মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৭১) ফানা-এর মাক্বামে অবস্থানকারী কতিপয় আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম

সংখ্যা: ২১২তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

পূর্ব প্রকাশিতের পর

ওই পাহাড়ের চূড়া ছিল অতি উঁচু। সেখানে আরোহণের ক্ষেত্রে হাবীবুল্লাহ হযরত জুননূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অসমর্থতার কথা প্রকাশ করলেন।

এবার দরবেশ নিজেই উনার কাছে উনার পরিচয় দিতে শুরু করলেন। দরবেশ বললেন, এই পর্বত শৃঙ্গের এক কুঁড়ে ঘরে একজন দরবেশ বহুদিন ধরে আল্লাহ পাক উনার ইবাদতে মশগুল ছিলেন। একদিন এক ব্যক্তি উনার সাথে কথা প্রসঙ্গে বললেন যে, ব্যবসা-বাণিজ্য করা ছাড়া লোকের পক্ষে জীবিকাজর্ন সম্ভব নয়। এ কথা শুনে উক্ত দরবেশ কসম করে বললেন, চেষ্টা ও পরিশ্রম করে রুজী অর্জন আমি করবো না, দেখি আল্লাহ পাক নিজে আমার রুজীর ব্যবস্থা করেন কি না? এভাবে শপথ করতঃ কয়েকদিন তিনি কোন কিছু পানাহার করলেন না। তারপর আল্লাহ পাক মৌমাছিদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা উনাকে মধু সরবরাহ করে। তখন থেকে তিনি নিয়মিত মধু পান করছেন। সুবহানাল্লাহ!

হাবীবুল্লাহ হযরত জুন্নূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, দরবেশের কথা শুনে আমার মনের অবস্থা পরিবর্তন হল। পবিত্র কুরআন শরীফ-এর এই আয়াত শরীফদ্বয় বার বার মনে উদয় হলো-

ومن يتوكل على الله فهو حسبه

অর্থ: যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে তার জন্য মহান আল্লাহ পাক তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা তলাক্ব: আয়াত শরীফ ৩)

وعلى الله فليتوكل الـمؤمنون

অর্থ: ‘মু’মিনগণের দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহ পাক উনার উপরই তাওয়াক্কুল (নির্ভরশীল) করা। (সূরা তওবা: আয়াত শরীফ ৫১)

আর আমার এ বিশ্বাস জন্মিল যে, যারা শুধু আল্লাহ পাক উনার প্রতি পূর্ণ নির্ভরশীল, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক উনাদের জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেন। অতঃপর আমি ওই দরবেশের কাছ থেকে ফিরে এলাম। পথে দেখতে পেলাম, একটি অন্ধ পাখি গাছের শাখা থেকে মাটিতে নেমে এল। এ দৃশ্য দেখে আমার মনে কৌতুহল জাগল যে, দেখি এ পাখিটি কিরূপে কোথা থেকে আহার যোগাড় করে। দেখতে পেলাম, পাখিটি ঠোঁট দিয়ে মাটি খুঁড়ে ফেলল, অমনি তার মধ্য থেকে খাদ্য ভর্তি একটি স্বর্ণের পেয়ালা, পানি ভর্তি একটি রৌপ্যের পাত্র বের হয়ে এল। পাখিটি তা থেকে পানাহার করে আবার উক্ত গাছের শাখায় গিয়ে বসলো। সাথে সাথে সেই খাদ্য ও পান পাত্র দুটোই অদৃশ্য হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখার সাথে সাথে আমার আল্লাহ পাক উনার প্রতি তাওয়াক্কুল বা নির্ভরশীলতা আরো বেশি মজবুত হলো।

পাশাপাশি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এই হাদীছ শরীফখানাও স্মরণ হলো-

لو انكم يتوكلون على الله حق توكله لرزقكم كما يرزق الطير تغدو خماصا وتروح بطانا.

অর্থ: তোমরা যদি মহান আল্লাহ পাক উনার উপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল করতে পার তাহলে তিনি তোমাদেরকে সেভাবে (কুদরতী) রিযিক দিবেন যেভাবে পাখিকে (কুদরতী) রিযিক দিয়ে থাকেন। পাখি সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে বাসায় ফিরে আসে।” অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে কুদরতী রিযিক পেয়ে থাকে। (তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত শরীফ-৪৫২)।

এই ঘটনার পর একদিন হাবীবুল্লাহ হযরত জুন্নূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গী-সাথীসহ এক জঙ্গলে গিয়ে পৌঁছলেন। সেখানে তিনি একটি ধনাগার দেখতে পেলেন। যেখানে স্বর্ণ ও রৌপ্যের স্তূপ ছিল। আর সে ধনাগারের মুখে একটি কাঠের ফলকে আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক অঙ্কিত ছিল। হাবীবুল্লাহ হযরত জুন্নূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গী-সাথীগণ স্বর্ণ ও রৌপ্য নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিল। হাবীবুল্লাহ হযরত জুন্নূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে শুধু মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক নামাঙ্কিত কাঠের ফলকখানি নিলেন। আর পরম আদরে বার বার তাতে চুম্বন করত লাগলেন। তার ফলে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট হলেন। রাতেই তিনি স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন, স্বয়ং আল্লাহ পাক উনাকে বলছেন, হে প্রিয় জুন্নূন রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনার সঙ্গী-সাথীগণ সকলেই স্বর্ণ এবং রৌপ্যের প্রতি আকৃষ্ট হল, কিন্তু আপনি সেদিকে লক্ষ্য করলেন না। আমার নাম মুবারক অঙ্কিত কাঠের ফলকটি মহামূল্যবান মনে করে তাই গ্রহণ করলেন। তার পুরস্কার স্বরূপ আমিও আপনার জন্য মা’রিফাত ও মুহব্বতের সকল ইলম ও হিকমতের দ্বার খুলে দিলাম। সুবহানাল্লাহ! (তাযকিরাতুল আওলিয়া)  (অসমাপ্ত)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৪)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৫)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৬)

ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছারল ল মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৭)

মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৫৮)