তাফসীরুল কুরআন: শাব‘আন বা অধিক আহারের অপকারিতা

সংখ্যা: ২৩০তম সংখ্যা | বিভাগ:

মানব হৃদয়ের যাবতীয় আকাঙ্খার মধ্যে ভোজনাকাঙ্খা সবচেয়ে প্রবল। মূলত ভোজনাকাঙ্খাই মানুষের অন্যান্য সমস্ত আকাঙ্খার মূল। ভোজন দ্বারা উদর পরিতৃপ্ত হলেই কাম-রিপু প্রবল হয়ে উঠে। আর ভোজনাকাঙ্খা ও কাম উগ্রতাকে চরিতার্থ করতে হলে অর্থকড়ির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এই প্রবৃত্তি দুটির সাথে সাথেই ধন সংগ্রহের লালসার উদয় হয়। ধনউপার্জন ও সঞ্চয়ের লক্ষ্যে প্রভাব-প্রতিপত্তির লিপ্সাও জেগে উঠে। এরপর নিজেই সেই ধন-সম্পদ এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি রক্ষার জন্য মানুষের সাথে বিবাদ-বিসম্বাদ এবং কলহ-কোন্দলে লিপ্ত হতে হয়। এই কলহ-কোন্দল থেকেই আবার পরস্পরের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা, অহঙ্কার প্রভৃতি জঘন্য দোষগুলো এসে দেখা দেয়। অতএব, ভোজনাকাঙ্খাকে তার নিজের অবস্থায় স্বাধীনতা দিলে নানা ধরনের পাপপ্রবৃত্তির উৎপত্তি হয়। পক্ষান্তরে ভোজনাকাঙ্খাকে লাঘব করে ক্ষুধা-পিপাসার কষ্ট সহ্য করার অভ্যাস করে নিতে পারলে ওই উদরই আবার সমুদয় পুণ্য ও কল্যাণের উৎস স্বরূপ হয়।

এ প্রসঙ্গে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমরা ক্ষুধা ও পিপাসার ক্লেশ সহ্য করে নিজেদের প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করো। এই জিহাদে কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদের সমতুল্য ছওয়াব রয়েছে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার চেয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে অন্যকিছু অধিক প্রিয় নয়।”

একদা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবার শরীফ-এ উপস্থিত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ আরয করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! কোন ব্যক্তি মর্যাদার দিক থেকে শ্রেষ্ঠ? তিনি জাওয়াবে বললেন, যে ব্যক্তি স্বল্পাহারেই পরিতুষ্ট হয়, অল্প হাসে এবং দেহ আবৃত করার উপযোগী (মোটা) কাপড় পছন্দ করে।

তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার অধিক ধ্যান করে এবং ক্ষুধার কষ্ট বেশি সহ্য করে, সে ব্যক্তিই মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট সর্বাধিক উত্তম। আর যে ব্যক্তি বেশি আহার করে এবং বেশি নিদ্রা যায়, সে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার দুশমন।”

তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমরা তোমাদের হৃদয়কে নির্জীব করে ফেলনা। কেননা হৃদয় একটি শস্যক্ষেত স্বরূপ। তাতে অত্যধিক পানি হলে তা অনুর্বর এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, ইহজগতে যে ব্যক্তি খুব তৃপ্তির সাথে ভোজন করবে সে ব্যক্তি পর জগতে ক্ষুধার্ত থাকবে।”

বিশিষ্ট ওলীআল্লাহ হযরত আব্দুল ওয়াহিদ ইবনে যায়িদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন, ক্ষুধার কষ্ট বরণ করা ব্যতীত কেউই মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয়পাত্র হতে পারেননি। ক্ষুধার কারণেই কেউ কেউ এক পলকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন, কেউ কেউ পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলেছেন।

উদরপূর্তি মানুষের আত্মাকে অন্ধ এবং মেধাকে নিষ্কর্মা করে দেয়। তাছাড়া অতি ভোজনে মস্তিষ্কে এক ধরনের বাষ্প প্রবেশ করে তা মানুষকে নির্বোধ ও বর্বর করে তোলে। চিন্তা ও কল্পনা শক্তি এলোমেলো ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এ কারণে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, অল্প ভোজনের অভ্যাস করে হৃদয়কে সজীব রাখো এবং ক্ষুধার আগুনে দগ্ধীভূত করে আত্মাকে নির্মল করে নাও। এর ফলে আত্মা হাল্কা হয়ে কর্মতৎপরতায় সক্ষম হবে। তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেছেন, “পরিতৃপ্তভাবে ভোজন করোনা। কেননা তাতে  হৃদয় থেকে মা’রিফাতের নূর বিলুপ্ত হয়।” মা’রিফাত অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার পরিচয়ের ইলমই হচ্ছে জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র পথ আর ক্ষুধার ক্লেশ সহ্য করাই হচ্ছে ওই মা’রিফাতের দরজা।

বর্ণিত রয়েছে, ক্ষুধার কষ্ট একাধারে সহ্য করার ফলে হৃদয় বা আত্মা এমন হাল্কা হয়ে যায় যে, মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির এবং ইবাদতে স্বাদ পূর্ণাঙ্গরূপে অনুভব করা সহজ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে তৃপ্ত ভোজনে আত্মা কঠিন হয়ে যাওয়ার ফলে মানুষ ইবাদত ও যিকির-আযকারে কোন কিছুতেই স্বাদ পায় না।

হযরত আবু সুলায়মান দারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন, যারা পেট ভরে পরিতৃপ্তভাবে আহার করে তাদের মধ্যে ছয়টি অপকার পরিদৃষ্ট হয়। (এক) ইবাদতে স্বাদ লাভ করেনা। (দুই) জ্ঞানমূলক বিষয়বস্তু স্মরণ রাখতে পারে না। (তিন) মানুষ ও অন্যান্য জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে পারে না। (চার) মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত-বন্দেগী তার কাছে কঠিন মনে হয়। (পাঁচ) কামপ্রবৃত্তি প্রবল হয়ে পড়ে। (ছয়) অতিভোজীরা ইস্তিঞ্জার বেগাধিক্যের কারণে বেশি সময় মসজিদে বা ইবাদতে লিপ্ত থাকতে পারে না বরং তারা ইস্তিঞ্জায় ব্যতিব্যস্ত থাকে।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

كلوا واشربوا ولا تسرفوا انه لا يحب الـمسرفين

অর্থাৎ “তোমরা খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।”

উল্লেখ্য, দেশ-কাল-পাত্র, পরিশ্রম ও পরিস্থিতি ভেদে আহারের পরিমাণও বেশ-কম হতে পারে। মোটকথা, আহারের পরিমাণ সংক্রান্ত একটি নিয়ম থাকা অপরিহার্য। তাহলো এই যে, আহার সমাপ্ত করে যখন বরতন থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া হবে তখনো যেনো কিছু ক্ষুধা বাকী থাকে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “উদরের এক তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ মহান আল্লাহ পাক উনার যিকিরের জন্য, অপর বর্ণনায় এসেছে, এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য।

তাফসীরুল কুরআন: মিথ্যার কুফল ও ভয়াবহ পরিণতি

তাফসীরুল কুরআন

তাফসীরুল কুরআন

তাফসীরুল কুরআন: কৃপণতার নিন্দা ও ভয়াবহ পরিণতি

তাফসীরুল কুরআন: গোপন শিরকের অন্তর্ভুক্ত রিয়া নামক বদ খাছলতটির ভয়ানক পরিণতি