মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৮১) রাবেতা বা তাছাওউরে শায়েখ এবং উনার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

সংখ্যা: ২২২তম সংখ্যা | বিভাগ:

হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

 

رابطة (রাবেতা) এর শাব্দিক অর্থ: সম্পর্ক। تصور (তাছাওউর) এর শাব্দিক অর্থ: কল্পনা বা ধ্যান করা। শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ছূরত বা আকৃতি মুবারক মুরীদের মানসপটে ভেসে আসাকে تصور شيخ (তাছাওউরে শায়েখ) বা رابطة (রাবেতা) বলা হয়। তাছাওউরে শায়েখ উনার চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে, স্বীয় শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে সবসময় সমানে হাজির বা উপস্থিত দেখা। চেষ্টা, কোশেশ করলে হাছিল হয়ে থাকে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে চেষ্টা কোশেশ ছাড়া, আপসে আপ হয়ে থাকে। তারা খুবই ভাগ্যবান।

উল্লেখ্য যে, রাবেতা বা তাছাওউরে শায়েখ, ইহা ইহসান উনারই একটি অংশ বিশেষ। মহান আল্লাহ পাক উনাকে দেখে দেখে ইবাদত করাকে ইহসান বলে। সেটা অবশ্যই মিছালী সুরত মুবারক। হাক্বীক্বী বা প্রকৃত মনে করা কুফরী। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা হচ্ছে- মহান আল্লাহ পাক উনাকে দুনিয়াতে হাক্বীক্বীভাবে দেখা যাবে না। পরকালে দেখা যাবে। আর স্বীয় শায়েখ উনাকে মিছালী ছূরত মুবারক-এ সর্বসময় দেখাকে তাছাওউরে শায়েখ বলে। ইহসান উনার দরজা হাছিলের পূর্বে তাছাওউরে শায়েখ হাছিল হয়। কাজেই এ কথা সহজেই অনুমেয় যে, যারা তাছাওউরে শায়েখ উনার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনিত হতে পারেন তারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইহসানে দরজায় উপনীত হতে পারেন। ইহসান উনার দুটি দরজা। একটি হচ্ছে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে সবসময় মেছালী ছূরত মুবারক-এ দেখতে পাওয়া। আর অপরটি হচ্ছে এরূপ হাল অর্জিত হওয়া যে, উনারা আমাকে দেখতে পাচ্ছেন।

এ সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

ان تعبد الله كانك تراه فان لـم تكن تراه فانه يراك

অর্থাৎ এমনভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করুন যেন মহান আল্লাহ পাক উনাকে দেখতে পাচ্ছেন। তবে যদি দেখতে না পান (এরূপ অবস্থার সৃষ্টি না হয়) তাহলে মনে করবেন- মহান “আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে দেখছেন”। (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ)। রাবেতা বা তাছাওউরে শায়েখ উনার বিষয়টিও অনুরূপ। মুরীদ যখন সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার দিকে রুজু হয় তথা শায়েখ উনার আদেশ নিষেধগুলো বিনা দ্বিধায় মেনে নিয়ে পরিপূর্ণরূপে পালন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা-কোশেশ করতে থাকে। সবার চেয়ে শায়েখ এবং উনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়বস্তুকে বেশি মুহব্বত করতে থাকে তখন সে ফানা ফিশ শায়েখ উনার মাক্বামে উপনীত হয়। আর সেই সময় নিজ শায়েখ তিনি মুরীদের মানসপটে ভেসে উঠেন। সবসময় উনাকে সামনে উপস্থিত দেখা যায়। সেই মুরীদের এ হালত বা অবস্থা চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যে তিনি মহান আল্লাহ পাক উনাকে এবং উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকেও সামনে উপস্থিত দেখতে পায়। সুবহানাল্লাহ!

এছাড়াও কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনি ইচ্ছা করলে যে কোন মুরীদের এই হালত পয়দা করে দিতে পারেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তা দিয়েও থাকেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মুজাদ্দিদে যামান, খলীফাতুল মুসলিমীন, আমিরুল মু’মিনীন, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার একজন মুরীদ, একদিন উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুযূর! পীর ছাহেব উনার হাতে বাইয়াত হওয়ার ফায়দা কি? পীর ছাহেব কি কাজে লাগে??

সেদিন তিনি তার কোন জাওয়াব দিলেন না। তিনি চিন্তা করলেন, সে একজন মাওলানা। জাহিরী ইলিম হাছিল করেছে বটে, কিন্তু ইলমে তাছাউফের কোন অংশই নেই তার মধ্যে। সেজন্য তার হাতে কলমে শিক্ষার প্রয়োজন। তাই চিন্তা করতে লাগলেন, কিভাবে এই শিক্ষা দেয়া যায়। আর এদিকে সেই মুরীদ প্রায় প্রতিদিনই একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করছে। পীর ছাহেব মুরীদের কি কাজে আসে?

একদিন উক্ত মুরীদ দোয়ার আরজু করলো। আয়-রোজগার করার জন্য পরামর্শ চাইলো। আরো বললো- আপনি ইযাজত দিলে আমি কলিকাতা শহরে চলে যাব। উপার্জনের কোন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

তিনি ইজাযত দিলেন। সাথে সাথে এটাও বললেন যে, কলিকাতা শহরে অমুক স্থানে আমার একজন মুরীদ আছে। সে পেশায় মুচি। জুতা সেলাই করে সংসার চালায়। তুমি তার সাথে সাক্ষাৎ করলে তোমার থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করবে। তোমার কোন অসুবিধা হবে না।

সে মুরীদ কলিকাতা শহরে গেলো এবং সেই ঠিকানা মতো সেই মুচি মুরীদের সাক্ষাৎ পেলো। সে মুরীদ অনেক দিন পর স্বীয় পীর ছাহেব ক্বিবলা উনার ছোহবত প্রাপ্ত মুরীদের সাক্ষাৎ পেয়ে খুবই খুশি হলো। তার থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করলো।

আর উক্ত মুরীদ সেখানে প্রায় ১ মাস থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করলো কিন্তু কোন চাকরির ব্যবস্থা হলো না। পরে সেখান থেকে ফিরে আসলো। আসার সময় মুচি মুরীদ উক্ত মুরীদকে তার যাতায়াতের খরচের টাকা দিলো। তার পরিবার-পরিজনদের জন্য আলাদা কিছু টাকা-পয়সা দিলো। আর একটি প্যাকেট দিয়ে বললো এটা আমার শায়েখ উনাকে দিবেন। ইহা উনার জন্য হাদিয়া।

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১২৭)

-ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার- মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১২৮)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১২৯)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছারল মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩০)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৩১)