মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৭২) তাওয়াক্কুল-এর মাক্বামে ফানা কতিপয় আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের হাল বা অবস্থা:

সংখ্যা: ২১৩তম সংখ্যা | বিভাগ:

হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

  توكل (তাওয়াক্কুল) অর্থ: আল্লাহ পাক উনার উপর পূর্ণভাবে ভরসা করা। অর্থাৎ নিজ ক্ষমতা ও শক্তিকে অক্ষম গন্য করে সব কাজের ভার আল্লাহ পাক উনার নিকট সোপর্দ করা।

নফস লতিফা হচ্ছে তাওয়াক্কুলের মাক্বাম। সালিক বা মুরীদ যখন নফস লতিফার মোরাকাবা করার পাশাপাশি তাওয়াক্কুল এর পরিপন্থী কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ ছেড়ে দিতে থাকে তখন সে এক প্রকার জজবা বা আকর্ষণ অনুভব করে। এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হতে থাকলে সে তাওয়াক্কুলের মাক্বামের সন্ধান পায়। আর তখন তা হাছিলের জন্য প্রাণ পণ চেষ্টা-কোশেশে লিপ্ত হয়। আর সে সময় বিষয়টি সেই মুরীদ বা সালিকের নিকট অতীব সহজ হয়ে যায়। যার ফলে প্রতিনিয়ত সে নতুন নতুন হালের সম্মুখীন হয়। সেই সময় নিজের শায়খ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনিও সেই মাক্বাম হাছিলের জন্য উক্ত মুরীদকে ফায়েজ-তাওয়াজ্জুহ দান করতে থাকেন। ফলে সে মুরীদ বা সালিক তাওয়াক্কুলের মাক্বামে গভীরভাবে ফানা হয় অতঃপর বাক্বা লাভ করে।

তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ পাক উনার প্রতি পূর্ণ নির্ভরশীলতা-এর মাক্বাম হাছিলের পথে ফানা বা বিলীন হওয়া একজন সালিক। যিনি এ পথে এমনি ফানা হয়েছিলেন যে, তিনি সেই হালে গরক হয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন।  “মহান আল্লাহ পাক না খাওয়ালে তিনি কোন খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করবেন না।”  তিনি এক স্থানে মুরাকাবা করতে বসলেন। অনেক সময় অতিবাহিত হলো। তিনি ধ্যান মগ্ন রয়েছেন। কোন দিকে কোন খেয়াল নেই। এদিকে মুষলধারে বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির পানি উনার গলা পর্যন্ত হলো। উনি সেদিকেও কোন দৃষ্টি দিলেন না। নিবিষ্ট মনে মুরাকাবায় রত রয়েছেন। এক পর্যায়ে বৃষ্টি বন্ধ হলো। রোদ উঠলো। তখনো চারদিকে পানি থৈ থৈ করছে। ক্ষণকাল পরেই একটি পাত্রে কয়েকটি গরুম রুটি ও কিছু ভুনা গোশত পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে উনার মুখের কাছে আসলো। আর কোথাও যাচ্ছে না। মুখের কাছে এসে থেমে গেল। উনি যখন নিশ্চিত হলেন যে, এ খাবার উনার জন্যই পাঠানো হয়েছে, তখন উনি সেই খাবার মুখে দিলেন। খাওয়া শুরু করলেন। আর সেই সময়ই গায়েবী নেদা (অদৃশ্য আওয়াজ) ভেসে আসলো। আর একটু ধৈর্য্য ধরতে পারলেন না? আপনি যদি খাবারে মুখ না দিতেন তাহলে আমি স্বয়ং নিজেই আপনার মুখে সেই খাবার তুলে দিতাম। সুবহানাল্লাহ! (তাযকিরাতুল আওলিয়া)

