ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছারল: মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫২)

সংখ্যা: ১৯৩তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

প্রসঙ্গ: স্বীয় শায়খ বা মুর্শিদ ক্বিবলা-এর মুহব্বত ও সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত দশটি মাক্বাম হাছিল করার কোশেশ করবে।

(৩) রিয়াজত-মাশাক্কাত

দশটি মাক্বাম হাছিলের অভিলাষী মুরীদের তৃতীয় করণীয় হচ্ছে রিয়াজত-মাশাক্কাত। শায়খ বা মুর্শিদ ক্বিবলার ছোহবত ইখতিয়ার, যিকির-ফিকির, ইবাদত-বন্দিগী সুসম্পন্ন করার জন্য দুঃখ, কষ্ট, তাকলীফ সহ্য করা তথা রিয়াজত-মাশাক্কাত করা আবশ্যক। হযরত হাতেম আসেম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শায়খ-এর ৩৩ বছর ছোহবত ইখতিয়ার করেছিলেন।

যিকির-ফিকির ও রিয়াজত-মাশাক্কাত করেছিলেন। উনার জীবনের সেই ঘটনাটি আগত-অনাগত সকল মুরীদের জন্যই উপদেশস্বরূপ। হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ উত্তরকালে সকল মাশায়িখে ইজাম স্ব স্ব মুরীদদেরকে উনার সেই ঘটনাটি বর্ণনা করে শুনাতেন। যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, খলীফাতুল্লাহ, খলীফাতু রসূলিল্লাহ, ইমামুল আইম্মাহ, ম্হুইস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদে আ’যম, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা ইমাম রাজারবাগ শরীফ-এর মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী, তিনিও নছীহতস্বরূপ উক্ত ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন এবং তার অতি সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন। যা অত্র নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে-

(ধারাবাহিক)

তোমার ষষ্ঠ মাসয়ালাটা কি?

তখন হযরত হাতেম আসেম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন যে, হুযূর আমি আর একটা আয়াত শরীফ ফিকির করলাম। এই আয়াত শরীফ-এর পরিপূরক তা হলো- আল্লাহ পাক কুরআন শরীফ-এ  বলেছেন,

وما من دابة فى الارض الا على الله رزقها

“যমিনে যত প্রাণী রয়েছে, সকলের রিযিকের জিম্মাদার আল্লাহ পাক স্বয়ং নিজে” অর্থাৎ তিনি বলেন আমি।

