।
আল্লাহ্ পাক কুরআনুল করীমে বলেন,
ان الدين عند الله الاسلام
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” (সূরা আলে ইমরান/১৯)
আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,
ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.
অর্থ: “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন (নিয়ম-নীতি, অন্য ধর্ম) তালাশ করে, তা কখনোই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৫)
আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,
ولن ترضى عنك اليهود ولا النصرى حتى تتبع ملتهم قل ان هدى الله هو الهدى ولئن اتبعت اهواءهم بعد الذى جائك من العلم مالك من الله من ولى ولا نصير.
অর্থ: “ইহুদী ও নাছারারা কখনোই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেনা, আপনি তাদের ধর্মের (নিয়ম-নীতির) যতক্ষণ পর্যন্ত অনুসরণ না করবেন। বলে দিন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর হিদায়েতই প্রকৃত হিদায়েত। আপনার কাছে সত্য ইল্ম (অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম) আসার পরও যদি আপনি তাদের নফসের বা মনগড়া নিয়ম-নীতির অনুসরণ করেন, তবে আপনার জন্য আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে কোন অভিভাবক বা সাহায্যকারী নাই বা পাবেন না।”(সূরা বাক্বারা/১২০)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ অনুযায়ী আমাদের কোন আমল করতে হলে, বিধর্মী ও বিজাতীয় কোন পন্থা অনুসরণ করা যাবেনা বা তাদের থেকে কোন নিয়ম-নীতি গ্রহণ করা যাবেনা। শুধুমাত্র কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস অনুযায়ী আমল করতে হবে। আর এ প্রসঙ্গে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى لقد جئتكم بها بيضاء نقية، ولو كان موسى حيا ماوسعه الا اتباعى.
অর্থ: “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, (ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, ওটার কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরাও কি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছো? যে রকম ইহুদী নাছারারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিস্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মসনদে আহমদ, বায়হাক্বী, মিশকাত)
সুতরাং উক্ত হাদীস শরীফ হতে বুঝা গেল যে, কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস ছাড়া অন্য কোন বিজাতীয় পন্থার অনুসরণ করা হারাম। আল্লাহ্ পাক বলেন,
يايها الذين امنوا لاتتخذوا اليهود والنصرى اولياء بعضهم اولياء بعض ومن يتولهم منكم فانه منهم.
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করোনা। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই দলভূক্ত হবে।” (সূরা মায়িদা/ ৫১)
ইহুদী, খৃষ্টান তথা কোন বিধর্মীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করোনা। এর অর্থ হলো- তাদের রীতি-নীতির অনুসরণ না করা, তারা যেভাবে দাবি আদায় করে সেভাবে দাবি আদায় না করা, তারা হরতাল করে মানুষকে কষ্ট দেয়, জান-মালের ক্ষতি করে, তারা লংমার্চ করে, ছবি তোলে ইত্যাদি বিবিধ হারাম কাজ না করা, কারণ এগুলো আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশিত পথ নয়। এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
عن عبد الله بن عمر رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভুক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (মসনদে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ)
এই হাদীস শরীফের প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত ঘটনা উল্লেখ করা যায়- হিন্দুস্থানে আল্লাহ্ পাক-এর একজন জবরদস্ত ওলী ছিলেন। তাঁর ইন্তিকালের পর অন্য একজন বুযুর্গ ব্যক্তি তাকে স্বপে¦ দেখে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহ্ পাক-এর ওলী! আপনি কেমন আছেন?” তখন সেই আল্লাহ্ পাক-এর ওলী জবাবে বললেন, “আপাততঃ আমি ভালই আছি; কিন্তু আমার উপর দিয়ে এক কঠিন সময় অতিবাহিত হয়েছে, যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমার ইন্তিকালের পর আমাকে ফেরেশ্তারা সরাসরি আল্লাহ্ পাক-এর সম্মুখে পেশ করলেন। আল্লাহ্ পাক ফেরেশ্তাদেরকে বললেন, “হে ফেরেশ্তারা! তোমরা তাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছ?” ফেরেশ্তাগণ বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমরা তাকে খাছ বান্দা হিসেবে আপনার সাথে সাক্ষাত করার জন্য নিয়ে এসেছি। এ কথা শুনে আল্লাহ্ পাক বললেন, “তাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, তার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে, কেননা “সে পূঁজা করেছে।” এ কথা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন আমি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট আরজু পেশ করলাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে কেন? আমি তো সব সময় আপনার এবং আপনার হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফরমাবরদার ছিলাম। কখনো ইচ্ছাকৃত নাফরমানি করিনি এবং পূঁজা করা তো দূরের কথা, মন্দিরের নিকটবর্তীও কখনো হইনি।” আল্লাহ্ পাক বললেন, “তুমি সেদিনের কথা স্মরণ কর, যেদিন হিন্দুস্থানে হোলি পূঁজা হচ্ছিল। তোমার সামনে-পিছনে, ডানে-বামে, উপরে-নীচে সমস্ত গাছ-পালা, তরু-লতা, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ সবকিছুকে রঙ দেয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় তোমার সামনে দিয়ে একটি গর্দভ যাচ্ছিল যাকে রঙ দেয়া হয়নি। তখন তুমি পান চিবাচ্ছিলে, তুমি সেই গর্দভের গায়ে এক চিপটি পানের রঙীন রস নিক্ষেপ করে বলেছিলে, “হে গর্দভ! তোমাকে তো কেউ রঙ দেয়নি, এই হোলি পূঁজার দিনে আমি তোমাকে রঙ দিয়ে দিলাম।” এটা কি তোমার পূঁজা করা হয়নি?” তুমি কি জান না, من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থ: “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।” সুতরাং তোমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে।
যখন আল্লাহ্ পাক এই কথা বললেন, তখন আমি লা জওয়াব হয়ে গেলাম এবং ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে বললাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমি এটা বুঝতে পারিনি, আমাকে কেউ বুঝিয়েও দেয়নি এবং আমার অন্তরও সাড়া দেয়নি।” কিছুক্ষণ পর আল্লাহ্ পাক বললেন, “হ্যাঁ তোমাকে অন্যান্য আমলের কারণে ক্ষমা করা হলো।”
উপরোক্ত আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ এবং তার ব্যাখ্যার দ্বারা এটাই ছাবেত হলো যে, বিজাতীয় বিধর্মীদের কোন নিয়ম-নীতি, আমল-আখলাক ও সীরত-ছূরত কোনটাই অনুসরণ-অনুকরণ করা যাবেনা। যদি কেউ করে তবে তার থেকে সেটা আল্লাহ্ পাক গ্রহণ করবেন না বা কোন ছওয়াবও দেবেন না এবং আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে কোন মদদ পাবেনা। যার ফলে সে ইহ্কালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং পরকালেও তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে, যাদেরকে সে অনুসরণ করবে। কাজেই হরতাল কোন মতেই জায়েয নেই।
(২) জনজীবনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে
হরতাল হারাম হওয়ার আর একটি কারণ হলো, এটা মানুষের স্বাভাবিক কাজ-কর্মকে ব্যহত করে, জনজীবনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে।
আল্লাহ্ পাক বলেন, لا تفسدوا فى الارض.
অর্থ: “তোমরা যমীনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করোনা।” (সূরা বাক্বারা/১১) আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, والفتنة اشد من القتل.
অর্থ: “ফিৎনা-ফাসাদ ক্বতলের চেয়েও ভয়াভহ।”(সূরা বাক্বারা/১৯১)
হরতালের ফলে যারা দিন-মজুর, রোজ কামাই করে রোজ খায়, তাদের কষ্ট হয়। মু’মিন মুসলমান না নিরাপদ থাকে, না শান্তিতে থাকে। বরং কষ্টে দিনাতিপাত করে, রোগীদের জন্য কষ্টদায়ক হয়ে যায়।
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ايذاء المسلم كفر.
অর্থ: “কোন মুসলমানকে কষ্ট দেয়া কুফরী।”
হরতাল এক ধরণের জুলুম, যা শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয় বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও হয়।
আল্লাহ্ পাক বলেন, والله لا يحب الظلمين.
অর্থ: “আল্লাহ্ পাক জালিমদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আলে ইমরান/১৪০)
আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, لا تظلمون ولا تظلمون.
অর্থ: “তোমরা অত্যাচার করোনা এবং অত্যাচারিত হয়োনা।” (সূরা আলে ইমরান/২৭৯)
যে সমস্ত জালিমরা গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ়, তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
والله لا يهدى القوم الظلمين.
অর্থ: “আর আল্লাহ্ পাক জালিমদেরকে হিদয়েত দেন না।” (সূরা আলে ইমরান/৮৬)
অর্থাৎ যে সমস্ত জালিম সম্প্রদায় তাদের জুলুমের মধ্যে দৃঢ় থাকে, তারা কখনো আল্লাহ্ পাক-এর হিদায়েত লাভ করতে পারবে না।
মূলতঃ হরতাল আর জুলুম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই যেখানে হরতাল হবে, সেখানেই জুলুম হবে। জুলুম ব্যতীত কোন হরতাল সংঘটিত হতে পারেনা।
কাজেই হরতাল করা জায়েয নেই, তা সম্পূর্ণরূপে হারাম।
(৩) জান-মালের ক্ষতি
হরতালের ফলে জান-মালের ক্ষতি হয়। মানুষের সম্পদের ক্ষতি হয়, গাড়ী ভাংচুর করা হয়, গরীব সাধারণের আয়ের সম্বল রিক্সা ভেঙ্গে দিয়ে আয়ের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। হরতালের ফলে হতাহতও সংঘটিত হয়ে থাকে। যাদের হরতাল ডাকার কারণে এ সমস্ত নিহত-আহত হবে, তারাই হত্যাকারী হিসেবে সাব্যস্ত ও দায়ী হবে।
কুরআনুল করীমে ইরশাদ হয়েছে,
ومن يقتل مؤمنا متعمدا فجزاؤه جهنم خالدا فيها.