হযরত সাহল বিন আব্দুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, তাওয়াক্কুলের প্রথম অবস্থান হলো, গোসলদানকারী যেরূপ মৃতকে যেদিকে ইচ্ছা ফিরায়, মৃত নিজে কোন প্রকারে নড়াচড়া করতে পারে না, অনুরূপ বান্দাও নিজেকে আল্লাহ পাক উনার হাতে সমর্পন করে দেয়। তাওয়াক্কুলকারী শুধু আল্লাহ তায়ালা উনার উপরই দৃষ্টি রাখে। আল্লাহ পাক উনার নিকট কিছু চান না এবং উনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেন না। আল্লাহ পাক উনার অনুগ্রহ, দয়া, দান, ইহসান প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না, নিষেধও করতে পারেন না। এটাও বলা হয়েছে যে, তাওয়াক্কুলকারী আল্লাহ পাক উনার নির্ধারিত তাকদীরের উপর শোকর গোজারী হয়।  (গুনিয়াতুত ত্বলিবীন-৩০৮)

হযরত হাতেম আসেম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি তাওয়াক্কুলের মাক্বাম কিভাবে লাভ করেছেন? তিনি জাওয়াব দেন, চারটি অভ্যাসের কারণে আমি তাওয়াক্কুলের মাক্বাম লাভ করি। তাহলো: আমি ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করেছি, আমার জীবিকা আল্লাহ পাক ব্যতীত আর কারো হাতে নেই। তাই আমি জীবিকার কোন ফিকির করি না। আমি জানি, আল্লাহ পাক ব্যতীত কেউ আমার কাজ সমাধা করে দেননা, সুতরাং আমি নিজের কাজে মগ্ন রয়েছি। আমি জানি হঠাৎ একদিন মৃত্যুর ফেরেশতা আসবে। তাই আমি প্রতি মুহূর্তে উনার আগমনের প্রতীক্ষা করি এবং নিজের কাজ অত্যন্ত দ্রƒততার সাথে সম্পাদন করে চলেছি। আমি ধারণা করি, সর্বাবস্থায় আমি পালনকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সম্মুখে রয়েছি, তাই আমি উনাকে লজ্জা করি।

হযরত ইবনে তাউস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, এক বেদুঈন মাঠে উটে আরোহিত ছিল। সে উট বসিয়ে এর নাকীল ধরে আকাশের দিকে মুখ তুলে বললো,  “ইয়া আল্লাহ পাক! আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এ উট এবং এর উপর রাখা মালপত্র আপনার যিম্মাদারিতে রইলো। এ বলে সে মসজিদে হারামে প্রবেশ করে। সেখান হতে অবসর হয়ে এসে দেখে, তার মালপত্র এবং উট চুরি হয়ে গিয়েছে। সে পুনরায় আকাশের দিকে মাথা তুলে বললো, ইয়া আল্লাহ পাক! আমার সামানপত্র, সম্পদ চুরি হয়ে গেছে এবং আপনার হিফাযতে থাকা অবস্থায় তা হয়েছে।আমরা যেমন বসা ছিলাম তেমনি বসে রইলাম। দেখলাম, এক বেদুঈন আবু কোবায়েস পাহাড় হতে অবতরণ করেছে। সে বাম হাতে উটের রশি ধরে টানছে। তার ডান হাত কাটা। কর্তিত হাত তার গর্দানে ঝুলছে। সে উটের মালিক বেদুঈনের নিকট এসে বললো, তোমার উট এবং সামানপত্র দেখে নাও।

আমি লোকটিকে ঘটনা জিজ্ঞেস করলে সে বললো, আবু কোবাইস পাহাড়ের অপর প্রান্তে এক লোক আমার দৃষ্টিগোচর হয়। সে ঘোড়ায় আরোহিত ছিল। লোকটি এসে আমাকে বললো, ওহে চোর! তোমার হাত এগিয়ে দাও। আমি হাত এগিয়ে দিলে সে আমার হাত পাথরের উপর রেখে আরেকটি পাথর এর উপর মারে। এতে আমার হাত কেটে যায়। অতঃপর লোকটি কর্তিত হাত আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে বলে, পাহাড়ের নিচে যাও এবং এই উট যার, তাকে বুঝিয়ে দিয়ে আস। (গুনিয়াতুত ত্বলিবীন-৩০৯)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৪)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৫)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৬)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছারল ল মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৭)

মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৮)