সকলের রিযিকের জিম্মাদার আমি। অন্য কেউ রিযিকের জিম্মাদার নয়। আমি রিযিক দিয়ে থাকি। যেমন এই প্রসঙ্গে বলা হয় যে- হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালাম, যাঁর অধীনে সারা পৃথিবী দেয়া হয়েছিল। মাটি, পানি, বাতাস, আগুন, তরুলতা, গাছ-পালা, পশু-পাখি সবকিছু উনার তাবেদার করে দেয়া হয়েছিল। উনার প্রসঙ্গে বলা হয়, উনি যদিও সমস্ত কিছুর মালিক ছিলেন, তারপরেও উনি থলি বানিয়ে বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে উনার সংসার চালাতেন। থলি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়ে উনি সংসার চালাতেন। হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম একদিন মনে মনে চিন্তা করলেন (নবীগণের চিন্তাও ওহী) যে, আল্লাহ পাক-এর রহমতে আমার এই ব্যাগগুলি বিক্রি করার ওসীলায় বা আল্লাহ পাক এটার বিনিময়ে আমার রিযিক দিয়ে থাকেন। উনি এটা খেয়াল করার সাথে সাথে (উম্মত ও বান্দাদের তালীম দেয়ার জন্য) আল্লাহ পাক হযরত জিব্রীল আলাইহিস্ সালামকে পাঠালেন। হে জিব্রীল আলাইহিস্ সালাম!    তুমি যাও, আমার নবী হযরত সুলাইমান আলাইহ্সি সালাম-এর কাছে গিয়ে বল, উনি যেন আকাশের দিকে লক্ষ্য করেন। আল্লাহ পাক যখন হযরত জিব্রীল আলাইহ্সি সালামকে হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালাম-এর কাছে পাঠালেন, এসে উনি যখন এটা বললেন, তখন তিনি সত্যিই আকাশের দিকে লক্ষ্য করলেন। আকাশের দিকে লক্ষ্য করে তিনি তাজ্জুব হয়ে বললেন, আল্লাহ পাক এটা কি? প্রতিদিন আমি আকাশে দেখি অসংখ্য তারকা, নক্ষত্র কিন্তু আজকে তো কিছুই নেই। শুধু থলি আর থলি সমস্ত আকাশে ঝুলছে। অর্থাৎ বাজারের ব্যাগগুলি আকাশে ঝুলছে। আল্লাহ পাক এটার কি হাক্বীক্বত আকাশে আজকে ব্যাগ আসল কোথা থেকে? এই চন্দ্র তারকার পরিবর্তে শুধু ব্যাগ আর ব্যাগ। এটা আসলো কোথা থেকে? আল্লাহ পাক তখন বললেন, “হে হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালাম! আপনি মনে করেছিলেন, আপনি খুব সুন্দর করে ব্যাগ বানান, সেটা বাজারে বিক্রি করেন, মানুষ কিনে নিয়ে যায়, আপনার রিযিকের বন্দোবস্ত হয়ে যায়। কিন্তু না, আপনার সব ব্যাগ মানুষ খরীদ করে না। যেহেতু রিযিকের জিম্মাদার আমি, কাজেই যখন কোন জ্বিন ইনসান আপনার ব্যাগ বা থলিগুলি খরীদ করে না, আমি তখন ফেরেশ্তা দিয়ে খরীদ করায়ে আপনার রিযিক পৌঁছায়ে দিয়ে থাকি এবং সেই ব্যাগগুলি আমার ফেরেশ্তার দ্বারা নিয়ে আসি।” সুবহানাল্লাহ্! সেই ব্যাগগুলি আমি আকাশে ঝুলায়ে রেখেছি। দেখুন, কতগুলি ব্যাগ মানুষ খরীদ করেছে, আর কতগুলি ব্যাগ আমি খরীদ করেছি।

وما من دابة فى الارض الا على الله رزقها

“যমীনে যত প্রাণী রয়েছে, সকলের রিযিকের জিম্মাদার স্বয়ং আমি আল্লাহ পাক।”

আমি সেই ব্যাগগুলি খরীদ করায়ে নিয়ে এসেছি। আমার দায়িত্ব হলো রিযিক পৌঁছায়ে দেয়া। আমি রিযিক পৌঁছায়ে দিয়ে থাকি। এই প্রসঙ্গে বলা হয়, আল্লাহ পাক বলেন:

ان الله هو الرزاق ذو القوة المتين

“নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক মজবুত রিযিক দেনেওয়ালা।”

হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর একটা ঘটনা উল্লেখ করা হয় যে- একদিন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘরে গেলেন হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা এবং হযরত ইমাম হাসান-হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা উনাদেরকে দেখার জন্য। যখন গেলেন, তখন হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু আনহু কি মেহমানদারী করবেন? তখন উনার ঘরে তো কিছুই ছিল না মেহমানদারী করার মত। আল্লাহ পাক-এর হাবীব এসেছেন, কিছু মেহমানদারী করা সুন্নত। কি মেহমানদারী করবেন, কিছুই নেই ঘরের মধ্যে। উনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি একটু বসুন, আপনি একটু আলোচনা করুন, কথা-বার্তা বলুন, আমি একটু আসছি। উনি বের হয়ে বাজারে আসলেন। উনার উদ্দেশ্য হলো- বাজার থেকে যদি কিছু পয়সা যোগাড় করা যায়, পয়সার বন্দোবস্ত করা যায়, সেই পয়সা দিয়ে কিছু খাদ্য খরীদ করে নিয়ে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মেহমানদারী করবেন। উনি যখন বাজারে আসলেন, হঠাৎ দেখলেন কি! একজন লোক একটি ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উনি যাচ্ছেন, উনাকে লোকটা বললো, হে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! কোথায় যাচ্ছেন আপনি? বললেন, কিছু ব্যবসার জন্য এসেছিলাম। আমার এই ঘোড়াটা ছয় দিনারে বিক্রি করব, আপনি কিনবেন কি? উনি বললেন, হ্যাঁ, কিনতে পারি। নিতে পারি, তবে শর্ত হলো- আমি এখন পয়সা দিতে পারবো না। আমি বিক্রি করে পয়সা দিব। বেশ, ঠিক আছে, আমি এখানে অপেক্ষা করি, আপনি নিয়ে যান। হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সেটা কিনে রওনা হলেন সামনের দিকে। কিছু দূর যাওয়ার পরে একলোক বললো, হে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আপনি কোথায় যাচ্ছেন? উনি বললেন, বাজারে এই ঘোড়াটা বিক্রি করার জন্য যাচ্ছি। সে ব্যক্তি বললো- আমি তো কিনতে চাচ্ছি। কত বিক্রি করবেন? উনি বললেন, তুমি কত দিতে চাও? কত দিতে পারবে? সে ব্যক্তি বললো- দশ দীনার। ঠিক আছে, উনি দশ দীনার বিক্রি করে দিলেন। বিক্রি করে ছয় দীনার সেই ব্যক্তিকে দিয়ে দিলেন। উনি চার দীনার দিয়ে খাদ্য নিয়ে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে পেশ করলেন। পেশ করে উনি খুব খুশি হলেন, উনার দিল ইতমিনান হয়ে গেল। উনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আজকে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। একটা খুব সুন্দর ঘটনা ঘটেছে। কি ঘটনা ঘটেছে? আল্লাহ পাক-এর রসূল তো সব জানেন, হাদীছ শরীফ-এ রয়েছে-

اعطيت بجوامع الكلم

“আল্লাহ পাক আমাকে সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ইলম বা জ্ঞান দিয়েছেন।”

আল্লাহ পাক-এর রসূল-এর সেটা জানা ছিল। আল্লাহ পাক-এর রসূল বললেন যে, কি হয়েছে? ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার তো পয়সা ছিল না আপনার মেহমানদারী করার জন্য। বাজারে গেলাম, একটা ঘোড়া বাকিতে কিনে বিক্রি করে চার দীনার লাভ করলাম। সেটা দিয়ে আপনার জন্য খাদ্য নিয়ে এসেছি। আল্লাহ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আপনি কি জানেন, কার থেকে কিনেছেন এবং কার কাছে বিক্রি করেছেন?” উনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সেটা তো জানি না। আল্লাহ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, আপনি যখন আমাকে এখানে বসায়ে রেখে বের হয়ে গেলেন, তখন আল্লাহ পাক সাথে সাথে হযরত জিব্রীল আলাইহিস্ সালামকে নির্দেশ দিলেন, হে হযরত জিব্রীল আলাইহিস্ সালাম! আমার হাবীব হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ঘরে বসে আছেন। হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অস্থির হয়ে গেছেন মেহমানদারী করার জন্য। তুমি এখনই একটা ঘোড়া নিয়ে যাও। উনার কাছে ঘোড়াটা বিক্রি করবে। আর হযরত মিকাঈল আলাইহিস্ সালামকে বললেন, তুমি গিয়ে ওটা খরীদ করে আনবে। মধ্যে দিয়ে তুমি কিছু পয়সা উনাকে দিয়ে দিও, যার ফলে উনি মেহমানদারী করতে পারেন। ঠিক সেই পয়সাটা আপনি নিয়ে এসেছেন। কাজেই,

وما من دابة فى الارض الا على الله رزقها

“যমিনে যত প্রাণী আছে প্রত্যেকের রিযিকের জিম্মাদার আল্লাহ পাক।” সুবহানাল্লাহ!

এখন চিন্তা-ফিকির করুন যে, আল্লাহ পাক রিযিক কিভাবে দিয়ে থাকেন। আমাদের আক্বলে সমঝে তো সেটা আসে না। আমরা তো মনে করি, আমরা খুব কামাই করি, খুব ব্যবসা চাকরি করে উপার্জন করে থাকি। কিন্তু হাক্বীক্বী আল্লাহ পাক যদি কাউকে না দেন, কেউ উপার্জন করতে পারবে না। কেউ আয় করতে পারবে না। (অসমাপ্ত)

 ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৩)

 ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছারল ল মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৪)

 ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার: মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৫)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৬)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩৭)