পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৫৮

সংখ্যা: ২৭৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

৩৩তম ফতওয়া হিসেবে

“পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”- পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

সম্মানিত চার মাযহাব হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী উনাদের সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম উনাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি মুবারক

সম্মানিত শরীয়ত অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের ফায়ছালা মতে প্রত্যেক মুসলমান পুরুষ-মহিলা, জ্বিন-ইনসান সকলের জন্য সম্মানিত চার মাযহাব উনাদের যেকোনো একটি সম্মানিত মাযহাব উনাদের অনুসরণ করা যেরূপ ফরয-ওয়াজিব তদ্রুপ সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে মাযহাব পরিবর্তন করা বা এক মাযহাবের অনুসারী হয়ে অন্য মাযহাবের উপর আমল করা জায়িয নেই।

এ প্রসঙ্গে মুসলিম শরীফ উনার বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ‘মুসলিম শরীফ উনার’ টিকায় এবং ইমাম তাহাবী ‘দুররুল মুখতার’ কিতাবের হাশিয়াতে লিখেন-

عَلَيْكُمْ يَا مَعْشَرَ الْـمُؤْمِنِيْنَ اِتِّبَاعُ الْفِرْقَةِ النَّاجِيَةِ الْـمُسَمَّاةِ بِأَهْلِ السُّنَّةِ وَالْـجَمَاعَةِ فَأِنَّ نَصْرَةَ اللهِ وَحِفْظَه وَتَوْفِيْقَه فِيْ مُوَافِقَتِهِمْ وَخَذَلًالَّه وَسَخْطَه وَمَقْتَه فِيْ مُـخَالِفَتِهِمْ وَهٰذِهِ الطَّائِفَةُ النَّاجِيَةُ قَدْ اِجْتَمَعَتِ الْيَوْمَ فِيْ مَذْهَبِ أَرْبَعٍ وَهُمُ الْـحَنَفِيُّوْنَ وَالْـمَالِكِيُّوْنَ وَالشَّفِعِيُّوْنَ وَالْـحَنَبِلِيُّوْنَ رَحِـمَهُمُ اللهُ وَمَنْ كَانَ خَارِجًا مِّنْ هٰذِهِ الْأَرْبَعَةِ فَهُوَ أَهْلُ الْبِدْعَةِ وَالنَّارِ.

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! আপনারা নাজিয়া (নাজাতপ্রাপ্ত) দলকে অনুসরণ করে চলুন যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ নামে মশহূর। কারণ মহান আল্লাহ পাক উনার সাহায্য, হিফাযত ও তাওফীক্ব অর্জন সম্মানিত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব এবং মহান আল্লাহ পাক উনার অসন্তুষ্টি, গযব ও অপদস্ততা উনাদের সাথে বিরোধিতার কারণেই। আর ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত’ বর্তমান যুগে চার মাযহাবে বিভক্ত। উনারাই হলেন সম্মানিত হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী মাযহাব। আর যারাই বর্তমানে এ ৪ মাযহাব বহির্ভূত তারাই বিদয়াতী ও জাহান্নামী। (তাম্বিহ ৪৬৬ পৃষ্ঠা)

অনুসরণীয় সকল ইমাম মুজতাহিদ উনারা এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, অনুসরণীয় ও গ্রহণযোগ্য মাযহাব হচ্ছে চারটি। ১। হানাফী ২। মালিকী ৩। শাফিয়ী ৪। হাম্বলী।

সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন ইমাম আ’যম ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত মালিকী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত শাফিয়ী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

সম্মানিত হাম্বলী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি।

নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে উনাদের পরিচিতি ও সাওয়ানেহ উমরী মুবারক তুলে ধরা হলো-

সম্মানিত হাম্বলী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক

নাম মুবারক ও বংশ পরিচয়:

নাম মুবারক : আহমদ,

পিতা উনার নাম: মুহাম্মদ,

দাদা উনার নাম হাম্বল: উপনাম: আবূ আব্দুল্লাহ।

বংশ পরিচয় : হযরত আহমদ বিন মুহম্মদ বিন হাম্বল বিন হিলাল বিন আসাদ বিন ইদ্রীস আশ্শায়বানী, আল-মারওয়ায়ী আল-বাগদাদী। উনার ১৩তম পূর্ব পুরুষ শায়বান এর দিকে সম্পৃক্ত করায় আশ শায়বানী, উনার জন্মভূমি মুরউ এর দিকে সম্পৃক্ত করায় আল-মারওয়ায়ী, অতঃপর উনার অবস্থান বাগ্দাদ এর দিকে সম্পৃক্ত করায় আল বাগ্দাদী …. ।

বিলাদত শরীফ ও প্রতিপালন : ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ১৬৪ হিজরীর মহাপবিত্র রবীউল আউয়াল শরীফ শরীফ মাসে মুরউতে পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বলেন তিনি মায়ের রেহেম শরীফে থাকা অবস্থায় মুরউ হতে বাগদাদে আসেন অতঃপর বাগদাদে পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। ছোট কালেই উনার সম্মানিত পিতা তিনি ইন্তেকাল করেন ফলে তিনি ইয়াতীম অবস্থায় সম্মানিত মাতা উনার কাছে লালিত-পালিত হন।

শিক্ষা জীবন: সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছোট বয়সেই শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রখর মেধাশক্তিসম্পন্ন ছিলেন। অতি সহজেই অনেক কিছু মুখস্ত করে ফেলতেন।

ইব্রাহীম আল হারবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “মনে হয় যেন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে আদি-অন্তের সকল প্রকার জ্ঞান দান করেছেন।” সুবহানাল্লাহ!

শিক্ষা সফর : জ্ঞান পিপাসু ইমামুস সুন্নাহ্ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বাগদাদের উল্লেখযোগ্য সকল আলিম থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর বিভিন্ন প্রান্তে জ্ঞান আহরণে ছুটে চলেন। তিনি সফর করেন কুফা, বসরা, পবিত্র মক্কা শরীফ, পবিত্র মদীনা শরীফ, ত্বারতুস, দামেস্ক, ইয়ামান, মিসর ইত্যাদি অঞ্চলে। তিনি পাঁচবার পবিত্র হজ্জ আদায় করেন তন্মধ্যে তিনবার পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ্জ পালন করেন। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার খিদমত: পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার জগতে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। উনার পবিত্র হাদীছ শরীফের পারদর্শিতা সম্পর্কে এক কথায় বলা যায় তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার এক বিশাল সাগর।

ইমাম আব্দুল ওয়াহ্হাব আল ওয়াররাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মত আর কাউকে দেখিনি, উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আপনি অন্যের চেয়ে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাঝে জ্ঞান-গরিমা বা মর্যাদা বেশী কি পেয়েছেন? তিনি বললেন : সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এমন একজন ব্যক্তি যাকে ৬০,০০০ (ষাট হাজার) প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি সকল প্রশ্নের জবাবে হাদ্দাছানা ওয়া আখবারানা অর্থাৎ পবিত্র হাদীছ শরীফ হতে জবাব দিয়েছেন অন্য কিছু বলেননি।” সুবহানাল্লাহ!

অতএব এক বাক্যে বলা যায় যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সাগর ছিলেন। এ ছাড়াও এর জলন্ত প্রমাণ হলো উনার সংকলিত সুপ্রসিদ্ধ হাদীছ শরীফ গ্রন্থ “আল মুসনাদ শরীফ” যার পবিত্র হাদীছ শরীফ সংখ্যা চল্লিশ হাজার। সুবহানাল্লাহ!

অতএব পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার জগতে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। পবিত্র হাদীছ শরীফ শাস্ত্রে মুসতালাহ, ঈলাল, আসমাউর রিজাল, জারাহ-তাদীল ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে উনার অসামান্য কৃতিত্ব বিদ্যমান রয়েছে। পবিত্র হাদীছ শরীফ শিক্ষাদানেও উনার কৃতিত্ব অতুলনীয়, উনার একেক মজলিসে পাঁচ হাজারেরও অধিক ছাত্র অংশ গ্রহণ করত। সুবহানাল্লাহ!

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত উনার ইমাম: সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। কিন্তু প্রকাশ্যভাবে পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাকে আঁকড়ে ধরা হতে সামান্যতম ছাড় দিতে প্রস্তুত নন। প্রয়োজনে জীবন যেতে পারে তবুও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনার অনুসরণ বর্জন হতে পারে না। ইমাম ইসহাক বিন রাহুয়াহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন : “যদি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি না হতেন এবং উনার ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকার না হত তাহলে ইসলাম বিনাশ হয়ে যেত, অর্থাৎ যখন সকলেই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় পবিত্র কুরআন শরীফ উনাকে মাখলুক হিসাবে স্বীকার করে নিল, তখন পৃথিবীর বুকে একজনই মাত্র সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার সঠিক বিশ্বাস ধারণ করেছিলেন, তিনিই হলেন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক তিনি  উনার মাধ্যমেই সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার সঠিক আক্বীদাহ্ বিশ্বাসকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। সুবহানাল্লাহ!

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে চলে আসা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার সঠিক বিশ্বাস: “পবিত্র কুরআন শরীফ মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম, কোন সৃষ্ট বস্তু নয়।” কিন্তু জাহমিয়া ও মু’তাযিলাদের আবির্ভাবে এ বিশ্বাসে বিকৃতি ঘটানো হয়। শুরু হয় “পবিত্র কুরআন মাখলূক্ব বা সৃষ্ট বস্তু” এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রচারণা। এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে আব্বাসীয় তথাকথিত খলীফা হারুনুর রশীদ এবং পরবর্তী তথাকথিত খলীফা মামুনুর রশীদ প্রভাবিত হলো এ ভ্রান্ত বিশ্বাসে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা হল সকলকে বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, “পবিত্র কুরআন শরীফ মাখলূক্ব বা সৃষ্ট বস্তু, এ বিশ্বাসের কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারবে না। নাউযুবিল্লাহ! বাধ্য হয়ে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় প্রায় সকলেই ঐক্যমত পোষণ করলো। শুধুমাত্র দু’জন দ্বিমত পোষণ করেন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি ও মুহম্মদ বিন নূহ রহমতুল্লাহি আলাইহি। নির্দেশ দেয়া হল উনাদেরকে গ্রেফতার করার জন্য। গ্রেফতার করে আনার পথে জুলুমের কারণে মুহম্মদ বিন নূহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইন্তেকাল করেন। আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি দু’য়া করেছিলেন যেন তথাকথিত খলীফা মামুনের সাথে সাক্ষাৎ না হয়। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে কারাবাস দেয়া হয়। নাউযুবিল্লাহ! প্রায় আটাশ (২৮) মাস কারাগারে আবদ্ধ হয়ে থাকলেন তিনি এবং তথাকথিত খলীফা মু‘তাসিম এর নির্দেশে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ না করায় বেত্রাঘাত করা হয়। হাত বেঁধে নিষ্ঠুরভাবে কোড়াঘাত করা হয়। নাউযুবিল্লাহ! কোড়াঘাতে রক্ত ঝড়তে থাকে, গায়ের কাপড় পর্যন্ত রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। নাউযুবিল্লাহ! জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আবার জ্ঞান ফিরলে জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসে একমত কিনা? একমত না হলে আবার কোড়াঘাত শুরু হয়। এভাবে নির্মম নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হন। এর কারণ শুধু একটিই তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের অনুসারী এবং বিদয়াতী বিশ্বাস বর্জনকারী। পরিশেষে খলীফা আল মুতাওয়াক্কিল তিনি সঠিক বিষয় উপলব্ধি করে গোটা মুসলিম জাহানে হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত অনড়, অটল একক ব্যক্তি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে কারামুক্ত করেন এবং উনাকে যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করেন।