অর্থ: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে।” (সুরা নিসা/৯৩)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده.
অর্থ: “মুসলমান ঐ ব্যক্তি, যার যবান এবং হাত থেকে মুসলমান নিরাপদ থাকে।” (বুখারী শরীফ)
হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,
سباب المسلم فسق وقتاله كفر.
অর্থ: “কোন মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী, আর ক্বতল করা কুফরী।” (মসনদে আহমদ)
বিদায় হজ্বের খুৎবায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فان دمائكم واموالكم واعضاء منكم بينكم حرام.
অর্থ: “একজনের জান-মাল, সম্পদ, রক্ত অন্যজনের জন্য হারাম।” (বুখারী শরীফ)
হরতালকারীরা স্বাভাবিক কাজ-কর্মে বাঁধা দেয়ার জন্য স্থানে স্থানে একত্র হয়ে যে পদক্ষেপ নেয়, (যেমন ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, চড়াও ইত্যাদি) তাকে পিকেটিং বলা হয়ে থাকে।
১৮৫৯ সালে গ্রেট বৃটেনে পিকেটিং প্রথার প্রবর্তন হয়। যদিও তখনকার পিকেটিংকে শান্তিপূর্ণ পিকেটিং বলে অভিহিত করা হয়। মূলতঃ এটা খৃষ্টানদের প্রথা, তাই পিকেটিং করাও জুলুম করার শামিল, যা সম্পূর্ণ হারাম এবং বিজাতীয় পদ্ধতি বা প্রথা।
সুতরাং হরতালের মাধ্যমে জান ও মালের ক্ষতি করা সম্পূর্ণ হারাম। হরতালের দ্বারা ব্যক্তিগত জান-মালের ক্ষতি তো হয়ই এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ঘটে। কাজেই হরতাল করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও হারাম।
(৪)একজনের অন্যায়ের শাস্তি অন্যকে দেয়া
হরতাল যে কারণে করা হয়, অর্থাৎ অপরাধীকে শাস্তি দেয়া; তা মোটেই হয়না। বরং অপরাধী অর্থনৈতিক ও মানবিক সব দিক থেকেই বহাল তবিয়তে অবস্থান করে থাকে। কিন্তু শাস্তি ভোগ করে জনসাধারণ, যারা অপরাধী নয়। অথচ হরতালের ফলে একজনের অপরাধের শাস্তি অন্যজনকে চাপিয়ে দেয়া হয়, এটা ইসলামের বিধান নয়। বরং আল্লাহ্ পাক-এর হুকুম হলো,
ولا تزر وازرة وزر اخرى.
অর্থ: “একজনের গুণাহ্র বোঝা অন্যজন বহন করবে না।” (সূরা আনয়াম/১৬৪)
অর্থাৎ একজনের অপরাধের শাস্তি আরেকজনকে দেয়া যাবেনা, যা মূলতঃ নিষেধ। কাজেই শরীয়তের দৃষ্টিতে হরতাল সম্পূর্ণ হারাম।
(৫) হারাম পন্থায় ইসলাম কায়েমের চেষ্টা
হারাম উপায়ে ইসলাম প্রচারের কথা কুরআন-সুন্নাহ্র কোথাও নেই। ইসলাম প্রচার করতে হলে আল্লাহ্ পাক-এর বিধান অনুযায়ী করতে হবে। যেমন আল্লাহ্ পাক কুরআনুল করীমে ইরশাদ করেন,
وان احكم بينهم بما انزل الله ولا تتبع اهواءهم.
অর্থ: “তারা আপনার নিকট কোন মোকদ্দমা নিয়ে আসলে, তার ফায়সালা শরীয়ত অনুযায়ী করুন। আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।” (সূরা মায়িদা/৪৯)
এ আয়াত শরীফ হতে বুঝা যায় যে, সর্ববিধ ক্ষেত্রেই আল্লাহ্ পাক-এর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করতে হবে। আর যারা আল্লাহ্ পাক-এর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করবেনা, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ومن لم يحكم بما انزل الله فاولئك هم الكفرون.
অর্থ: “আল্লাহ্ পাক যা নাযিল করেছেন, তদানুযায়ী যারা ফায়সালা করেনা, তারাই কাফির।” (সূরা মায়িদা/৪৪)
কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
وقد فصل لكم ما حرم عليكم.
অর্থ: “তোমাদের প্রতি যা হারাম করা হয়েছে, আল্লাহ্ পাক তা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন।” (সূরা আনয়াম/১১৯)
আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াত শরীফের তাফসীরে বলেন,
الحلال بين والحرام بين وبينهما مشتبهات.
অর্থ: “হালাল সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট। এর মাঝে কিছু জিনিস আছে, যা সন্দেহজনক।” (বুখারী শরীফ)
অনুরূপভাবে অন্য রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে,
الحلال بين والحرام بين دع ما يريبك الى ما لايربيك.
অর্থ: “হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট। যা সন্দেহজনক তা ছেড়ে দাও। যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই, সেদিকে ধাবিত হও।” (বুখারী শরীফ)
এ হাদীস শরীফের দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যা হারাম তাতো অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে। আর যা সন্দেহজনক, তা থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শরীয়তের উছূল হলো,
ما ادى الى الحرام فهو حرام.
অর্থ: “যা হারামের দিকে নিয়ে যায়, তাও হারাম।”
কাজেই যে সমস্ত কাজ মানুষকে হারামের দিকে নিয়ে যায়, তা পরিহার করা অবশ্য কর্তব্য। আর ছবি তোলা, গণতন্ত্র, লংমার্চ, কুশপুত্তলিকা দাহ, হরতাল ইত্যাদি সবই বিধর্মীদের রীতি-নীতি এবং স্পষ্ট হারাম। তা অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে। আর যারা হারাম বা শরীয়তের খেলাফ কাজ করে, তাদেরকে অনুসরণ করতে আল্লাহ্ পাক নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
ولا تطع من اغفلنا قلبه عن ذكرنا واتبع هوه وكان امره فرطا.
অর্থ: “ঐ ব্যক্তিকে অনুসরণ করোনা, যার অন্তর আমার যিকির থেকে গাফিল ও যে প্রবৃত্তির (নফ্সের) অনুসরণ করে এবং যার কাজসমূহ শরীয়তের খেলাফ।” (সূরা কাহ্ফ/২৮)
একমাত্র অনুসরণ করতে হবে আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.
অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য (প্রতি ক্ষেত্রে) রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহ্যাব/২১)
সেই আদর্শ বাস্তবায়নের তরীক্বা কি? আল্লাহ্ পাক “সূরা ফাতিহা”তেই তা জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা নামাযের প্রতি রাকায়াতে এবং নামাযের বাইরে তিলাওয়াতের সময় দোয়া করি,
اهدنا الصراط المستقيم صراط الذين انعمت عليهم.
অর্থ: “আয় আল্লাহ্ পাক! আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন। ঐ সকল লোকদের পথ, যাদেরকে আপনি নিয়ামত দান করেছেন।” (সূরা ফাতিহা/৫, ৬)
এখন কাদেরকে নিয়ামত দেয়া হয়েছে? সে প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে,
انعم الله عليهم من النبين والصدقين والشهداء والصلحين وحسن اولئك رفيقا.
অর্থ: “আল্লাহ্ পাক তাঁদেরকে নিয়ামত দিয়েছেন যারা নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহ্ এবং তাঁরাই উত্তম বন্ধু। (সূরা নিসা/৬৯)
উল্লেখ্য, নবী হচ্ছেন এক স্তর। আর ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহ্ হচ্ছেন এক স্তর। তথা উম্মতের স্তর। যাঁরা উলিল আমর বা হক্কানী ওলামা-মাশায়েখ।
আল্লাহ্ পাক অন্য আয়াত শরীফে বলেন,
اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم.
অর্থ: “তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর ইতায়াত (অনুসরণ) কর, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত কর এবং ইতায়াত কর যিনি উলীল আমর। (যিনি আল্লাহ্ পাক-এর মতে মত এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথে পথ অর্থাৎ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস অনুযায়ী চলেন, তিনিই উলীল আমরের অন্তর্ভূক্ত।)” (সূরা নিসা/৫৯)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
الشيخ لقومه كالنبى فى امته.
অর্থ: “নবী-রসূল যেরূপ অনুসরনীয় উম্মতের জন্য, তদ্রুপ শায়খ তাঁর ক্বওমের জন্য অনুসরণীয়।” (দায়লামী শরীফ, মাকতুবাত শরীফ)
এ মত ও পথের যারা বিপরীত তাদের অনুসরণ করা হারাম। তাদের মত ও পথ থেকে আল্লাহ্ পাক পানাহ্ তলব করতে বলেছেন। যেমন, আমরা সূরা ফাতিহা পাঠ কালে দোয়া করি,
غير المغضوب عليهم ولاالضالين.
