ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৭)

সংখ্যা: ১৮৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

প্রসঙ্গ: স্বীয় শায়খ বা মুর্শিদ ক্বিবলা-এর মুহব্বত ও সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত দশটি মাক্বাম হাছিল করার কোশেশ করবে।

(৩) রিয়াজত-মাশাক্কাত

হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি আরো বললেন, হে প্রিয় সন্তান! হযরত লোকমান হাকীম আলাইহিস্্ সালাম-এর উপদেশাবলীর মধ্যে উল্লেখ আছে, তিনি স্বীয়  সন্তানকে লক্ষ্য করে বলেছেন, প্রিয়  সন্তান! মোরগ যেন তোমার চেয়ে চালাক না হয়। (এই হিসেবে যে) উহা শেষ রাতে আল্লাহর স্মরণে আহ্বান করবে আর তুমি ঘুমিয়ে থাকবে।

প্রিয় বৎস! উপদেশের সংক্ষিপ্ত সার এই যে, ইতায়াত বা অনুসরণ-অনুকরণ ও ইবাদত-বন্দেগী করার হাক্বীক্বত কি? অতএব ইবাদত বা বন্দেগী করার হাক্বীক্বত এই যে, সমুদয় আদেশ নিষেধাবলীতে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ণ অনুকরণ ও অনুসরণ করাই সকল ইবাদতের মূল লক্ষ্য এবং হাক্বীক্বত। তুমি যদি এমন কাজ কর, যেই সম্বন্ধে তোমাকে হুকুম করা হয়নি (তোমাকে অনুমতি দেয়া হয়নি) উহা ইবাদত নয়। যদিও প্রকাশ্য দৃষ্টিতে উহা ইবাদতের ন্যায়ই দেখা যায়। বরং উহা নাফরমানীর মধ্যেও গণ্য হতে পারে। এমনকি উহা নামায-রোযা হলেও অপরাধমূলক হিসেবেও গণ্য হতে পারে। তুমি কি দেখছো না যে, কেউ যদি দুই ঈদের দিন অথবা কুরবানীর দিনগুলোতে রোযা রাখে, তাহলে সে গুনাহগার হবে। তদ্রুপ কেউ যদি নিষিদ্ধ সময়ে অথবা জবরদস্তি দখল করা যমীনে নামায পড়ে, তাহলে সেও গুনাহগার হবে। যদিও সে যা করেছে তা ইবাদতের আকারে হয়। কেননা উহার অনুমতি দেয়া হয়নি। আরো জ্ঞাত হও, কেউ যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে হাসি-খুশি করে, সে ছওয়াবের অধিকারী হয়। যদিও তা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে খেল-তামাশার মধ্যে গণ্য। কেননা তা এই জন্যে যে, শরীয়ত তার অনুমতি দিয়েছে। ইহা দ্বারা প্রমাণিত হলো এবং জানতে পারলে যে, আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুকুম তামীল করাই হচ্ছে প্রকৃত ইবাদত। শুধু নামায-রোযাকেই ইবাদত বলা যায় না, যদি উহা অনুমোদিত না হয় তথা আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত বা অনুসরণে না হয়।

প্রিয় বৎস! তোমার সমুদয় কথা ও কাজ-কর্ম শরীয়ত নির্দেশিত এবং অনুমোদিত হতে হবে। মাখলুকাতের সকল ইল্্ম ও আমল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত-অনুসরণ-অনুকরণ ব্যতিরেকে গুমরাহী ছাড়া আর কিছুই নয় এবং আল্লাহ পাক-এর দিক হতে বান্দাকে দূরে রাখার কারণও ইহাই। এ কারণেই তিনি পূর্ববর্তী সমুদয় আমলকে মানসূখ করে দিয়েছেন। অতএব, উনার অনুমোদনহীন একটি শব্দও তোমার মুখে উচ্চারণ করো না। আর ছূফীদের চাক-চিক্য কথা-বার্তা এবং বাহ্যিক বেষভুশা দেখে প্রতারিত হয়ো না। মনে রাখবে, এ পথে প্রবৃত্তির দাসত্ব ও নফছানী শাহওয়াতকে রিয়াজত-মাশাক্কাতের (ইবাদতে কষ্ট স্বীকার করার) তরবারীর দ্বারা দ্বিখ-িত করতে পারলেই তথায় পৌঁছতে পারবে।