আক্বীদাহ্-বিশ্বাস : পৃথিবীর বুকে যখন ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সকলেই মু’তাযিলাদের বাতিল আক্বীদাহ-বিশ্বাস করে তখন একক ব্যক্তি যিনি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ ছহীহ হাদীছ শরীফ উনার আলোকে সঠিক আক্বীদাহ্ বিশ্বাসের উপর অটল ছিলেন। এমনকি নির্মম, নিষ্ঠুর নির্যাতনেও তিনি সঠিক আক্বীদাহ হতে সামান্যতমও বিচ্যুত হননি। সুতরাং একবাক্যে বলা যায় যে, তিনি সঠিক আক্বীদায় শুধু বিশ্বাসী নয় বরং সঠিক আক্বীদায় বিশ্বাসীদের অন্যতম ইমাম ছিলেন। সুবহানাল্লাহ!

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শিক্ষকবৃন্দ : সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বাগদাদসহ গোটা মুসলিম জাহানের প্রায় সকল শিক্ষা কেন্দ্রে জ্ঞানের সন্ধানে বিচরণ করেন। ফলে উনার শিক্ষক হাতে গণা কয়েকজন হতে পারে না বরং উনার শিক্ষক অগণিত ও অসংখ্য। ইমাম যাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন : সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “মুসনাদে আহমদ” গ্রন্থের পবিত্র হাদীছসমূহ যে সব শিক্ষক হতে গ্রহণ করেন উনাদের সংখ্যা হলো দুইশত তিরাশি (২৮৩) জন। সুবহানাল্লাহ!

এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে বহু সংখ্যক শিক্ষক রয়েছেন। নিম্নে উনাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হল।

(১) ইমাম সুফইয়ান বিন উয়ায়নাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি।

(২) ইমাম ওয়াকী বিন আল জাররাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি।

(৩) ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস আশ্শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

(৪) ইমাম আব্দুর রাযযাক আস সানআনী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

(৫) ইমাম কুতাইবাহ বিন সাঈদ রহমতুল্লাহি আলাইহি।

(৬) ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

(৭) ইমাম ইবনু আবী শাইবাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ।

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ছাত্র বৃন্দ: সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ছাত্র অগণিত হওয়াই স্বাভাবিক। উনাদের সংখ্যাও গণনা সম্ভব নয় এবং তালিকাও বর্ণনা সহজ নয়। যিনি লক্ষাধিক পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের হাফিয, চল্লিশ হাজার পবিত্র হাদীছ শরীফ সঙ্কলিত হয়েছে এমন গ্রন্থের সংকলক উনার ছাত্র বিশ্বজুড়ে হওয়াই স্বাভাবিক । যার মাজলিসে পাঁচ হাজার পর্যন্ত ছাত্র থাকত। নিম্নে কয়েকজন নক্ষত্রতুল্য ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হল।

১. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল আল বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

২. ইমাম মুসলিম বিন হাজ্জাজ আল কুশায়রী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

৩. ইমাম আবূ দাঊদ আস সিজিস্তানী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

৪. ইমাম আবূ ঈসা আত্তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

৫. ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আননাসাঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি।

৬. ইমাম ছালিহ বিন আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি।

৭. ইমাম আব্দুল্লাহ্ বিন আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ।

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রচনাবলী : প্রসিদ্ধ চারজন ইমাম উনাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশী গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি হলেন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি। সুবহানাল্লাহ! শুধু তাই নয় বরং উনার সংকলিত পবিত্র হাদীছ শরীফ গ্রন্থ ‘মুসনাদ’ সর্ব প্রসিদ্ধ। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ নিম্নে বর্ণনা করা হলো।

১. পবিত্র হাদীছ শরীফ গ্রন্থ ‘আল মুসনাদ’ (হাদীছ সংখ্যা চল্লিশ হাজার)।

২. আযযুহ্দ।

৩. ফাদ্বায়িলুছ ছাহাবাহ।

৪. আল ঈলাল ওয়া মারিফাতির রিজাল।

৫. আল ওয়ার।

৬. কিতাবুছ ছলাত।

৭. আর রদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ।

৮. রিসালাতু ইমাম আহমদ।

৯. আল মাসায়িল।

১০. আহ্কামুন নিসা।

১১. কিতাবুল মানাসিক।

১২. কিতাবুস্সুন্নাহ, ইত্যাদি।

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে আলিম সমাজের প্রশংসা :

(১) ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন : মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পর দু’জন ব্যক্তির মাধ্যমেই সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একজন হলেন- হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম। যার মাধ্যমে মুরতাদ ও ভন্ড নবীদের দমন করেছেন। আর অপরজন হলেন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি। যার মাধ্যমে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মানহানীর সময় পবিত্র কুরআন শরীফ উনাকে সমুন্নত করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

(২) ইমাম আব্দুল ওয়াহ্হাব আল ওয়াররাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন : “আমি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মত আর কাউকে দেখিনি, উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আপনি অন্যের চেয়ে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাঝে জ্ঞান-গরিমার বা মর্যাদার বেশী পেয়েছেন কি? তিনি বললেন : সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এমন একজন ব্যক্তি যাকে ৬০,০০০ (ষাট হাজার) প্রশ্ন করা হল, তিনি সকল প্রশ্নের জবাবে হাদ্দাছানা ওয়া আখ্বারানা অর্থাৎ শুধু পবিত্র হাদীছ শরীফ হতে জবাব দিয়েছেন অন্য কিছু বলেনননি। সুবহানাল্লাহ!

(৩) সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমি বাগদাদ হতে বের হয়ে ইমাম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার চেয়ে অধিক আল্লাহভীরু, তাক্বওয়াশীল, ফাক্বীহ ও জ্ঞানী আর কাউকে পাইনি। সুবহানাল্লাহ!

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পবিত্র বিছাল শরীফ:  সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ২৪১ হিজরীর সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’দাদ শরীফ মহাপবিত্র ১২ই রবীউল আউয়াল শরীফ জুমুয়াবার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন। সুবহানাল্লাহ!

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জানাযায় এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হয় যে, ইমাম আব্দুল ওয়াহ্হাব আল ওয়াররাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন : জাহিলী যুগে কিংবা ইসলামী যুগে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাবেশ ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। খোলা মরুভূমিতে প্রথম জানাযা সম্পন্ন হয় যাতে পুরুষের সংখ্যা ছিল ৬-৮ লক্ষ। কেউ কেউ বলেন দশ লক্ষ, আর নারীর সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। এ ছাড়াও কয়েকদিন পর্যন্ত জানাযা চলতে থাকে। সুবহানাল্লাহ! সম্মানিত জানাযা উনার এ বিরল দৃশ্য প্রমাণ করে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি সত্যিই তিনি ছিলেন পবিত্র আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ উনার সম্মানিত ইমাম। সুবহানাল্লাহ!

অসমাপ্ত- পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় থাকুন

সম্মানিত ও পবিত্র কুরআন শরীফ, সম্মানিত ও পবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা’ শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খ্বাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের যারা মানহানী করবে, তাদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারা নামধারী মুসলমান হোক বা কাফির হোক অথবা নাস্তিক হোক কিংবা যেকোনো ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন। তাদের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি যারা তাদেরকে সমর্থন করবে, তাদেরও একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ বিষয়ে কারো কোনো প্রকার ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আখাছ্ছুল খাছ সম্মানিত বিশেষ ফতওয়া মুবারক- (২য় পর্ব)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া-৪৮

মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ, সম্মানিত ইজমা শরীফ এবং সম্মানিত ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক উনার ও উনার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে এবং বিশেষ করে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক যারা ভাঙবে, ভাঙ্গার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে বা সমর্থন করবে তাদের প্রত্যেকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া- (পর্ব-৪)

পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে খাছ সুন্নতী বাল্যবিবাহ ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (পর্ব-৫)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমাউল উম্মাহ শরীফ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ইসলামী মাস ও বিশেষ বিশেষ রাত, দিন, সময় ও মুহূর্তের আমলসমূহের গুরুত্ব, ফযীলত এবং বেদ্বীন-বদদ্বীনদের দিবসসমূহ পালন করা হারাম ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া (৩০তম পর্ব)