পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৬৩

সংখ্যা: ২৮৩তম সংখ্যা | বিভাগ:

৩৩তম ফতওয়া হিসেবে

“পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”-

পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

সম্মানিত চার মাযহাব হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী উনাদের সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম উনাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি মুবারক

সম্মানিত শরীয়ত অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের ফায়ছালা মতে প্রত্যেক মুসলমান পুরুষ-মহিলা, জ্বিন-ইনসান সকলের জন্য সম্মানিত চার মাযহাব উনাদের যেকোনো একটি সম্মানিত মাযহাব উনাদের অনুসরণ করা যেরূপ ফরয-ওয়াজিব তদ্রƒপ সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে মাযহাব পরিবর্তন করা বা এক মাযহাবের অনুসারী হয়ে অন্য মাযহাবের উপর আমল করা জায়িয নেই।

এ প্রসঙ্গে মুসলিম শরীফ উনার বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ‘মুসলিম শরীফ উনার’ টিকায় এবং ইমাম তাহাবী ‘দুররুল মুখতার’ কিতাবের হাশিয়াতে লিখেন-

عَلَيْكُمْ يَا مَعْشَرَ الْـمُؤْمِنِيْنَ اِتِّبَاعُ الْفِرْقَةِ النَّاجِيَةِ الْـمُسَمَّاةِ بِأَهْلِ السُّنَّةِ وَالْـجَمَاعَةِ فَأِنَّ نَصْرَةَ اللهِ وَحِفْظهٗ وَتَوْفِيْقَهٗ فِيْ مُوَافِقَتِهِمْ وَخَذَلًالَّهٗ وَسَخْطَهٗ وَمَقْتَهٗ فِيْ مُـخَالِفَتِهِمْ وَهٰذِهِ الطَّائِفَةُ النَّاجِيَةُ قَدْ اِجْتَمَعَتِ الْيَوْمَ فِيْ مَذْهَبِ أَرْبَعٍ وَهُمُ الْـحَنَفِيُّوْنَ وَالْـمَالِكِيُّوْنَ وَالشَّفِعِيُّوْنَ وَالْـحَنَبِلِيُّوْنَ رَحِـمَهُمُ اللهُ وَمَنْ كَانَ خَارِجًا مِّنْ هٰذِهِ الْأَرْبَعَةِ فَهُوَ أَهْلُ الْبِدْعَةِ وَالنَّارِ.

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! আপনারা নাজিয়া (নাজাতপ্রাপ্ত) দলকে অনুসরণ করে চলুন যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ নামে মশহূর। কারণ মহান আল্লাহ পাক উনার সাহায্য, হিফাযত ও তাওফীক্ব অর্জন সম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব এবং মহান আল্লাহ পাক উনার অসন্তুষ্টি, গযব ও অপদস্ততা উনাদের সাথে বিরোধিতার কারণেই। আর ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত’ বর্তমান যুগে চার মাযহাবে বিভক্ত। উনারাই হলেন সম্মানিত হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী মাযহাব। আর যারাই বর্তমানে এ ৪ মাযহাব বহির্ভূত তারাই বিদয়াতী ও জাহান্নামী। (তাম্বিহ ৪৬৬ পৃষ্ঠা)

অনুসরণীয় সকল ইমাম মুজতাহিদ উনারা এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, অনুসরণীয় ও গ্রহণযোগ্য মাযহাব হচ্ছে চারটি। ১। হানাফী ২। মালিকী ৩। শাফিয়ী ৪। হাম্বলী।

সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন ইমাম আ’যম ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত মালিকী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত শাফিয়ী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত হাম্বলী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে উনাদের পরিচিতি ও সাওয়ানেহ উমরী মুবারক তুলে ধরা হলো-

সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাওয়ানেহ উমরী মুবারক!

হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বাইয়াত গ্রহণ ও ইলমে তাছাওউফ হাছিল

 

শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার

প্রতি আদব প্রদর্শন

 

ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হাকিমুল হাদীছ, সাইয়্যিদুনা ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ফক্বীহ, সূফী সকলের জন্য উত্তম আদর্শ রেখে গেছেন। তিনি উনার সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার প্রতি যেরূপ আদব-ইহতিরাম প্রদর্শন করেছেন তা সর্বকালে সর্বযুগে সকলের জন্য উত্তম আদর্শ। সুবহানাল্লাহ!

তিনি উনার সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন, ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম জাফর ছাদিক্ব আলাইহিস সালাম উনার মুবারক ছোহবত ইখতিয়ার করার পূর্বেই সারা দুনিয়ায় ইমাম আ’যম তথা সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে মাশহূর হয়েছিলেন। সবাই উনাকে মনে করতেন যে, তিনি সব বিষয়েই পূর্ণ অভিজ্ঞ। সুবহানাল্লাহ!

কিন্তু যখন উনার শায়েখ আলাইহিস সালাম উনার মুবারক ছোহবতে যেতেন তখন তিনি তার কিছুই জাহির (প্রকাশ) করতেন না। অত্যন্ত আদব-ইহতিরামের সাথে শায়েখ আলাইহিস সালাম উনার মুবারক ছোহবতে বসতেন। নিজেকে একান্ত শূন্য বা রিক্ত হস্ত মনে করতেন। কথা-কাজ, আচার-আচরণে তা স্পষ্ট ফুটে উঠতো। শূন্য বা রিক্ত হাতে হযরত শায়েখ আলাইহিস সালাম উনার ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা উচিত তিনি সেটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জানিয়ে দিতেন। সুবহানাল্লাহ!

একদিন হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার শায়েখ সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন, ইমামুল মুত্তাক্বীন, ফখরুল আরিফীন, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক আলাইহিস সালাম উনার মুবারক ছোহবতে বসা ছিলেন। তিনি উনাকে বললেন, হে ইমামে আ’যম! “বলুন তো জ্ঞানী কে?” ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, যিনি ভাল-মন্দের মাঝে তমীজ (পার্থক্য) করতে পারেন তাকে জ্ঞানী মনে করা হয়।

সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন, ইমামুল মুত্তাক্বীন, ফখরুল আরিফীন, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, এই কাজ তো চতুষ্পদ জন্তুও করতে পারে? কারণ, সে তাকে আঘাতকারী এবং পানাহার দানকারীর মধ্যে তমীজ (পার্থক্য) করতে পারে।

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিনীতভাবে আরয করলেন-  আমার সম্মানিত শায়েখ আলাইহিস সালাম! তাহলে জ্ঞানী কে? সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন, ইমামুল মুত্তাক্বীন, ফখরুল আরিফীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি জ্ঞানী যে দুটি ভাল কাজের মধ্যে তমীজ করতে পারেন যে, কোনটি অধিক ভাল। আর দুটি মন্দ কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন যে, অধিক মন্দ কাজ কোনটি। তখন মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াত্ দ্বীন, হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, সত্যি আপনিই “উস্তাযু বিল্লাহ”। তথা মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের খাছ নিছবত-তায়াল্লুকপ্রাপ্ত ও প্রদর্শনকারী মহান শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা। (ইক্বতিরাসূল আনওয়ার- ১৪২, কাশফুল মাহযুব-৯৩)

উল্লেখ্য যে, সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন, ইমামুল মুত্তাক্বীন, ফখরুল আরিফীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ছিলেন মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার লক্ষ্যস্থল। কায়িনাতের সকলেই ছিলেন উনার মুবারক নছীহতের মুহতাজ বা মুখাপেক্ষী। তিনি তদানীন্তন সকল ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদেরকে নছীহত মুবারক করতেন। কখনো সম্মিলিতভাবে কখনো বা ব্যক্তিগতভাবে। সবাই উনার সেই অমূল্য নছীহত মুবারক শোনার জন্য উনার দরবার শরীফ-এ যেতেন। সুবহানাল্লাহ!

ইমামে আ’যম, ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুত্তাক্বীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক ছোহবতের সওগাত হাছিলের জন্য উনার দরবার শরীফ-এ যেতেন। তিনি উনাকেও খাছভাবে নছীহত মুবারক করতেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আমর ইবনে জামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন- একদা আমি, হযরত ইবনে আবী লাইলা রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সিবরামাহ রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন, ইমামুল মুত্তাক্বীন, ফখরুল আরিফীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবার শরীফ-এ গেলাম। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইবনে আবী লাইলা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে লক্ষ্য করে বললেন- আপনার সাথে আগত এই ব্যক্তি সম্পর্কে আপনি কি জানেন? তিনি বললেন- তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সম্মানিত দ্বীনের হুকুম-আহকামের ব্যাপারে অত্যন্ত অভিজ্ঞ। ফিরাসাত বা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন খাছ ইলমে লাদুন্নী (যে ইলিম মহান আল্লাহ পাক তিনি বিনা মধ্যস্থতায় সরাসরি হাদিয়া করেন) প্রাপ্ত অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একথা শুনে বললেন, তিনি কি সম্মানিত দ্বীন উনার হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে ক্বিয়াস করে থাকেন? হযরত আমর ইবনে জামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, হ্যাঁ, তিনি সেরূপ ক্বিয়াসই করে থাকেন যেরূপ ক্বিয়াস করেছিলেন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা।

স্মর্তব্য যে, ইমামুল মুসলিমীন হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিরুদ্ধবাদীরা ইহুদী-নাছারাদের দ্বারা প্রতারিত, গোমরাহ, পথভ্রষ্ট লোকেরা উনার সম্পর্কে অত্যন্ত খারাপ ধারণা পোষন করতো। নাউযুবিল্লাহ! এমনকি তা উনার শায়েখ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকেও অবহিত করেছিলো। সে বিষয়টি মুসলিম উম্মাহ উনাদের কাছে সুস্পষ্ট- পরিষ্কার করার জন্য সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। যার ফলে বিরুদ্ধবাদীদের মুখ থুবড়ে যায়। আর মুসলিম উম্মাহ তাদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পারে।

বর্ণনাকারী বলেন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বললেন- আপনার নাম কি? তিনি বললেন- নু’মান। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন- হে নু’মান! আপনার মাথা মুবারক সম্পর্কে আপনি কি ক্বিয়াস করবেন?

আপনি কি জানেন, কানের ভিতরে তিতা তৈলাক্ততা থাকে কেন? চোখের পানি লবণাক্ত কেন? নাকের ভিতর থেকে গরম বাতাস বের হয় কেন? দুই ঠোঁটের মাঝে মিষ্টতা অনুভব হয় কেন? ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, সম্মানিত শায়েখ, জি না, তা আমার জানা নেই। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আপনি কি জানেন, এমন কোন্ কালিমা আছে, যার প্রথম অংশ কুফরী আর শেষাংশ ঈমান? ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কোন কথা বলার পূর্বেই হযরত ইবনে আবী লাইলা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন- হে আহলে বাইতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি দয়া করে যে সকল প্রশ্ন করলেন তার উত্তর কি হতে পারে তা আমাদেরকে জানান।

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আমার পিতা আমার দাদা থেকে বর্ণনা করেন। মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, মহান আল্লাহ পাক আদম সন্তানের উপর ফযল-করম ও অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের চক্ষুদ্বয়ের পানিকে লবনাক্ত করেছেন। তাদের চক্ষুদ্বয়ে রয়েছে দু’টুকরা চর্বি। যদি সেই পানি লবনাক্ত না হতো তাহলে চক্ষুদ্বয় সুস্থ থাকতে পারতো না। মহান আল্লাহ পাক উনার রহম, করম, দয়া ও ইহসান যে, তিনি কানদ্বয়ের ভিতরে তিতা-তৈলাক্ততার সৃষ্টি করেছেন। যেটা কানের পর্দাস্বরূপ। তিতাযুক্ততার কারণে পোকা-মাকড় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যদি সেই তিক্ততার পর্দা না থাকতো তাহলে কানে কোন পোকা-মাকড় ঢুকলে তা মগজে প্রবেশ করতো। কাজেই, যখন কোন পোকা-মাকড় কানে প্রবেশ করে তখন সেই তিতা তৈলাক্ততার কারণে মগজে প্রবেশ করতে পারে না। তার কারণে ভিতরে অবস্থানও করতে পারে না। বাধ্য হয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজতে থাকে। নাকে ছিদ্রদ্বয়ের দ্বারা গরম বাতাস প্রবাহিত করেছেন। যদি সেখান দিয়ে গরম বাতাস বের না হতো তাহলে মগজ ক্ষতিগ্রস্থ হতো। মহান আল্লাহ পাক তিনি খাদ্য দ্রব্যের স্বাদ গ্রহণের জন্য দুই ঠোঁট দান করেছেন। তা দ্বারা মানুষ খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করে এবং তার স্বাধ আস্বাদন করে।

হযরত আমর ইবনে জামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “হে রসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিস সালাম! আপনি দয়া করে সেই কালিমাটি সম্পর্কে বলুন, যার প্রথমাংশ কুফর এবং শেষাংশ ঈমান।”

সুলতানুল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন, ইমামুল মুত্তাক্বীন, ফখরুল আরিফীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন- যখন বান্দা বলেلَا اِلٰهَ  (লা ইলাহা) তখন সে কুফরী করে। আর যখন বলে اِلَّا اللهُ (ইল্লাল্লাহ) তখন ঈমানদার হয়।

তিনি ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ্ দ্বীন, ইমামে আ’যম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দিকে লক্ষ্য করে আরো বললেন- হে নু’মান বিন ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি! আমার পিতা আমার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “সম্মানিত দ্বীন উনার হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম বাতিল ক্বিয়াস করে স্বীয় মতামত প্রকাশ করেছে ইবলিস। মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে বলেছিলেন যে,

مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ

অর্থ: “আমি তোমাকে সিজদা করতে বললাম, তারপরেও তুমি সিজদা করলে না কেন?” (পবিত্র সূরা আ’রাফ: পবিত্র আয়াত শরীফ১২)

তখন সে বাতিল ক্বিয়াস করে স্বীয় মত পোষণ করতঃ বলেছিল-

أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِـيْ مِن نَّارٍ وَّخَلَقْتَهٗ مِنْ طِيْنٍ

অর্থ: “আমি হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম উনার থেকে উত্তম। কারণ, আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে। আর হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম উনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে।” (পবিত্র সূরা আ’রাফ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১২)

কাজেই, যে ব্যক্তি সম্মানিত দ্বীন উনার হুকুম-আহকামের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনার খিলাফ, মনগড়া ক্বিয়াস করে স্বীয় মত প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাকে মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্বিয়ামতের দিন ইবলিসের সাথী করবেন। কেননা, এ ব্যাপারে সে তাকে অনুসরণ করে বাতিল ক্বিয়াস করেছে। নাউযুবিল্লাহ! (হিলয়াতুল আউলিয়া-৩/২২৯)

কাজেই, এ ব্যাপারে নিজে সাবধান থাকবেন এবং অনুসারীদেরকেও সাবধান থাকার তাকিদ দিবেন।

উল্লেখ্য যে, ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন সাইয়্যিদুনা ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ইমামুল মুসলিমীন’ লক্বব মুবারক দ্বারা সম্বোধন করেছেন। (সুবহানাল্লাহ)। যিনি সেই সময়েও সারা দুনিয়ায় ‘ইমাম আ’যম’ হিসেবে মাশহূর বা বিখ্যাত। এমনকি তিনিই পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের খিলাফ ক্বিয়াসকে পরিত্যাজ্য বলে ফতওয়া দেন। উপরন্তু তিনি যদি যবান খুলেন তাহলে উনার উপর কথা বলার ভাষা কারো নেই। সবাই উনার ইলম ও হিকমতের কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য। সেই মহান ব্যক্তিত্ব তিনি উনার শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সামনে কোন টু শব্দ করলেন না। শুধু অবোধ শিশুর মত বসে মাথা মুবারক নেড়ে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। কেননা সুলতানুল আউলিয়া, ইমামুল মুত্তাক্বীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুস সাদিস মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একদিকে ছিলেন আহলে বাইতে রসূল তথা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বংশধর। অপরদিকে ছিলেন সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা। উভয় দিক দিয়েই তিনি ছিলেন চরম-পরম সম্মানিত, মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব। তাছাড়া তিনি আলোচ্য পবিত্র আয়াত শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের পরিপূর্ণ হক্বদার-মিছদাক ছিলেন। উনি যথাযথভাবে সেগুলো আমল করেছেন।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى

অর্থ: “আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি (উম্মতদেরকে) বলুন, আমি তোমাদের নিকট কোনো প্রতিদান চাই না। (আর তোমাদের পক্ষ্যে তা দেয়াও সম্ভব নয় তবে যেহেতু তোমাদের ইহকাল ও পরকালে নাজাত লাভ করতে হবে, মুহব্বত-মা’রিফাত, রেযামন্দি মুবারক হাছিল করতে হবে সেহেতু), তোমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে- আমার নিকটজন তথা হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম ও আওলাদ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সাথে তোমরা সদাচারণ করবে।”

ইমামুল মুসলিমীন, ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা ছিলেন আহলে বাইত আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্যতম ইমাম। একদিকে শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা অপরদিকে আহলে বাইত শরীফ অলাইহিমুস সালাম। উভয় দিক থেকেই মহাসম্মানের অধিকারী। আহলে বাইত এবং আওলাদে রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি আদব প্রদর্শন করার যে নির্দেশ মুবারক পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফে এসেছে, তা তিনি হুবহু পালন করেছেন তিনি। সুবহানাল্লাহ!

অসমাপ্ত

পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন

পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (পর্ব-১৩)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৫৬

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক উনার ও উনার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে এবং বিশেষ করে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক যারা ভাঙবে, ভাঙ্গার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে বা সমর্থন করবে তাদের প্রত্যেকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া- (পর্ব-১২)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ শরীফ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত, দিন, সময় ও মুহূর্তের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩৮তম পর্ব)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা’ শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খ্বাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের যারা মানহানী করবে, তাদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারা নামধারী মুসলমান হোক বা কাফির হোক অথবা নাস্তিক হোক কিংবা যেকোনো ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন। তাদের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি যারা তাদেরকে সমর্থন করবে, তাদেরও একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ বিষয়ে কারো কোনো প্রকার ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আখাছ্ছুল খাছ সম্মানিত বিশেষ ফতওয়া মুবারক (১১ম পর্ব)