মাহে রজব ও তার প্রাসঙ্গিক আলোচনা

সংখ্যা: ১৯৭তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শুয়াইব আহমদ

আরবী সপ্তম মাসের নাম রজব। এ মাসটি কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদকৃত চারটি হারাম বা সম্মানিত মাসের মধ্যে অন্যতম। উল্লেখ্য, রজবের পহেলা রাতটি দুআ কবুলের খাছ রাত, পহেলা জুমুআর রাতটি মুবারক রগায়িবের রাত এবং সাতাশ তারিখ মুবারক রাতটি মি’রাজ শরীফ-এর রাত।

স্মরণীয় যে, মি’রাজ শরীফ হলো নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সীমাহীন মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য প্রকাশের এক বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা আর তা হলো কুল-মাখলূক্বাত, বিশেষ করে ফেরেশতা, জ্বিন ও ইনসান তারা সম্যকরূপে অবগত নয় যে, আল্লাহ পাক-উনার যিনি হাবীব, যিনি কুল-কায়িনাতের নবী ও রসূল, নবীদের নবী, রসূলদের রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- উনার সাথে খালিক্ব, মালিক, রব, আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তাআলা উনার কী সম্পর্ক রয়েছে; সেটা জানানো ও বুঝানোর জন্যেই আল্লাহ পাক তিনি উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত প্রকাশের একাদশ বছরে মি’রাজ শরীফ-এর আনুষ্ঠানিকতার ব্যবস্থা করেন। এখানে বিশেষভাবে জানার বিষয় হলো, এই মি’রাজ শরীফেই যে কেবল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আল্লাহ পাক-উনার মুবারক দীদার লাভে ধন্য হয়েছেন তা নয়। বরং সৃষ্টির শুরু থেকেই তিনি আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তাআলা উনার মুবারক দীদারে ছিলেন, এখনও আছেন এবং অনন্তকাল ধরে থাকবেন। সুবহানাল্লাহ!

যেমন এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে, স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-

لى مع الله وقت لا يسعان فيه ملك مقرب ولا نبى مرسل

অর্থাৎ “খালিক্ব, মালিক, রব, আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তাআলা-উনার সাথে আমার প্রতিটি মুহূর্ত বা সময় এমনভাবে অতিবাহিত হয় যেখানে কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম এবং কোন নৈকট্যশীল ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম পৌঁছতে সক্ষম নন।”

উলামায়ে কিরামগণের পরিভাষায় মসজিদে হারাম অর্থাৎ বাইতুল্লাহ শরীফ থেকে মসজিদে আক্বসা অর্থাৎ বাইতুল মুক্বাদ্দাস শরীফ পর্যন্ত ভ্রমণকে ইসরা বলা হয়। আর মসজিদে আক্বসা থেকে সিদরাতুল মুনতাহা অতঃপর সেখান থেকে আল্লাহ পাক-উনার মুবারক সাক্ষাৎ পর্যন্ত ভ্রমণকে মি’রাজ শরীফ বলা হয়। কখনো কখনো উভয় ভ্রমণকে একত্রে ইসরা ও মি’রাজ বলা হয়। উল্লেখ্য, ‘ইসরা’-এর শাব্দিক অর্থ হলো রাতের বেলা ভ্রমণ করা। আর মি’রাজ-এর শাব্দিক অর্থ হলো সিঁড়ি বা সোপান। অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ২৭শে রজব সোমবার রাতের বেলা বোরাকে চড়ে বাইতুল্লাহ শরীফ থেকে বাইতুল মুক্বাদ্দাস শরীফে গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে সমস্ত নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ইমাম হয়ে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন। নামায শেষে বাইতুল মুক্বাদ্দাস শরীফ থেকে বের হওয়ার পর উনার জন্য বেহেশত থেকে যমরজদ ও যবরজদ পাথরের একটি সিঁড়ি আনয়ন করা হয়। তিনি পুনরায় বোরাকে সওয়ার হয়ে উক্ত সিঁড়ির উপর দিয়ে ভ্রমণ ও পরিদর্শন করে করে সপ্তাকাশ গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে বাইতুল মা’মূর যা ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের ক্বিবলা, জান্নাত, জাহান্নাম, শরীফুল আক্বলাম অর্থাৎ তাক্বদীর ও বিধি-বিধান লিপিবদ্ধ করার দফতর, ছিদরাতুল মুনতাহা ইত্যাদি নিদর্শনসমূহ পরিদর্শন করেন। অতঃপর সেখান থেকে সবুজ রংয়ের ‘রফরফ’ নামক মখমলী আসন মুবারকে

উপবেশন করে বিভিন্ন স্থানে রক্ষিত নূরের পর্দাসমূহ অতিক্রম করে অবশেষে আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তাআলা উনার পবিত্র দরবারে পৌঁছেন ও উনার পরম দীদারে মিলিত হন। সুবহানাল্লাহ!