অর্থ: “আল্লাহ্ পাক! আমাদেরকে তাদের পথ দিবেন না, যারা গযবপ্রাপ্ত ও বিভ্রান্ত।” (সূরা ফাতিহা/৭)
অর্থাৎ যারা নবী এবং হক্কানী ওলামা-মাশায়েখের মুখালিফ বা বিরোধী। যেমন, ইহুদী, নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী, মুশরিক ইত্যাদি।
অতএব, হরতাল করলে বিজাতীয়দের অনুসরণ করা হয়, জনজীবনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, জান-মালের ক্ষতি হয়, একজনের শাস্তি অন্যজনের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় এবং হারাম উপায়ে ইসলাম কায়েমের কোশেশ করা হয়, তাই ইত্যাদি কারণে হরতাল করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।
কাজেই ইসলামের নামে গণতন্ত্র করা, ছবি তোলা, কুশপুত্তলিকা দাহ্ করা, লংমার্চ করা, ব্লাসফেমী আইন চাওয়া, হরতাল করা ইত্যাদি বিজাতীয়, বিধর্মীদের কর্মপদ্ধতি ইসলামের নামে করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
অতএব, এ সমস্ত হারামসমূহকে যারা শরীয়তসম্মত মনে করে, তারা ওলামা-মাশায়েখ হওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ মুসলমান হিসেবেও বিবেচিত নয়। বরং তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে মুরতাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে। কারণ ইসলামী আক্বাইদ ইচ্ছে, কোন হারাম বিষয়কে হালাল বলা সম্পূর্ণ কুফরী এবং কোন অনৈসলামিক কার্যকলাপকে ইসলামিক কার্যকলাপ হিসেবে শামীল করা সেটাও কাট্টা কুফরী।
শরীয়তের মাসয়ালা হচ্ছে- “যে কুফরী করে, সে মুরতাদ হয়ে যায়। আর মুরতাদের ফায়সালা হচ্ছে- তার স্ত্রী তালাক হবে (যদি বিয়ে করে থাকে) এবং এক্ষেত্রে পূনরায় তওবা না করে, বিয়ে না দোহরানো ব্যতীত তার স্ত্রীর সাথে বসবাস করা বৈধ হবেনা। আর এ অবৈধ অবস্থায় সন্তান হলে সে সন্তানও অবৈধ হবে। হজ্ব বাতিল হয়ে যাবে (যদি হজ্ব করে থাকে), সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার ওয়ারিশসত্ব বাতিল হবে। তাকে তিন দিন সময় দেয়া হবে তওবা করার জন্য এবং যদি তওবা করে, তবে ক্ষমা করা হবে। অন্যথায় একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কেননা হাদীস শরীফে রয়েছে, তিন কারণে মৃত্যুদন্ড দেয়া জায়েয। যথা- (ক) ঈমান আনার পর কুফরী করলে অর্থাৎ মুরতাদ হলে। (খ) ঐ জিনাকার বা জিনাকারিনী, যারা বিবাহিত বা বিবাহিতা। (গ) যে অন্যায়ভাবে কাউকে ক্বতল করে, তাকে। (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ্, মসনদে শাফেয়ী, মসনদে বাজ্জার, মুস্তাদরেকে হাকেম)
আর মুরতাদ মারা যাবার পর যারা জানাযার নামায পড়ে বা পড়ায় বা জানাযার নামাযে সাহায্য-সহযোগীতা করে, তাদের সকলের উপরই মুরতাদের হুকুম বর্তাবে এবং এ সকল মুরতাদ মরলে বা নিহত হলে তাকে মুসলমানগণের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না। এমনকি মুসলমানের ন্যায়ও দাফন করা যাবেনা। বরং তাকে কুকুরের ন্যায় একটি গর্তের মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে।
কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই যারা কাফির এবং কুফরী অবস্থায় মারা গিয়েছে, তারা যদি পরিপূর্ণ স্বর্ণ তার ফিদিয়া বা যমীন (কুফরীর পরিবর্তে) কাফ্ফারা বাবদ দেয় (আমার থেকে বাঁচার জন্য), তা কখনো গ্রহণ করা হবেনা। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি বা আযাব এবং তাদের জন্য কস্মিনকালেও সাহায্যকারী নেই। (সূরা আলে ইমরান/৯১)
এ সকল ওলামা-মাশায়েখ নামধারী মূলতঃ আবুল ফজল ফৈজী ও মোল্লা মোবারক নাগরীর যোগ্য উত্তরসূরী। যারা দ্বীন ইসলামের পরিবর্তে এক নতুন দ্বীন “দ্বীনে ইলাহী”-এর প্রবর্তনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। যারা দুনিয়ার বিনিময়ে ঈমানকে বিক্রি করে জাহান্নামের পথকে সুগম করেছিল। ঠিক বর্তমানে একই কায়দায় হারাম-হালাল মিশ্রিত করে ঈমান-আক্বীদা বিনষ্ট করার পায়তারা করছে তথাকথিত নামধারী ওলামা-মাশায়েখ।
এদের সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن ابى هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يكون فى اخر الزمان دخالون كذابون ياتونكم من الاحاديث بما لم تسمعوا انتم ولا ابائكم فاياكم واياهم لايضلونكم ولايفتنونكم.
অর্থ: “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আখেরী যামানায় কিছু সংখ্যক মিথ্যাবাদী দাজ্জাল বের হবে, তারা তোমাদের নিকট এমন সব (মিথ্যা-মনগড়া) কথা উপস্থাপন করবে, যা তোমরা কখনো শুননি এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও শুনেনি, সাবধান! তোমরা তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে, তবে তারা তোমাদেরকে গোমরাহ্ করতে পারবে না এবং ফিৎনায় ফেলতে পারবেনা।” (মুসলিম শরীফ)
সূতরাং আওয়ামুন্ নাছ বা সাধারণ মুসলমানগণ তাদেরকে চিহ্নিত করে প্রতিহত করতে হবে এবং তাদের থেকে সাবধান ও সতর্ক থেকে ঈমান হিফাযত করতে হবে।
{বিঃ দ্রঃ হরতাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত, ১৬তম সংখ্যা (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর/১৯৯৪ঈঃ সংখ্যায় প্রকাশিত) ভালভাবে পাঠ করুন।}
{দলীলসমূহঃ (১) আল্ ফিকহুল আক্বার, (২) শরহে আক্বাঈদে নছফি, (৩) আক্বাঈদে হাক্কা, (৪) তাক্মিলুল ঈমান, (৫) তাফসীরে মাযহারী, (৬) রুহুল বয়ান, (৭) রুহুল মায়ানী, (৮) খাযেন, (৯) বাগবী, (১০) ইবনে কাছীর, (১১) তাবারী, (১২) বুখারী, (১৩) আবূ দাউদ, মিশকাত, (১৪) মিরকাত, (১৫) আশয়াতুল লুমুয়াত, (১৬) লুমুয়াত, (১৭) ত্বীবী, (২৩) তালীক্ব, (১৮) মোযাহেরে হক্ব, (১৯) ফতহুল বারী, (২০) উমদাতুল কারী, (২১) বযলুল মাযহুদ (২২) ইরশাদুস্ সারি, (২৩) মসনদেআহমদ, (২৪) বায়হাক্বী, (২৫) আউনুল মা’বুদ (২৬) যথাশব্দ- হাবীবুর রহমান, (২৭) বাংলা অভিধান, (২৮) Encyclopeadia Britanica, (২৯) Encyclopeadia Americana. (৩০) world book, (৩১) Lexicon Encyclopedia, (৩২) Macmillan Encyclopedia, (৩৩) New book of knowledge, (৩৪) Grollir Encyclopedia, (৩৫) Funk and Wagnalls Encyclopedia, (৩৬) Wordsworth Encyclopedia, ইত্যাদি।)
মুহম্মদ মশীউয্ যামান
পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম
সুওয়ালঃ “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” ৮৫তম সংখ্যায় “সুওয়াল-জাওয়াব” বিভাগে এক জাওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নামাজে দু’সিজদার মধ্যে দোয়া পাঠ করা সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে, তা কতটুকু সত্য? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রের উক্ত উত্তরটি সম্পূর্ণ অশুদ্ধ, মিথ্যা, প্রতারণামূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, ইবারত চুরি, অনুবাদে ভুল এবং এ ধরণের “প্রায় ৩৫টি ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
উক্ত বিবিধ ত্রুটিপূর্ণ উত্তরটি নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে খন্ডন করে তার সহীহ জাওয়াব ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হচ্ছে।
(ধারাবাহিক)
৩৪. তারা বলেছে- বৈধ ও উত্তম বস্তুকে অবৈধ বলে চাপিয়ে দেয়ার নামান্তর। যা জুলুম, সীমালংঘন, মিথ্যা ফতওয়াবাজী, মুর্খতা, পাগলামী ….।
অথচ রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্রদের এ বক্তব্যও ডাহা মিথ্যা, কারণ ফরয নামাযে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى এই বাক্যটি পড়া বৈধ। আর এই বৈধকে আমরা অবৈধ বলিনি।
আমরা বলেছি যে, “রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রে উল্লিখিত “আল্লাহুম্মারযুকনী ওয়ারহামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহ্দিনী” এই দোয়াটি এবং হাদীস শরীফে বর্ণিত
اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى واررقنى.
এ সম্পূর্ণ দোয়াটি আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবেক ফরয নামাযের দু’সিজদার মাঝে পড়া যাবেনা বা অবৈধ।
আর এই অবৈধতাকে কূট কৌশলে ফরয নামাযের দু’সিজদার মাঝে পড়া বৈধ ও উত্তম বলে প্রমাণ করার জন্য মাগফিরাতের দোয়ার দোহাই দিয়ে যে অপপ্রয়াস চালিয়েছে, তা রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্রদেরই জুলুম, সীমালঙ্গন, মিথ্যা ফতওয়াবাজী, মুর্খতা ও পাগলামী। এটা তাদের ৩৪তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।
৩৫. তারা বলেছে, “কিতাবের মনগড়া দোহাই দিয়ে নিজকে জাহির করার এক বানোয়াট কৌশল।”
অথচ উপরোক্ত দলীল-প্রমাণসহ বিস্তারিত আলোচনায় সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হলো যে, কিতাবের মনগড়া দোহাই দ্বারা নিজেদের জাহির করা রেযাখানী মাযহাবী মুখপাত্রদেরই অবলম্বনকৃত বানোয়াটি কৌশল। কারণ রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররাই কিতাবের ইবারত বিকৃত করে, নিজ হাতে ইবারত লিখে কিতাবের মনগড়া দোহাই দিয়েছে। যার জাজ্বল্য প্রমাণ হলো, রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র নভেম্বর/২০০০ঈং সংখ্যার ৪৭ পৃষ্ঠায় “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের ১ম খন্ড ৫০৫ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে يقول الرجل .. اللهم اغفرلى الخ. এই ইবারতটি।
অথচ মূল কিতাবে اللهم اغفرلى এর পরে الخ শব্দটি নেই। বরং রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররাই اللهم اغفرلى এর পরে নিজ হাতে الخ শব্দটি লিখে কিতাবের মনগড়া দোহাই দিয়েছে। অনুরূপ মূল কিতাবের ইবারত হলো,
أيقول الرجل ………… اللهم اغفرلى؟
অথচ রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্র কিতাবের মনগড়া দোহাই দিয়ে নিজ হাতে কিতাবের ইবারত
يقول الرجل ………. اللهم اغفرلى الخ.
লিখে নিজকে তথা রেযাখানী মাযহাবকে জাহির করা রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্রদেরই এক বানোয়াট কৌশল। রেযাখানী মাযহাবের গংরা কিতাবের মনগড়া দোহাই দিয়ে নিজ হাতে কিতাবের ইবারত লিখে যে প্রতারণা করেছে এটা তাদের ৩৫তম জালিয়াতী ও প্রতারণা। পরম করুনাময় আল্লাহ্ পাক রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্রদের হিদায়েত নছীব করুন। (চলবে)
সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)
সুবহানী ঘাট, সিলেট।
সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেজভীয়া কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফসহ অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ…………..।”
জাওয়াব : রেযাখানী মুখপত্রের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল ও জিহালতপূর্ণ এবং প্রতারণামূলক যা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুণিয়াতুত্ তালেবীন ইত্যাদি কিতাবের কথা বলে যা বলতে চেয়েছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সেরকম নয়। আমরা পর্যায়ক্রমে উক্ত কিতাবসমূহের নাম ব্যবহার করে তারা যে প্রতারণা করেছে সেটা তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ্।
তারা তাফসীরে রুহুল বয়ানের ইবারতে প্রথম দলীল হিসেবে শরহুন নিক্বায়া কিতাবের বরাত দিয়েছে। অথচ শরহে নিক্বায়ার বক্তব্য যে তাদের মতকে সমর্থন করেনা তা আমরা গত সংখ্যায় উক্ত শরহুন নিক্বায়ার বক্তব্যকে বিশ্লেষন করে প্রমাণ করেছি যে, তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল ও জিহালতপূর্ণ।
(ধারাবাহিক)
বর্তমান সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ানের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হলো-
উল্লেখ্য, রেযাখানীরা আযান ইক্বামত ছাড়া শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা জায়েয বলে ‘তাফসীরে রুহুল’ বয়ানের যে ইবারত উল্লেখ করেছে, তাতেও তারা প্রতারণা করেছে।
দ্বিতীয়তঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা “তাফসীর রুহুল বয়ান-এর উক্ত ইবারতের যে অর্থ করেছে, তাতেও জালিয়াতি করেছে।
নিম্নে তা উল্লেখ করার পর “তাফসীরে রুহুল বয়ান”-এর সঠিক অর্থ তুলে ধরা হলো- যেমন,
صلوة التطوع بالجماعة جائزة من غيركراهية لو صلوا بغير تداع وهو الاذان والاقامة كما فى الفر ائض صرح بذالك كثير من العلماء قال فى شرح النقاية وغيره وفى المحيط لايكره الاقتداء بالامام فى النوافل مطلقا نحو القدر والرغائب وليلة النصف من شعبان ونحو ذلك لان ماراه المؤمنون حسنا فهو عند الله حسن فلا تلتفت الى قول من لامذاق لهم من الطاعنين الخ- روح البيان ص৪৮৩ سورة القدر.
অর্থ: “নফল নামায জামাতের সাথে পড়া জায়েয। মাকরূহ নয়। যদি আযান ও ইক্বামত ছারা পড়া হয়। যেভাবে ফরজ নামাযে আযান ও ইক্বামত দেয়া হয়। অনেক সম্মানিত উলামায়ে কিরামও এ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। শরহে নেকায়া ও মুহিত ইত্যাদি গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, সাধারণতঃ নফল নামাযে ইমামের পিছনে ইক্বতিদা করা মাকরূহ নয়। যেমন- শব-এ-ক্বদর, রাগায়েব (রজবের প্রথম জুমার রাত) ও শাবানের পনের তারিখ শব-এ বরাত ইত্যাদি নফল নামাযসমূহ। কেননা মুসলমানগণ যা উত্তম মনে করেন তা আল্লাহ্ তায়ালার কাছেও উত্তম বলে বিবেচিত। অতএব, (এসব পবিত্র রাতে নফল নামায জামাতে পড়াকে অবৈধ বলে) সমালোচনাকারীদের উক্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করবেনা, কারণ তাদের কোন আনন্দ উৎফুল্লতা বলতে নেই, তারা ইন্নিন (নপুংসক) এর পর্যায়ের লোক। তারা মুনাজাতের সওক, ইবাদত বন্দেগীর স্বাদ ও সময়ের গুরুত্ব বুঝে না। (তাফসীরে রুহুল বয়ান, কৃতঃ আল্লামা ইসমাঈল হক্কী (রহঃ), ১০ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৪৮৩, সূরা ক্বদর-বৈরুত, লেবানন)
এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা তাফসীরে রুহুল বয়ানের ইবারত বুঝতে ব্যর্থ হয়েই নিজ হাতে ইবারত লিখে কিতাবের নামে তথা “তাফসীরে রুহুল বয়ান”-এর নামে চালিয়ে দিয়ে যে প্রতারণা করেছে, তাদের সেই প্রতারণামূলক ইবারতটি হলো
– قال فى شرح النقاية وغيره.
উল্লিখিত ইবারতে রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা فى (ফী) অক্ষরটি নিজ হাতে লিখে দিয়ে “তাফসীরে রুহুল বয়ান”-এর ইবারতে প্রতারণা করেছে।
অথচ “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” فى (ফী) অক্ষরটি নেই। ররং “তাফসীরে রুহুল বয়ানের” প্রকৃত ও মূল ইবারত হলো- قال شرح النقاية وغيره.
দ্বিতীয়তঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা তাফসীরে রুহুল বয়ানের ইবারত বুঝতে ব্যর্থ হয়েই ইবারতে যেহেতু প্রতারণা করেছে, সেহেতু একইভাবে ইবারতের অর্থ করতে ও তারা জালিয়াতি করেছে। যেমন, তাদের জালিয়াতিমূলক অর্থ হলো……, “শরহে নিকায়া ও মুহিত ইত্যাদি গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, সাধারনত নফল নামাযে ইমামের পিছনে ইক্বতিদা করা মাকরূহ নয়। …
উল্লিখিত অর্থে রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা “তাফসীরে রুহুল বয়ানের ইবারত বুঝতে ব্যর্থ হয়েই পৃথক দুটি ইবারতকে একত্রিত করে অর্থ করেছে। অর্থাৎ পূর্বের ইবারতকে পরবর্তী ইবারতের সঙ্গে একত্রিত করে অর্থ করেছে।
অথচ “শরহুন নিক্বায়া” এবং “মুহীত” হলো পৃথক দুটি ইবারত ও অর্থ। অতএব, قال شرح النقاية وغيره. এটা হলো, পূর্বের ইবারতের শেষাংশ। আর وفى المحيط এটা হলো পরবর্তী ইবারতের শুরু। সুতরাং রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা পূর্বের শেষাংশ – قال شرح النقاية وغيره.
ইবারতটিকে পরবর্তী- وفى المحيط ইবারতের সঙ্গে একত্রিত করে অর্থ করার জন্য, ইবারত অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েই شرح النقاية এর পূর্বে فى (ফী) অক্ষরটি নিজ হাতে লিখে দিয়েছে।
অতএব, রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রদের “শরহে নিকায়া ও মুহিত ইত্যাদি গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, সাধারনত নফল নামাযে ইমামের পিছনে ইক্বতিদা করা মাকরূহ নয়। … এই অর্থের পরিবর্তে সঠিক অর্থ হবে, “শরহুন নিকায়া”-এর মুছান্নিফ বা লেখক এবং অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন।
আর “মুহীত” কিতাবে উল্লেখ আছে, সাধারনভাবে নফল নামাযসমূহে ইমামের সহিত ইক্তেদা করা মাকরূহ হবেনা।
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, শরহুন নিকায়া এবং মুহীত হলো পৃথক দু’টি ইবারত ও অর্থ। আর সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, “শরহুন নিক্বায়া” বলতে কিতাবকে বুঝানো হয়নি বরং “শরহুন নিক্বায়া”-এর মুছান্নিফ বা লেখককে বুঝানো হয়েছে।
অথচ রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা শরহুন নিক্বায়াকে কিতাব মনে করেই মুহীত কিতাবের সঙ্গে একত্রিত করেই অর্থ করেছে যে, “শরহে নেকায়া ও মুহিত ইত্যাদি গ্রন্থে বলা হয়েছে। … আর সেজন্য তারা شرح النقاية এর পূর্বে فى (ফী) অক্ষরটি নিজ হাতে লিখে দিয়ে তাফসীরে রুহুল বয়ানের ইবারতে এবং অর্থে জালিয়াতি ও প্রতারণা করেছে। (চলবে)
মুছাম্মত বিজলী খাতুন উম্মু আহমদ
কদমতলা, কুড়িগ্রাম।
সুওয়াল : রোযা অবস্থায় ইন্জেকশন এবং স্যালাইন নেয়া প্রসঙ্গে কয়েকবারই মাসিক মদীনার ভুল উত্তরের প্রেক্ষিতে আপনাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাতের” সহীহ্ জাওয়াব আমি পড়েছি। কিন্তু তারপরেও সম্প্রতি ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় মাসিক মদীনায় নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর দেখতে পেলাম।
প্রশ্নঃ- রোযা অবস্থায় ইঞ্জেকশান এবং সেলাইন নিলে রোযা ভঙ্গ হবে কিনা?
উত্তর- রোযা ভঙ্গ হবে না।
এখন আমার সুওয়াল হলো- রোযা অবস্থায় ইন্জেকশন এবং স্যালাইন নেয়া সম্পর্কিত মাসিক মদীনার একই ভুল উত্তরের বার বার পুনরাবৃত্তির কারণ কি? এবং তার পরিণতিই বা কি?
জাওয়াবঃ কিতাবে বর্ণিত আছে যে لكل فن رجال অর্থাৎ প্রত্যেক বিষয়ে অভিজ্ঞ লোক রয়েছে।
উল্লেখ্য, ইনজেকশন যেহেতু চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্তর্ভূক্ত, সেহেতু এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত বিবেচনার দাবী রাখে।
মূলতঃ চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামেরই অবদান। পবিত্র কুরআন শরীফের প্রায় ১১% আয়াত শরীফ সরাসরি বিজ্ঞানমূলক। তবে উল্লেখ্য যে, প্রচলিত বিজ্ঞানের সাথে যদি ইসলামের কোন বিষয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে ইসলামের মতকেই প্রাধান্য দিতে হবে ও গ্রহণ করতে হবে। আর যেক্ষেত্রে শরীয়ত অনুযায়ী বিজ্ঞানের বক্তব্য হয়, সেক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা যাবে।
অর্থাৎ বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে কথা ইসলাম বিরোধী নয় বা শরীয়ত সম্মত তা গ্রহণ করা ইসলাম সম্মত। কিতাবে উল্লেখ আছে,
كلمة حكمة من سفيه فاقبلها كلمة سفيهة من حكيم فاتركها.
“কোন মূর্খ লোকও যদি জ্ঞানমূলক কথা বলে, তবে তা গ্রহণ কর। আর কোন তথাকথিত জ্ঞানী লোকের দ্বারাও যদি মূর্খতাসূচক কথা বের হয়, তবে তা পরিত্যাজ্য।”
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
من حديث عائشة رضى الله تعالى عنها مرفوعا انما الافطار مما دخل وليس مما خرج واخرجه الطبرانى ولابن ابى شيبة عن ابن عباس رضى الله تعالى عنه الفطر مما دخل وليس مما خرج.
অর্থ: “হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে মারফু হিসাবে বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই রোযা ভঙ্গ হবে শরীরের ভিতর কিছু প্রবেশ করলে, বের হলে নয়। আর তাবরানী ও ইব্নে আবি শায়বা হযরত ইব্নে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেন, “কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে, বের হলে রোযা ভঙ্গ হবেনা।”
এ প্রসঙ্গে ফিক্বাহের বিখ্যাত কিতাব “মাবছূত” কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে,
وابوحنيفة رحمه الله تعالى يقول المفسد للصوم وصل المفطر الى باطنه فالعبرة للواصل لاللمسلك.
অর্থ: “ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রোযা ভঙ্গের কারণ হলো- রোযা ভঙ্গকারী কোন কিছু ভিতরে প্রবেশ করা, সুতরাং পৌঁছাটাই গ্রহণযোগ্য, মূল রাস্তা নয়।”
এ ব্যাপারে ফিক্বাহের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,
بان داواى جائفه والامة فان داواها يدواء يابس لايفسد لانه لم يصل الى الجوف ولا الى الدماغ ولو علم انه وصل يفسد فى قول ابى حنيفة وان داواها يدوء رطب يفسد عنه ابى حنيفة.
অর্থ: “জায়েফা ও আম্মাতে যে ওষুধ দেয়া হয়, উক্ত ওষুধ যদি শুকনা হয়, তবে রোযা ভঙ্গ হবেনা। কেননা উক্ত ওষুধ পেট অথবা মগজে পৌঁছেনা। আর যদি জানা যায় যে উক্ত ওষুধ মগজ অথবা পেটে পৌঁছে, তবে ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর ওষুধ যদি ভিজা হয়, তবুও ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।” (বাদায়ে, আইনুল হেদায়া, আলমগীরী, মাবছূত ইত্যাদি)
আর চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে, সকল প্রকার ইন্জেকশন ইত্যাদি মগজে পৌঁছে।
উল্লেখ্য, এরূপ ভুল ফতওয়া দানকারী ও সে ফতওয়ার উপর আমলকারীদের উক্তি সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,
وقالوا ربنا انا اطعنا سادتنا وكبراء نا فاضلونا السبيلا ربنا اتهم ضعفين من العذاب والعنهم لعنا كبيرا.
অর্থ: “তারা আরো বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, এরা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। হে প্রভূ ওদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দাও এবং মহা অভিসম্পাত কর।” (সূরা আহযাব/৬৭,৬৮)
কাজেই যারা “রোযাবস্থায় ইন্জেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয়না” বলে বা ফতওয়া দিয়ে মানুষের ঈমান-আমল নষ্ট করছে, তারা কেবল চরম জাহিল, গোমরাহ্, ভন্ড ও বিদ্য়াতীই নয় সাথে তারা মহা লা’নতী ও মহা শাস্তির যোগ্য। তারা দুনিয়াবী জিন্দেগীতে তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ভোগ করছে। কিন্তু এটা তাদের জন্য শুভকর নয়।
যেমন, কাফিরদের প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ولا يحسبن الذين كفروا انما نملى لهم خير لانفسهم انما نملى لهم ليزدادو اثما ولهم عذاب مهين.
অর্থ: “কাফিররা যেন কিছুতেই মনে না করে যে, আমি কালবিলম্বিত করি তাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য! নিশ্চয়ই আমি বিলম্ব করি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায়, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আলে ইমরান/১৭৮)
অতএব, রোযা অবস্থায় যে কোন ইন্জেকশন এবং স্যালাইন যে কোন স্থানে নেয়া হোক না কেন তাতে রোযা অবশ্যই ভঙ্গ হবে।
(ইন্জেকশন এবং স্যালাইন ইত্যাদি নিলে রোযা ভঙ্গ হবে, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর ২১ ও ২২তম সংখ্যায় বিস্তারিত ফতওয়া দেয়া হয়েছে তা পড়ণ্ডন।
এছাড়াও ২৩, ২৬, ৪০, ৪১, ৪৩, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৫৩, ৬৫, ৭২ ও ৭৬তম সংখ্যায় আলোচিত হয়েছে, তা ভাল করে পাঠ করুন।}
হাফিজ মুহম্মদ আতাউর রহমান
পলাশ, রাজশাহী।
সুওয়াল : মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার অক্টোবর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে ৬৭৩ নং জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে, “মাথা মুন্ডানো উত্তম ……. মাথা মুন্ডানো সুন্নত কি-না এতে মতানৈক্য রয়েছে। ….. আল্লামা ত্বহাবী (রহঃ) এটাকে সুন্নত বলেছেন। ….. ”
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাথা মুন্ডানো সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ মাথা মুন্ডন সম্পর্কে মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য ভুল হয়েছে। যা সাধারণ মানুষকে ভুল ফতওয়ার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করে সুন্নতের খেলাফ (বিপরীত) আমল করতে উৎসাহিত করছে।
কারণ কেউ এমন একখানা হাদীস শরীফ উল্লেখ করতে পারবে না, যেখানে উল্লেখ আছে যে, “আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্ব ও ওমরা ব্যতীত অন্য সময় নিজ মাথার চুল মুবারক মুন্ডন করেছেন।” বরং অসংখ্য সহীহ্ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, “আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় বাবরী চুল মুবারক রাখতেন।”
যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চার ধরণের বাবরী চুল মুবারক রাখতেন, যাকে হাদীস শরীফের বর্ণনায় জুম্মা, লিম্মা, ওফরা ও নিছফু উযুনাইহি বলে। অর্থাৎ (১) কানের লতি বরাবর, (২) কাঁধ ও কানের লতির মাঝামাঝি, (৩) কাধের কাছাকাছি, (৪) আবার কোন কোন সময় দু’কানের মাঝামাঝি চুল মুবারকও রাখতেন, যাকে নিছ্ফু উযুনাইহি বলা হয়।” (আবূ দাউদ, তিরমিযী, বযলুল মাজহুদ, জামউল ওসায়েল, শামায়েলে তিরমিযী ও সমূহ সীরাতের কিতাব)
হজ্ব সম্পর্কে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে,
دعا رسول الله صلى الله عليه وسلم للمحلقين ثلاث مرات وللمقصرين مرة واحدة.
অর্থ: “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, (হজ্বের মধ্যে) যারা চুল মুন্ডন করবে, তাদের জন্যে তিনবার দোয়া করেছেন। আর যারা চুল ছোট করবে, তাদের জন্যে একবার দোয়া করেছেন। (মিশকাত, মুসলিম, শরহে নববী, ফতহুল মুলহিম, মিরকাত, আশয়াতুল লুমুয়াত, লুমুয়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, মোযাহেরে হক্ব ইত্যাদি)
ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি যে, শুধু হজ্বের উপর ক্বিয়াস করে মাথা মুন্ডন করাকে সুন্নত বলেছেন, নিম্নে তার প্রমাণ পেশ করা হলো- বুখারী শরীফের বিখ্যাত শরাহ্ ফাত্হুল বারী কিতাবের ১ম খন্ডের ৩৪৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,
وقدرجح الطحاوى الحلق على القص بتفضله صلى الله عليه وسلم الحلق على التقصير فى النسك.
অর্থ: “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্বের মধ্যে মুন্ডন করাকে ছোট করার উপর ফযীলত দিয়েছেন বিধায় হযরত ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি মুন্ডন করাকে ছোট করার উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।”
অতএব, গ্রহণযোগ্য কথা হলো- শুধুমাত্র হজ্বের সময় চুল মুন্ডন করলে সুন্নত এবং ওয়াজিব উভয়টাই আদায় হয়। আর ছোট করলে ওয়াজিব আদায় হবে, সুন্নত আদায় হবেনা। যারা ওয়াজিবের সাথে সাথে সুন্নতও আদায় করবে অর্থাৎ মাথা মুন্ডন করবে, তাদের জন্যে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার দোয়া করেছেন, আর যারা শুধুমাত্র ওয়াজিব আদায় করবে, সুন্নত আদায় করবেনা অর্থাৎ চুল ছোট করবে, তাদের জন্যে একবার দোয়া করেছেন। আর এর দ্বারা আরো প্রমাণিত হয় যে, সুন্নতের গুরুত্ব ও ফযীলত অপরিসীম।
সুতরাং সুন্নত যথাযথভাবে পালনার্থেই গভীরভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, শুধুমাত্র হজ্বের উপর ক্বিয়াস করে হজ্ব ব্যতীত অন্য সময় চুল মুন্ডন করা খেলাফে সুন্নত। তাছাড়া যেখানে অসংখ্য সহীহ্ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, বাবরী চুল রাখা সুন্নত। আর মুন্ডন করা খেলাফে সুন্নত। সেখানে শুধুমাত্র হযরত ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উক্ত বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা।
দ্বিতীয়তঃ আল্লামা সাইয়্যিদ আমীর আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি “ফতওয়ায়ে আলমগীরীতে” উল্লেখ করেন,
وانما صح عند المترجم الفرق فقط ولم يصح ان الحلق سنة.
অর্থ: “আর মুতারজিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট নিশ্চয় সহীহ্ (বিশুদ্ধ) মত হল, শুধু মাত্র বাবরী চুল রাখাই সুন্নত। মাথা মুন্ডন করা সুন্নত, এ মতটি সহীহ্ বা গ্রহণযোগ্য নয়।” (ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া)
অতএব গ্রহণেযোগ্য কথা হলো যে, মাথা মুন্ডন করা সম্পর্কিত হযরত ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মতটি সহীহ্ নয়। বরং সহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো- শুধু মাত্র বাবরী চুল রাখাই সুন্নত।
আল্লাহ্ পাক-এর খাছ রহ্মতে আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পত্রিকার ফতওয়া বিভাগ হতে এ পর্যন্ত যতগুলো “ফতওয়া” প্রকাশ করা হয়েছে এবং “সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে” যতগুলো “সুওয়ালের-জাওয়াব” দেয়া হয়েছে, তার প্রত্যেকটিই পূর্ণ তাহ্ক্বীক্বসহ অসংখ্য, অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। যার কারণে সকলেই তা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মেনে নিতে বাধ্য।
উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, হজ্ব ও ওমরা ব্যতীত অন্য সময় বাবরী চুল রাখা দায়েমী সুন্নত। আর মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার মাথা মুন্ডন করা সম্পর্কিত উক্ত বক্তব্য বিভ্রান্তিকর, দলীল বিহীন, সুন্নত বিনষ্টকারী ও বিদ্য়াত প্রচলনকারী।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, অধিক মাত্রায় মাথা মুন্ডন করা খারেজীদের আলামত।
{এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১২, ২৮, ৩৭, ৪৪, ৪৭, ৫২, ৫৩তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন।}
{দলীলসমূহঃ (১) আবূ দাউদ, (২) তিরমিযী, (৩) শামায়েলে তিরমিযী, (৪) নাসাঈ, (৫) জামেউল উছুল, (৬) শরহে সুন্নাহ্, (৭) বজলুল মাজহুদ, (৮) আওনুল মা’বাদ, (৯) শরহে আবূ দাউদ লি বদরিদ্দীন আইনী, (১০) তুহফাতুল আহওয়াজী, (১১) আরিদাতুল আহওয়াজী, (১২) জামউল ওসায়েল, (১৩) আল মাওয়াহেবুল লাদুন্নিয়া আলাশ শামায়েলে মুহম্মদিয়া, (১৪) শামায়েলু বি শরহিল মানাবী, (১৫) খাছায়েলে নববী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, (১৬) নাসাঈ বি শরহিস্ সুয়ূতী, (১৭) আসসুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, (১৮) মিশকাত, (১৯) মিরকাত, (২০) শরহুত্ ত্বীবী, (২১) আত্ তালীকুছ্ ছবীহ্, (২২) আশয়াতুল লুময়াত, (২৩) লুময়াত, (২৪) মুযাহেরে হক্ব, (২৫) মিরআতুল মানাজিহ্, (২৬) ফতহুল বারী, (২৭) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া ইত্যাদি।}
মুহম্মদ কাওছার জামান (বাবলা)
মাহিগঞ্জ, রংপুর
সুওয়াল : হাটহাজারী মাদ্রাসার মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকায় এক জিজ্ঞাসার সমাধানে বলা হয়েছে, “তাকবীরে তাশরীক একবারের চেয়ে বেশী বলা সুন্নাত পরিপন্থী অর্থাৎ সুন্নতের খেলাফ।”
তার এ সমাধান কতটুকু সঠিক? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক।
জাওয়াব : তাকবীরে তাশরীক সম্পর্কে হাটহাজারী মাদ্রাসার উক্ত জাহিল মৌলভীর প্রদত্ত সমাধান সম্পূর্ণ ভুল, সুন্নতের খেলাফ ও দলীলবিহীন হয়েছে। কারণ তাকবীরে তাশরীক একবার বলা সুন্নত। আর একাধিকবার বলা মুস্তাহাব ও ফযীলতপূর্ণ। একাধিকবার বলা সুন্নতের খেলাফ হবে এমন কথা কোথাও উল্লেখ নেই।
বরং সর্বজনমান্য এবং স্বীকৃত ইমাম-মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরামগণ তাঁদের বিশ্ব বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাবে একাধিকবার তাকবীরে তাশরীক বলা মুাস্তাহাব বা ফযীলতের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।
যেমন, “দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে যে,
ويجب تكبير التشريق مرة وان زاد عليها يكون فضلا.
অর্থ: “তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব, তবে যদি (কেহ) একাধিকবার বলে, তাহলে তা ফযীলতের কারণ হবে।”
আর “ফতওয়ায়ে শামীতে” উল্লেখ আছে,
وقيل ثلاث مرات.
অর্থ: “কেউ কেউ বলেছেন (তাকবীরে তাশ্রীক) তিনবার।”
“গায়াতুল আওতার” “শরহে দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে,
উর্দু কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে (আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হওয়ার কারণে একবার তাকবীরে তাশ্রীক বলা ওয়াজিব। আর যদি একবারের চেয়ে অতিরিক্ত বলে তবে সওয়াবের অধিকারী হবে।”
“মুলতাক্বাল আবহুর” কিতাবে উল্লেখ আছে,
وان زاد عليها يكون نفلا.
অর্থ: “যদি “তাকবীরে তাশ্রীক” একাধিকবার বলে তাহলে তা নফল হবে।
“মারাকিউল ফালাহ্” কিতাবের ৩৫১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, وما زاد فهو مستحب.
অর্থ: “সাধারণভাবে একাধিকবার “তাকবীরে তাশ্রীক” পড়া মুস্তাহাব।”
“শরহে নেকায়া” কিতাবের ৩০৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ويجب قوله مرة والزيادة مستحبة.
অর্থ: “তাকবীরে তাশ্রীক” একবার পাঠ করা ওয়াজিব। আর একাধিকবার পাঠ করা মুস্তাহাব।”
উপরোক্ত নির্ভরযোগ্য কিতাবের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, একবার “তাকবীরে তাশ্রীক” বলা ওয়াজিব এবং তিনবার বলা মুস্তাহাব।
{দলীলসমূহঃ (১) আইনী, (২) মারাকিউল ফালাহ্, (৩) মোলতাকাল আবহুর, (৪) শামী, (৫) তানভীরুল আবছার, (৬) রদ্দুল মোহ্তার, (৭) দুররুল মোখতার, (৮) শরহ্ েতোহফা, (৯) গায়াতুল আওতার, (১০) আলমগীরী, (১১) হাশিয়ায়ে তাহ্তাবী, (১২) শরহে নেকায়া ইত্যাদি।}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ আরিফ
রামপুরা, ঢাকা।
সুওয়াল : পাগড়ীর উপর রুমাল পরিধান করা কি? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াব : পাগড়ীসহ অর্থাৎ পাগড়ীর উপর রুমাল পরিধান করা ও পাগড়ী ছাড়া রুমাল পরিধান করা উভয়টাই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত। অর্থাৎ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই মাথা মুবারকে পাগড়ীর উপরে রুমাল পরিধান করতেন এবং পাগড়ী ছাড়াও রুমাল পরিধান করতেন।
যেমন, হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
قالت عائشة رضى الله تعالى عنها فبينا نحن يوما جلوس فى بيتنا فى نحر الظهيرة قال قائل لابى بكر رضى الله تعالى عنه هذا رسول الله صلى الله عليه وسلم مقبلا متقنعا.
অর্থ: “হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, একদা দ্বিপ্রহরের সময় আমরা আমাদের গৃহে বসা ছিলাম। তখন একজন হযরত আবূ বরক ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে উদ্দেশ্য করে বললেন যে, “ঐ যে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (পাগড়ীর উপর) রুমাল পরিধান করে মাথা মুবারক আবৃত করে আগমন করছেন।” (বুখারী শরীফ ২/৮৬৪, আহমদ, আবূ দাউদ শরীফ ৫৬৪, ফতহুল বারী ১০/২২৪, উমদাতুল কারী ২১/৩০৯, বযলুল মাযহুদ ৬/৫৩)
উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত হাদীস শরীফে متقنعا শব্দটি تقنع শব্দ থেকে এসেছে। আর تقنع শব্দের অর্থ হলো,
وضع شيى الزائد على الرأس فوق العمامة.
অর্থ: تقنع হলো মাথায় পাগড়ীর উপরে অতিরিক্ত একটি কাপড় (রুমাল) পরিধান করা।” (বুখারী শরীফ ২/৮৬৪, ফতহুল বারী ১০/২২৪, উমদাতুল কারী ২১/৩০৯)
تقنع শব্দের ব্যাখ্যায় অনত্রে বলা হয়েছে,
تغطية الرأس واكثر الوجه برداء اوغيره.
