মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে- (১৬৬)

সংখ্যা: ২০৭তম সংখ্যা | বিভাগ:

প্রসঙ্গ: ফানা ও বাক্বা

আল্লাহ পাক উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সাথে গভীর তায়াল্লুক, নিসবত প্রতিষ্ঠার জন্য ফানা হওয়া বা অস্তিত্বকে বিলীন করা আবশ্যক। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ তার অস্তিত্বকে ফানা বা বিলীন করতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পূর্ণতায় পৌঁছতে পারবে না। কাজেই, শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট নিজের ব্যক্তিত্ব, অস্তিত্ব, প্রভাব, প্রতিপত্তি ইত্যাদি সবকিছুকে বিসর্জন দিতে হবে। নিজের ইচ্ছা বা ইরাদাকে বিলীন করতে হবে। শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ইচ্ছাই হবে তার ইচ্ছা। কামনা-বাসনাও সেরূপ হতে হবে। তবেই কামিয়াবী লাভের আশা করা যায়।

আফযালুল আউলিয়া, ইমামে রব্বানী, ক্বইয়্যূমে আউয়াল হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ফানা যে পরিমাণ হবে বাক্বাও সে পরিমাণ হবে । তিনি আরো বলেন, ক্বলবের ফানা ও নফসের ফানা এ পথের প্রথম ধাপ। গাইরুল্লার সর্বপ্রকার আকর্ষণ হতে ক্বলব বা অন্তঃকরণ মুক্ত হওয়াকে ক্বলবের ফানা বলে। আর সর্বপ্রকার বদ খাছলত হতে নফসকে মুক্ত রাখাকে নফসের ফানা বলে।

তিনি আরো বলেন, বিলায়েত বা ওলীত্ব ফানা এবং বাক্বাকেই বলা হয়ে থাকে। এটা হয়তো আম বা সাধারণ হবে নতুবা খাছ বা বিশিষ্ট হবে।

বিলায়েতে আম-এর অর্থ হচ্ছে, সাধারণ নৈকট্য। বেলায়েতে খাছ হচ্ছে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলায়েত বা নৈকট্য। উক্ত বিলায়েতের মধ্যে ফানা (বিলীন) বাক্বা (স্থায়িত্ব) পূর্ণরূপে হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি এই উচ্চ নিয়ামত পেল ইবাদত-বন্দিগী, যিকির-ফিকির, রিয়াযত-মাশাক্কাতের জন্য তার শরহে ছুদূর বা অন্তর প্রসারিত হলো, নফস প্রশান্ত হলো। ফলে সে তার রব আল্লাহ পাক উনার প্রতি সন্তুষ্ট এবং আল্লাহ পাক তিনিও তার প্রতি সন্তুষ্ট হলেন। (মাকতুবাত শরীফ-১/২১৪)

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত অন্যের আকর্ষণ হতে ক্বলব বা অন্তঃকরণকে মুক্ত রাখা আমাদের সকলের কর্তব্য। এমনিভাবে মুক্ত রাখা আবশ্যক যে, অন্যের কোন কিছুর চিন্তাও যেন ক্বলবে প্রবেশ করতে না পারে। যদি কারো হায়াত হাজার বছর হয় তথাপি যেন তার অন্তরে অন্যের চিন্তা প্রবেশ করতে না পারে। যেহেতু তার অন্তঃকরণ আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত অন্যকে পূর্ণরূপে ভুলে গিয়েছে। এটাই হচ্ছে মূল কাজ। আর অন্য সবই অনর্থক। (মাকতুবাত শরীফ ১/১৬১)

যে পর্যন্ত রোগী রোগ মুক্ত না হয়, সে পর্যন্ত কোন খাদ্যই তার জন্য উপকারী হয় না। বরং তা দ্বারা রোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। কাজেই, সর্বপ্রথম তার রোগ মুক্তির চেষ্টা করতে হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক শক্তি ফিরে আসে। একইভাবে মানুষের ক্বলব বা অন্তঃকরণ যখন ব্যাধিগ্রস্ত হয় তখন তার কোন ইবাদত-বন্দিগীই ফলপ্রসূ হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে অপকারী হয়। আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন-

رب صائم ليس له من صيامه الا الظماء ورب قائم ليس له من قيامه الا السهر

অর্থ: æঅনেক রোযাদার রয়েছে যারা রোযা দ্বারা ক্ষুধা-পিপাসা ব্যতীত কিছুই লাভ করতে পারে না। আর অনেক রাত জাগরণকারী রয়েছে, যারা রাত জাগরণের কষ্ট ব্যতীত কিছুই লাভ করতে পারে না।” (দারিমী, মিশকাত)

মাশায়িখে ইজাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ তদ্রƒপ রোগমুক্তির নির্দেশ দেন। আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত অন্য কারো সাথে তার মুহব্বত বা আকৃষ্টতা তা যেন নিজের সাথেই আকর্ষণ। কেননা যে কেউ যে কোন বস্তুর আকাঙ্খা করুক না কেন তা নিজের জন্যই হয়ে থাকে। সন্তান-সন্ততিগণকে ভালবাসে তাও নিজের জন্যেই ভালভাসে। একইভাবে ধন-সম্পদ, কর্তৃত্ব এবং মান-সম্মান ইত্যাদির ভালবাসাও অনুরূপ। কাজেই, প্রকৃতপক্ষে তার নফসের আকাঙ্খাই তার মা’বুদ বা উপাস্যতুল্য। যে পর্যন্ত উক্ত মুহব্বত হতে মুক্তি লাভ না হবে, সে পর্যন্ত তার কামিয়াবী লাভ হওয়া কঠিন। (মাকতুবাত শরীফ ১/১৮৬)

উপরোক্ত বক্তব্যসমূহের ব্যাখ্যা হলো আহাল ও ইয়াল আল-আওলাদ, মাল-সম্পদ, ধন-দৌলত, টাকা-পয়সা, মান-সম্মান ইত্যাদি যদি গাইরুল্লাহ হাছিলের উদ্দেশ্য হয় তাহলে তা না কামিয়াবীর কারণ। আর যদি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইত্তিবার লক্ষ্যে হয় অর্থাৎ আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে হয় তাহলে তা কামিয়াবীর কারণ। (অসমাপ্ত)

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম

মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৬৭)

মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৬৮)

মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৬৯)

মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৭০)

মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (১৭১) ফানা-এর মাক্বামে অবস্থানকারী কতিপয় আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম