পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৬০

সংখ্যা: ২৮০তম সংখ্যা | বিভাগ:

৩৩তম ফতওয়া হিসেবে

“পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”-

পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

সম্মানিত চার মাযহাব হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী উনাদের সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম উনাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি মুবারক

সম্মানিত শরীয়ত অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের ফায়ছালা মতে প্রত্যেক মুসলমান পুরুষ-মহিলা, জ্বিন-ইনসান সকলের জন্য সম্মানিত চার মাযহাব উনাদের যেকোনো একটি সম্মানিত মাযহাব উনাদের অনুসরণ করা যেরূপ ফরয-ওয়াজিব তদ্রƒপ সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে মাযহাব পরিবর্তন করা বা এক মাযহাবের অনুসারী হয়ে অন্য মাযহাবের উপর আমল করা জায়িয নেই।

এ প্রসঙ্গে মুসলিম শরীফ উনার বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ‘মুসলিম শরীফ উনার’ টিকায় এবং ইমাম তাহাবী ‘দুররুল মুখতার’ কিতাবের হাশিয়াতে লিখেন-

عَلَيْكُمْ يَا مَعْشَرَ الْـمُؤْمِنِيْنَ اِتِّبَاعُ الْفِرْقَةِ النَّاجِيَةِ الْـمُسَمَّاةِ بِأَهْلِ السُّنَّةِ وَالْـجَمَاعَةِ فَأِنَّ نَصْرَةَ اللهِ وَحِفْظَه وَتَوْفِيْقَه فِيْ مُوَافِقَتِهِمْ وَخَذَلًالَّه وَسَخْطَه وَمَقْتَه فِيْ مُـخَالِفَتِهِمْ وَهٰذِهِ الطَّائِفَةُ النَّاجِيَةُ قَدْ اِجْتَمَعَتِ الْيَوْمَ فِيْ مَذْهَبٍ أَرْبَعٍ وَهُمُ الْـحَنَفِيُّوْنَ وَالْـمَالِكِيُّوْنَ وَالشَّفِعِيُّوْنَ وَالْـحَنَبِلِيُّوْنَ رَحِـمَهُمُ اللهُ وَمَنْ كَانَ خَارِجًا مِّنْ هٰذِهِ الْأَرْبَعَةِ فَهُوَ أَهْلُ الْبِدْعَةِ وَالنَّارِ.

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! আপনারা নাজিয়া (নাজাতপ্রাপ্ত) দলকে অনুসরণ করে চলুন যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ নামে মশহূর। কারণ মহান আল্লাহ পাক উনার সাহায্য, হিফাযত ও তাওফীক্ব অর্জন সম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব এবং মহান আল্লাহ পাক উনার অসন্তুষ্টি, গযব ও অপদস্ততা উনাদের সাথে বিরোধিতার কারণেই। আর ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত’ বর্তমান যুগে চার মাযহাবে বিভক্ত। উনারাই হলেন সম্মানিত হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী মাযহাব। আর যারাই বর্তমানে এ ৪ মাযহাব বহির্ভূত তারাই বিদয়াতী ও জাহান্নামী। (তাম্বিহ ৪৬৬ পৃষ্ঠা)

অনুসরণীয় সকল ইমাম মুজতাহিদ উনারা এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, অনুসরণীয় ও গ্রহণযোগ্য মাযহাব হচ্ছে চারটি। ১। হানাফী ২। মালিকী ৩। শাফিয়ী ৪। হাম্বলী।

সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন ইমাম আ’যম ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত মালিকী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত শাফিয়ী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত হাম্বলী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে উনাদের পরিচিতি ও সাওয়ানেহ উমরী মুবারক তুলে ধরা হলো-

সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাওয়ানেহ উমরী মুবারক!

পূর্ব প্রকাশিতের পর

ব্যবসায়িক বৈশিষ্ট্য

যে সব কাজকর্মে, লেন-দেনে ও ক্রয়-বিক্রয়ে পাপের দূরতম কোন সন্দেহ হতো, তা হতে এই মহান ব্যক্তিত্ব সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কঠোরভাবে বেঁচে থাকতেন। যদি কোন ব্যবসায়ের পণ্যে সামান্যতম পাপ বা পঙ্কিলতার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি অনুভব করতেন, তবে তা ফকির ও দুস্থ লোকদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন।

একবার ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি  উনার ব্যবসায়ের অংশীদার হযরত হাফস ইবনে আব্দুর রহমান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বিক্রির জন্য কিছু পণ্য প্রেরণ করেছিলেন। তিনি এটাও বলেছিলেন যে, একটি কাপড়ে ত্রুটি রয়েছে, বিক্রির সময় ক্রেতাকে তা অবশ্যই বলে দিতে হবে এবং কিছু কম নিতে হবে। হযরত হাফস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কাপড়খানা বিক্রি করেছিলেন, কিন্তু ক্রেতাকে কাপড়ের ত্রুটির কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। ক্রেতাও তা অজ্ঞাত ছিল। হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যখন তা অবগত হলেন, তখন সেদিনের পণ্যের সব মূল্য গরীব-দুঃখীকে দান করে দিয়েছিলেন। সুবহানাল্লাহ!

উল্লেখ্য যে, সেদিন উনার বিক্রি হয়েছিল ৩০ হাজার দিরহাম। সুবহানাল্লাহ!

মহান আল্লাহ পাক উনার ভয় ও হালালের উপর সন্তুষ্টি থাকা সত্ত্বেও তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা বিপুলভাবে লাভবান হতেন এবং প্রচুর লাভ করেছিলেন। তদুপরি তিনি এ লভ্যাংশের বিরাট অংশ তদানীন্তন সময়ের ইমাম-মুজতাহিদ এবং আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম তথা যারা ইলিম অন্বেষণ ও প্রচার-প্রসারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন উনাদের খিদমতে হাদিয়া দিতেন।

‘তারিখে বাগদাদ’ কিতাবে উল্লেখ আছে যে, তিনি বাৎসরিক লভ্যাংশ একত্র করতেন এবং তা হতে মুফাসসির, মুহাদ্দিছ তথা শায়েখ উনাদের ভরণ-পোষণের কাজে ব্যয় করতেন। উনাদের জন্য কাপড়-চোপড় এবং সকল প্রয়োজনীয় সামগ্রী খরিদ করতেন। আর অবশিষ্টাংশ উনাদের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন “আপনাদের ইচ্ছানুযায়ী প্রয়োজনে খরচ করবেন। আর এজন্য শুধু মহান আল্লাহ পাক উনার শোকরগুযারী করবেন। মনে করবেন, আমি আপনাদের যা দিলাম, তা আমার পকেট থেকে দেইনি, বরং মহান আল্লাহ পাক তিনিই দিয়েছেন।” কখনও কাউকে বলতেন, মনে করবেন এটা আপনারই টাকা, যা আমার কাছে আমানত ছিল। (তারীখে বাগদাদ, ১৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৬০)

মোটকথা উনার ব্যবসায়ের লভ্যাংশ ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণ এবং ইলমে দ্বীনের অধিকারী ব্যক্তিত্বদেরকে মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্যই ব্যয় হতো।

ব্যক্তিত্ব মুবারক

তিনি উনার বাহ্যিক আচার-আচরণকে অভ্যন্তরীণের মতো সুন্দর ও অমলিন করার একান্ত প্রয়াসী ছিলেন। এ কারণে তিনি উনার পোশাক-পরিচ্ছদের বিষয়েও বিশেষ নজর দিতেন। উনার ব্যবহৃত একখানা চাদরের মূল্যই ছিল চল্লিশ দীনার। তিনি ছিলেন খোশ মেজাজী সুন্দর চেহারা মুবারক ও উন্নত ললাট মুবারক উনার অধিকারী। আতর ও খুশবু অধিক পরিমাণে ব্যবহার করতেন। সুরমা ব্যবহারে খুবই স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। তিনি প্রতিক্ষেত্রে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয়তম হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করতেন। সুবহানাল্লাহ!

ইমাম হযরত আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “তিনি উনার জুতার শুকতলার পর্যন্ত খেয়াল রাখতেন। আর এমন কখনও হয়নি যে, উনার জুতার শুকতলা ছেঁড়া কিংবা ফাটা দেখা গিয়েছে। (আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা-৬১)

ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদেরকে পোশাক-পরিচ্ছদ এবং বাহ্যিক বেশ-ভূষা সুন্দর রাখার জন্য বিশেষ উৎসাহ দিতেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার উনার একজন বন্ধুকে অতি অল্প মূল্যের পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখলেন। যখন তিনি উনার ছোহবত থেকে চলে যাওয়ার মনস্থ করলেন, তখন ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনাকে একটু বসতে বললেন। যখন অপরাপর লোকজন চলে গেলো আর বন্ধুটি একাই রয়ে গেলো। তখন তিনি তাকে বললেন, “আমার জায়নামাযখানা উঠান এবং তার নিচে যা রাখা আছে তা গ্রহণ করুন।” বন্ধুটি জায়নামায উঠিয়ে দেখলেন ওখানে এক হাজার দিরহাম পড়ে আছে। তিনি বললেন, দিরহামগুলো নিন এবং তা দ্বারা নিজের অবস্থার পরিবর্তন করুন। বন্ধুটি বললো, আমি ধনাঢ্য ব্যক্তি, আমার এত প্রয়োজন নেই। ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, আপনি কি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীছ শরীফখানা শুনেননি যে, তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

إِنَّ اللهَ يُـحِبُّ أَنْ يَّرٰى أَثَرَ نِعْمَتَهٗ عَلٰى عَبْدِهٖ

অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার বান্দাদের মাঝে উনার প্রদত্ত নিয়ামতের প্রকাশ দেখলে খুশি হন।” সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র তিরমিযী শরীফ, পবিত্র মিশকাত শরীফ, ইমাম আয’ম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-৪৭)

তারপর তিনি বন্ধুটিকে বিনয়ের সাথে বললেন, “নিজের বেশ-ভূষার পরিবর্তন করুন যাতে বন্ধুজন ও শুভাকাঙ্খীরা আপনাকে দেখে কখনও চিন্তিত না হন। বিরূপ মন্তব্য না করেন।” (তারীখে বাগদাদ ১৩ খণ্ড, ৩৬০ পৃষ্ঠা)

ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি

উনার শিক্ষা ও পাঠদান পদ্ধতি:

হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার ছাত্রদেরকে বর্তমান যুগের ন্যায় গতানুগতিক সবক পড়াতেন না, বরং ইলমী আলোচনা অনুশীলনের ন্যায় পাঠদান করতেন। যে মাসয়ালাটি আলোচনাধীন হতো, তা তিনি ছাত্রদের সামনে তুলে ধরতেন এবং এ বিষয়ে শরয়ী নির্দেশ সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন। ব্যাপক পর্যালোচনা হতো। প্রত্যেক ছাত্রই নিজ নিজ মত উপস্থাপন করতেন। ক্বিয়াসের বিষয়ে ছাত্রগণ উনাদের পূর্ণ অধিকার পেতেন। ইমাম মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণিত যে, এ সব ছাত্র ইজতিহাদে উনার বিপরীত মতও দিতেন। এমনকি দীর্ঘ সময় আলোচনা-পর্যালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হতো।

সার্বিক দিকের উপর গভীর চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের পর ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার নিজের মতামত পেশ করতেন। যা সে ইলমী পর্যালোচনা ও অনুশীলনের ফলাফল এবং খুবই বিশ্লেষণমূলক ও সন্তোষজনক হতো। আর উনার মতামত এত সুন্দর হতো যে, সবাই তা গ্রহণে বাধ্য হতেন এবং সকলের মনোঃপুত হতো। এ ধরনের আলোচনা ও পর্যালোচনা ছাত্র ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ফলদায়ক প্রশিক্ষণ। এতে ছাত্র-শিক্ষক উভয়ই সমপরিমাণ উপকৃত হতেন। এ পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের কারণে তিনি জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত শিক্ষার্থীই থেকে যান এবং উনার ইলিম ও হিকমত এবং চিন্তাধারা উপর্যুপরি উন্নতির সিঁড়ি পার হয়ে যেতে থাকে।

যখন কোন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সামনে আসত, তখনই যে সব আহকামের সাথে তা সম্পর্কিত হতো, তার ইল্লাত এবং বিভিন্ন দিকের উপর চিন্তা করা হতো এবং তার উপর আলোচনা ও পর্যালোচনা শুরু হয়ে যেত। যে সব মাসয়ালা ইল্লাতে মূলের সাথে সম্পর্কিত বা সাদৃশ্যপূর্ণ হতো, তাকে মূলের উপর শাখা-প্রশাখা হিসেবে সাব্যস্ত করা হতো। আর ইহা ছিল ফিক্বহ।

ইলিম অন্বেষণকারী উনাদের সাথে সৌহার্দ্যমূলক আচরণ :

তদানিন্তন সময়ের সকল ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ইলিম ও হিকমত হাছিলের জন্য হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুবারক ছোহবতে আসতেন। তিনি গোঁড়াপন্থী ও অন্ধ অনুকরণপ্রিয় হওয়া থেকে বিরত রাখতেন। উনাদেরকে স্বাধীন মন-মানসিকতাসম্পন্ন পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও ক্বিয়াসের পূর্ণ অনুসরণে সহযোগিতাকারী দেখতে চাইতেন। তিনি তিনটি বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতেন।

১. ইলিম অন্বেষণকারীদেরকে তিনি আর্থিক সাহায্য করতেন। প্রয়োজনীয় সময়ে তাদের পাশে দাঁড়াতেন, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। যার বিবাহের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য ছিলনা, তার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন এবং প্রত্যেক ইলম অন্বেষণকারী উনার সকল প্রকার প্রয়োজন মেটাতেন। এমন একজন শিক্ষার্থী বলেন-

كَانَ يَعْنِـىْ مِنْ عَمَلِهٖ وَيُنْفِقُ عَلَيْهَ وَعَلٰى عِيَالِهٖ فَاِذَا تَعَلَّمَ قَالَ لَقَدْ وَصَلْتَ اِلَى الْغَنِـىِّ الْاَكْبَرِ بِـمَعْرِفَةِ الْـحَلَالِ وَالْـحَرَامِ.

অর্থ: ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার ছোহবত ইখতিয়ারকারী উনাদেরকে চাহিদা থেকে মুখাপেক্ষিহীন করে দিতেন এবং তার ও তার পরিবার-পরিজনের জন্য সম্পদ ব্যয় করতেন। যখন শিক্ষার্থী জ্ঞান অন্বেষণ শেষ করতো, তখন বলতেন: হালাল ও হারাম সম্পর্কে জানার কারণে তুমি সম্পদশালী হয়ে গেলে।

২. তিনি উনার অনুসারীদের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখতেন। যদি কারো মাঝে ইলিম অর্জনের অনুভূতির সাথে অহঙ্কারের নমুনা দেখতে পেতেন, তবে তা বিভিন্ন হিকমত বা কৌশলের মাধ্যমে দূরীভূত করতেন। তাকে বিশ্বাস করাতেন যে, অর্জন করতে হলে তোমাকে অপরের মুখাপেক্ষী হতেই হবে।

বর্ণিত আছে যে, উনার স্নেভাজন অনুসারী কাযী আবূ ইউসূফ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মনে মনে অনুভব করলেন যে, এখন উনাকে পৃথকভাবে নিজের ‘হালকায়ে দরস’ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার একজন সাথীকে বললেন যে, হযরত আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মজলিসে গিয়ে জিজ্ঞেস কর যে, এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

সে লোকটি হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরসে গেল এবং মাসয়ালাটি জিজ্ঞেস করল। হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। লোকটি বলল, আপনি ভুল করলেন। হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, “সে পারিশ্রমিক পাবে না।” লোকটি বললেন, “আপনি এবারও ভুল করলেন।” হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সাথে সাথে উঠে গিয়ে হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে হাযির হলেন। হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, সম্ভবত আপনি ধোপার মাসয়ালার বিষয়ে এসেছেন। হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, জ্বি; হ্যাঁ। আমাকে মাসয়ালাটি অবহিত করুন। তিনি বললেন, যদি ধোপা এ কাপড়খানা আত্মসাৎ করার পর ধৌত করে থাকে, তবে সে পারিশ্রমিক পাবে না। কেননা সে নিজের ব্যবহারের জন্য কাপড়খানা ধৌত করেছিল। আর যদি আত্মসাৎ করার পূর্বেই ধৌত করে থাকে, তবে সে পারিশ্রমিক পাবে। কেননা, সে কাপড়খানা প্রকৃত মালিকের জন্য ধৌত করেছিল।

হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে পদ্ধতিতে শিক্ষাদানে অভ্যস্ত ছিলেন, তাতে এ ধরনের সতর্কতা অবলম্বন অবশ্য কর্তব্য ছিল। কেননা পাঠদানের সময়ে পরস্পর আলোচনা ও পর্যালোচনায় দুর্বল চিত্তের মাঝে অহঙ্কারবোধ সৃষ্টি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান যে, সেও নিজেকে উস্তাদের সমকক্ষ বা সমপর্যায়ের ভাবতে শুরু করতে পারে, যেটা তার জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং প্রয়োজন ছিল যে, এমন ব্যক্তিদেরকে তাদের অসার কল্পনা ও জীবন নষ্টকারী বিষয়সমূহ পরিহারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক জ্ঞান আহরণ বা চর্চা পরিপূর্ণ ও শেষ করার বাস্তব অনুভূতি জাগিয়ে দেয়া। আর তার কাছে স্পষ্ট করে তোলা যে, এখন পর্যন্ত সে জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে বিশেষ কোন মর্যাদাপূর্ণ স্থান লাভ করতে পারেনি।

৩. তিনি শিক্ষার্থীদেরকে উপদেশ দিতেন। বিশেষত তাদেরকে, যারা তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে চাইতেন অথবা যারা বড় হওয়ার জন্য প্রাণপণ কোশেশ করতেন।

আল্লামা হযরত মাক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং ইবনে বাযযাযীর ‘মানাকিব’- কিতাবে উনার অত্যন্ত মূল্যবান উপদেশ বর্ণিত আছে। সে উপদেশসমূহ, যা তিনি হযরত ইমাম ইউসুফ ইবনে খালিদ সিমতী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম নূহ ইবনে আবূ মরিয়ম রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম কাযী আবূ ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং অপরাপর ছাত্রদের জন্য লিখেছেন।

মোদ্দাকথা: হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার ছাত্রদেরকে অত্যন্ত মুহব্বত করতেন ও উনাদের প্রতি তীক্ষè দৃষ্টি রাখতেন। তিনি স্বয়ং বলতেন-

اَنْتُمْ مَسَارُ قَلْبِـىْ وَجَلَاءُ حُزَنِـىْ.

অর্থ : “তোমরা হলে আমার হৃদয়ের প্রশান্তি এবং হৃদয়ের চিন্তামুক্তির কারণ।”

বিশিষ্ট বুযূর্গ হযরত দাউদ তাঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইলম ও হিকমত অর্জন শেষ করে প্রখ্যাত আলিম ও বুযূর্গ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি উনার শায়েখ ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে আরয করলেন, “আমি এখন কি করবো?”

জাওয়াবে ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন,

عَلَيْكَ بِالْعَمَلِ فَاِنَّ الْعِلْمَ بِلَا عَمَلٍ كَالْـجَسَدِ بِلَا رُوْحٍ

অর্থ : “এখন আপনার দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে আমল করা। কেননা, আমলবিহীন ইলম রূহ বা আত্মাবিহীন দেহের মতো।” (কাশফুল মাহযূব-১১৬)

হযরত ইমাম দাউদ তাঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এটাও বলেছেন, “আমি একাধারে বিশ বছর ইমামে আ’যম হযরত রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে ছিলাম। উনার প্রতি আমার গভীর লক্ষ্য ছিল। উনার আমল-আখলাক্ব, রীতি-নীতি মুবারক, সীরাত-ছূরত মুবারক উনার প্রতি বিশেষ নজর রাখতাম। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি উনাকে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে খালি মাথায় বসে থাকতে কখনো দেখিনি। তাছাড়া দেহ মুবারক অবসাদজনিত কারণেও কোন দিন পা মুবারক ছড়িয়ে বসেননি। একবার আমি উনাকে বললাম, হুযূর! বেয়াদবি ক্ষমা চাই। যেখানে লোকজন নেই সেখানে একটু পা মুবারক ছড়িয়ে ইতমিনানের সাথে বসলে তা এমনকি দোষের হবে?

জাওয়াবে ইমামুল মুসলিমীন, ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “এমন স্থানেও মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে আদব রক্ষা করা উচিত।” সুবহানাল্লাহ! (তাযকিরাতুল আওলিয়া-১/২১২)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার

সাথে তায়াল্লুক-নিসবত মুবারক

মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে যার যত গভীর তায়াল্লুক-নিসবত বা সম্পর্ক মুবারক তিনি তত বেশি মর্যাদা-মর্তবা, বুযুর্গী ও সম্মানের অধিকারী। ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে ছিলেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার গভীর ও বেমেছাল তায়াল্লুক-নিসবত মুবারক। সুবহানাল্লাহ!

তাযকিরাতুল আউলিয়া ১/২০৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, একদিন মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, ইমামে আ’যম, সাইয়্যিদুনা ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র রওজা শরীফ উনার নিকট উপস্থিত হয়ে উনাকে সম্বোধন করে বললেন-

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا سَيِّدَ الْـمُرْسَلِيْنَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

অর্থাৎ ইয়া সাইয়্যিদাল মুরসালীন ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার উপর সালাম বা শান্তি বর্ষিত হউক।

তখন পবিত্র রওজা শরীফ থেকে মুবারক জাওয়াব ভেসে আসলো-

وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ يَا اِمَامَ الْـمُسْلِمِيْنَ

অর্থাৎ “হে মুসলমানগণের ইমাম! আপনার উপরও সালাম বা শান্তি বর্ষিত হোক।” সুবহানাল্লাহ!

শায়খুল মাশায়িখ হযরত দাতা গঞ্জে বখশ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিখ্যাত কিতাব “কাশফুল মাহযুব” ১১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন- ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হাকিমুল হাদীছ, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হলেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত উনাদের ইমাম। তিনি সমস্ত ইমামগণের ইমাম, ফকীহগণের শিরোমণি এবং আলিমগণের মাথার তাজ বা মুকুট। তিনি আহলে তরীক্বতের বড় মর্যাদাসম্পন্ন বুযর্গ ছিলেন। তিনি সৃষ্টির নিকট সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি পাওয়ার কোন আমলই করতেন না। প্রথম জীবনে তিনি নির্জনতা অবলম্বনের ইচ্ছা পোষন করেন। কিন্তু একদিন স্বপ্নে দেখলেন যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে খেতাব বা সম্বোধন করে বলছেন, “ওহে আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি!  মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে আমার সুন্নাত মুবারক জিন্দা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। কাজেই, নির্জনতা অবলম্বন করা হতে বিরত থাকুন। (তাযকিরাতুল আউলিয়া-১/২১০, কাশফুল মাহযূব-১১২)

এক রাতে স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র রওযা শরীফ থেকে উনার পবিত্র হাড় মুবারক সংগ্রহ করছেন এবং একখানা আর একখানা থেকে পৃথক করছেন। এরূপ আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখে তিনি ভয়ে অস্থির হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। অত:পর স্বপ্নের বিখ্যাত তা’বীর বিশারদ (ব্যাখ্যাকার) আল্লামা ইমাম ইবনে সিরীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার একজন মুরীদ বা ছাত্রের কাছে গিয়ে তার অর্থ জিজ্ঞাসা করলেন। জাওয়াবে তিনি বললেন, এ স্বপ্নের তা’বীর বা ব্যাখ্যা হচ্ছে, আপনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইলিম বা জ্ঞানরাজি তথা ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে হাদীছ শরীফ উনার এরূপ অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন যে, উক্ত বিষয়ে  শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার হিসেবে পরিগণিত হবেন। সত্যকে অসত্য হতে পৃথক করার ক্ষমতা মহান আল্লাহ পাক আপনাকে দান করবেন।” সুবহানাল্লাহ! (তাযকিরাতুল আওলিয়া-১/২০৯, কাশফুল মাহযূব-১১২)

ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ফতওয়া দিলেন যে, চার রাকায়াত বিশিষ্ট ফরয নামায উনার দ্বিতীয় রাকাআতে তাশাহুদ পাঠ করার পর আর কিছু পাঠ করা যাবে না। তাশাহুদ পাঠ করার পর কেউ যদি দুরূদ শরীফ পাঠ করতে শুরু করে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক পাঠ করে, তাকে সাহু সিজদা করতে হবে। আর যদি নাম মুবারক পাঠ না করে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে তাকে সাহু সিজদা দিতে হবে না। এই ফতওয়া যেদিন তিনি দিলেন, সেই রাতে তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশেষ সাক্ষাত মুবারক লাভ করলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বললেন, আমার নাম মুবারক উচ্চারণ করলে সাহু সিজদা দিতে হবে, এটা কেমন কথা? তখন সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি চাইনা কেউ আপনার মহান নাম মুবারক গাফলতির সাথে স্মরণ করুক। উনার জাওয়াব শুনে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অত্যধিক খুশি হলেন। সুবহানাল্লাহ!  (আল বাইয়্যিনাত শরীফ-২২১/১০২ পৃ.)

তাক্বওয়া বা পরহেযগারিতা

তাক্বওয়া বা মহান আল্লাহ পাক উনার ভীতি হচ্ছে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার মূল। যিনি যতবেশি তাক্বওয়া উনার অধিকারী তিনি তত বড় আলিম। মহান আল্লাহ পাক এবং উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রিয় বা নৈকট্যপ্রাপ্ত। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اِنَّ اَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ اَتْقَاكُمْ

অর্থ : “তোমাদের মধ্যে যিনি সর্বাধিক তাক্বওয়া উনার অধিকারী তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট সর্বাপেক্ষা সম্মানিত।” (পবিত্র সূরা হুজুরাত শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৩)

ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হাকীমুল হাদীছ, সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন সে যুগের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ তাক্বওয়া উনার অধিকারী। এমনকি মুত্তাক্বীনগণ উনাদের ইমাম তথা ইমামুল মুত্তাক্বীন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এক ব্যক্তি ইমামুল মুসলিমীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছ থেকে কিছু টাকা কর্জ নিয়েছিল। লোকটি যে গ্রামের অধিবাসী ছিল ঘটনাক্রমে সে গ্রামে ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার একজন মুরীদ বা ছাত্র ইন্তিকাল করেন। সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তার জানাযার নামায আদায়ের জন্য সেখানে তাশরীফ নিলেন। দ্বিপ্রহরের প্রচ- রোদের তাপে সকলের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল। সেখানে সেই কর্জ গ্রহণকারী ব্যক্তির দালানের ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়ার ব্যবস্থা ছিলনা। যার কারণে উপস্থিত মুরীদণ্ডমু’তাকিদ মুহিব্বীনগণ উনাকে সেই ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলেন। তিনি বললেন, এ দালানের মালিক আমার নিকট থেকে টাকা কর্জ নিয়েছে। কাজেই তার দালানের ছায়া দ্বারা ফায়দা হাছিল করা ঠিক হবেনা। যেহেতু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “কাউকে কিছু ধার দিয়ে তার থেকে কোন উপকার গ্রহণ কর না।” অতএব, আমি তা করলে আমার জন্য তা সুদ গ্রহণের অনুরূপ হবে। সুবহানাল্লাহ! (তাযকিরাতুল আউলিয়া-১/২১২)

বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ও ইমাম হযরত ইয়াজিদ ইবনে হারুন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “আমি এক হাজার শায়েখ বা উস্তাদ থেকে ইলম হাছিল করেছি ও লিখেছি; মহান আল্লাহ পাক উনার শপথ! উনাদের মাঝে হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে অধিক মুত্তাক্বী বা পরহেযগার এবং স্বীয় যবান মুবারক উনার হিফাযতকারী আমি কাউকে দেখিনি।” (মানাকিবে মাওফাক-২/১৯৫, ইমামুল মুহাদ্দিছীন-৭৮)

হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র বাইতুল্লাহ শরীফ উনার হজ্জ শেষে যখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র শহরে পৌঁছলেন, তখন সেখানেও উনার অনুসারীগণ উনাদের এক জামায়াত উনার দরসে একত্রিত হয়েছিলেন। সেখানে ঊনিশ দিন অতিবাহিত হয়। হঠাৎ একদিন তিনি শিশুদের মতো কাঁদতে শুরু করে দিলেন যে, আমি আর এখানে থাকতে পারছি না, আমি পবিত্র মদীনা শরীফ উনার যমীন থেকে বাইরে চলে যেতে চাই। উনার অনুসারী ও মুহব্বতকারীগণ চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলেন এবং আরজু করলেন-

اَتَبْكِىْ اَنْتَ يَا سَيِّدَنَا بِقِيَامِ الْـمَدِيْنَةِ

অর্থ: “হে আমাদের শায়েখ! আমাদের উস্তাদ! কোন বিষয় আপনাকে কাঁদাচ্ছে? পবিত্র মদীনা শরীফ-এ থাকা কি আপনার জন্য কষ্টকর হচ্ছে? যখন কিনা আপনিই এই তা’লীম দিয়েছেন যে, পবিত্র মদীনা শরীফ-এ যতদিন থাকবে, গণীমত মনে করবে, সৌভাগ্যের কারণ মনে করবে।”

তিনি বললেন, ব্যাপারটা এরকম নয়; বরং এটা গোপন বিষয় ছিল, যা তোমাদের কাছে আমি এতদিন গোপন রেখেছিলাম। আর যখন তোমরা জিজ্ঞাসাই করেছ, তাহলে শোনো। এ পবিত্র যমীন, যা হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের গর্ব এবং পবিত্র গুণের আত্মা মুবারক উনাদের আবাসস্থল, এই স্থান লৌহ, কলম, আরশ, কুরসী থেকেও উত্তম, উন্নত ও মর্যাদাসম্পন্ন; আমি এ পবিত্র যমীনে, জরুরত সারিনি, ইস্তিঞ্জা করিনি। আরো শুকরিয়া যে, আমি পুরা ঊনিশ দিন ওযুর সাথে রয়েছি, এক পলকের জন্যও শুইনি, পুরা চব্বিশ ঘণ্টার মাঝে একটি অথবা দুটি খেজুর খেয়েছি এবং সামান্য পবিত্র যমযম উনার পানি পান করেছি, একমাত্র এই ছিল আমার খাদ্য। এ পর্যন্ত আমি নিজেকে আয়ত্তে রেখেছি এখন আমার পক্ষে এখানে অবস্থান করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাকে তাড়াতাড়ি করে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার হেরেম শরীফ থেকে বাইরে নিয়ে চলো।

আল্লাহু আকবার! কী পরিমাণ তাক্বওয়া-পরহেযগারিতার অধিকারী ছিলেন তিনি। কিরূপ কষ্টকর রিয়াযত-মাশাক্কাত ও পূর্ণাঙ্গ মুজাহাদা করেছিলেন তিনি। তাক্বওয়া ও পবিত্রতা, ভীতি ও সচেতনতা, আদব ও সাধনার কি এর চেয়ে উত্তম কোন মিছাল বা দৃষ্টান্ত হতে পারে? (ইমামুল মুহাদ্দিছীন-১০০)

অসমাপ্ত-পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন।

পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (পর্ব-১৩)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৫৬

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক উনার ও উনার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে এবং বিশেষ করে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক যারা ভাঙবে, ভাঙ্গার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে বা সমর্থন করবে তাদের প্রত্যেকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া- (পর্ব-১২)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ শরীফ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত, দিন, সময় ও মুহূর্তের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩৮তম পর্ব)

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা’ শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খ্বাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের যারা মানহানী করবে, তাদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারা নামধারী মুসলমান হোক বা কাফির হোক অথবা নাস্তিক হোক কিংবা যেকোনো ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন। তাদের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি যারা তাদেরকে সমর্থন করবে, তাদেরও একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ বিষয়ে কারো কোনো প্রকার ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আখাছ্ছুল খাছ সম্মানিত বিশেষ ফতওয়া মুবারক (১১ম পর্ব)