নফছে আম্মারা এবং উহার চাহিদাগুলিকে মুজাহাদা বা চেষ্টা-সাধনা এবং রিয়াজতের বন্ধন দ্বারা যদি পরাভূত করতে না পার এবং উহাকে যদি শরীয়তের গ-িভূত করতে অক্ষম হও, তাহলে মা’রিফাতের নূর দ্বারা অন্তরকে সঞ্জীবিত করতে পারবে না। ইমামুল মুহাক্কিকীন মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই মুরীদকে উদ্দেশ্য করে আরো বলেন, প্রিয় বৎস! তুমি সালিক বা মুরীদের কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছ। তবে জেনে রাখ, সালিক বা মুরীদের চারটি কাজ আবশ্যক।

১.    অন্তর হতে বিদয়াতকে সমূলে উচ্ছেদ করত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা-বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়া।

২.    তওবাতুন নাছূহা বা পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ হতে খালিছভাবে তওবা করা; যেন আর পদস্খলন না ঘটে বা গুনাহের কাজ না হয়।

৩.    সকল বান্দার হক এমনভাবে আদায় করা যেন শত্রুরাও সন্তুষ্ট হয়।

৪.    শরীয়তের আদেশ-নির্দেশগুলোকে পালন করা এবং নিষেধসমূহকে পরিত্যাগ করতে যে পরিমাণ ইল্্মে শরীয়তের দরকার সেই পরিমাণ ইল্্মে শরীয়ত শিক্ষা করা। আর ইল্্মে শরীয়ত ব্যতীত অন্য ইল্্ম এতটুকু শিক্ষা করাই যথেষ্ট যার মাধ্যমে আখিরাতে সে নাজাত লাভ করব।

বর্ণিত আছে যে, শাইখুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, ইমামুল মুহসিনীন হযরত আবূ বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, আমি চারশত উস্তাদের খিদমত করেছি। তাঁদের কাছ থেকে চল্লিশ হাজার হাদীছ শরীফ শিক্ষা করেছি। তার মধ্য হতে আমি একখানা হাদীছ শরীফ নিজের জন্য ইখতিয়ার বা গ্রহণ করেছি। তার উপরই আমল করেছি। কারণ তার মধ্যেই আমার নাজাত বা পরিত্রাণ রয়েছে বলে আমি ধারণা করছি। আমি উহাও উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, পূর্ববর্তীগণের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমষ্টি হচ্ছে এই একটি মাত্র হাদীছ শরীফ-এর মধ্যে নিহিত। সেই হাদীছ শরীফখানা হচ্ছে, আল্লাহ পাক-এর হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন একদিন কতিপয় ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে উপলক্ষ করে বলেন-

اعمال لدنياك بقدر مقامك فيها واعمل لاخرتك بقدر بقائك فيها واعمل لله بقدر حاجتك اليه واعمل للنار بقدر صبرك عليها.

অর্থ: “তুমি দুনিয়ার জন্য সেই পরিমাণ কাজ কর, যতদিন তুমি সেখানে অবস্থান করবে। আখিরাতের জন্য সেই পরিমাণে আমল কর, যতদিন তথায় অবস্থান করবে। আর আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য তুমি এই পরিমাণ আমল করবে, যতটুকু তুমি উনাদের মুখাপেক্ষী রয়েছো। আর জাহান্নামের জন্য সেই পরিমাণই কর যতটুকু জাহান্নামের আযাব-বরদাশ্ত (সহ্য) করতে পারবে।”

প্রিয় বৎস! তুমি এই হাদীছ শরীফ থেকে জানতে পেরেছ যে, আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রহমত ও ইহসান লাভ করার জন্য অনেক ইল্্মের আবশ্যকতা নেই। অধিক বিদ্যার্জন করে আলিম হওয়া ফরযে কিফায়া। ফরযে আইন নয়। নিম্নে বর্ণিত হিকায়েতটি প্রতি চিন্তা করে উপরোক্ত মন্তব্যের প্রতি দৃঢ় ইয়াক্বীন বা স্থির বিশ্বাসী হও।

হযরত হাতেম আসেম রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি খুব বড় বুযুর্গ ছিলেন, আল্লাহর ওলী ছিলেন। উনার একটা ওয়াকিয়া উল্লেখ করা হয়। হযরত শাক্বীক্ব বল্খী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পীর সাহেব ছিলেন। যিনি ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ব ত্বরীক্বত এবং সেই যামানার বিশ্ব বিখ্যাত আলিম ছিলেন, যিনি তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল, কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফ অর্থাৎ ইসলাম এবং পূর্ববর্তী ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানে খুব পারদর্শী ছিলেন। হযরত শাক্বীক্ব বল্খী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মুরীদ হযরত হাতেম আসেম রহমতুল্লাহি আলাইহি, উনিও বড় আলিম ছিলেন। একদিন এই হযরত শাক্বীক্ব বল্খী রহমতুল্লাহি আলাইহি, উনার মুরীদ হযরত হাতেম আসেম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে বললেন, হে হাতেম আসেম, আজকে কত বৎসর যাবৎ তুমি আমার ছোহ্বতে? উনি বললেন- হুযূর, তেত্রিশ বৎসর, তেত্রিশ বৎসর যাবৎ আপনার ছোহ্বতে আছি। এই তেত্রিশ বৎসরে তুমি কি শিখলে? হুযূর, তেমন কিছু শিখতে পারিনি, মাত্র কয়েকটা জিনিস শিখেছি। আরো কয়টা জিনিস শিখেছ? আটটা জিনিস শিখেছি। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবেন- তাহলে বুঝতে পারবেন যে কুরআন-সুন্নাহ্্র প্রতি আমল করতে গেলে কি দরকার এবং কতটুকু থাকা সম্ভব ও কিভাবে তা সম্ভব।  কি শিখেছ আটটা জিনিস? মাত্র আটটা মাসয়ালা শিখেছ? হযরত শাক্বীক্ব বল্খী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, হে হাতেম আসেম, আমার জীবনের বলতে গেলে সম্পূর্ণটা সময় শেষ হয়ে গেছে, তেত্রিশ বৎসর যদি চলে গিয়ে থাকে, তাহলে আমার আর বাকি রইলো কি? আর তুমি মাত্র এই কয়েকটা জিনিস শিখেছ। উনি বললেন, হুযূর আপনি তো শিক্ষা দিয়েছেন, আমাকে সত্য কথা বলার জন্য। অর্থাৎ

الصدق ينجى والكذب يهلك

আল্লাহ পাক-এর রসূল বলেছেন, “সত্য জীবন দান করে মিথ্যা ধ্বংস করে দেয়।”

যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আমি কি করে মিথ্যা বলবো? আমি সত্য কথাই বলেছি যে, আমি  আটটা জিনিস শিখেছি। তখন হযরত হাতেম আসেম রহমতুল্লাহি আলাইহি-কে জিজ্ঞেস করা হলো। হযরত শাক্বীক্ব বল্খী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, সেই আটটা মাসয়ালা তুমি কি শিখেছ বলতো দেখি। কি শিখেছ? উনি বললেন, যে  হুযূর আমিতো আপনার ছোহ্বতে থাকি, যিকির আযকার করি, তাছবীহ্-তাহ্লীল পাঠ করি, আপনার হুকুম আহ্কাম তামিল করি এবং সাথে সাথে আমি কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ ফিকির করি, রিসার্চ করি। রিসার্চ করতে করতে আমি দেখলাম এবং মানুষের মধ্যে আমি লক্ষ্য করলাম যে মানুষ যখন ইন্তেকাল করে তখন অনেক ধন-সম্পদ থাকে, নানান বিষয়-সম্পত্তি থাকে, অর্থ বাড়ি-গাড়ি অনেক কিছু তার থাকে। কিন্তু মৃত্যুর সময় কিন্তু সে কিছুই নিতে পারে না। তখন আমি ফিকির করলাম, আল্লাহ পাক-এর একটা আয়াত শরীফের দিকে। আল্লাহ্ পাক বলেছেন,

فمن يعمل مثقال ذرة خيرايره ومن يعمل مثقال ذرة شرايره.

“যে একবিন্দু পরিমাণ নেকী করবে, সে তার বদলা পাবে। আর এক বিন্দু পরিমাণ পাপ যদি করে, সেটারও বদলা তাকে গ্রহণ করতে হবে।” আমি ফিকির করে দেখলাম- মানুষ তো গাড়ি-বাড়ি, ধন-দৌলত, অর্থ-সম্পদ, টাকা-পয়সা কিছুই নিতে পারে না। আল-আওলাদও তার সাথে যায় না। কিছুই তার সাথে যায় না। শুধু তার আমলনামাটাই যায়। আমলনামা অর্থাৎ নেক আমলটা তার কাজে আসবে। তখন আমি ফিকির করে নেক কাজ বেশি বেশি করতে লাগলাম। সুবহানাল্লাহ।

 ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৩)

 ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছারল ল মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৪)

 ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার: মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৫)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৬)

 ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৪৮)