এ মর্মে কালামুল্লাহ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

ثم دنى فتدلى فكان قاب قوسين او ادنى فاوحى الى عبده ما اوحى

অর্থ: “অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন ও ঝুঁকে গেলেন, ধনুকের দু’মাথা যেরূপভাবে মিলিত হয় অথবা তার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী হলেন। অতঃপর আল্লাহ পাক তিনি উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে যা ওহী করার তা করেন।” অর্থাৎ কোন ব্যবধান ও মাধ্যম ব্যতীত দীদার ও কথোপকথন হয়। সুবহানাল্লাহ! (সূরা নজম-৮,৯,১০)

হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে এক সুদীর্ঘ হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে, আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তাআলা উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে কথোপকথনকালে বলেন, “আমি আপনাকে আমার হাবীব ও খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছি। সমগ্র মানবজাতির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দানকারী আর জাহান্নামের ব্যাপারে ভয়প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। আপনার বক্ষ মুবারক সম্প্রসারিত করেছি। আপনার দায়িত্বের বোঝা সহজ করে দিয়েছি। আপনার আলোচনাকে সমুন্নত করেছি। আমার অদ্বিতীয়তা ও তাওহীদের বাণীর সাথে আপনার রসূল হওয়া ও বান্দা হওয়ার বাণীকে সংযোজন করেছি। আপনার উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত এবং মধ্যপন্থা অবলম্বী উম্মত বানিয়েছি। মানুষের কল্যাণের জন্য তাদের অভ্যুদয়। মর্যাদা ও সম্মানের দিক দিয়ে তাদেরকে প্রথম কাতারের উম্মত আর আবির্ভাবের দিক দিয়ে সর্বশেষ উম্মত বানিয়েছি। আপনার উম্মতের মধ্যে এমন কতক লোক জন্মগ্রহণ করবে যাদের অন্তরে আমার কালাম লিপিবদ্ধ থাকবে। অস্তিত্বের দিক দিয়ে আপনি সর্বপ্রথম নবী আর যমীনে আগমনের দিক দিয়ে সর্বশেষ নবী। আপনাকে সূরা ফাতিহা হাদিয়া করেছি। আপনার পূর্বে অন্য কেউ এ সূরা লাভ করেনি। আপনাকে আরশের নিচে রক্ষিত খনি থেকে সূরা বাক্বারার শেষাংশের আয়াত শরীফসমূহ হাদিয়া করেছি। আপনার পূর্বে কোন নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে তা হাদিয়া করিনি। আপনাকে হাউজে কাওছার হাদিয়া করেছি। বিশেষ করে আটটি বিষয় আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে। মুসলমান হওয়ার উপাধি, হিজরত, জিহাদ, নামায, ছদকা, রমাদ্বান মাসের রোযা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কার্যের নিষেধ।

অর্থাৎ আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তাআলা স্বীয় সান্নিধ্যে উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেন। বিভিন্ন প্রকার সুসংবাদ দান করে উনাকে আনন্দিত করেন। বিশেষ বিশেষ বিধি-বিধান ও বিভিন্ন বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেন। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো উনার উম্মতের দায়িত্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করা। অতঃপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাকে প্রদত্ত বিভিন্ন বিধি-বিধান ও দিক-নির্দেশনা ও সুসংবাদসহ আনন্দের সাথে প্রত্যাবর্তন করেন। সুবহানাল্লাহ!

 

মাহে রবীউছ ছানী ও তার প্রাসঙ্গিক আলোচনা

মাহে জুমাদাল উখরা ও তার প্রাসঙ্গিক আলোচনা

মাহে রমাদ্বান শরীফ ও তার প্রাসঙ্গিক আলোচনা

মাহে শাওওয়াল ও তার প্রাসঙ্গিক আলোচনা

মাহে রবীউল আউয়াল শরীফ ও তার প্রাসঙ্গিক আলোচনা