অর্থ: “মাথা এবং চেহারার অধিকাংশ কোন চাদর অথবা অন্য কোন কাপড় (রুমাল) দিয়ে ঢেকে রাখা।” (বুখারী শরীফ ২/৮৬৪, ফতহুল বারী ১০/২২৪, উমদাতুল কারী ২১/৩০৮)
অন্য হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
عائشة رضى الله تعالى عنها قالت مااتى رسول الله صلى الله عليه وسلم احدا من نسائه الا متقنعا يرخى الثوب على راسه حياء.
অর্থ: “হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাগণের কারো নিকট আসতেন তখন (রুমাল দিয়ে) মাথা মুবারক ঢেকে আসতেন। তিনি হায়ার কারণে স্বীয় মাথা মুবারকের উপর কাপড় (রুমাল) পরিধান করতেন।” (মসনদে আয়েশা, হাশীয়াদে আবূ দাউদ/২০৯)
এছাড়া অনেক হাদীস শরীফে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের রুমাল ব্যবহারের কথাও বর্ণনা করা হয়েছে।
উপরোক্ত দলীলভিত্তিক বর্ণনায় এটাই প্রমাণিত হলো যে, পাগড়ীর উপরে রুমাল পরিধান করা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাছ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।
{দলীলসমূহঃ (১) বুখারী শরীফ, (২) আহমদ, (৩) আবূ দাউদ শরীফ, (৪) দারেমী, (৫) ইবমে মাযাহ্, (৬) মিশকাত, (৭) ফতহুল বারী, (৮) উমদাতুল কারী, (৯) বযলুল মাযহুদ (১০) ইরশাদুস্সারী, (১১) ফতহুর রব্বানী, (১২) আউনুল মা’বুদ, (১৩) মিরকাত, (১৪) আশয়াতুল লুময়াত, (১৫) লুময়াত, (১৬) ত্বীবী, (১৭) তালীক্ব, (১৮) মোযাহেরে হক্ব, (১৯) মসনদে আয়েশা, (২০) মসনদে আহমদ, (২১) আরবাঈন ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি, (২২) আল মুর্শিদুল আমীন (২৩) নেহায়া, (২৪) লুগাতুল হাদীস, (২৫) লিসানুল আরব, (২৬) লুগাতে হিরা, (২৭) মিছবাহুল লুগাত, (২৮) মু’জামুল ওয়াসীত, (২৯) কামুছ ইত্যাদি।}
মুহম্মদ আব্দুল কুদ্দুস
গাঙ্গুরিয়া, নওগাঁ।
সুওয়াল : রুমাল মাথায় দিয়ে নামায আদায় করা জায়েয কিনা? রুমাল মাথায় দিয়ে চলাফেরা করলে এবং নামায আদায় করলে অনেকে বলে যে, “মেয়েদের মতো ঘোমটা দিয়ে চলাচল করে ও নামায পড়ে।” এ কথাটা কতটুকু শরীয়তসম্মত?
জাওয়াবঃ হ্যাঁ, রুমাল মাথায় দিয়ে নামায আদায় করা জায়েয তো অবশ্যই, শুধু জায়েযই নয় বরং খাছ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।
উল্লেখ্য, টুপি, পাগড়ীর ন্যায় রুমাল পরিধান করাও দায়েমী সুন্নত। নামাযের সময় এবং নামাযের বাইরের সময় উভয় অবস্থাতেই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুমাল পরিধান করেছেন।
সুতরাং রুমাল মাথায় দিয়ে চলাচল করলে ও নামায আদায় করলে “মেয়েদের মতো ঘোমটা দিয়ে চলাচল করে ও নামায পড়ে,” এ কথা সম্পূর্ণ কুরআন-সুন্নাহ্র পরিপন্থী এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যা তোহ্মত দেয়া এবং তাঁর খাছ সুন্নতি আমলের প্রতি এহানত করার শামীল যা স্পষ্টতঃ কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। যেমন, এ প্রসঙ্গে আক্বাইদের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,
اهانة السنة كفر.
অর্থ: “সুন্নতের এহানত করা কুফরী।”
আক্বাইদের কিতাবে এও উল্লেখ করা হয়েছে, “যদি কোন ব্যক্তি এ কথা বলে যে, ‘আমি কদু খাওয়া পছন্দ করিনা’ তাহলে সে কাট্টা কাফির হয়ে যাবে।” কারণ স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে কদু খেয়েছেন এবং তা পছন্দ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ما سلككم فى سقر قالوا لم نك من المصلين ولم نك نطعم المسكين وكنا نخوض مع الخائضين وكنا نكذب بيوم الدين حتى اتنا اليقين.
অর্থ: “(জাহান্নামীদের জিজ্ঞাসা করা হবে) তোমরা জাহান্নামী হওয়ার কারণ কি? তারা বলবে, আমরা নামায পড়তাম না, মিসকীনকে খাদ্য দিতাম না, যারা (কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ তথা ইসলাম নিয়ে) ঠাট্টা-বিদ্রুপ, সমালোচনা করতো, তাদের সাথে মিলে আমরাও ঠাট্টা-বিদ্রুপ, সমালোচনা করতাম আর ক্বিয়ামত দিবসকে মিথ্যারোপ করতাম আমাদের মৃত্যু পর্যন্ত।” (সূরা মুদ্দাছ্ছির/৪২-৪৭)
কাজেই আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন আমল তথা সুন্নতকে এহানত করা, অবজ্ঞা করা, সুন্নত সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা সম্পূর্ণ কুফরী।
এ ধরণের কুফরী কথা বলা হতে সকলকে বিরত থাকতে হবে। আর এ ধরণের কথা যে বলবে, তাকে খালিছ ইস্তেগ্ফার ও তওবা করতে হবে। অন্যথায় তার ঈমান-আমল নষ্ট হয়ে কুফরী অবস্থায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শরীয়তের মাসয়ালা হচ্ছে- “যদি কেউ শরীয়তের কোন আইনকে অবজ্ঞা করলো, এনকার বা অপছন্দ করলো, তবে সে কুফরী করলো। যে কুফরী করে, সে মুরতাদ হয়ে যায়। আর মুরতাদের ফায়সালা হচ্ছে- তার স্ত্রী তালাক হবে (যদি বিয়ে করে থাকে) এবং এক্ষেত্রে পুনরায় তওবা না করে, বিয়ে না দোহরানো ব্যতীত তার স্ত্রীর সাথে বসবাস করা বৈধ হবেনা। আর এই অবৈধ অবস্থায় সন্তান হলে সেই সন্তানও অবৈধ হবে। হজ্ব বাতিল হয়ে যাবে (যদি হজ্ব করে থাকে), সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার ওয়ারিশ সত্ব বাতিল হবে। তাকে তিন দিন সময় দেয়া হবে তওবা করার জন্য এবং যদি তওবা করে, তবে ক্ষমা করা হবে। অন্যথায় একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কেননা হাদীস শরীফে রয়েছে, তিন কারণে মৃত্যুদন্ড দেয়া জায়েয। যথা- (ক) ঈমান আনার পর কুফরী করলে অর্থাৎ মুরতাদ হলে। (খ) ঐ জিনাকার বা জিনাকারিনী, যারা বিবাহিত বা বিবাহিতা। (গ) যে অন্যায়ভাবে কাউকে ক্বতল করে, তাকে। (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাযাহ্, মসনদে শাফেয়ী, মসনদে বাজ্জার, মুস্তাদরেকে হাকেম)
আর মুরতাদ মারা যাবার পর যারা জানাযার নামায পড়ে বা পড়ায় বা জানাযার নামাযে সাহায্য-সহযোগীতা করে, তাদের সকলের উপরই মুরতাদের হুকুম বর্তাবে এবং এ সকল মুরতাদ মরলে বা নিহত হলে তাকে মুসলমানগণের কবরস্থানে দাফন করা যাবেনা। এমনকি মুসলমানের ন্যায়ও দাফন করা যাবেনা। বরং তাকে কুকুরের ন্যায় একটি গর্তের মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে।
কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই যারা কাফির এবং কুফরী অবস্থায় মারা গিয়েছে, তারা যদি পরিপূর্ণ স্বর্ণ তার ফিদিয়া বা যমীন (কুফরীর পরিবর্তে)কাফ্ফারা বাবদ দেয় (আমার থেকে বাঁচার জন্য), তা কখনো গ্রহণ করা হবেনা। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি বা আযাব এবং তাদের জন্য কস্মিনকালেও সাহায্যকারী নেই। (সূরা আলে ইমরান/৯১)
{দলীলসমূহঃ (১) আল্ ফিকুল আক্বার, (২) শরহে আকাঈদে নছফি, (৩) আকাঈদে হাক্কা, ((৪) তাক্মিলুল ঈমান, (৫) তাফসীরে মাযহারী, (৬) রুহুল বয়ান, (৭) রুহুল মায়ানী, (৮) খাযেন, (৯) বাগবী, (১০) ইবনে কাছীর, (১১) তাবারী, (১২) বুখারী, (১৩) মসনদে আহমদ, (১৪) মসনদে আশেয়া, (১৫) আবূ দাউদ, (১৬) দারেমী, (১৭) ইবমে মাযাহ্, (১৮) মিশকাত, (১৯) মিরকাত, (২০) আশয়াতুল লুমুয়াত, (২১) লুময়াত, (২২) ত্বীবী, (২৩) তালীক্ব, (২৪) মোযাহেরে হক্ব, (২৫) ফতহুল বারী, (২৬) উমদাতুল কারী, (২৭) বযলুল মাযহুদ (২৮) ইরশাদুস্ সারি, (২৯) ফতহুর রব্বানী, (৩০) আউনুল মা’বুদ, (৩১) আরবাঈন ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি (৩২) আল মুর্শিদুল আমীন, (৩৩) দুররুল মুখতার, (৩৪) খানিয়া, (৩৫) ফতওয়ায়ে কাজীখান, (৩৬) বাহরুর রায়েক, (৩৭) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (৩৮) ফতওয়ে আল বারুরিয়া, (৩৯) জামিউল ফুছুলিন, (৪০) আল্ বায্যাজিয়া ইত্যাদি।}
মুহম্মদ শাহাবুদ্দীন সরকার (সহঃ শিক্ষক)
চিলমারী, কুড়িগ্রাম।
সুওয়াল : কুরবানী করার সুন্নতী পদ্ধতি এবং নিয়ত জানালে খুশি হবো।
জাওয়াবঃ কুরবানীর পশুর মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা পশ্চিম দিকে রেখে অর্থাৎ ক্বিবলামুখী করে শোয়ায়ে পূর্ব দিক থেকে চেপে ধরতে হবে, তারপর কুরবানী করতে হবে। আর কুরবানী করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, সীনার উপরিভাগ এবং কক্তনালীর মাঝামাঝি স্থানে যেন জবেহ করা হয়। আরো উল্লেখ্য যে, গলাতে চারটি রগ রয়েছে, তন্মধ্যে গলার সম্মূখভাগে দু’টি- খাদ্যনালী ও শ্বাসনালী এবং দু’পার্শ্বে দু’টি রক্তনালী। এ চারটির মধ্যে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং দু’টি রক্তনালীর মধ্যে একটি অবশ্যই কাটতে হবে। অর্থাৎ চারটি রগ বা নালীর মধ্যে তিনটি অবশ্যই কাটতে হবে, অন্যথায় কুরবানী হবেনা। যদি সম্ভব হয়, তবে ছুরি চালানোর সময় বেজোড় সংখ্যার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
কুরবানীর নিয়ত :- (জবেহ্ করার পূর্বে)
انى وجهت وجهى للذى فطر السموت والارض حنيفا وما انا من المشركين. ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العلمين لاشريك له وبذلك امرت وانا من المسلمين اللهم منك ولك.
উচ্চারণঃ- ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না ছলাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্ইয়া ইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা শারীকাল্লাহু ওয়া বি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ও লাকা।
এ দোয়া পড়ে بسم الله الله اكبر বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে জবেহ করতে হবে। জবেহ করার পর এ দোয়া পড়বে
اللهم تقبله منى كما تقبلت من حبيبك سيدنا محمد صلى الله عليه وسلم وخليلك ابراهيم عليه السلام.
উচ্চারণঃ- আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বালহু মিন্নী কামা তাক্বাব্বালতা মিন হাবীবিকা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খালীলিকা ইব্রাহীমা আলাইহিস সালাম।
যদি নিজের কুরবানী হয়, তবে منى (মিন্নী) বলতে হবে। আর যদি অন্যের কুরবানী হয়, তবে من (মিন) শব্দের পর যার বা যাদের কুরবানী, তার বা তাদের নাম উল্লেখ করতে হবে। আর যদি অন্যের সাথে শরীক হয়, তাহলে منى (মিন্নী)ও বলবে, অতঃপর من (মিন) বলে অন্যদের নাম বলতে হবে। কেউ যদি উপরোক্ত নিয়ত না জানে, তাহলে জবেহ করার সময় শুধু বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে কুরবানী করলেও শুদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ নিয়ত অন্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তবে অবশ্যই প্রত্যেক জবেহকারীর উচিৎ উপরোক্ত নিয়ত শিক্ষা করা। কেননা উপরোক্ত নিয়ত পাঠ করে কুরবানী করা সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।
{দলীলসমূহঃ- (১) আহমদ, (২) আবূ দাউদ, (৩) তিরমিযী, (৪) দারেমী ইবনে মাযাহ্, (৫) বজলূল মযহুদ, (৬) মিশকাত, (৭) মিরকাত, (৮) মুজাহেরে হক্ব, (৯) লুময়াত, (১০) ত্বীবী, (১১) তালিক্ছ্ছুবী, (১২) আশয়াতুল লুময়াত, (১৩) আলমগীরী, (১৪) শামী, (১৫) দুররুল মুখতার, (১৬) আইনুল হেদায়া, (১৭) বাহর ইত্যাদি।}
আহমদুর রহমান,
মানিকগঞ্জ।
সুওয়ালঃ হালাল পশুর কোন কোন অংশ খাওয়া নিষিদ্ধ?
জাওয়াবঃ কুরবানী বা হালাল পশুর ৮টি জিনিস খাওয়া যাবেনা। (১) দমে মাছফুহা বা প্রবাহিত রক্ত হারাম, (২) অন্ডকোষ, (৩) মুত্রনালী, (৪) পিত্ত, (৫) লিঙ্গ, (৬) যোনি, (৭) গদুদ বা গুটলী মাকরূহ্ তাহ্রীমী, (৮) শিরদাড়ার ভিতরের মগজ, এটা কেউ মাকরূহ্ তাহ্রীমী, আবার কেউ মাকরূহ্ তান্যিহী বলেছেন।
{দলীলসমূহঃ- (১) শামী, (২) ফতওয়ায়ে আমিনিয়া, (৩) উমদাতুল কালাম, (৪) কিতাব শাইখুল ইসলাম, (৫) মাতালিবুল মু’মিনীন ইত্যাদি।
মুহম্মদ ফরিদুদ্দীন
গ্রীন রোড, ঢাকা।
সুওয়াল : মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করা কি? আর খাছ করে কোন বিশেষ দিনে যেমন, ঈদের দিনে মুয়ানাকা করা জায়েয কিনা? অনেকে ঈদের দিনে মুয়ানাকা করাকে বিদ্য়াত বলে থাকে। ইহা কতটুকু ঠিক?
জাওয়াব : মুয়ানাকা করা সুন্নত। কোন বিশেষ দিনে হোক আর বিশেষ দিন ছাড়া অন্য দিনেই হোক সব দিনেই মুয়ানাকা করা জায়েয এবং সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن عائشة رضى الله تعالى عنها قالت قدم زيد بن حارثة المدينة ورسول الله صلى الله عليه وسلم فى بيتى فاتاه فقرع الباب فقال اليه رسول الله صلى الله عليه وسلم عريانا يجر ثوبه والله مارايته عريانا قبله ولابعده فاعتنقه وقبله.
অর্থ: “হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মদীনা শরীফে আগমন করতঃ রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আমার ঘরে আসলেন এবং দরজায় করাঘাত করলেন। তখন রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে ছিলেন। রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনাবৃত শরীর মুবারকে চাদর টানতে টানতে তাঁর কাছে গেলেন। আল্লাহ্ পাক-এর কছম! আমি তাঁকে এর পূর্বে বা পরে কখনো অনাবৃত শরীর মুবারকে দেখিনি। তিনি (মুহব্বতের আতিশয্যে) তাঁর সাথে মুয়ানাকা করলেন এবং তাঁকে চুম্বন করলেন।” (তিরমিযী শরীফ)
উল্লেখ্য, শরীয়তের ফতওয়া হলো- “কোন সুন্নতকে বিদ্য়াত বলা কুফরী।” যারা ঈদের দিনে মুয়ানাকা করাকে বিদ্য়াত বলে তারা বিনা দলীলে, মনগড়া এবং হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা ও মাসয়ালা না জানার কারণেই বলে থাকে। আবার যারা শুধু একবার বা একদিকে মুয়ানাকা করার কথা বলে, তারাও ঠিক একই কারণে বলে থাকে।
মূলতঃ ঈদের দিনে মুয়ানাকা করার সঠিক ইতিহাস হলো, পূর্ববর্তী যামানায় বর্তমান যামানার ন্যায় এলাকা ভিত্তিক এত ঘন ঘন ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হতোনা। বরং কোন স্থানে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হলে সেখানে অনেক দূর দূরান্ত হতে লোক সমাগম হয়ে নামায আদায় করতো। অতঃপর নামায শেষে অনেকের সাথে দীর্ঘ দিন পর দেখা-সাক্ষাৎ হতো, তারপর খোজ-খবর ও পরিচয় নেয়ার পাশাপাশি সালাম বিনিময়, মুছাফাহা ও মুয়ানাকা করতো। তখন থেকে ঈদের দিনে পরিচিত-অপরিচিত সবার সাথে সালাম-কালাম, মুছাফাহা, মুয়ানাকার ব্যাপক প্রচলন হয়ে আসছে। উপরোল্লিখিত প্রত্যেকটি আমলই খাছ সুন্নত এবং মুসলমান পরস্পর পরস্পরের প্রতি মুহব্বত বৃদ্ধি এবং আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টির কারণ।
সুতরাং খালিছ বা নেক উদ্দেশ্যে মুয়ানাকা করা খাছ সুন্নত এবং আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টির কারণ। তবে ফিৎনার আশংকা থাকলে তথা কামভাবে মুয়ানাকা করা হলে তা নাজায়েয ও হারাম হবে।
মুয়ানাকা করার নিয়মঃ প্রথমে উভয়ের ডান দিকে গলায় গলায় মিলাবে এরপর একইভাবে বাম দিকে মিলিয়ে পুণরায় ডান দিকে মিলাবে এবং নিম্নোক্ত দোয়াটি বলবে, اللهم زد محبتى لله ورسوله.
অর্থ: “আয় আল্লাহ্ পাক! আপনি আমার মুহব্বত বৃদ্ধি করে দিন আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টির জন্য।” (তিরমিযী শরীফ)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الوتيراء.
অর্থ: “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোট বেজোড় থেকে নিষেধ করেছেন।” (ইবনে আব্দিল বার)
সুতরাং একবার গলা মিলানো সুন্নতের পরিপন্থী।
{দলীসমূহঃ (১) বুখারী শরীফ, (২) উমদাতুল কারী, (৩) ফতহুল বারী, (৪) ইরশাদচ্ছারি, (৫) ফয়জুল বারী, (৬) তাইসীরুল কারী, (৭) তিরমিযী, (৮) শরহে তিরমিযী, (৯) শরহে নববী, (১০) মিশকাত, (১১) মিরকাত, (১২) আশয়াতুল লুমুয়াত, (১৩) লুমুয়াত, (১৪) শরহুত ত্বীবী, (১৫) তালীক্বুছ ছাবী, (১৬) মোযাহেরে হক্ব, (১৭) শরহুস্ সুন্নাহ্, (১৮) মাকতুবাত শরীফ, (১৯) হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ইত্যাদি।}